অস্তিত্ব রক্ষায় গ্রহান্তরে

বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে প্রায়ই দেখা যায়, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি মানবসভ্যতার জন্য ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে কি শেষ পর্যন্ত ন্যানো প্রযুক্তি, জৈব অস্ত্র, কম্পিউটারই মানুষের সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়াবে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, ব্যাপারটি দিন দিন সেদিকেই এগোচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত অগ্রগতিই হতে পারে বিপদের বড় কারণ।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত অগ্রগতির কারণে মানবসভ্যতার ধ্বংসের ঝুঁকি কতটুকু এ বিষয়ে সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব এক্সসটেনশিয়াল রিস্ক বা সিএসইআরে গবেষণা শুরু হয়েছে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন ব্রিটিশ জ্যোতিঃপদার্থবিদ মার্টিন রিজ।

এর থেকে বাঁচার উপায় হচ্ছে মানুষের গ্রহ-গ্রহান্তরে ছড়িয়ে পড়া। তখনই কাজে লাগবে এসব দ্রুতগতির উত্কর্ষ ও ন্যানো প্রযুক্তির বিকাশকে। ফলে বিপর্যয় এড়ানো যাবে। বিখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী মার্টিন রিজ তাঁর আওয়ার ফাইনাল সেঞ্চুরি গ্রন্থেও তাই বলেছেন। প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত উন্নতি পৃথিবীকে হয়তো ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে অথবা এর থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে গ্রহান্তরের পথে বেরিয়ে পড়বে মানুষ। এগুলোর যেকোনো একটি অবশ্যম্ভাবীভাবে ঘটবে। তা থেকেই নির্ধারিত হবে মানবজাতির ভবিষ্যত্। ন্যানো প্রযুক্তির বিকাশ, মৌলবাদী সহিংসতা এবং প্রযুক্তির উন্নয়নে বায়োস্ফিয়ারের ধ্বংস আমাদের এক মারাত্মক সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

মানবজাতির বিলুপ্তি প্রতিরোধে ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী রিজের পরামর্শ হচ্ছে—বিশ্বব্যাপী বৈজ্ঞানিক গবেষণার এবং গবেষণার ফল যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করা। ভয়ংকর বিপর্যয় এড়াতে নিউক্লিয়ার অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণের আন্দোলনে যুক্ত রিজ। তারপরও বলছেন, এ অস্ত্র অতটা বিপজ্জনক নয়, যতটা বিপজ্জনক প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত অগ্রগতি। ব্যাপারটি আগামী ২০ বছরের মধ্যে প্রকট আকারে দেখা দেবে। এ বিপদ থেকে বাঁচতে যত দ্রুত সম্ভব আমাদের মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়তে হবে। নইলে ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠবে। আমরা আসলে প্রাযুক্তিক বয়ঃসন্ধিকালে অবস্থান করছি।

তরুণ প্রজন্ম যখন মঙ্গল বা গ্রহান্তরে যেতে প্রবলভাবে ইচ্ছুক, তখন পৃথিবীব্যাপী ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও মধ্যযুগীয় আচরণ মানুষকে হতাশ করছে। সাংস্কৃতিক বিকাশের তুলনায় প্রযুক্তির উন্নতি অনেকখানি এগিয়ে গেছে। তাই এ ধরনের যান্ত্রিক সুবিধার ব্যবহার উপযোগিতা বুঝতে পারছেন না পুরোনো ধ্যানধারণার রাজনৈতিক নেতারা। ফলে তরুণ প্রজন্ম মানসিক বৈকল্যের মুখোমুখি।

প্রয়াত জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী কার্ল সাগানও কয়েক দশক আগে বলেছিলেন, আমাদের টিকে থাকার প্রয়োজনেই বহির্জাগতিক সভ্যতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাকে বাড়ানো প্রয়োজন। গ্রহান্তরে যাত্রা জরুরি। কিন্তু এর বিরোধিতা করে অনেকেই বলেছেন, এটা একধরনের অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অপচয়। তারা এ-ও বলেছেন, যদি গ্রহান্তরের কেউ শক্তিশালী হয় তাহলে আমাদের খোঁজ পেয়ে আমাদের দখল অথবা ধ্বংস করে ফেলতে পারে। এটা আমাদের পশ্চাত্পদ মানসিকতারই এক রকম প্রতিফলন। খরচের কথা উঠলে বলা যায়, আধুনিক একটি যুদ্ধজাহাজ, যেমন ডেস্ট্রয়ার তৈরির খরচ দিয়ে অনায়াসে এক দশক বহির্জাগতিক প্রাণের অনুসন্ধান চালিয়ে নেওয়া যায়।

ফলে এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে সিএসইআর গবেষণা কেন্দ্রটি গড়ে উঠেছে। এর গবেষকেরা বায়োটেকনোলজি বা জৈবপ্রযুক্তি, ন্যানো টেকনোলজি ও পরিবেশের পরিবর্তনে মানবসভ্যতার কী ধরনের ধ্বংসের ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে, তা নিয়ে কাজ করছেন। সিএসইআর প্রকল্পটি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক হিউ প্রাইস, বিশ্বতত্ত্ব (কসমোলজি) ও জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যার অধ্যাপক মার্টিন রিজ এবং স্কাইপের সহপ্রতিষ্ঠাতা জান টালিনের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। এক সাক্ষাত্কারে অধ্যাপক প্রাইস বলেছিলেন, অবস্থাদৃষ্টে ধারণা করা যাচ্ছে, আগামী শতাব্দীর কোনো এক সময়, যন্ত্র বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে মানুষকে ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি অলীক কল্পনা নয়।

সম্ভাব্য রোবট বিদ্রোহের বিষয়টিও গবেষকেরা বিবেচনার মধ্যে এনেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, দুষ্ট কম্পিউটারের খোঁজের বিষয়টিতে এখন গুরুত্ব দেওয়ার সময় হয়েছে। এ ধরনের ঝুঁকি বাস্তবে কতটা, তা নির্ধারণ কঠিন হলেও এ বিষয়ে এখন সচেতনতার সময় এসেছে। বিখ্যাত চলচ্চিত্র টার্মিনেটর চলচ্চিত্রে দেখানো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন দুষ্ট প্রকৃতির রোবট মানুষের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। এ ছাড়া চলচ্চিত্রের ‘স্কাইনেট’ নামের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা বাস্তবে তৈরি হলে মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জান টালিন মনে করেন, রোবট ও কম্পিউটার মানুষের চেয়ে যত বুদ্ধিমান হবে, তত আমাদের যন্ত্রের অনুকম্পার ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকবে। টার্মিনেটর ছবিটা হচ্ছে মানুষ আর মেশিন বা কম্পিউটারের যুদ্ধ। কীভাবে মার্কিন সেনাবাহিনীর নির্মিত স্কাইনেট প্রোগ্রাম ধ্বংসযজ্ঞে মত্ত হয়ে ওঠে। এই ভয় আজকের নয়, অনেক দিনের। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির রচয়িতারা অনেক দিন ধরে এই ভয় মানুষকে দেখিয়ে আসছেন। ২০০৪ সালের উইল স্মিথের আই, রোবট সিনেমাতেও দেখানো হয়েছে, কীভাবে কম্পিউটার প্রোগ্রাম মানুষকে জিম্মির চেষ্টা করছে। আসলে আমরা নিজেদের নিরাপদ করতে আত্মধ্বংসের পথ তৈরি করেছি।

বিজ্ঞাপন

তাই বিশ্বের সেরা বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কাজে নেমেছেন। তাঁরা জানতে চান, আসলেই প্রযুক্তি একসময় মানবসভ্যতাকে ধ্বংস করে দেবে কি না। সিএসইআর কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে গবেষকেরা লিখেছেন, এর ভয়াবহতা এই মূহর্তে পরিমাপ করা কঠিন হলেও এর ঝুঁকির পরিমাণ এতটাই বেশি যে তা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

প্রাচীন যুগে মানুষ কোনো অঞ্চলে বসতি স্থাপনের কয়েক প্রজন্মের পর নতুন বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে অন্য অঞ্চলে যাত্রা শুরু করত। তেমনি বর্তমান প্রজন্ম সারা পৃথিবী উন্মোচনের পর অস্থির হয়ে উঠেছে কবে তারা নতুন অবস্থানে বসতি স্থাপন করবে।

বর্তমানে নক্ষত্রযাত্রা তৃতীয় বিশ্বের জন্য কল্পনার ফানুস হলেও এটিই আমাদের গন্তব্য; ১৯৬০ সালে সোভিয়েত মহাকাশ বিজ্ঞানীদের রচনায় সেই ভবিষ্যত্ই আঁকা আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্টিন রিজ তাঁর ২০১০ সালে বিবিসি রেডিও ৪-এ প্রচারিত রিথ লেকচার্স-এ এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কারণ আমাজন, স্পেসএক্সের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারেরা নক্ষত্রযাত্রায় বা মঙ্গলে বসবাসের ব্যাপারে এগিয়ে আসছেন। শিগগিরই এ ব্যাপারে অগ্রগতি হবে। এর সূচনা হিসেবে ফ্যালকন নাইন রকেটের কথা বলা যায়, যা মহাশূন্যে সফলভাবে পেলোড স্থাপন করে দিয়েছে। তবে জীববিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির মধ্যে সমন্বয় না থাকলে মহাশূন্যে দীর্ঘস্থায়ী বসতি শুধু কঠিন হবে না, মানবজাতির নিজেদের আন্তসম্পর্কও ঠিক থাকবে না।

লেখক: বিজ্ঞানবক্তা

*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত

মন্তব্য করুন