মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদা
মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদাঅলংকরণ: মাসুক হেলাল

বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের প্রধান তিনি। এদেশের বিজ্ঞানচর্চার, বিজ্ঞান সংগঠনগুলোর ভিত নির্মিত হয়েছিল তাঁর হতে। এ কালের তুমুল জনপ্রিয় পার্টিকেল বোর্ডের জনক তিনি। ড. মুহম্মদ কুদরাৎ ৪৩ বছর আগে ৩ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি বিজ্ঞানচিন্তার পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা।

বাবা-মা চাইতেন ছেলে কুদরাত-এ-খুদা কোরআনের হাফেজ হোক। এ জন্য তাঁকে ছোটবেলায় হাফেজি মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়। তাঁর এক চাচাতো ভাই কলকাতায় লেখাপড়া করতেন। তিনি গ্রীষ্মের ছুটিতে এসেছেন বাড়িতে বেড়াতে। তিনি কুদরাত-এ-খুদার জন্য নিয়েছেন বর্ণবোধ নামে একখানা আদর্শলিপির বই। এক পয়সা মোটে দাম ছিল সেই বইখানার।

একদিন সকালে সেই চাচাতো ভাই কুদরাত-এ-খুদাকে কাছে ডাকলেন। বইখানা মেলে ধরে কিছু পড়া দেখিয়ে দিলেন। বললেন, পড়াগুলো যেন ঠিক ঠিকভাবে হয়। কিন্তু দুপুর না হতেই দেখলেন কুদরাত-এ-খুদা পড়া বাদ দিয়ে খেলা করে বেড়াচ্ছে। তিনি হেঁকে বললেন, ‘এই হতভাগা দৌড়ে বেড়াচ্ছিস যে, পড়া হয়েছে?’

জবাবে কুদরাত-এ-খুদা বললেন, ‘হয়েছে।’

চাচাতো ভাই তাঁর কথা বিশ্বাস করলেন না। যাচাই করার জন্য কুদরাত-এ-খুদাকে বইটা আনতে বললেন। কিন্তু পড়া ধরার পর প্রমাণ হলো কুদরাত মিথ্যা বলেনি। ঠিক ঠিকই পড়াগুলো করে ফেলেছেন! চাচাতো ভাই অবাক হলেন। তিনি কুদরাত-এ-খুদার মা-বাবাকে অনুরোধ করলেন তাঁকে যেন স্কুলে ভর্তি করানো হয়। তাঁর সেই অনুরোধ বৃথা গেল না। কুদরাত-এ-খুদাকে স্কুলে ভর্তি করানো হলো। তত দিনে কুদরাত বেশ বড় হয়ে গেছেন।

বিজ্ঞাপন

ছাত্র হিসেবে যেমন তুখোড় ছিলেন কুদরাত-এ-খুদা, তুখোড় ছিলেন শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবেও। তিনি স্বপ্ন দেখতেন বাঙালি ছেলেমেয়েরাও বিজ্ঞান চর্চা করবে। ইউরোপ-আমেরিকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গবেষণা করবে, বড় কিছু আবিষ্কার করবে। এ জন্য সবার আগে দরকার বিজ্ঞানকে ভালোভাবে বোঝা। সে জন্য বিজ্ঞানচর্চা করা উচিত বাংলাতেই। বাংলা ভাষায় ছাত্ররা যাতে সহজে বিজ্ঞানচর্চা করতে পারে, সে জন্য তিনি লিখেছেন বেশ কিছু মূল্যবান বই। অনেকে মনে করত, বিজ্ঞানচর্চা করার মতো যথেষ্ট সম্পদ আমাদের দেশে নেই। সে জন্য এ দেশ থেকে বড় কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করা সম্ভব নয়। কিন্তু কুদরাত সে কথা মানতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করেই গবেষণা করা সম্ভব। সম্ভব সেই গবেষণা থেকে দেশের উন্নতি করাও। পারটেক্স আবিষ্কার করে তিনি তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন।

পারটেক্স গবেষণা ছাড়াও কুদরাত-এ-খুদা গবেষণা করেছেন এ দেশের বুনো গাছগাছড়া নিয়েও। বিশেষ করে যেসব গাছের ঔষধি গুণ আছে, সেগুলো নিয়ে। সেসব থেকে ওষুধ তৈরি করা যায় কি না, সেটাই দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। সফলও হয়েছিলেন। বেশ কিছু গাছ থেকে জৈব রাসায়নিক উপাদান নিষ্কাশনের উপায় বের করতে সক্ষম হন তিনি।

মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদা জন্মেছিলেন অবিভক্ত বাংলার বীরভূম জেলার মাড়গ্রামে (বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে)। ১৯০০ সালের ১ ডিসেম্বর। তাঁর বাবার নাম খোন্দকার আবদুল মুকিত। তিনিও উচ্চশিক্ষিত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেছিলেন আবদুল মুকিত। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের গোলামি করতে রাজি ছিলেন না। তাই চাকরি করেননি কখনো। আবদুল মুকিত ধর্মভীরু ছিলেন। মুরিদ ছিলেন তিনি কলকাতার তালতলার এক পীরের। কুদরাত-এ-খুদা যেদিন জন্মালেন, সেদিন তিনি ওই পীরের দরগায় ছিলেন। সেই পীর সাহেবই ছেলের নাম রাখলেন কুদরাত-এ-খুদা।

১৯০৯-১০ সালের দিকে কুদরাত-এ-খুদাকে কলকাতায় পাঠানো হলো। ভর্তি হলেন এমই স্কুলে। স্কলারশিপ নিয়ে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোলেন। তারপর ভর্তি হলেন কলকাতার এক মাদ্রাসায়। ১৯১৮ সালে সেই মাদ্রাসা থেকেই প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করলেন কুদরাত-এ-খুদা। এরপর ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। একটানা ছয় বছর সেখানে লেখাপড়া করলেন। ১৯২৫ সালে রসায়নবিদ্যায় এমএসসি ডিগ্রি লাভ করলেন। দীর্ঘ ছয় বছরের কলেজজীবন খারাপ কাটেনি কুদরাত-এ-খুদার। এমএসসিতে প্রথম হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কোনো এক শিক্ষক নাকি আরেকজনকে অবৈধভাবে কিছু নম্বর বেশি দিয়ে প্রথম করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সব জায়গায় তো ভালো-মন্দ দুই রকম মানুষই থাকে। তখন সেখানকার শিক্ষক আরেক বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায়। প্রফুল্লচন্দ্র এ ঘটনার প্রতিবাদ করে তা হতে দিলেন না। ফলে কুদরাত-এ-খুদাই প্রথম হয়ে রইলেন।

বিজ্ঞাপন

সেকালে ভালো রেজাল্ট করলে বিদেশে পড়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৃত্তি দেওয়া হতো। ঢাকা ও কলকাতা দুই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। দুটোই রাষ্ট্রীয় বৃত্তি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাড়িতে টেলিগ্রাম করে কুদরাত-এ-খুদাকে ডেকে আনল বৃত্তির জন্য। তিনি এলেন, কিন্তু তাঁকে বৃত্তি দেওয়া হলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে কুদরাত-এ-খুদার একজন পরিচিত শিক্ষক ছিলেন। আবদুর রহীম নাম তাঁর। তিনি এ কথা শুনে ভীষণ চটলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে কুদরাত-এ-খুদার সব কাগজপত্র চেয়ে পাঠালেন। তিনি বিষয়টা খতিয়ে দেখলেন। শেষ পর্যন্ত কুদরাতকেই বৃত্তি দেওয়া হলো। ডিএসসি করার জন্য বিলেতে চলে গেলেন কুদরাত-এ-খুদা। ভর্তি হলেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ডিএসসি মানে ডক্টরেট অব সায়েন্স। কুদরাত-এ-খুদা থিসিস শুরু করলেন জে এফ থর্প নামের এক শিক্ষকের কাছে। থর্প প্রথম দিকে কুদরাত-এ-খুদাকে ভালো চোখে দেখতেন না। কারণ, কুদরাতের শিক্ষক প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে তিনি পছন্দ করতেন না। তাই পিসি রায়ের যেসব ছাত্র থর্পের কাছে ডিএসসির জন্য যেত, তাঁদেরও তিনি অবহেলা করতেন। কুদরাত-এ-খুদাকেও অবহেলা করতে লাগলেন থর্প। অন্য ছাত্রদের তিনি থিসিসের বিষয়গুলো খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতেন। কিন্তু কুদরাত-এ-খুদাকে নিজে বুঝে নিতে বলতেন। এটাই বরং তাঁর জন্য ভালো হলো। নিজের মতো করে কাজ করতে গিয়ে কুদরাত-এ-খুদা দেখলেন, তিনটি থিসিস লেখার মতো উপাত্ত তিনি জোগাড় করে ফেলেছেন। তিনটি থিসিস তিনি তৈরিও করে ফেললেন। তাঁর এই কাজ দেখে খুব খুশি হলেন থর্প। আগের সেই অবহেলা আর রইল না। ১৯২৯ সালে ডিএসসি ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে এলেন কুদরাত-এ-খুদা। তিনিই প্রথম মুসলমান ডিএসসি।

ডিএসসি লাভ করেও মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদাকে দুই বছর বেকার থাকতে হলো। এটা অবাক ব্যাপার। যাহোক, ১৯৩১ সালে তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পাঁচ বছর পরে তিনি রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হন।

১৯২৬ সাল। সে বছরই তাঁর প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে লন্ডনের জার্নাল অব কেমিক্যাল সোসাইটিতে। ১৯২৯ সালে একই জার্নালে আরও একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯৩০ সালে চাকরি পাওয়ার আগেই কুদরাত-এ-খুদা স্টেরিও রসায়ন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ইন্ডিয়ান জার্নাল অব কেমিস্ট্রিতে মোট ১৪টি প্রবন্ধ ছাপা হয় তাঁর। প্রকশিত মোট গবেষণামূলক প্রবন্ধের সংখ্যা ১০২টি।

১৯৪২ সালে কুদরাত-এ-খুদা কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হন। ১৯৪৬ সালে আবার ফিরে আসেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। একবারে প্রিন্সিপাল হয়ে।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হয়। কুদরাত-এ-খুদা কলকাতা ছেড়ে চলে আসেন ঢাকায়। যোগ দেন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের জনশিক্ষা দপ্তরে পরিচালক পদে। তবে সরকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো ছিল না। কারণ, উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে তিনি মানতে পারেননি।

এ সময় লন্ডনের বিখ্যাত নেচার পত্রিকাতেও তাঁর দুটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ছাপা হয়। তিনি রিং সিস্টেমের ওপর একটা তত্ত্ব দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রসায়নশাস্ত্রে তা স্থায়ী হয়নি। যাহোক, ১৯৫০ সালে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান কুদরাত-এ-খুদা। চলে যান করাচিতে। কিন্তু সেখানে তিনি সুখে ছিলেন না। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের দেখতে পারত না। কুদরাত-এ-খুদার বাড়িতে রাতে ইটপাটকেল পড়ত।

১৯৫৩ সালে পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ১৯৫৫ সালে তাঁকে পাকিস্তান বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারের পর্বূাঞ্চলীয় শাখার চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। এ সময় তিনি তেলাকুচা থেকে বারোটি জৈব রাসায়নিক উপাদন নিষ্কাশন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তা ছাড়া তুলসী, বিষকাঁটালি, গুলঞ্চ, কালোমেঘ ইত্যাদি উদ্ভিদেরও জৈব উপাদান নিষ্কাশন করতে সক্ষম হন। এই গবেষণাগারেই তিনি পাটখড়ি নিয়ে নানা গবেষণা শুরু করেন। পাটখড়ি থেকে মণ্ড তৈরির ফর্মুলা আবিষ্কার করেন। পরে সেই মণ্ড থেকে কাগজ তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। পাটখড়ি এই মণ্ড থেকে পারটেক্স বা পার্টিকেল বোর্ডের ফর্মুলা তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন। পার্টিকেল বোর্ড আজ ব্যবহার হচ্ছে গোটা দুনিয়াজুড়ে!

বিজ্ঞাপন

পাট, লবণ, কাঠকয়লা, মৃত্তিকা ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ নিয়েও গবেষণা করেন কুদরাত-এ-খুদা। রস ও গুড় থেকে মল্ট ভিনেগার তৈরি ফর্মুলাও তাঁর আবিষ্কার। বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর ও তাঁর সহকর্মীদের ১৮টি আবিষ্কারের পেটেন্ট রাইট বা মেধাস্বত্ব রয়েছে। এর মধ্যে ৯টি পাটসংক্রান্ত।

১৯৬৬ সাল পর্যন্ত কুদরাত-এ-খুদা পাকিস্তান বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারের পূর্বাঞ্চলীয় শাখার চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করে। এই শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাংলাদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে আজও মাইলফলক হয়ে আছে। কুদরাত-এ-খুদা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। ১৯৭৬ সালে তাঁকে একুশে পদক প্রদান করা হয়।

বিজ্ঞানলেখক হিসেবেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। যুদ্ধোত্তর বাংলার কৃষি ও শিল্প নামের বইখানি প্রকাশ করে বিশ্বভারতী। তাঁর লেখা বিজ্ঞানের সরস কাহিনী, বিজ্ঞানের বিচিত্র কাহিনী, বিজ্ঞানের সূচনা, পূর্ব-পাকিস্তানের শিল্প সম্ভাবনা, রমাণু পরিচিতি, বিজ্ঞানের পহেলা কথা, বিচিত্র বিজ্ঞান ইত্যাদি বই আজও বিখ্যাত। এ ছাড়া ১৯৬৩ সালে পুরোগামী বিজ্ঞান এবং ১৯৭২ সালে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা নামে দুটি বিজ্ঞান সাময়িকী সম্পাদনা করেন কুদরাত-এ-খুদা।

১৯৭৭ সালের ৪ নভেম্বর এই বিজ্ঞানী, লেখক, সংগঠক ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

সূত্র: উপমহাদেশের কয়েকজন বিজ্ঞানী/ এ এম হারুন অর-রশীদ, উইকিপিডিয়া

মন্তব্য করুন