আকাশ পর্যবেক্ষকের খেরোখাতা ৪

আকাশের আপাত গতি

স্থানীয় দিগন্ত: আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য দিগন্ত সম্বন্ধে ধারণা থাকা খুবই দরকার। পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরছে, যার জন্য আমাদের মনে হয় আকাশ পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে। আকাশের এই ঘূর্ণনকে ঠিকমতো বুঝতে হলে প্রথমেই ঠিক করে নিতে হবে দিগন্ত বলতে আমরা কী বুঝি। পৃথিবীকে যদি একটা গোলক ধরা হয় এবং আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেই বিন্দুতে যদি একটা স্পর্শক আঁকা হয়, তবে সেই স্পর্শক যেখানে অসীমে মিলিয়ে যাবে, সেটাই হবে আমাদের স্থানীয় দিগন্তের একটা দিক। (পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে আমাদের অবস্থান বিন্দুতে একটি সরলরেখা টানলে সেই রেখা ওই স্পর্শকের সঙ্গে একটি সমকোণ বা ৯০ ডিগ্রি কোণ সৃষ্টি করবে।) এ রকম অসীমসংখ্যক স্পর্শক চারদিকে গঠন করলে সেই স্পর্শকগুলোকে নিয়ে একটা সমতল তলের কল্পনা করা যেতে পারে। সেই তল অসীমে যে চক্রাকার বলয় সৃষ্টি করবে, তাকেই আমরা বলব স্থানীয় দিগন্ত। এটা স্পষ্ট যে দিগন্তরেখার নিচের কোনো বস্তুকে আমরা দেখতে পাব না।

আমাদের ঠিক মাথার ওপর অর্থাৎ দিগন্ত থেকে ৯০ ডিগ্রি ওপরে যে বিন্দুটি আছে, তাকে সুবিন্দু (Zenith) বলে অভিহিত করা হয়। সুবিন্দু থেকে দিগন্তরেখার পরিমাণ হচ্ছে ৯০ কৌণিক ডিগ্রি।

খ-গোল মেরু ও বিষুবরেখা: পৃথিবীর নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরছে আবার সূর্যের চারদিকেও ঘুরছে। ফলে আমাদের মাথার ওপরের আকাশের স্থানসমূহের অবস্থান সব সময়ই বদলাচ্ছে। কিন্তু কিছু কিছু চিহ্নিত স্থান তার অবস্থান বদলায় না (আসলে বলা উচিত বদলাতে বেশ সময় নেয়)। তার মধ্যে অন্যতম হলো খ-গোলকের উত্তর মেরু। পৃথিবীর উত্তর মেরুর ঠিক ওপরে, খ-গোলকের উত্তর মেরু অবস্থিত। আর খ-গোলকের বিষুবরেখা আকাশের গায়ে পৃথিবীর বিষুবরেখার সমান্তরালভাবে কল্পিত (চিত্র ১ এবং ২)। খ-গোল বিষুবরেখা ঠিক কোথায় সেটা খালি চোখে আমাদের পক্ষে চেনা মুশকিল। কিন্তু খ-গোলের সুমেরু (বা উত্তর মেরু) ধ্রুবতারা (পোলারিস) নামের একটা তারার খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ধ্রুবতারাকে কীভাবে চিহ্নিত করা যায়, সেটা আমরা পরে জানব। যেকোনো রাতে উত্তর আকাশে তাকালে দেখা যাবে যে ধ্রুবতারা তার জায়গায় মোটামুটি স্থির, আর তাকে ঘিরে তারারা ঘুরছে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে, বামাবর্তী গতিতে (Anti-clockwise)।

default-image
বিজ্ঞাপন
default-image

অক্ষাংশ ও ধ্রুবতারার উন্নতি: আমরা যদি উত্তর মেরুতে অবস্থান করতাম তাহলে দেখতাম, আকাশের তারারা সেখানকার সুবিন্দুকে (ধ্রুবতারার খুব কাছাকাছি) কেন্দ্র করে বামাবর্তী বা ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে ঘুরছে। উত্তর মেরুর সুবিন্দু থেকে দক্ষিণে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত যে তারারা দৃশ্যমান, তাদের উত্তর মেরু থেকে বছরের সব সময়ই দেখা যাবে এবং ঋতুর পরিবর্তনের ফলে নতুন তারা সেখানে দৃশ্যমান হয় না। উত্তর মেরু থেকে আমরা যত দক্ষিণে যেতে থাকব, ধ্রুবতারা তত আকাশের নিচে নেমে যেতে থাকবে। উত্তর মেরুতে ধ্রুবতারাকে যদি ধরা হয় মাথার ওপরে, দিগন্ত থেকে ৯০ ডিগ্রি ওপরে (ধ্রুবতারা উত্তর মেরুর ঠিক সুবিন্দুতে অবস্থিত নয় সেটা আগেই বলা হয়েছে), তাহলে উত্তর মেরু থেকে ৫ ডিগ্রি নিচে নামলে, ধ্রুবতারাও সুবিন্দু থেকে ৫ ডিগ্রি নিচে নেমে আসবে। উত্তর মেরু থেকে ৫ ডিগ্রি নিচের অক্ষাংশ (Latitude) হবে ৮৫ ডিগ্রি। আকাশে ধ্রুবতারার অবস্থানও হবে দিগন্ত থেকে ৮৫ ডিগ্রি।

দিগন্ত থেকে খ-গোলের যেকোনো জ্যোতিষ্কের অবস্থানকে উন্নতি (Altitude) বলা হয়। দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর উত্তরাংশের যেকোনো অবস্থান থেকে ধ্রুবতারার উন্নতির মান সেই অবস্থানের অক্ষাংশের মানের সমান হবে। যেমন ঢাকা শহরে সংসদ ভবনের অক্ষাংশ হচ্ছে ২৪.৭৬০ বা ২৪ ডিগ্রি ৪৬ মিনিট। অর্থাৎ ঢাকার সংসদ ভবন বিষুবরেখা থেকে ২৪.৭৬০ উত্তরে অবস্থিত (নিচে কৌণিক ডিগ্রি, মিনিট ও সেকেন্ড সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে)। ঢাকার আকাশে ধ্রুবতারা তুলনামূলকভাবে উত্তরাকাশের নিচের দিকে অবস্থান করে, সংসদ ভবন থেকে সেই তারাকে পর্যবেক্ষণ করলে তারও উন্নতি হবে ২৪.৭৬০। তাই ধ্রুবতারার উন্নতি পর্যবেক্ষণ করে অক্ষাংশের মান খুব সহজেই পাওয়া যায়। তবে দ্রাঘিমার (Longitude) মানটা পাওয়া একটু কঠিন। ধ্রুবতারা থেকে দূরে অবস্থিত কোনো তারার গতিবিধি বিশ্লেষণ করে দ্রাঘিমা নির্ধারণ করা যায়।

একমাত্র পৃথিবীর বিষুবরেখায় অবস্থান করলে সারা বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করলে সমগ্র আকাশ দেখা সম্ভব। বিষুবরেখায় অবস্থান করলে ধ্রুবতারাকে একদম দিগন্তের সঙ্গে সাঁটা অবস্থায় দেখা যাবে। ঢাকা থেকে সারা বছরে পুরোটা আকাশ দেখা সম্ভব নয়, দক্ষিণ আকাশের কিছু তারা সব সময়ই আমাদের দৃষ্টিপথের বাইরে থাকবে।

তারাদের বামাবর্তী ও ডানাবর্তী গতি: খালি চোখে তারাদের আকাশে স্থান পরিবর্তনকে বুঝতে হলে আমাদের অন্তত মিনিট পনেরো অপেক্ষা করতে হবে, যতক্ষণ না নক্ষত্ররা কয়েক ডিগ্রি সরছে। তবে কোনো দুরবিন দিয়ে যেকোনো খ-গোল বস্তু পর্যবেক্ষণ করলে সেটা পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে খুব দ্রুত দৃষ্টিগোলকের (Field-of-view) বাইরে চলে যাবে। দুরবিনের মাত্র কয়েক ডিগ্রি দৃষ্টিগোলকে মনে হবে আকাশের বস্তুটি খুব দ্রুতগতিতে সরছে, খ-গোলকের বিষুবরেখার কাছাকাছি তারারা চার মিনিটে প্রায় এক ডিগ্রি সরে যায়।

৩ নম্বর চিত্রে ডিসেম্বরের রাতের বিভিন্ন সময়ে কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলীর অবস্থানকে ব্যবহার করে আকাশের আপাত গতিকে দেখানো হয়েছে। এই চিত্রগুলো উত্তর গোলার্ধের অক্ষাংশের জন্য প্রযোজ্য। যেকোনো রাতে আমরা পূর্ব দিকে তাকালে দেখব, তারারা দিগন্তের বাঁ দিক থেকে উঠছে ওপরের ডান দিকে। দক্ষিণমুখী হয়ে যদি আমরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখা যাবে তারারা ধীরে ধীরে বাঁ দিক থেকে ডান দিকে একটা বক্ররেখায় সরছে। কিন্তু যেখানে উত্তর দিকের তারারা বামাবর্তী, সেখানে দক্ষিণের তারারা ডানাবর্তী (Clockwise)। পশ্চিম দিকে তাকালে আমরা দেখব তারারা আকাশের ওপরের বাঁ দিক থেকে নিচের ডান দিকে নামছে। উত্তর দিকে তাকালে দেখব তারারা ঘুরছে ধ্রুবতারার চারদিকে বামাবর্তী হয়ে।

default-image
বিজ্ঞাপন

তারাদের স্থানাঙ্ক

আকাশের প্রতিটি বস্তুর স্থান নির্দেশ করার জন্য একটা স্থানাঙ্ক আছে। বিষুবাংশ (Right ascension) ও বিষুবলম্ব (Declination) দিয়ে যেকোনো তারার অবস্থান দেখানো যায়। যেমন আর্দ্রার (Betelguese) বিষুবাংশ হচ্ছে ৫ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট ১০.৩ সেকেন্ড ও বিষুবলম্ব হচ্ছে +০৭ ডিগ্রি ২৪ মিনিট ২৫.৪৩ সেকেন্ড। বিষুবাংশ হচ্ছে আকাশের গায়ে পৃথিবীর দ্রাঘিমারেখার প্রতিচ্ছবি। এই স্থানাঙ্কের আদি বিন্দু হচ্ছে মেষ রাশির প্রথম বিন্দু, যেখানে কিনা সূর্যের অয়নপথ খ-গোল বিষুবরেখাকে অতিক্রম বা ছেদ করে। সূর্য এ বিন্দু পার হয় বসন্ত বিষুবের সময় (২১ বা ২২ মার্চ)। যেহেতু পৃথিবী ২৪ ঘণ্টায় একটি চক্রের ৩৬০ ডিগ্রি পার হয়, তাই বিষুবাংশের মান ০ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিস্তৃত। বিষুবাংশের ১ ঘণ্টা তাই চক্রের ১/২৪ অংশ বা ৩৬০/২৪ = ১৫ কৌণিক ডিগ্রি।

অন্যদিকে বিষুবলম্ব, যা কিনা পৃথিবীপৃষ্ঠে অক্ষাংশের সমতুল্য, খ-গোল বিষুবের উত্তর ও দক্ষিণে ০ থেকে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত বিস্তৃত। খ-গোল বিষুবরেখার ওপরে অবস্থিত কোনো তারার বিষুবলম্ব হবে ০ ডিগ্রি আর খ-গোল উত্তর মেরু +৯০ ডিগ্রি ও দক্ষিণ মেরু হবে -৯০ ডিগ্রি বিষুবলম্ব। যদি কোনো তারা ঠিক আমাদের মাথার ওপর সুবিন্দু অতিক্রম করে, তবে তার বিষুবলম্ব হবে আমাদের অক্ষাংশের সমান। কৃত্তিকার (প্লেয়াডিস, সাত বোন) নক্ষত্রদের বিষুবলম্বগুলো হচ্ছে ২৪.৭ ডিগ্রির কাছাকাছি, ঢাকার অক্ষাংশ হচ্ছে ২৩.৫১ ডিগ্রি, তাই কৃত্তিকা জানুয়ারি মাসে ঢাকার আকাশে সুবিন্দুর কাছ দিয়ে যাবে। অন্যদিকে ধ্রুবতারা, যার বিষুবলম্ব হচ্ছে +৮৯.১৬ ডিগ্রি, ঢাকার আকাশে উত্তর দিগন্তের ওপর সর্বোচ্চ ২৩.৫১ + (৯০-৮৯.১৬) বা ২৪.৩৫ ডিগ্রিতে উঠবে। অর্থাত্ তার সর্বোচ্চ উন্নতি হবে ২৪.৩৫ ডিগ্রি ও সর্বনিম্ন উন্নতি হবে ২৩.৫১ (৯০-৮৯.১৬) = ২২.৬৭ ডিগ্রি। অর্থাৎ সুমেরুকে কেন্দ্র করে ধ্রুবতারা ২৪ ঘণ্টায় ০.৮৪ ডিগ্রি ব্যাসার্ধের একটি বৃত্ত রচনা করবে।

*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত

মন্তব্য করুন