সন্ধ্যার দিকে একটু বেরিয়েছিলাম, টুকটাক কেনাকাটার কাজ ছিল। বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। সঙ্গের ছাতাটা পুরোনো, দেখতে কিম্ভূতকিমাকার। ছাতা হারানোর ঘটনা এত বেশি ঘটে আমার যে নতুন করে ছাতা কেনাই ছেড়ে দিয়েছি।

পিচঢালা পথটা ভিজে চকচক করছে, ল্যাম্পপোস্ট, রাস্তার আশপাশের দোকানপাট আর গাড়ির হেডলাইটের আলো ভেজা রাস্তায় পড়ে অদ্ভুত এক দৃশ্য তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির কারণে রিকশা পাচ্ছিলাম না বলেই এই নিত্য সাধারণ দৃশ্যকেই অন্য রকম মনে হচ্ছে হয়তো।

হঠাৎ বৃষ্টির তোড়টা বেড়ে গেল, পানির ছাট এসে গায়ে লাগা শুরু করল। আশপাশে কোনো শেড নজরে পড়ল না। দ্রুত সামনে হাঁটা দিলাম। জায়গাটা মিরপুর চিড়িয়াখানার কাছেই। মনে পড়ল সামনেই একটা যাত্রীছাউনি থাকার কথা, ওদিকেই রওনা দিলাম।

ছাউনির কাছাকাছি যেতেই বেশ ভয়ার্ত একটা ব্যাপার ঘটল। চট করে কোথা থেকে একটা মিনিবাস প্রায় গায়ের ওপর এসে পড়ল। ড্রাইভার শেষ মুহূর্তে বিকট স্বরে হর্ন বাজাল, সেই ভয়াবহ কর্ণভেদী শব্দে উল্টো আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম, তীব্র হেডলাইট দুটোর আলোয় আমি সম্ভবত সম্মোহিত হয়ে রইলাম। আমি বুঝতে পারলাম, বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার এ তীব্র আলোই আমার দেখা শেষ দৃশ্য।

এবং শেষমেশ তা-ই হতো, যদি না একজোড়া হাত ঠিক তখনই টান মেরে আমাকে সরিয়ে না দিত।

অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমি কোনো কথাই বলতে পারলাম না। জীবনরক্ষাকারী ভদ্রলোকটিকে কোনো ধন্যবাদসূচক কথা দূরে থাক, মুখ তুলে তাকিয়েও দেখলাম না। তিনি আমাকে ধরে ছাউনির বেঞ্চে বসিয়ে দিয়েছেন। ‘আপনি কি চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছিলেন,’ ভদ্রলোক আমি কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পর প্রশ্নটা করলেন।

‘না না, আমি বলি, বৃষ্টি দেখে এখানকার ছাউনিতে বসতে এসেছিলাম।’

‘আসলে আপনি না থাকলে যে কী হতো’, আমি শেষমেশ বলতে চাইলাম।

‘না ঠিক আছে।’ লোকটার বাংলা কেমন যেন লাগল, এবার ভালোমতো দেখে বুঝলাম ইনি বাঙালি নন হয়তো। বাংলা বেশ ভেঙে ভেঙে বলছেন, কিন্তু নির্ভুল বলছেন।

আমি বললাম, ‘আপনি বাঙালি নন।’

‘হুম, ঠিকই ধরেছেন। কিসে বুঝলেন, ভাঙা বাংলায়?’

‘হ্যাঁ, তা ছাড়া আপনার মুখের আদলেও অবাঙালি একটা ভাব আছে।’

তিনি মনে হলো বেশ অবাক হলেন, ‘আপনাদের বাঙালিরা তো মিশ্র জাতি, সব ধরনের আদলই আছে আপনাদের। আমার তো ধারণা ছিল অন্তত চেহারায় আমি অবাঙালি, সেটা কেউ বুঝতে পারে না।’

‘কত দিন ধরে আছেন এ দেশে?’

‘বেশ কিছুদিন ধরে’, হঠাত্ তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, ‘আপনাদের চিড়িয়াখানাটার তো বেশ বাজে অবস্থা, খানিক আগে আমি ঘুরে ঘুরে ওটা দেখছিলাম।’

আমি কিছু বললাম না, চিড়িয়াখানার কাছাকাছি থাকলেও ওটাতে ঢোকা হয় না বেশ কয়েক বছর, কী অবস্থা কে জানে।

‘চিড়িয়াখানা এমন হওয়া উচিত, যেন প্রাণীগুলো বুঝতে না পারে তারা খাঁচায় আছে।’

আমি বললাম, ‘আমাদের দেশে এমনিতেই নানা ধরনের সমস্যা আছে, অত আধুনিক চিড়িয়াখানা করার জন্য যত জায়গা আর ম্যানেজমেন্ট দরকার, সেটা আমাদের নেই।’

‘আরে আপনাদের কথা রাখেন, আমি অনেক দেশেরই বিখ্যাত বিখ্যাত চিড়িয়াখানা দেখেছি, সেগুলোর অধিকাংশই একই অবস্থা, প্রাণীগুলো ঠিকই বুঝতে পারে তারা কারও দেওয়া সীমানার মধ্যে আছে।’

চিড়িয়াখানা নিয়ে এ আলোচনা আমার ভালো লাগছিল না। তিনি বলে চলছেন একমনে, ‘এই কিছুদিন আগেও টরন্টোর চিড়িয়াখানাটা দেখলাম। বুঝলেন, পৃথিবীর অন্য চিড়িয়াখানাগুলো থেকে অনেক বড়, প্রায় ৭০০ একর জায়গা নিয়ে তৈরি, তারপরও প্রাণীগুলো ঠিকই বুঝতে পারছে তারা যে বন্দী, কী লাভ হলো! ফ্লোরিডার অ্যানিমেল কিংডমটা বেশ চেষ্টা করেছে, কিন্তু নাহ! লাভ হয় নাই। তারপর ধরেন...’

আমি বললাম, ‘আপনি পুরো পৃথিবীর চিড়িয়াখানা দেখে বেড়ান নাকি?’

‘না, আসলে চিড়িয়াখানার প্রতি আমার আগ্রহ আছে, আমার কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছুটা, তাই যখন যেখানে ডিউটি পড়ে, সুযোগ পেলে সেখানকার চিড়িয়াখানা দেখে নিই!’

আমি মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না, জিজ্ঞেস করলাম, ‘ডিউটি! আপনি আসলে কী করেন?’ একটু থেমে বললাম, ‘অবশ্য বলতে যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে!’

এমন সময় তিনি উঠে দাঁড়ালেন, খেয়াল করলাম যাত্রীছাউনির পাশেই একটা প্রাইভেট কার এসে থেমেছে। বেশ আগের মডেলের একটা সেডান।

তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘যেতে হবে আমার। আর আমি আসলে একজন চিড়িয়াখানার কর্মী, আমাদের চিড়িয়াখানার জীবজন্তুদের অবস্থা রিপোর্ট করাই  আমার কাজ।’

আমি কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম।

তিনি গাড়িতে গিয়ে বসলেন, গাড়ির ভেতরটা যতটুকু নজরে এল, কেমন যেন অন্য রকম লাগল। পুরোনো মডেলের সঙ্গে ঠিক যাচ্ছে না মনে হলো।

দরজা লাগানোর আগে তিনি বললেন, ‘আজকে এখানে আমার ডিউটি ছিল, আর হয়তো কোনো দিন দেখা হবে না, ভালো থাকবেন। আর হ্যাঁ, সাবধানে রাস্তা চলবেন।’

আমাকে যেভাবে হ্যাঁচকা টান মেরে লোকটা বাঁচিয়েছেন, তাতে বোঝা যায় লোকটা বেশ শক্তিশালী, কিন্তু গাড়িতে ওঠার সময় মনে হচ্ছিল, লোকটার হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছে।

কেন যেন মনে হতে লাগল, দুই পায়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে তাঁকে বেশ ভান করতে হচ্ছে! জোর করে ব্যাপারটা মাথা থেকে       সরিয়ে দিলাম।

 বৃষ্টিটা ধরে এসেছে।

আমি একটা রিকশার জন্য উঠে পড়লাম।

খানিক পর কয়েক আলোকবর্ষ দূরে—

প্রথম জন: কাজটা করা তোমার ঠিক হয়নি!

দ্বিতীয় জন: হ্যাঁ, জানি।

প্রথম জন: অনাকাঙ্ক্ষিত তথ্য প্রদানের জন্য তোমাকে তোমার পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে, সেটা জানো?

দ্বিতীয় জন: শুনেছি, কিন্তু তোমার কী মনে হয়, লোকটা কিছু ধরতে পেরেছে?

প্রথম জন: তাতে কিছুই যায়-আসে না। নিয়ম নিয়মই!

দ্বিতীয় জন দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহাকাশযানের  বাইরে তাকালেন।

বাইরে অনন্ত শূন্যতা যত দূর চোখ যায়। সে শূন্যতা বুকের মধ্যে কেমন যেন হাহাকার জাগায়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন