মাইকেল গিলনের সাক্ষাৎকার

ট্রাপিস্ট-১। আশা জাগানিয়া এক সূর্য। তার চারপাশে ঘুরছে অন্তত সাতটি গ্রহ। মাত্র ৪০ আলোক বর্ষ দূরের এ সৌরজগত নিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ নেচার জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তবে ২০১৬ সালের ১২ মে একই জার্নালে প্রথম বাসযোগ্য তিনটি গ্রহের কথা বলেছিলেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা। তারপর ই-মেইলে গবেষক দলের প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাইকেল গিলোনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন বিজ্ঞানকর্মী ও সাংবাদিক জাহাঙ্গীর সুর।

প্রশ্ন: বামন সূর্যটার জগতে কি প্রাণের অনুকূল পরিবেশ থাকতে পারে?

মাইকেল গিলন: হ্যাঁ, আমরা যতটুকু জানি, এটা সম্ভব। তিনটি গ্রহের পৃষ্ঠভাগের কিছুর অংশে তরল পানিও থাকতে পারে। পৃথিবীতে সব রকমের জীবনের জন্য তরল পানি অনিবার্য। তাই বহির্জগতে প্রাণের সন্ধান করতে গেলে এ ধরনের ভিনগ্রহই উত্তম লক্ষ্য। এ কারণেই আমরা এদের বলছি, ‘সম্ভাব্য বাসযোগ্য’ গ্রহ। আমাদের বিদ্যমান প্রযুক্তি দিয়েই এসব বাসযোগ্য গ্রহের আবহাওয়ার পুঙ্খানুপুঙ্খ খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব। যদি এদের কোনোটায় অনুকূল পরিবেশ থাকে, তা মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই শনাক্ত করতে পারব।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন: নেচারে প্রকাশিত আপনাদের গবেষণা প্রবন্ধটি (নেচার ১৭৪৪৮, ১২ মে ২০১৬) বলছে, ওই সূর্যের কিরণ হলো অবলোহিত আলো। সুতরাং, যদি তারাটির গ্রহগুলোয় কোনো অ্যালিয়েন উদ্ভিদ জন্মায়ও এবং আমরা যদি কোনোমতে তা পরখ করতে পারি, তাহলে কি উদ্ভিদগুলো ভিন্ন রকম দেখাবে?

মাইকেল গিলন: সালোকসংশ্লেষণের জন্য সূর্যালোক দরকার। সৌরকিরণ ধরতে গাছ রঞ্জক পদার্থ হিসেবে ক্লোরোফিল ব্যবহার করে। ক্লোরোফিল মূলত নীল ও লাল ফোটন শোষণ করে। কিন্তু কোন সূর্য (ট্রাপিস্ট-১) যখন দৃশ্যমান কোনো আলো বিকিরণ করেই না, তখন সেখানে ভিন্ন ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। সালোকসংশ্লেষী প্রজাতিরা হয়তো অন্য এমন রঞ্জক ব্যবহার করতে পারে, যাতে তারা লাল ও অবলোহিত আলোর কণা শোষণ করতে পারে। আমাদের চোখে ওই গ্রহের ভূচিত্র সম্ভবত লালচে দেখাতে পারে। গাছগাছালিগুলো দেখতে কালচে মনে হতে পারে।

প্রশ্ন: কিন্তু সেখানে পৃথিবীর হিসাবে মাত্র ২ থেকে ৫ দিন কিংবা বড়জোর ৭৩ দিনে এক বছর হয়। এমন দ্রুতগতির গ্রহে কি অনুকূল পরিবেশ হতে পারে?

মাইকেল গিলন: পৃথিবীর দিনের হিসাবে কোনো গ্রহের এক বছরের দৈর্ঘ্য কত, তা কিন্তু জীবনের প্রশ্নে সত্যিকার অর্থে জরুরি বৈশিষ্ট্য নয়। বরং নিজ নক্ষত্রের কতটুকু আলো ওই গ্রহের ওপর পড়ে, রশ্মিপাতের সেই হারই গুরুত্বপূর্ণ। গ্রহ বি ও সি পৃথিবীর থেকে যথাক্রমে চার ও দুই গুণ বেশি আলো পায় তাদের নক্ষত্র থেকে। আর গ্রহ ডি আলো পায় পৃথিবীর তুলনায় দশ ভাগের এক ভাগেরও কম কিংবা সর্বোচ্চ পৃথিবীর সমান। গ্রহগুলোয় নক্ষত্রের আলো পড়ার এই হারের তুলনা করা যেতে পারে শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গলের সঙ্গে।

শুক্র ও মঙ্গলের বেলায় ভিন্ন কোনো বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় নিলে হয়তো দেখা যাবে, তাদের ভূপৃষ্ঠও তরল জল ও জীবনের উপযোগী। উদাহরণস্বরূপ, অনেক ভরওয়ালা মঙ্গলে কিন্তু আবহাওয়া ও পুরোনো সাগর থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কাজেই, এসব গ্রহে প্রাণ থাকতে পারে কিংবা নাও থাকতে পারে। কয়েক বছরের মধ্যেই আমরা উত্তরটা নিশ্চিত হতে পারি।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন: বহির্জাগতিক গ্রহ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এই আবিষ্কার বড় কোনো প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

মাইকেল গিলন: অবশ্যই। দুটো কারণে।

এই প্রথম আমরা এমন গ্রহের দেখা পেলাম যারা আকারে ও ঔজ্জ্বলতায় আমাদের সৌরজগতের পৃথিবীসদৃশ গ্রহদের (বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল) মতোই। বর্তমান প্রযুক্তি দিয়েই এদের আবহাওয়ার গঠন নিয়ে গবেষণা করা যায়।

অতিশীতল বামন নক্ষত্রের চারপাশে ঘোরা কোনো গ্রহের সন্ধানও এটাই প্রথম। মাত্র একটা নয়, তিন-তিনটা গ্রহ শনাক্ত হয়েছে। ছায়াপথে এই ধরনের খুদে নক্ষত্রমণ্ডল সংখ্যায় সূর্যসদৃশ তারাদের চেয়ে ঢের বেশি। এদের চারধারে যে পৃথিবীর মতো গ্রহরা গড়ে উঠতে পারে, এ আবিষ্কার সেই ধারণাকে জোরালো করে। এরা হলো সম্পূর্ণ নতুন এক গ্রহকুল, যারা আকাশগঙ্গা ছায়াপথে সব গ্রহজগত মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করবে।

মাইকেল গিলন ট্রাপিস্ট-১ নক্ষত্র গবেষক দলের প্রধান জ্যোতির্বিদ

*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত

মন্তব্য করুন