বাংলাদেশের শিশুদের সঙ্গে অড্রে হেপবার্ন
বাংলাদেশের শিশুদের সঙ্গে অড্রে হেপবার্ন ইউনিসেফ

অড্রে হেপবার্ন মারা যান ১৯৯৩ সালের ২০ জানুয়ারি। তাঁকে সবাই চেনে রোমান হলিউডের 'রাজকুমারী' হিসেবে। কিন্তু এপিজেনেটিকসের রহস্য উন্মোচনেও যে তাঁর জীবনের বড় একটা ভূমিকা আছে সে কথা কজন জানেন? তাঁকে নিয়ে হয়েছিল জিন গবেষণা। সে গবেষণা থেকে উঠে এসেছিল জিনবিজ্ঞানের অনেক অজানা তথ্য। গতকাল ২০ জানুয়ারি ছিল তাঁর সাতাশ তম মৃত্যুবার্ষিকী।

বিজ্ঞাপন

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারীর তকমা তাঁরই অধিকারে ছিল। এখনো আছে অনেকের কাছে। তিনি অড্রে হেপবার্ন। দি রোমান হলিডে, ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস, মাই ফেয়ার লেডির ভুবনমোহিনী নায়িকা। সৌন্দর্যের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন তিনি। ক্ষীণ, শীর্ণকায়া, বালিকাসুলভ, ফ্যাকাশে মেয়েটির আশ্চর্য বাঙময় দুটি চোখ আর ছটফটে এক চড়ুই পাখির মতো চলন, সকলের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। নায়িকা-জীবন শেষে ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে বিশ্ব জুড়ে মানবতার প্রচারে, ইথিওপিয়া থেকে এল সালভাদর, গুয়াতেমালা থেকে সুদান অব্দি অবিরাম ছুটে চলায়, যুদ্ধ আর দারিদ্রের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ শক্ত অবস্থান আর শিশুদের প্রতি গভীর ভালবাসায় এমন অনন্য অসাধারণ নায়িকা আর কে আছে?

শৈশবের অবহেলিত এই নারী বড় হয়ে কেবল ভক্তদের নয়, অনুপম ভালোবাসা পেয়েছেন বন্ধুদেরও। রুগ্ন ক্যান্সার আক্রান্ত তাঁকে জেনেভায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বন্ধু ও ফ্যাশন আইকন গিভেন্সি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ফুলে ফুলে ভরা গোটা একটা বিমান। রবীন্দ্রনাথের প্রতি হেপবার্নের পরম অনুরাগের কথা স্মরণ করে শেষকৃত্যে তাঁর উদ্দেশ্যে বন্ধু ও নায়ক গ্রেগরি পেক রবীন্দ্রনাথ থেকে আবৃত্তি করে কাঁদিয়েছেন সকলকে—‘তোমারেই যেন ভালবাসিয়াছি/ শতরূপে শতবার, জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।’

কিন্তু এই হৃদয়হরণকারিণী নায়িকা যে হরণ করেছিলেন বিজ্ঞানীদের মনোযোগও। অড্রে হেপবার্নের জীবনপ্রবাহ নিয়ে বিশ্বের বড় বড় এপিডেমিওলজিস্টরা লিখেছেন বই। আধুনিক জিনবিদ্যার এক নতুন দ্বার এপিজেনেটিকসের রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানীরা বার বার ফিরে গেছেন অড্রের অতীতে, তাঁর ডিএনএ অ্যানালাইসিসে, তার রোগ বালাই ও মনস্তত্ব বিচারে—আমরা অনেকেই জানি না তা। জিনবিদ্যার পাঠ্যসূচীতে অড্রে হেপবার্ন পঠিত হন এক গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি হিসাবে।

এপিজেনেটিকস হল আমাদের জিনে অবস্থিত রাসায়নিক অণুর এক একটা সেট। এই সেট জিনকে পুরোপুরি পাল্টায় না, ডিএনএর মিউটেশন বা রূপান্তর ঘটায় না, কেবল তার এক্সপ্রেশন বা প্রকাশকে প্রভাবিত করতে পারে। ডিএনএর মূল নীল নকশাকে রূপান্তর না করেই এই অণু মানুষের পরবর্তী জীবনকে উলটে-পালটে ফেলতে পারে আশপাশের পরিবেশের প্রভাবে। এর একটা বড় উদাহরণ ডিএনএর হিস্টোন মডিফিকেশন, যা শৈশবের জীবনাচরণ ও খাদ্যাভ্যাসের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পরবর্তী জীবনে গভীর ছাপ ফেলে যায়। এর একটা বড় উদাহরণ হলেন অড্রে হেপবার্ন।

অড্রের জন্ম ব্রিটিশ ব্যাংকার বাবা আর ডাচ ব্যারোনেস মায়ের ঘরে। ১৯৪৪ সালে যখন তিনি সদ্য কৈশোরে পা দিয়েছেন, তখন নেদারল্যান্ড প্রবেশ করেছে ইতিহাসের কুখ্যাত ডাচ হাঙ্গার উইনটার পিরিয়ডে। বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান নিষেধাজ্ঞা এক ভয়াবহ খাদ্য সংকট সৃষ্টি করেছিল পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে। ১৯৪৪ সালের শীতের শুরু থেকে ১৯৪৫-এর বসন্ত পর্যন্ত স্থায়ী হয় ওই সংকট। স্বাভাবিক দৈনিক ক্যালরি চাহিদার মাত্র ৩০ শতাংশ খেয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছিল ডাচদের তখন। নাৎসিদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে সেলের ভেতর লুকিয়ে থাকতে হচ্ছিল বলে সূর্যের আলোর দেখা মেলেনি। আর সবার মত হেপবার্নের পরিবারও তখন খিদের জ্বালায় টিউলিপ ফুলের কাণ্ড আর ঘাস লতা পাতা খেয়ে জীবনধারণ করেছেন। দিনের পর দিন কাটিয়েছেন অন্ধকার কুঠরিতে। খাদ্যাভাবে ২০ হাজার ডাচ নাগরিক মৃত্যুবরণ করেছিল, সেই ডাচ হাঙ্গার উইনটার কালে। এই ঘটনার এক বিশাল প্রভাব পড়ে সে সময়কার শিশু-কিশোর আর অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ওপর। দীর্ঘকাল ধরে এদের জীবনপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ আর পর্যালোচনা করেছেন নেদারল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা। মাতৃজঠরে আর শৈশবের এই ভয়াবহ খাদ্যাভাব ও অপুষ্টি পরবর্তীতে এদের জীবনে কী প্রভাব ফেলে সেটা দেখতে গিয়েই আবিষ্কৃত হয় এপিজেনেটিকসের অনবদ্য থিওরি।

default-image
বিজ্ঞাপন

দ্য এপিজেনেটিক রিভোলিউশন: হাউ মডার্ন বায়োলজি ইজ রিরাইটিং আওয়ার আন্ডারস্ট্যান্ডিং অফ জেনেটিকস, ডিজিজ অ্যান্ড ইনহেরিটেন্স বইতে এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন ড. নেসা ক্যারি, ইমপেরিয়াল কলেজের বায়োলজিস্ট। তাঁর মতে হেপবার্নের এই ক্ষীণ তনু আর মাত্র ২০ ইঞ্চি কোমরের মাপ কোন সেলিব্রেটি ডায়েটের ফলাফল নয়, যেমন নয় তাঁর আজীবনের রক্তাল্পতা, অস্টিওপোরোটিক বা দুর্বল ভঙ্গুর হাড়, বার বার গর্ভপাত, জরায়ুর এন্ডোমেট্রিওসিস, শ্বাসতন্ত্রের ক্রনিক রোগ, ডিপ্রেশন আর শেষ জীবনের অ্যাবডোমিনাল ক্যান্সারও। ভয়াবহ এক দুর্যোগ শৈশবেই তার জেনেটিক এক্সপ্রেশনকে বদলে দেয়। আপাত সুখি স্বচ্ছল ডাচ পরিবারগুলো যখন আকস্মিকভাবে মুখোমুখি হয় ভয়াবহ অপুষ্টি আর খাদ্যসংকটের—তখন টিকে থাকার উদ্দেশ্যেই জিন তার এপিজেনেটিকস মলিকুলার এক্সপ্রেশনসকে পালটে দিতে বাধ্য হয়। অড্রে হেপবার্ন তারই শিকার। তিনি এই বইতে ধন্যবাদ জানিয়েছেন নেদারল্যান্ডের বিস্ময়কর রেকর্ড কিপিং নৈপুন্যের। যে পদ্ধতিতে পরবর্তী পাঁচ দশক ধরে এদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে গেছেন ডাচ বিজ্ঞানীরা।

তাঁরা আরও লক্ষ করেন যে সেই সময় যাঁরা অন্তঃসত্ত্বা ছিল, তাদের অনাগত শিশুরা এক দুর্ভিক্ষপীড়িত সমাজে জন্ম নেবার জন্য নিজেদের অভিযোজন করে যকৃত, হৃদযন্ত্র আর মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক পরিমাণে চর্বি বা ফ্যাটসেল সংরক্ষণ করে। পরবর্তীতে এই প্রজন্মের মধ্যে মেটাবলিক নানা অস্বাভাবিকতা, ইনসুলিন রেসিসট্যান্স, স্থুলতা, ডায়াবেটিস, করোনারি আর্টারি ডিজিজ, ডিমেনশিয়া, ক্যান্সার ও সিজোফ্রনিয়াসহ নানা রোগের আধিক্য দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয় যে জিনের এই মডিফিকেশন কেবল এক প্রজন্মেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা প্রবাহিত হতে থাকে পরবর্তী প্রজন্মেও। মডিফাইড ট্রান্সজেনারেশনাল এপিজেনেটিক কাইনেটিকস বা মোটেক জিন পরবর্তী প্রজন্মে এই মডিফিকেশন প্রবাহিত করতে সাহায্য করে।

এপিজেনেটিকস এর এই থিওরি বদলে দিতে শুরু করেছে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে। বিজ্ঞানীরা দেখছেন আমাদের বয়সকালে ডায়াবেটিসের মাত্রা কেমন হবে, হৃদযন্ত্রের আর্টারিতে কয়টা ব্লক ধরা পড়বে, স্মৃতিশক্তি কোন বয়সে গিয়ে হারিয়ে যাবে কিংবা মৃত্যু ক্যান্সারে হবে কিনা—সেটা মাতৃগর্ভে আর শৈশবের পরিবেশই নির্ধারণ করে দেয় অনেকটা। এমনকি ঠাকুর পরিবারে একজন রবীন্দ্রনাথ জন্মাবেন কিংবা বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজবার আগে জার্মানিতে জন্মাবেন একজন আইনস্টাইন—এও যেন এপিজেনেটিকসেরই খেলা।

টিকে থাকার জন্য অভিযোজন করতে গিয়েই বদলায় জিনের এক্সপ্রেশনস। বংশ পরম্পরায় আমরা কেবল জিন নয়, জিনের ওপরকার এপিজেনেটিক মলিকিউল দ্বারা চালিত হই। তাই একজন অপুষ্ট শীর্ণ অসুস্থ অড্রে হেপবার্ন সেলিব্রেটি বর্ণাঢ্য জীবন শেষে শীর্ণ কালো দরিদ্র শিশুদের জড়িয়ে ধরেন স্বতঃস্ফুর্তভাবে। বিখ্যাত ফটোগ্রাফার জন আইজ্যাক যার সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘আমি এমনটা আর কারও বেলায় দেখিনি, শিশুরা যেমন করে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর ওপর। যেন তিনি এক পাইড পাইপার, হ্যামিলনের বাঁশিওলা। আর অড্রে হেপবার্ন নিজে বলেছিলেন তাঁর জীবন নিংড়ানো সেই সত্য কথাটি—শিশুদের সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক কারণে বিশ্ব জুড়ে মানবতার সাহায্যের দরকার নেই, আসলে দরকার রাজনীতিকেই মানবিক করে তোলা!

অনেকেই জানে না চলচ্চিত্র, ব্যালে, হিউম্যানেটিরিয়ান এইড জগতের মতো বিজ্ঞানের জগতের মানুষও অড্রে হেপবার্নের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁর জীবন ও যাতনা বিজ্ঞানীদেরও শিখিয়েছে অনেক কিছু। কত কী ই না দিয়েছেন এই ছোট্ট পলকা মানুষটি আমাদের। এ পৃথিবী একবারই পায় তারে, পায় নাকো আর। অড্রে হেপবার্নের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই বিজ্ঞানচিন্তারও শ্রদ্ধার্ঘ্য।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনলজি ওন্ড মেটাবলিজম বিভাগ, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা

বিজ্ঞানচিন্তা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন