মহাবিশ্ব নিয়ে মানুষের বিস্ময়-আগ্রহ পুরকালের। পৌরাণিক যুগ থেকেই প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হয়ে চলেছে জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞানভান্ডার। আধুনিক যুগে এসে আমূলে বদলে গেছে মহাকাশবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস। মানুষ এখন অনন্ত মহাবিশ্বের গভীর থেকে গভীরে ডুব দিতে চায়। কতটুকু সফল সে চেষ্টায়। ইতিহাস আর বিজ্ঞানের খেরোখাতায় চোখ রাখা যাক।

মহাবিশ্ব খুবই ফাঁকা

প্রায়ই শুনি জ্যোতির্বিদেরা বড় বড় দুরবিন দিয়ে মহাবিশ্বের বহু দূরে গ্যালাক্সি আবিষ্কার করছেন। সেখান থেকে আলো আসতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি বছর লেগে যাচ্ছে। সামান্য কুয়াশা যেখানে আমাদের কয়েক মিটার দূর পর্যন্ত দেখতে দেয় না, সেখানে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের বস্তু আমরা কীভাবে দেখি? এটা বুঝতে হলে বায়ুর ঘনত্ব নিয়ে একটু আলোচনা করলে ভালো হয়। দুটো হাতের তালু এক করে মুঠো করলে যে ছোট ফাঁকা জায়গা হবে, তাতে বাতাসের কয়টি কণা থাকবে? এ কণাগুলো হচ্ছে মূলত নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনের অণু, আর কিছু ধূলিকণা। হাতের মুঠোয় থাকবে হয়তো প্রায় ১০২০ টি কণা। ১০২০ মানে হচ্ছে ১ এর পর ২০টি শূন্য। এক বিলিয়নে হচ্ছে ১ এর পর নয়টি শূন্য, এক কোটিতে হচ্ছে ১ এর পরে সাতটি শূন্য। অর্থাত্ এক বিলিয়ন হচ্ছে ১০০ কোটি। তাই ১০২০ হচ্ছে ১০০ বিলিয়ন বিলিয়ন (102 x 109 x 109 = 102+9+9 = 1020)।

এখন আকাশের এমন একটা জায়গা নির্ধারিত করি, যেখানে কোনো নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি নেই। একদম ফাঁকা একটা অংশ। সেই ফাঁকা অংশে আমাদের চোখ থেকে একটা (১ সেন্টিমিটার x ১ সেন্টিমিটার) বর্গক্ষেত্র কল্পনা করে সেই বর্গক্ষেত্রটা পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত, ওই দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো পর্যন্ত, একটা সিলিন্ডার আকারে টেনে নিয়ে গেলে সেই সরু সিলিন্ডারের মধ্যে কটি কণা থাকবে? আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আন্তনাক্ষত্রিক স্থান খুবই ফাঁকা, সেখানে ১ ঘন সেন্টিমিটারে একটি পরমাণুও নেই বললে চলে। আর আন্তগ্যালাক্সি স্থান তো আরও ফাঁকা, সেখানে ১ ঘনমিটারে একটি পরমাণু পাওয়া যাবে না। তাই আমাদের সুদীর্ঘ কিন্তু সরু সিলিন্ডারের মধ্যে সব মিলিয়ে যে কটি কণা পাওয়া যাবে, তার সংখ্যা আমাদের হাতের মুঠোর মধ্যে যে কটি কণা পাওয়া যায়, তার থেকে খুব বেশি হলে কয়েক শ গুণ বেশি হতে পারে।

এটা নিয়ে একটু চিন্তা করা যাক। দৃশ্যমান মহাবিশ্বের শেষ প্রান্ত থেকে কিছু আলোক কণিকা প্রায় ১৩ বিলিয়ন বছর আগে রওনা দিয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় সেই আলোক কণাগুলো যতগুলো কণার মধ্য দিয়ে পার হয়েছে, তাদের সঙ্গে বিক্রিয়া না করে সেগুলোর পরিমাণ কিন্তু খুব বেশি নয়। আমার হাতের মুঠোয় যে কটা কণা রয়েছে, তার থেকে হয়তো কিছু বেশি। আর আমার ঘরের সমগ্র বায়ুকণার পরিমাণ বায়ুমণ্ডলের ওপরে উঠে দৃশ্যমান মহাবিশ্বের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ১ বর্গ সেন্টিমিটারের একটা সিলিন্ডার টানলে তার মধ্যে যে পরিমাণ কণা থাকবে, তার থেকে অনেক বেশি। অন্যভাবে বললে আমরা হাতের মুঠোয় মহাবিশ্বকে ধরতে পারি।

মহাবিশ্ব ফাঁকা, নইলে দূরের কিছু দেখা যেত না

অবিশ্বাস্য, কিন্তু একটু চিন্তা করলে বোঝা যাবে এর বাস্তবতা। পৃথিবীর বুকে সামান্য কুয়াশা আমাদের কয়েক মিটার দূরত্ব দেখতে দেয় না। অথচ কুয়াশার ঘনত্ব এমন কিছু নয়, যদিও বাতাসের চেয়ে কিছুটা বেশি। তাই আমাদের বায়ুমণ্ডল যদি আরেকটু বিস্তৃত হতো, ধরা যাক চাঁদ পর্যন্ত, তাহলে দূরের তারারা কেন, সূর্যও অদৃশ্য থাকত। মেঘের আড়ালে সূর্য কি দেখা যায়? এমনকি সূর্যাস্তের সময় বায়ুমণ্ডলের বাড়তি কয়েকটি স্তর পার হতে গিয়ে সূর্য তার ঔজ্জ্বল্য হারায়। পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের জন্য বায়ুর দরকার, কিন্তু বায়ুমণ্ডলের পুরুত্ব বেশি হলে সূর্যের প্রয়োজনীয় আলো পৃথিবীপৃষ্ঠে পৌঁছাবে না। সেই ক্ষেত্রে প্রকৃতির সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার ব্যাপার ছিল। তাই বায়ুমণ্ডলের উচ্চতা এত কম। বায়ুমণ্ডলের বাইরে মহাবিশ্ব, কিছু নক্ষত্র ও নক্ষত্র সমষ্টি (গ্যালাক্সি) বাদ দিলে, একেবারেই শূন্য। আর সে জন্যই আজ জ্যোতির্বিদেরা ১৩ বিলিয়ন বা ১৩০০ কোটি বছর আগে সৃষ্ট গ্যালাক্সিদের আলো দেখতে পারছেন।

বিজ্ঞানীরা শুধু দৃশ্যমান তরছেনঙ্গে মহাবিশ্বকে অবলোকন করছেন না, তাঁরা বিদ্যুৎচুম্বকীয় বর্ণালির বিভিন্ন তরঙ্গে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করছেন। আমরা এখন মহাবিশ্বকে শুধু দৃশ্যমান আলোতে অবলোকন করি না, আমরা তাকে পর্যবেক্ষণ করি বেতার, মাইক্রো, অবলোহিত, অতিবেগুনি, এক্স ও গামা তরঙ্গেও। সেই চর্চা আমাদের মহাবিশ্বকে নতুনভাবে দেখিয়েছে।

দিনের বেলা তারারা উধাও হয় না

দিনের বেলা সূর্যের সাদা আলোর নীল অংশ বায়ুমণ্ডলের কণাসমূহে বিচ্ছুরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা আকাশে, সেই উজ্জ্বল নীল রং ঢেকে রাখে আকাশের নক্ষত্রদের। আমরা যদি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপরে উঠি, তাহলে সেই তারাগুলোকে স্পষ্ট দেখা যেত, কালো আকাশে তারা ও সূর্যরা একই সময়ে জাজ্বল্যমান থাকত। পৃথিবীর কক্ষপথে অবস্থিত স্পেস স্টেশনের নভোচারীরা সূর্য ও আকাশের প্রায় সব দৃশ্যমান তারাদের দেখতে পারেন একই সময়ে, তাঁদের আকাশ সব সময়ই কালো থাকে। তাদের কক্ষপথ বায়ুমণ্ডলের ওপরে, সূর্যের আলোকে বিচ্ছুরিত করার জন্য কণার সংখ্যা সেখানে খুবই কম। পৃথিবীর বুক থেকেও ভালো দুরবিন দিয়ে দিনের বেলায় উজ্জ্বল তারা বা গ্রহদের দেখা সম্ভব, শুধু আকাশে তাদের অবস্থান জানতে হবে।

সকালবেলা কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ কে না দেখেছে!

পৃথিবীপৃষ্ঠে আমরা যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের পায়ের নিচে পৃথিবী আকাশের অর্ধেক অংশ ঢেকে রাখে। আমরা যদি বিষুবরেখার ওপর থাকতাম, তাহলে যেকোনো সময় আমরা সারা আকাশের অর্ধেকটা দেখতে পেতাম। পৃথিবী তার অক্ষের চারদিকে ২৪ ঘণ্টায় একবার ঘোরে। ফলে ২৪ ঘণ্টায় আমরা পুরোটা আকাশ দেখতে পেতাম। যদিও তার মধ্যে অর্ধেক সময় আকাশ দিনের আলোয় উদ্ভাসিত থাকত।

দিনের তারাদের কয়েক মাস পরেই রাতে দেখা যাবে

সূর্য ডুবে গেলে আকাশের নীল রং চলে গিয়ে কালো হয়ে ওঠে আকাশ, ফুটে ওঠে রাতের তারারা। তাহলে কি দিনের আলোয় ঢাকা তারাদের আমরা কোনো দিন পৃথিবীর বুক থেকে দেখতে পাব না? তা নয়, কারণ কয়েক মাস পরে যখন পৃথিবী তার কক্ষপথের অন্য একটি জায়গায় অবস্থান করবে, সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে রাতের তারারা ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হবে পশ্চিম দিগন্তে, তখন দিনের বেলার সেই তারাদের দেখা যাবে রাতের বেলা, আর আগের রাতের তারারা অদৃশ্য থাকবে দিনের নীল আকাশে। কিন্তু দিনের বেলাতেও উজ্জ্বল তারা শক্তিশালী দুরবিনে দেখা সম্ভব।

খালি চোখে মাত্র কয়েক হাজার তারা দেখা যায়

অনেকের ধারণা, দূষণহীন আকাশে লাখ লাখ তারা দেখা সম্ভব। কিন্তু খালি চোখে দুই গোলার্ধ মিলিয়ে পাঁচ থেকে নয় হাজারের বেশি তারা দেখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে শহরের আলো থেকে দূরে কোনো অন্ধকার গ্রামের আকাশে হয়তো এক হাজার তারা একই সময়ে দেখা যেতে পারে। আমরা যদি তাদের মধ্যে অন্তত ৫০টিকে ভালোমতো চিনি, তাহলে প্রতি ঋতুতে আকাশের পরিবর্তন সম্পর্কে আমরা সচেতন হব, বিশাল আকাশের নক্ষত্র নাগরদোলা আমাদের অভিভূত করবে। আকাশকে আমরা দেখব জীবনের একটা অংশ হিসেবে। যদিও তারাদের নিজস্ব গতি আছে, কিন্তু তাদের দূরত্বের জন্য সেই তারারা আমাদের জীবনকালে তাদের অবস্থান বদলাবে না। সেই তারাদের আমরা একবার চিনলে তারা আমাদের সারা জীবনের আনন্দের উত্স হয়ে থাকবে।

সূর্য ও চাঁদের পর্যবেক্ষণ

কিন্তু তারাদের দেখা ছাড়া আরও সহজভাবে জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা সম্ভব। সূর্য বছরের কোন সময়ে কোথায় উদয় হচ্ছে ও কোথায় অস্ত যাচ্ছে, সেটার দিকে খেয়াল রাখলেই আমরা সূর্যের চারদিকে আমাদের ঘূর্ণনের বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হব। চাঁদের কলা ও সময়ের সঙ্গে আকাশে চাঁদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের প্রদক্ষিণের প্রক্রিয়াটা সহজেই বুঝে নেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া সাধারণ একটি বাইনোকুলার দিয়ে চাঁদের পৃষ্ঠের বিভিন্ন ভৌগোলিক চিহ্নকে চিনে নেওয়া যায়। পৃথিবীপৃষ্ঠে জোয়ার-ভাটা ঘটাতে চাঁদের (এবং কিছুটা সূর্যের) ভূমিকা মুখ্য। তাই চাঁদ প্রাথমিক শৌখিন জ্যোতির্বিদ্যার প্রথম সোপান হতে পারে।

জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে বর্তমান জ্ঞান

আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে নক্ষত্ররা তাদের অন্তিম পরিণতিতে রূপান্তরিত হয় শ্বেত বামন, নিউট্রন নক্ষত্র বা কৃষ্ণবিবরে। তাঁরা ব্যাখ্যা করতে পেরেছেন তারাদের মধ্যে কেমন করে কার্বন, অক্সিজেন, লোহা বা ইউরেনিয়ামের মতো মৌলিক বস্তু সংশ্লেষিত হতে পারে, সেটার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কেমন করে একটা অতিনবতারা ভীষণ শক্তি নিয়ে বিস্ফোরিত হয় এবং তার অভ্যন্তরে সৃষ্ট পদার্থসমূহ মহাশূন্যে ছড়িয়ে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন বিগ ব্যাং সৃষ্ট আদি বিস্ফোরণের অবশিষ্ট বিকিরণটুকু। তাঁরা মনে করছেন, মহাবিশ্বের বেশির ভাগ বস্তুই অদৃশ্য, যদিও সেই অন্ধকার বা কৃষ্ণ বস্তু মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অনুগত। আবিষ্কার করেছেন মহাবিশ্বের ক্রমস্ফীতি, ত্বরান্বিত স্ফীতি আর সেই স্ফীতির উত্স হিসেবে এক অন্ধকার শক্তির। যত নতুন কিছু আবিষ্কৃত হয়েছে, ততই নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। অন্ধকার বস্তু, অন্ধকার শক্তি, গামা রশ্মি বিস্ফোরণ, আদি গ্যালাক্সি সৃষ্টি—এসবই এখনো রহস্যময়। সেই রহস্যের সমাধানেই বিজ্ঞানের আকর্ষণ। শৌখিন জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা সেই রহস্য বোঝার চাবিকাঠি হতে পারে।

বিজ্ঞান গভীর প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়

সেই কবে, হয়তো ত্রিশ, চল্লিশ বা পঞ্চাশ হাজার বছর আগে মানুষ সৃজনশীলভাবে চিন্তা করতে শুরু করেছিল। তখন থেকে হাজার হাজার বছর ধরে যুদ্ধ, বিগ্রহ, অসুখ, মহামারি, রাজনীতি, ধর্ম মানব সভ্যতাকে বিভিন্ন খাতে নিয়ে গেছে, তবু মানুষের কৌতূহল শেষাবধি জয়ী হয়েছে। তাই আজ আমরা টলেমির পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের মডেলের পরিবর্তে এক অসীম প্রসারণশীল মহাবিশ্বের কথা ভাবি। কোপের্নিকাস, কেপলার, গ্যালিলিও, নিউটন আকাশ পর্যবেক্ষণ ও তাত্ত্বিক পদ্ধতির  সূচনা করে দিয়েছিলেন, বর্তমান সময়ের আইনস্টাইনীয় আপেক্ষিকতা তত্ত্ব থেকে আরম্ভ করে কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের হিগস ক্ষেত্রের উদ্ঘাটনের আগে সেই অদম্য জানার ইচ্ছাটাই প্রকাশ পেয়েছে। বর্তমানের বিজ্ঞান যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চায়, সেই প্রশ্নগুলো খুবই গভীর। আমাদের বাস্তবতার ভিত্তিভূমি কী? বস্তু তার ভর কোনখান থেকে পায়?

বিজ্ঞান কখনো থেমে থাকে না

আজকের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব হয়তো আগামীকাল পরিত্যক্ত হবে। তার জন্য বিজ্ঞানীরা ভীত নন, কারণ তাঁদের কাজই হলো সত্যের সন্ধান। কিন্তু এই সত্য চিরন্তন কিছু নয়। এই সত্য বাস্তবতার একটি মডেল মাত্র। যত দিন যাবে সেই মডেল আরও পরিশীলিত হবে। আকাশ পর্যবেক্ষণ এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার এক সহজ পদ্ধতি।

 লেখক: জ্যোতিঃপদার্থবিদ, ক্যালিফোর্নিয়া রিভারসাইড কলেজের অধ্যাপক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0