default-image

প্রথম থেকেই একটা কথা চলে আসছিল, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার পর শরীরে সৃষ্ট কোভিড-১৯ প্রতিরোধী ক্ষমতা বেশি দিন টেকে না,তাই হয়তো তিন-চার সপ্তাহ পর আবার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই ধারণা মানুষকে আতঙ্কিত করে। কিন্তু সম্প্রতি দেখা গেছে, একবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রতিরোধী ক্ষমতা দীর্ঘদিন পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। এ বিষয়ে ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকায় ১৭ নভেম্বর একটি লেখা ছাপা হয়। অপূর্ভা ম্যানডাভিলি (Apoorva Mandavilli) লিখেছেন, সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করে গবেষকেরা দেখেছেন, তাঁদের দীর্ঘস্থায়ী এবং বেশ শক্তিশালী প্রতিরোধী ক্ষমতা সক্রিয় রয়েছে। এ থেকে গবেষকেরা বলছেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধী ক্ষমতা কয়েক বছর, এমনকি কয়েক দশক পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।

গবেষণাপ্রাপ্ত এই ফল কোভিড-১৯ চিকিৎসায় নতুন মাত্রা যোগ করল। এই গবেষণার প্রাপ্ত ফল সম্প্রতি অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। তবে সমগোত্রীয় গবেষকদের পর্যালোচনা (পিয়ার রিভিউ) এখনো হয়নি বা কোনো বিজ্ঞান ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, গবেষণায় প্রাপ্ত এই ফল বেশ নির্ভরযোগ্য এবং ব্যাপকসংখ্যক মানুষের রক্ত নিয়ে পরিচালিত হয়েছে। এত ব্যাপকভিত্তিক গবেষণা এর আগে আর হয়নি বলে তাঁরা বলছেন।

যদি এ গবেষণায় প্রাপ্ত ফল যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য হয়, তাহলে দুটি উপকার—প্রথমত, কোভিডে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমে আসবে, হাসপাতালগুলো নতুন রোগীদের সহজে সুচিকিৎসা দিতে পারবে। অন্যদিকে, আপাতত টিকার প্রয়োজনীয় চাহিদা কমবে। সুতরাং টিকার ঘাটতির সমস্যা মোকাবিলা সহজ হবে।

বিজ্ঞাপন

শিশুদের আশঙ্কা কম কেন?

সাধারণত দেখা যায় শিশুরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয় না। যদি হয়ও, সেটা খুবই দুর্বল এবং তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। এই অভিজ্ঞতা আমাদের অবাক করে। কারণ, আমরা সাধারণত দেখি যে শিশুরা প্রায়ই অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয়। তাহলে করোনা হয় না কেন? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুরা মাঝেমধ্যেই সর্দি-কাশি-জ্বরে ভোগে। এগুলো হয়তো ভিন্ন ধরনের করোনাভাইরাসের অসুখ। এসব ভাইরাসের অ্যান্টিবডি শিশুদের শরীরে থাকে, ওগুলোই হয়তো কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ সৃষ্টি করে।

লন্ডনের ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের (Francis Crick Institute in London) গবেষকেরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন, শিশু এবং কিশোর-তরুণদের অনেকের করোনাভাইরাস রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা রয়েছে। ‘সায়েন্স’ ম্যাগাজিনে সম্প্রতি প্রকাশিত এক নিবন্ধে গবেষকেরা বলছেন, মাত্র ৫ শতাংশ পূর্ণবয়স্ক মানুষের এ ধরনের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা রয়েছে কিন্তু শিশুদের ৪৩ শতাংশ রোগ প্রতিরোধী।

যাঁদের রক্ত কোভিড-১৯ অতিমারির আগে সংগৃহীত হয়েছিল, তাঁদের রক্তে এই নতুন করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি থাকবে না বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা ছিল। কিন্তু তাঁরা দেখলেন, শিশু ও পূর্ণ বয়স্ক লোকজনের কারও কারও নতুন করোনাভাইরাস প্রতিরোধী অন্তত একটি গুণসম্পন্ন অ্যান্টিবডি রয়েছে। এই অ্যান্টিবডি করোনাভাইরাসের স্পাইকের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাই ভাইরাস রক্তের সেলে ঢুকতে পারে না। স্পাইকই হলো নতুন করোনাভাইরাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এর ভিত্তি অন্য সব ধরনের করোনাভাইরাসের মতোই। গবেষণাগারে পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই ভিত্তির অ্যান্টিবডি কোভিড-১৯ ভাইরাসকেও রক্তের সেলে ঢুকে বংশ বিস্তারে বাধা দেয়।
এ বিষয়ে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর বিজ্ঞান বিষয়ের লেখক গিনা কোলাটা (Gina Kolata) ১০ নভেম্বর (১২ নভেম্বর আপডেটেড) বিস্তারিত লিখেছেন।

স্কুল খুলবে কি না

সম্প্রতি স্কুল আরও কিছুদিনের জন্য ছুটি দেওয়া হয়েছে। এর অন্যতম কারণ, শীতের মৌসুমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি। শিশুদের যেন জীবনের ঝুঁকি সৃষ্টি না হয়, সে জন্যই এ ব্যবস্থা। সম্প্রতি নিউইয়র্কেও স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, শিশুরা যেন ঝুঁকির মুখে না পড়ে। আমাদের দেশেও একই অবস্থান নেওয়া হয়েছে। তবে পড়াশোনা যেন অব্যাহত থাকে, সে ব্যবস্থা যতটা সম্ভব সবার জন্য সহজলভ্য করা দরকার। অনলাইনে পড়াশোনা সীমিতভাবে হলেও অব্যাহত রাখা যায়। পরে পরিস্থিতির উন্নতি হলে স্বাস্থ্য বিধিমালা অনুযায়ী স্কুল খোলার প্রস্তুতি রাখা দরকার।

* আব্দুল কাইুয়ম, মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক
quayum.abdul@prothomalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0