default-image

সাইটোকাইন হলো একধরনের প্রোটিন। এরা রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থার অণুগুলোকে করণীয় সম্পর্কে সংকেত দেয়। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটলে দেহের রোগ প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া অনেক সময় মারাত্মক রূপে প্রকাশ পায়। এ সময় রক্তে প্রচুর পরিমাণে সাইটোকাইন নিঃসৃত হয়। এরা রোগ প্রতিরোধে উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। আকস্মিকভাবে অতিরিক্ত সাইটোকাইন নিঃসরণ ঘটলে তাকে ‘সাইটোকাইন স্টর্ম’ বা সাইটোকাইন ঝড় বলে। এটা দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিমাত্রার প্রতিক্রিয়া বলা যেতে পারে। অনেক সময় এর ফলে দেহে প্রদাহ বেড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

সাধারণত ফুসফুস, কিডনি, মস্তিষ্ক প্রভৃতি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও রক্তপ্রবাহে সাইটোকাইনের আধিক্য বেশি ঘটে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ফলে শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। করোনাভাইরাস তার আঁকশিগুলো ব্যবহার করে শ্বাসতন্ত্রের সেলের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং সেলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এভাবে সেলগুলোর মাধ্যমে ভাইরাস তার অনুলিপি তৈরি করতে থাকে। একের পর এক শ্বাসতন্ত্রের সেলগুলো আক্রান্ত হয়। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ফুসফুসের পাশাপাশি কিডনি, মস্তিষ্ক, লিভার প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গও আক্রান্ত হয়। রক্তে অক্সিজেন সম্পৃক্ততা কমে যায়। এ অবস্থায় ভাইরাসের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অভিযান হিসেবে সাইটোকাইন স্টর্ম ঘটতে পারে। এর পরিণামে অনেক সময় আক্রান্ত সেলগুলোই সাইটোকাইন স্টর্মের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এর ফলে রোগীর সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

করোনা পজিটিভ হলে কী করবেন?

আমরা অবশ্য সবাই জানি কী করতে হবে। প্রথমে রোগের লক্ষণ বুঝে রক্ত পরীক্ষা। পজিটিভ হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে সে অনুযায়ী চলতে হবে। এসব তো আমরা সবাই করি। কিন্তু যেটা করি না বা করতে চাই না, সেটা হলো সব সময় মুখে মাস্ক পরে থাকা। বাসায়ও। পজিটিভ হলে তো বাইরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, এমনকি বাসায়ও আলাদা থাকতে হবে এবং মুখে মাস্ক রাখতে হবে সর্বক্ষণ। এটা দরকার বাসার অন্যদের সুরক্ষার জন্য। ঘরে একা থাকলেও মাস্ক পরার প্রয়োজনীয়তা আমরা অনেকেই বুঝতে চাই না। কিন্তু দরকার এ জন্য যে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস, কথা বলা, হাঁচি-কাশি—এসব তো সারাক্ষণই চলতে থাকে। তাই অন্যদের সংক্রমণ কিছুটা রোধ হবে যদি আমাদের মুখে মাস্ক থাকে।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয় কাজটি হলো ঘরে একা থাকলেও দিনে কয়েকবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। করোনাভাইরাস খুব কঠিন ও দুর্দমনীয়, সন্দেহ নেই। কিন্তু সামান্য সাবানে একেবারে কাবু। শুধু সাবান-পানির সংস্পর্শে ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড থাকলেই ভাইরাসের চারপাশের চর্বিজাতীয় আবরণ গলে যায়। আরএনএ ভাইরাসটি আর টিকে থাকতে পারে না।

তৃতীয় জরুরি কাজটি হলো পালস-অক্সিমিটারে দিনে কয়েকবার রক্তে অক্সিজেন স্যাচুরেশনের মাত্রা পরীক্ষা করে দেখা। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বেশি কমে গেলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। এ ব্যাপারে সব সময় ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে।

করোনাভাইরাস রোগের টিকা এখনো আসেনি, কিন্তু এর চিকিৎসার বিষয়ে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তাই সর্বশেষ চিকিৎসা লাভের জন্য সব সময় ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করে চলা একান্ত প্রয়োজন।

টিকার নিশ্চয়তা

এখন এটা পরিষ্কার যে টিকা মাসখানেকের মধ্যে এসে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশেও আসবে, হয়তো আরও কিছু সময় লাগতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টিকার কোল্ডচেইন নিশ্চিত করা। সেটা না হলে হয়তো টিকার কার্যকারিতা কমে যাবে অথবা কাজে লাগবে না। টিকা না আসা পর্যন্ত সবাই যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্তত আরও এক বছর পর্যন্ত মাস্ক পরা ও নিয়মিত সাবান–পানিতে হাত ধোয়ার অভ্যাস রাখতে হবে। তাহলেই কেবল আমরা করোনাভাইরাস মহামারি থেকে বাঁচতে পারব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

আব্দুল কাইুয়ম: মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক
quayum.abdul@prothomalo.com

মন্তব্য করুন