গত ২০ ও ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৬, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, নাটোর, টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে ২৬ জন নিহত হন। তাঁদের কেউ বাড়ির উঠানে কাজ করছিলেন। কেউ নদীতে নৌকায় যাচ্ছিলেন। আবার কেউ টিনের ঘরের ভেতরেই বজ্রপাতে মারা যান। এর কয়েক মাস আগে গত মে মাসে কালবৈশাখীর মৌসুমে ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় ৬৫ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। প্রতিবছর বজ্রপাতে এত মানুষের মৃত্যু সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। আমাদের দেশে বরং কম। দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলা আরও ভয়াবহ বাজের দেশ হিসেবে পরিচিত। ওই দেশের জুলিয়া রাজ্যে ক্যাটাটুম্বো নদীর তীরবর্তী এলাকায় বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ৩০০ দিনই বজ্রপাত ঘটে। এ জন্য ওই এলাকা বিশ্বে ‘বজ্রপাতের রাজধানী’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। নাসা ঘোষণা করেছে, ওটা ‘বজ্রপাতের রাজধানী’।

সেখানে এত বেশি বজ্রপাতের কারণ হলো ওই এলাকার ভূমির গঠন। সেখানে লেক মারাখায়বোর চারপাশ ঘিরে দক্ষিণে রয়েছে ঘোড়ার খুরের মতো আন্দিজ পর্বতমালা ও উত্তরে ক্যারিবিয়ান সাগর। ঠান্ডা পার্বত্য বাতাস আর সাগর ও লেকের গরম বাতাসের সংঘর্ষ বজ্র বিদ্যুতের আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করে।

শুধু মানুষ নয়, প্রাণীও মারা যায়। চলতি বছরের ২৬ আগস্ট নরওয়ের একটি পার্বত্য উপত্যকায় বজ্রপাতে একসঙ্গে অন্তত ৩২৩টি হরিণ (রেইনডিয়ার) মারা যায়। বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে গবেষণা করেছেন। খোলা প্রান্তরে ওরা চরে বেড়াচ্ছিল। ঝড়-বিদ্যুতের ভয়ে ওরা একসঙ্গে জড়ো হয়। বজ্রপাতে প্রথমে মাটি বিদ্যুতায়িত হয় এবং সেই বৈদ্যুতিক চার্জ হরিণগুলোর এক পাশের দুই পা দিয়ে উঠে অপর পাশের দুই পা দিয়ে আবার মাটিতে চলে যায়। এই বিদ্যুত্প্রবাহই হরিণগুলোকে মারে।

বাজ পড়ার রহস্যটা কী? আকাশের মেঘে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চার্জ সঞ্চিত হয়ে একসময় প্রবল শব্দে মাটিতে নেমে বিপরীত চার্জের সঙ্গে মিলিত হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়, এটাই বজ্রপাত। উঁচু গাছ বা দালানকোঠায় বাজ আঘাত হানে। কারণ, মেঘে সঞ্চিত চার্জ সবচেয়ে কম দূরত্বে ও কম সময়ে বিপরীত চার্জের সঙ্গে মিলিত হতে চায়।

তাই ঝড়-বৃষ্টির সময় ঘন ঘন বাজ পড়লে আপনি বাইরে খোলা বিস্তৃত প্রান্তরে বা নদীতে নৌকায় থাকবেন না। কারণ, সেই সময় খোলা প্রান্তরে আপনিই সবচেয়ে উঁচু স্থান, যে স্থানটি বাজ বেছে নিতে পারে। আপনার মাথায় বাজ পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকবে, কারণ আপনিই সেখানে সবচেয়ে উঁচু বস্তু! তাই এ সময় ঘরের ভেতর থাকা নিরাপদ। অবশ্য সেখানেও কথা আছে। ছোট টিনের চালা ঘর হলে চলবে না। একটু বড় বাসা হতে হবে। তাহলে বাসায় বাজ পড়লেও তা টিনের চালা ও ইটের দেয়ালের মাধ্যমে মাটির সঙ্গে সহজে যুক্ত হবে, আপনার তেমন ক্ষতি হবে না। সে জন্যই শহরে উঁচু ভবনের চারপাশে আর্থিং ব্যবস্থা থাকে। বিদ্যুত্ পরিবাহী তামার তারের এক মাথা মাটির গভীরে পুঁতে রাখা হয়, অন্য প্রান্ত থাকে ছাদের ওপরে, চোখা শিকের আকারে। এতে বাজের হাত থেকে ভবন ও ঘরের মানুষ রক্ষা পায়। গ্রামে বাড়ির চারপাশে উঁচু সুপারি ও নারকেলগাছ লাগানো হয়, যেন বাজ পড়লে সেখানেই পড়ে, বাড়ি রক্ষা পায়।

এমন কুসংস্কার আছে যে বজ্রাঘাতে মৃত ব্যক্তির শরীরে দামি পাথর থাকে, তাই কিছু দুর্বৃত্ত লাশ চুরি করে। আত্মীয়স্বজন কবর পাহারা দেয়। আসলে বাজ কোনো বস্তু না যে আকাশ থেকে পড়বে। এটা শুধুই বৈদ্যুতিক চার্জ। বাজের সঙ্গে কোনো দামি পাথরের সম্পর্ক নেই। আবার অনেকে মনে করেন, বজ্রাঘাতে মৃত ব্যক্তির হাড়গোড়ে অতীন্দ্রিয় কিছু থাকে। ওগুলো দিয়ে জাদুটোনা করা যায়। এগুলো সব বাজে কথা। বিদ্যুতের শর্টসার্কিটে মৃত্যু আর বজ্রাঘাতে মৃত্যু একই ব্যাপার। বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে এসে কারও মৃত্যু হলে যদি তার শরীরে কোনো দামি পাথর পাওয়া না যায়, যদি তার হাড়গোড় দিয়ে জাদুটোনা করা না যায়, তাহলে বজ্রাঘাতে মৃত ব্যক্তির বেলায় কেন ওসব কথা বলা হবে? এগুলো সব কুসংস্কার।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0