২০২০ সালে রসায়নে নোবেলজয়ী দুই বিজ্ঞানী ইমানুয়েল কার্পেন্টিয়ার এবং জেনিফার ডোডনা
২০২০ সালে রসায়নে নোবেলজয়ী দুই বিজ্ঞানী ইমানুয়েল কার্পেন্টিয়ার এবং জেনিফার ডোডনানোবেলপ্রাইজ ডট ওআরজি

ইমানুয়েল কার্পেন্টিয়ার এবং জেনিফার ডোডনার হাতে উঠেছে চলতি বছরের রসায়নের নোবেল। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কাঁচিগুলোর একটা আবিষ্কার করেছেন তাঁরা—ক্রিসপার-ক্যাস৯ (CRISPR-Cas9)। যে সে কাঁচি নয়। এই কাঁচি দিয়ে কেটে-ছেঁটে নতুনভাবে লেখা যায় জীবন রহস্যের ভাষা—জিন। সেজন্য একে বলা হচ্ছে জেনেটিক কাঁচি। এই কাঁচি ব্যবহার করে চিকিৎসা করা সম্ভব ক্যানসারের। বদলে দেওয়া সম্ভব যেকোনো প্রাণী বা উদ্ভিদের জিনোম সিকোয়েন্স। আর এই কাজটা করা সম্ভব মাত্র কয়েক সপ্তাহে!

ইমানুয়েল কার্পেন্টিয়ার তখন স্ট্রেপ্টোকক্কাস পায়োজিনিস (Streptococcus pyogenes) নামের একটি ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এই ব্যাকটেরিয়া মানুষকে অনেক ভুগিয়েছে। সেজন্যই মূলত গবেষণা করা। এ সময় নতুন এক ধরনের জৈব অণু আবিষ্কার করে বসেন তিনি। এর নাম ট্রেসার আরএনএ (tracrRNA)। দেখা গেল, এটি ব্যাকটেরিয়াটির আদিম রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, ক্রিসপার-ক্যাস-এর একটি অংশ।

বিজ্ঞাপন

এখন কথা হচ্ছে, ক্রিসপার-ক্যাস৯ কী? তারচেয়েও বড় কথা, ব্যাক্টেরিয়ার রোগ প্রতিরোধ করার প্রয়োজনই বা পড়ে কেন? কারণ, নচ্ছার ভাইরাস মানুষের পাশাপাশি ব্যাক্টেরিয়াকেও আক্রমণ করে। দুই ক্ষেত্রেই আক্রমণ করার প্রক্রিয়াটি মোটামুটি একইরকম। ভাইরাসের দেহে কাঁটা কাঁটা কিছু অংশ আছে। এই কাঁটাগুলো ব্যবহার করে তারা যে কোষকে আক্রমণ করতে চায়, সেই কোষের গায়ে নিজেদেরকে আটকে ফেলে। এ সময় তারা নিজের ডিএনএ ইনজেকশনের মতো করে ঢুকিয়ে দেয় কোষের ভেতরে। কার্পেন্টিয়ার দেখলেন, স্ট্রেপ্টোকক্কাস পায়োজিনিসের দেহে কোনো ভাইরাস আক্রমণ করলে, ভাইরাসের ডিএনএকে টুকরো টুকরো করে ফেলে ব্যাকটেরিয়াটি। এক্ষেত্রে কাঁচি হিসেবে ব্যবহৃত হয় ক্যাস-নাইন (Cas9) প্রোটিন। এখন, এই ডিএনএ টুকরোগুলোর কী হবে? স্ট্রেপ্টোকক্কাস পায়োজিনিস করে কী, নিজের ডিএনএতে এই টুকরোগুলো জায়গামতো বসিয়ে নেয়।

ভাবছেন, ব্যাকটেরিয়াটা পাগল হলো নাকি? সেধে সেধে নিজের ডিএনএতে ভাইরাসের ডিএনএর টুকরো বসাবে কেন? কারণ, রেকর্ড রাখা! ডিএনএর এই টুকরোগুলো ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়াটি রেকর্ড রাখে, কোন ভাইরাসটা তাকে আক্রমণ করেছে। পরে নতুন ব্যাকটেরিয়া তৈরির সময় এই ডিএনএই কপি হয়ে চলে যায় ব্যাকটেরিয়া থেকে ব্যাকটেরিয়ার কোষে। এভাবেই ব্যাকটেরিয়াটি ভাইরাসের হাত থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখে।

বিজ্ঞাপন

ভাইরাসের ডিএনএর ছোট টুকরোগুলো ব্যাক্টেরিয়ার ডিএনএর যে অংশে গিয়ে যুক্ত হয়, তাকে বলে Clustered Regularly Interspaced Short Palindromic Repeats (CRISPR)। হ্যাঁ, এভাবেই এসেছে ক্রিসপার-ক্যাস৯।

২০১১ সালে কার্পেন্টিয়ার তাঁর এই আবিষ্কার প্রকাশ করেন। একই বছর তিনি জেনিফার ডোডনার সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। উদ্দেশ্য, ক্রিসপারকে নিজের মতো করে ব্যবহার করা যায় কি না, সেটা বের করা। ডোডনা নিজে জৈবরসায়নবিদ। দুজন মিলে একটি টেস্ট টিউবে ব্যাকটেরিয়ার এই জেনেটিক কাঁচি নতুনভাবে তৈরি করেন তারা। সেই সঙ্গে জৈব অণুটির উপাদানে সামান্য পরিবর্তন আনেন। ফলে তাদের জন্য জৈব অণুটি সহজে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।

এবারে তারা এই অণুটির মধ্যে আরও কিছু পরিবর্তন আনেন। কম্পিউটার কোডে যেমন পরিবর্তন করা যায়, সেরকম অণুটির গঠনে পরিবর্তন আনেন তারা। ইংরেজিতে বলা যায়, জেনেটিক কাঁচিটিকে তারা রিপ্রোগ্রাম করে ফেলেন। এর ফলে এতদিন যে কাঁচি শুধু ভাইরাসের ডিএনএ চিনত, এখন সে যেকোনো ধরনের ডিএনএ অণু কাটতে পারে। তাদের প্রাথমিক কাজ শেষ হয় ২০১২ সালে।

বিজ্ঞাপন

এরপর শুরু হয় ক্রিসপার ব্যবহার। গুরুত্বপূর্ণ সব গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এটি কাজে লাগাতে শুরু করেন। ধান বা গাছের জিনে পরিবর্তন করে উন্নতমানের ফসলি উদ্ভিদ তৈরি করা হয়। ক্যানসার চিকিৎসাতেও এটি ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। এখন সেটার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।

ক্রিসপারকে তাই বলা যায় জাদুর কাঁচি! যে কাঁচি ঘুরিয়ে নতুন করে লেখা যায় জীবন রহস্যের ভাষা। ইমানুয়েল কার্পেন্টিয়ার ও জেনিফার ডোডনা এই জাদুর কাঁচির আবিষ্কার হিসেবে নোবেল যে তাদের প্রাপ্য, তা আর বলতে!

লেখক: শিক্ষার্থী, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য পড়ুন 0