অবাস্তব বাস্তবতার গল্প

রাস্তায় নেমে একটুও দেরি না করে রিস্টব্যান্ডে অদিতিকে কানেক্ট করল দীপ্ত। কয়েকবারের চেষ্টায় ধরতে পারল অদিতিকে। উত্তেজনায় ঠিকমতো কথাই বলতে পারছে না সে।

দারুণ একটা খবর আছে অদিতি! ফোর্স টোয়েন্টি নাইনে আমি শেষ পর্যন্ত সিলেকটেড হয়েছি! শুনতে পাচ্ছ? আজকেই খবর পেলাম। এইমাত্র।

অদিতিকেও উচ্ছ্বসিত শোনাল এ খবরে—ওয়াও! দারুণ ব্যাপার, তোমার স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে তাহলে।

হাঁটতে হাঁটতে ফুটপাত ছেড়ে পার্কের মধ্যে ঢুকে পড়ল দীপ্ত। একটা দেবদারুগাছের নিচে এসে বলল, দাঁড়াও, ভালো করে আড্ডা দেওয়া যাক। সব বলছি। তুমি এক্ষুনি চলে এসো তো।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গাছের নিচে অদিতির হলোগ্রাফিক অবয়ব এসে হাজির। চুল ছোট করে কেটেছে মেয়েটা। কপালের ওপর ছোট ছোট চুল ছড়িয়ে আছে। ভারি মিষ্টি লাগছে দেখতে। দীপ্ত খুশি হয়ে ওর হাত ধরল—বিশ্বাস হচ্ছে না আমার। ওরা শেষ পর্যন্ত আমাকে নিল।

অদিতিও হাসল—কেন নেবে না? তুমি হচ্ছো এই দশকের সবচেয়ে দক্ষ হ্যাকার। তিন-তিনটে প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছ। তোমাকে নেবে না তো কাকে নেবে?

দীপ্ত পা ছড়িয়ে গাছের নিচে বসল। তার পাশে বসল অদিতির হলোগ্রাফিক অবয়ব। আসল অদিতি এই মুহূর্তে বহু দূরে, সিউলের একটি ইনস্টিটিউটে সেতু নির্মাণের ওপর প্রশিক্ষণ নিতে গেছে। কিন্তু দীপ্তর মনে হচ্ছে, অদিতি খুব কাছেই রয়েছে। এই যে ওর কপালের খুচরো চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। এমনকি হাতের ভেতর ওর হাতের উত্তাপও টের পাওয়া যাচ্ছে। অদিতির হাতে একটু চাপ দিয়ে দীপ্ত বলল, সামনের সপ্তাহেই মিশন শুরু হবে।

মিশনের বিষয়টা খোলাসা করা যাক। তিন মাস আগে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের ওপর প্রথম বড় একটা আঘাত হেনেছিল টুইয়ানরা। তছনছ করে দিয়েছিল ওদের নেটওয়ার্ক সিস্টেমকে। ধাক্কাটা সামলাতে অনেক দিন গেছে। তার ওপর চিরতরে হারিয়ে গেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এই বিশাল ক্ষতি সামলে উঠতে না উঠতে আরেকটা আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিয়েছে ওরা, এমনটাই খবর মিলেছে। কিন্তু কাউন্সিল এবার সাবধান। উল্টো টুইয়ানদের ওপর ভালো রকমের একটা সাইবার আঘাত করার পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। গড়ে তোলা হয়েছে একটা সুদক্ষ টিম। এই দলেরই নাম ফোর্স টোয়েন্টি নাইন। এলিট এই দলে নাম লেখানোর জন্য এই সময়ের তরুণেরা একেবারে বেচয়েন। অনেক যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই কেবল দলে নেওয়া হচ্ছে কাউকে। দীপ্তর স্বপ্ন ছিল এই দলে কাজ করার। স্বপ্নটা শেষ পর্যন্ত সফল হলো। অনেক মাথা খাটাতে হবে এখন। নইলে টিমে টেকা যাবে না।

অদিতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তোমাকে হয়তো ওরা আর আমার সঙ্গে কথা বলতে দেবে না। মিশনের গোপনীয়তা রক্ষায় এটাই তো নিয়ম। বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ। তাই না?

একটু মন খারাপ হলো দীপ্তরও। বলল, হ্যাঁ, তা ঠিক। তবে মোটে তো কটা দিন। আমাদের মিশন শেষ হতে বেশি সময় লাগবে না দেখো। তারপর তো সব আগের মতো। বেশ, এই কাজে আমি যা রোজগার করব, তা দিয়ে তুমি আমি কোথাও ঘুরে আসতে পারব। কোথায় যাওয়া যায় বলো তো?

অদিতি বলল, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ। আমার খুব যাওয়ার ইচ্ছে।

দীপ্ত আঙুলে চুটকি বাজাল—ওকে। ডান। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ। আমরা যাচ্ছি। মিশন শেষ হওয়ার পর। টানা সাত দিন থাকব। খুব মজা হবে। তাই না?

অদিতি উঠে দাঁড়াল ঘাস ছেড়ে—আমার ক্লাস আছে। এবার যেতে হবে। কাল নাহয় আবার আসব। সিইউ। বাই।

অদিতি হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার পর দীপ্ত আরেকবার বাতাসে আঁকিবুঁকি করে কাউন্সিলের চিঠিটা খুলল। ইউ হ্যাভ বিন সিলিক্টেড ইন ফোর্স টোয়েন্টি নাইন। কোথাও যেতে হবে না তোমাকে। তোমার ঘরেই একটা বিশেষ স্ক্রিন রিস্টব্যান্ডসহ পৌঁছে দেওয়া হবে। অন করলেই ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়াল পেয়ে যাবে। স্বাধীনভাবে কাজ করো। কাজের কোনো সময়-অসময় নেই। কাজটা শেষ করতে পারলেই হলো। উইশ ইউ গুড লাক।

বাতাসেই চিঠিটা গুটিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল দীপ্ত। এবার ঘরে ফিরতে হবে। যেকোনো সময় কাজ শুরুর আদেশ আসতে পারে। এখন থেকে আর ঘরের বাইরে বেশি যাবে না সে। পার্কের ঝরাপাতার ওপর দিয়ে একটা সুখী কাঠবিড়ালির মতো লাফাতে লাফাতে বাড়ির পথে রওনা দিল দীপ্ত।

বিজ্ঞাপন

দুই

তোমার কি মনে হয়? ও পারবে?, চোখ নাচিয়ে প্রশ্ন করলেন কবির আহমেদ। পাশে বসে তাঁর স্ত্রী রুবিনা বায়বীয় আয়নায় চুল ঠিক করছিলেন। হাত দিয়ে আয়নাটা বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে হাসলেন—পারতেই হবে। আমি ওকে সাপোর্ট করছি। ইয়ং হ্যান্ডসাম গাই। আই লাইক হিম, বলে হাসলেন রুবিনা। কবির আহমেদ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। বললেন, অত সহজ নয়। প্রতিপক্ষ কিন্তু বেশি বুদ্ধিমান। কী চাল চালবে কে জানে!

রুবিনা চুলে রিবন বাঁধতে বাঁধতে বললেন, টুইয়ানদের হোস্ট মোটেও রোমান্টিক নয়। ওখানে কোনো আবেগ-অনুভূতির বালাই নেই। আমার এ রকমটা ভালো লাগে না। আমাদের দীপ্ত, এই দেখো, কত মানবিক। অদিতিকে ভালোবাসে। অদিতির জন্য ফিল করে। এটাই ওকে জিতিয়ে দেবে।

কবির আহমেদ একটা হাই তুললেন। ঘুমচোখে বললেন, আমি এখন ঘুমিয়ে পড়ছি। গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটলে আমাকে জানিয়ো।

কবির শুতে গেলে রুবিনা তাঁর ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। ঘন অন্ধকার আকাশে দূরে কয়েকটি তারা জ্বলজ্বল করছে। ওগুলোরই কোনো একটায় হয়তো টুইয়ানরা থাকে। কেমন তাদের জীবনযাত্রা, কীভাবে তারা কথা বলে, খায়, একে অপরকে ভালোবাসে? এই অজানা জীবদের সঙ্গে কি আদৌ পেরে উঠবে দীপ্ত? ব্যাপারটা ওর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠবে না তো? তার চেয়ে বড় কথা, দীপ্ত কোনো বিপদে পড়লে অদিতির কী হবে? মেয়েটাকে তিনি খুবই পছন্দ করেন। দীপ্তর এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁর ভালো লাগছে না। রুবিনা জানেন, অদিতি একটা সহজ-সরল সাধারণ গড়পড়তা জীবন চায়। যেখানে সে আর দীপ্ত সময় পেলেই সমুদ্রের ধার ধরে খালি পায়ে হাঁটবে, শামুক কুড়াবে, ইচ্ছে হলে প্রজাপতি ধরার জন্য দিনমান ছুটবে, আর একটা সাদা বেড়া দেওয়া ছোট্ট একতলা বাড়িতে নিজেদের জীবন কাটিয়ে দেবে। রাতের অন্ধকার হাওয়ায় রুবিনার ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস মিলিয়ে গেল। এ রকম একটা জীবনের স্বপ্ন কি তিনিও একসময় দেখতেন?

তিন

নিজের ছোট্ট চৌদ্দ বাই চৌদ্দ ফুট কিউবিকলটাই দীপ্তর অফিস। সায়েন্স কাউন্সিল প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো আগেই পৌঁছে দিয়ে গেছে। পশ্চিম দিকের দেয়ালটাকে স্ক্রিন বানিয়ে নিয়েছে দীপ্ত। একের পর এক ইনপুট দিচ্ছে। পাসওয়ার্ড পাল্টাচ্ছে। প্রবাবিলিটি নিরীক্ষা করছে। দিন নেই রাত নেই। সময়-অসময় নেই। নাওয়া-খাওয়া নেই। দীপ্তর দিনগুলো কীভাবে যে কেটে যাচ্ছে সে নিজেও জানে না।

প্রথমে ওকে একটা মেলিশিয়াস ফাইল তৈরি করতে হবে। মনে মনে ভাবে দীপ্ত। কিন্তু ফাইল তৈরিরও আগে যে কাজটা জরুরি তা হলো টুইয়ানদের নেটওয়ার্কে কোনো একটা ছিদ্র বা রন্ধ্র খুঁজে বের করা। টুইয়ানরা কীভাবে সায়েন্স কাউন্সিলের নেটওয়ার্কে ঢুকেছিল, তা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখল দীপ্ত। দেখে একটুখানি চমকেই গেল সে। জলি গুড। কাউন্সিলেরই এক হর্তাকর্তার মেইল আইডি ব্যবহার করেছে ওরা। তার ছদ্মনাম ফ্যালকন। ফ্যালকনের আইডি হুবহু নিজের করে নিতে বেশি সময় লাগল না দীপ্তর। এবার টুইয়ানদের সঙ্গে একটা দুর্বল যোগাযোগ বোধ হয় তৈরি করা যাবে। দীপ্ত কয়েকটা কনটাক্টে এলামেলো পোক করল। আর তখনই রিস্টব্যান্ডে মেসেজ ভেসে উঠল একটা—হাই।

অদিতি। অদিতিকে এই কটা দিন যোগাযোগ করতে নিষেধ করে দিয়েছিল দীপ্ত। কিন্তু মেয়েটা কথা শুনছে না। প্রায়ই কনটাক্ট করছে। দীপ্ত একটু বিরক্তই হয়।

মিস ইউ। আর কত দিন?—আবার! ওফ, এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা গেল না। একেবারে অধৈর্য হয়ে উঠেছে। দীপ্ত রেসপন্স করল না। তার সব চেতনাজুড়ে আছে একটাই বিষয়। কীভাবে টুইয়ানদের নেটওয়ার্কে ঢোকা যায়।

ওদিকে অদিতি নিজের ল্যাবে গভীর রাতে একা অনেকক্ষণ বসে থেকেও কোনো রেসপন্স না পেয়ে মন খারাপ করে একসময় উঠে দাঁড়ায়। এই ফোর্স টোয়েন্টি নাইন মিশনটাই সব সর্বনাশের মূল। কত দিন ধরে এই মিশন চলবে কে জানে! হতে পারে মিশন শেষ হতে হতে ওরা বুড়োবুড়িই হয়ে গেল। এই জীবনে সাদা বেড়ার ছোট্ট একতলা বাড়িতে থাকা আর হবে না ওদের। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অদিতি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিজের কিউবিকলের দিকে রওনা দেয়। দৃশ্যটা দেখে বহু দূরে নিজের ৩৮৪ তলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রুবিনাও। ব্যাপারটা তাঁর ভালো লাগছে না। দীপ্ত দূরে সরে যাচ্ছে অদিতির কাছ থেকে। বিভোর হয়ে আছে তার প্রোগ্রামে। এই নেশা মারাত্মক, নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছেন রুবিনা। এবার মনে হয় ব্যাপারটাতে তাকে হস্তক্ষেপ করতে হবে।

তিন দিন পর ছোট্ট একটা কনটাক্ট থেকে ছোট্ট একটা রেসপন্স চোখে পড়ে দীপ্তর। আশাবাদী হয়ে উঠল সে। মাথায় লাল ব্যান্ড পরা একটা বিড়ালের ছবি পাঠাল দীপ্ত। উত্তরটা এল কয়েক মিনিট পর। ছবিতে একটা উজ্জ্বল মোটা কাঠি। এবার দীপ্ত পাঠাল একটা লাল আপেল। উত্তর একটা নীল চারকোনা কিউব। দীপ্ত পাঠাল একটা সবুজ বল। পাল্টা উত্তর এল—একটা চ্যাপ্টা বইয়ের মতো জিনিস। চার দিন চার রাত ধরে এই পাল্টাপাল্টি ছবি চলল। তারপর দীপ্ত একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাল যে টুইয়ানদের জগতে চার বাহুবিশিষ্ট বস্তু ছাড়া আর কিছু নেই। গোলাকার, ত্রিভুজ বা অন্য কোনো আকৃতি সম্বন্ধে ওদের কোনো ধারণা নেই। কেননা, তাদের সবকিছুই বর্গাকার। ব্যাপারটা আবিষ্কার করতে পেরে খুশি হয়ে উঠল সে। এবার কাজটাকে একটু গুছিয়ে আনা যাবে।

চার

ছেলেটা জিনিয়াস। মনে মনে ভাবলেন কবির আহমেদ। খেলা বেশ জমে উঠেছে। টুইয়ানদের হোস্ট পুরো বিষয় সম্পর্কে এখনো অন্ধকারে। এটা ওদের একটা বড় দুর্বলতা। রুবিনাকে ডেকে তিনি প্রশংসা করলেন—তোমার ইয়ং হ্যান্ডসাম গাই বেশ বুদ্ধি রাখে। অন্যদের তুলনায় সে ভিন্নপথে এগোচ্ছে। আই থিংক হি উইল সাকসিড।

রুবিনা মুখ গোমড়া করে বললেন, কিন্তু অদিতির কী হবে? মেয়েটা তো ভরসা হারিয়ে ফেলছে।

কবির আহমেদ পাত্তা দিলেন না কথাটা। হাত নেড়ে বললেন, আরে মিশন শেষ হলে তো আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে। দীপ্ত আবার ফিরে যাবে আগের জীবনে। তাই না?

রুবিনা চুপ করে রইলেন। তিনি জানেন, কোনো কিছুই আর আগের মতো হয় না। যে সময় হারিয়ে যায়, তা আর কখনো ফিরে আসে না।

দীপ্ত একের পর এক নানা আকৃতির নানা কিসিমের ছবি পাঠিয়ে চলেছে। প্রাপকেরও আগ্রহের সীমা নেই। এসব তারা কখনো দেখেনি। কদিনে বেশ খাতির জমিয়ে ফেলল সে। এবার ছবি পাঠাতে লাগল জোড়ায় জোড়ায়। কোনটাতে একটা গোলাকার জিনিস, সঙ্গে একটা বর্গাকার। কখনো দুটোই গোল। তারপর দুটোই পাঁচকোনা। এভাবে একটা ভাষা তৈরি করে ফেলল সে। টুইয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগের সাংকেতিক ভাষা। কয়েক দিন পর অপর পক্ষের ভাষাও বুঝতে শুরু করল সে। যেমন একদিন টুইয়ান প্রশ্ন করল—এটা কী?

এটা কমলা।

কমলা কী?

একটা ফল।

ফল মানে?

ফল গাছে ধরে। আমরা খাই।

খাই মানে? কীভাবে খাও?

মুখ দিয়ে।

মুখ কী?

মুখ হচ্ছে এই যে এ রকম। হাঁ করে খোলা যায়।

টুইয়ানটা যারপরনাই আশ্চর্য হয়। তার জানার আগ্রহ বেড়ে যায়। দীপ্ত একটু একটু সুতো ছাড়তে থাকে। ধীরে বাছা ধীরে। মাঝেমধ্যে সে-ও জানতে চায়। তুমি কীভাবে চলাচল করো?

চলাচল করব কেন?

তোমরা তবে এক জায়গায় স্থির থাকো? নড়াচড়া করো না?

নড়াচড়া কেন করব?

ধরো খাওয়াদাওয়া। কাজকর্ম।

কাজকর্ম তো করি। সারাক্ষণ করি। আমাদের কাজই হলো কাজ করা।

কী কাজ?

ভাবা।

তোমাকে ভাবনার কিছু রসদ দেব? নেবে?—সাবধানে প্রস্তাব দেয় দীপ্ত।

অনুমতি লাগবে।

কার অনুমতি?

গ্রহের।

গ্রহ কীভাবে অনুমতি দেবে? গ্রহ কি জীবন্ত?

অপর পক্ষ কোনো উত্তর দেয় না এবার। সম্ভবত অনুমতি নেই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার। কিন্তু দীপ্ত প্রতিদিন চেষ্টা চালিয়ে যায়।

ওদিকে অদিতি প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে। পাকা তিন মাস হতে চলল। দীপ্ত বোধ হয় আর ফিরে আসবে না। সে একা একা ঝাউগাছঘেরা পথে হেঁটে বেড়ায়। সমুদ্রের লোনা পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকে। কখনো রাতের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। এসব দেখে রুবিনার আরও মন খারাপ হয়ে যায়। একদিন রুবিনা কবির আহমেদকে বলেই বসেন—অনেক হয়েছে। এবার বাদ দাও দেখি।

কবির আঁতকে ওঠেন—কী বলো? তীরে এসে তরি ডুববে? টুইয়ানদের হোস্ট বেকায়দায়। আমরা এবার শেষ চাল চালব।

কী হবে এসব করে বলো তো? ধরা যাক, টুইয়ানদের হোস্ট হেরে গেল। তারপর? তারপর কী হবে? রুবিনা বলেন।

কবির আহমেদ হাসেন—আরেকটা প্রোগ্রাম বানাব।

কিন্তু রুবিনা বলেন, এসব করে কী লাভ?

কবির আহমেদ একটু অবাক হন—তাহলে আমরা কী করব? আমাদের জীবনের অর্থ কী তাহলে?

রুবিনা নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। কী আশ্চর্য! এই লোকটা একদিন কত অন্য রকম ছিল!

বিজ্ঞাপন

পাঁচ

মেলিসিয়াস ফাইলটা প্রায় তৈরি করে এনেছে দীপ্ত। টুইয়ানটার সঙ্গে যোগাযোগও অব্যাহত আছে। আগ্রহের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে ওকে সে। একটা বোঝাপড়ায়ও পৌঁছেছে। আমি তোমাকে কিছু তথ্য দেব। বিনিময়ে তুমি কিছু দেবে?

কী তথ্য?

এই ধরো, তোমার সম্পর্কে। তোমাদের সম্পর্কে।

আমাদের কোনো তথ্য দেওয়া যাবে না। নিষেধ আছে।

শুনে দীপ্ত মুচকি হাসে—বেশ, তোমাকে কিছু দিতে হবে না। তবে আমাদের এত বিধিনিষেধ নেই। আমরা স্বাধীন।

স্বাধীন মানে কী?

স্বাধীন মানে আমরা যা খুশি তা-ই করতে পারি। যা আমার ভালো লাগে। যেমন আমি চাই নিজেকে জানাতে।

কেন?

কারণ তুমি আমার বন্ধু।

বন্ধু মানে?

বন্ধু মানে যাকে নিজের সব কথা বলতে ইচ্ছে করে।

টুইয়ান চুপ করে থাকে। দীপ্ত বেশ বুঝতে পারে এবার সময় হয়েছে। সে ফাইলটা পাঠিয়ে দেয়। সে জানে, টুইয়ান ফাইলটা খুলবে। গ্রহের অনুমতি ছাড়াই খুলবে। আর খোলামাত্রই টুইয়ানদের সব নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়বে এই ভাইরাস। ছয় ঘণ্টার মধ্যেই গ্রাস করে নেবে সবকিছু। বন্ধুত্বের খোলসে সে পাঠিয়ে দিয়েছে এক সর্বনাশা জীবাণু।

দীপ্ত অনেক দিন পর স্ক্রিনের সামনে থেকে উঠে কিউবিকলের বারান্দায় দাঁড়ায়। মহাকাশের দিকে চেয়ে মুচকি হাসে। এবার সে এই কিউবিকল থেকে বেরোবে। কোথায় যেন যাওয়ার কথা ছিল তার? ও হ্যাঁ, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ। অদিতিকে এবার ডাকতে হবে।

সে রাতে কবির আহমেদের চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেল রুবিনার। আরে, শিগগির এসো। দেখো, আমরা জিতে গেছি। টুইয়ানদের হোস্ট গো-হারা হেরেছে। উই আর দ্য বেস্ট। ইয়াহু।

রুবিনা ঘুমভাঙা চোখে স্বামীর দিকে তাকান। ভাঙা গলায় বলেন, এবার কী হবে?

কী আবার হবে? কবিরকে উচ্ছ্বসিত দেখায়। আবার একটা প্রোগাম বানাব। এই খেলা শেষ। বাট ইউ নো, আই রিয়েলি এনজয়েড দ্য গেম।

ওদিকে টুইয়ানদের সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ককে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে দীপ্ত যখন অদিতিকে খুঁজতে বেরিয়েছে, তখনই এক অদ্ভুত আর মর্মান্তিক সত্যের মুখোমুখি হতে হলো তাকে। যে সত্য সম্পর্কে ঘুণাক্ষরেও কোনো ধারণা ছিল না তার নিজের বা অদিতির। কিন্তু অদিতিই প্রথম বিষয়টা টের পায়। হলোগ্রাফিক অবয়বে দীপ্তর কিউবিকলে হাজির হয়ে বিষণ্ন ভঙ্গিতে ওর হাত ধরে অদিতি বলে—আমাদের আর সমুদ্রের ধারে সাদা বেড়া দেওয়া ছোট্ট একতলা বাড়িতে সংসার পাতা হলো না! কেন? কেন হবে না? দীপ্ত আকুল হয়ে প্রশ্ন করে।

অদিতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে—তুমি সব সময় ব্যয় করে ফেলেছ। আমাদের আয়ু শেষ।

দীপ্ত এবার ভয় পেয়ে যায়—মানে? মানে কী?

অদিতি বিষণ্ন চোখে দীপ্তর দিকে তাকায়। তারপর বলে, তুমি জানো না দীপ্ত। কিন্তু আমি জেনেছি। তুমি, আমি—আমরা কেউ-ই মানুষ নই। আমরা ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি। এই আকাশ, রাত, তোমার মিশন, আমাদের ভালোবাসা, এই জীবন—এসব বাস্তব নয়। এ এক অবাস্তব বাস্তবতা। আমরা বোকার মতোই এত দিন এর পেছনে ছুটেছি।

তারপর একটা বিষণ্ন হাহাকার রাতের ঠান্ডা হাওয়ায় মিশে যায়। অদিতি আর দীপ্ত হাত ধরাধরি করে তারাভরা কালো মহাকাশের দিকে নির্বাক চেয়ে থাকে।

*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত

মন্তব্য পড়ুন 0