২৮ ফেব্রুয়ারি ৯৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রিম্যান ডাইসন।  জন্ম ১৯২৩ সালে। ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিষয়ে স্নাতক করেন, তারপর ডক্টরেট করতে যান যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী হানস বেথের সঙ্গে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পিএইচডি ডিগ্রি করেনি। গবেষণা জীবনের শুরুর দিকে কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডাইনামিকস নিয়ে কাজ করেন। পরে নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর, সলিড স্টেট ফিজিক্স, ফেরোম্যাগনেটইজম, জ্যোতিপদার্থবিদ্যা এবং জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে গণিতের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করেছেন। পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন জনপ্রিয় বইয়ের লেখক তিনি। লেখালেখির জন্য ২০০০ সালে তিনি টেমপ্লেটন পুরস্কার পেয়েছিলেন। ডাইসন ট্রি বা ডাইসন স্ফিয়ার নামে দুটি বিখ্যাত তত্ত্বের জনক তিনি।

ফ্রিম্যান ডাইসন ছিলেন বাংলাদেশী পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ট বন্ধু। গত বছর বিজ্ঞানচিন্তাকে একটা সাক্ষাৎকার দেন। মূলত জামাল নজরুলকে ইসলাম সম্পর্কে ডাইসন তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেন সেই সাক্ষাৎকারে। বিজ্ঞানচিন্তার পক্ষ থেকে ইমেইলে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জাহাঙ্গীর সুর।

বিজ্ঞানচিন্তা: ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত দ্য আলটিমেট ফেট অব দ্য ইউনিভার্স বইয়ের ভূমিকায় জামাল নজরুল ইসলাম আপনার কাছে তাঁর ঋণ স্বীকার করেছেন। ওই সময়ে তাঁর সঙ্গে আপনার ‘বৈজ্ঞানিক বন্ধুত্ব’ কেমন ছিল?

ফ্রিম্যান ডাইসন: জামাল ইসলামের একটা গবেষণা প্রবন্ধ পড়েই আমি মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি নিয়ে কৌতূহলী হয়েছিলাম। এটা ১৯৭৭ সালের কথা। প্রবন্ধটা ছাপা হয়েছিল দ্য কোয়ার্টারলি জার্নাল অব দ্য রয়াল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিতে। ওই প্রবন্ধটাই প্রথম। আমি পরে ওই সমস্যাটা নিয়ে একাকী গবেষণা করি। ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিতে একটা বছর কাটানোর জন্য আমি জামালকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। সেই সূত্রেই আমি তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে জানাশোনার সুযোগ পাই। ওই সময় আমরা একে অপরের চিন্তাভাবনা বিনিময় করি এবং আমাদের বন্ধুত্বের ফসলই হচ্ছে ইসলামের ১৯৮৩ সালের বইটা। তবে দরকারি সব আইডিয়া জামালের ১৯৭৭ সালের প্রবন্ধেই ছিল।

বিজ্ঞানচিন্তা: বৈজ্ঞানিক সমাজে বইটা কতখানি প্রভাব ফেলেছিল?

ফ্রিম্যান ডাইসন: বিশ্বব্রহ্মাণ্ডেরও ভবিষ্যৎ আছে এবং এর চূড়ান্ত পরিণতির চিন্তাকে বিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণার বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে বইটার অনেক প্রভাব ছিল।

বিজ্ঞানচিন্তা: আমাদের মতো প্রাচ্যের দেশগুলোর বেশির ভাগ বিজ্ঞানী যখন পশ্চিমে অভিবাসী হচ্ছেন, সেখানে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী হয়েও জে এন ইসলাম কেন তাঁর জন্মভূমিতে ফিরে এসেছিলেন?

ফ্রিম্যান ডাইসন: বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যই জামাল ইসলামের প্রতি আমার অসম্ভব শ্রদ্ধা। কত সহজেই তিনি আমেরিকা বা ইউরোপে একটা বৈজ্ঞানিক ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারতেন। অথচ তিনি ফিরে গেলেন জন্মভূমিতে।

জামাল নজরুল ইসলাম বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে বাকি জীবনটা শিক্ষক হিসেবেই কাটিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশকে আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে দেশে ফিরেছিলেন তিনি। ফিরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করেছেন বিশ্ব বিজ্ঞানসমাজের সঙ্গে যুক্ত হতে। নিজের ক্যারিয়ারকে তিনি বলি দিয়েছিলেন আপন দেশকে সাহায্য করার জন্যই।

বিজ্ঞানচিন্তা: মহাকালের এই মঞ্চে জীবনের অন্তিম পরিণতি আসলে কী?

ফ্রিম্যান ডাইসন: মহাবিশ্বটা অবিরত অপরিবর্তনীয় ধ্রুবগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে, তখনকার দিনে এমন ধারণাই ছিল। এমন মহাজাগতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে জামাল আর আমি মহাবিশ্বের পরিণতি নিয়ে অঙ্ক কষেছিলাম। তখনকার দিনে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ওই মডেলকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, মহাজগৎটা ত্বরিত গতিতে প্রসারিত হচ্ছে। সুতরাং আগের মডেল এখন ভুল। সতত পরিবর্তিত গতিতে সম্প্রসারিত মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ পরিণতিটা হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কী–বা কারণ আর কীই–বা তার পরিণতি—এই ত্বরণ সম্পর্কে অনেক জানাশোনাই বাকি। এই কারণে মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি এখনো অজানা রয়ে গেছে।

বিজ্ঞানচিন্তা: আপনাকে ধন্যবাদ।

ফ্রিম্যান ডাইসন: ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0