এই বাসা ছেড়ে যেতে কষ্ট হবে খুব।

সতেরো বছর আগে উঠেছিলাম।

আমি ধ্রুব এষ। বইয়ের প্রচ্ছদ বানাই!

সতেরো বছর! কম দিন না। তিনটা লিপ ইয়ার গেছে এর মধ্যে।

কত-কী ঘটনা।

ভালো ঘটনা, বাজে ঘটনা।

কত হইহল্লা, কত আনন্দ, কত অভিমান, কত ভালোবাসা।

কত বইয়ের প্রচ্ছদ এই বাসায় বসে করেছি!

কষ্ট হবে না এই বাসা ছেড়ে যেতে?

যাকে বলে ছিল মৌরসি পাট্টা। চারতলা পুরোনো বিল্ডিং। চারতলার ফ্ল্যাট। সন্ধ্যার পরও ছাদে ওঠা যায়। রাত বারোটা হোক কি একটা, ভুলে থেকে আড্ডা দেওয়া যায় বেজায়। নিষেধাজ্ঞা নেই বাড়িওয়ালা ভাইয়ের। কোনো কোনো দিন এমন হয়েছে, ২২-২৩ জন দখল করে আছে ছাদ। কবি টোকন ঠাকুর, মাঝেমধ্যে ভিডিও ফিকশনও বানায়। কয়েক বছর আগে এই বাসায় একবার তার একটা ভিডিও ফিকশনের শুটিং করেছিল। লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন-সাইলেন্স। সে এক কাণ্ড। লনে মানুষ, সিঁড়িতে মানুষ, ঘরে মানুষ, ছাদে মানুষ। দিনভর শুটিং, রাতভর শুটিং। টানা কয়েক দিন। বাড়িওয়ালা ভাই বিরক্ত হননি। মানুষটা ভালো। কিন্তু কী আর করবেন, পুরোনো বিল্ডিং, এতখানি জায়গা, অঢেল টাকা দেবেন ডেভেলপার ভাইয়েরা, না হলে এই বিল্ডিং কি প্রাণে ধরে ভাঙতেন?

এখন বিল্ডিং ভাঙলে ভাড়াটেদের আর কোথাও চলে তো যেতে হবেই। বাড়িওয়ালা ভাইকেও চলে যেতে হবে। তবে বাড়িওয়ালা ভাইয়ের থাকার ব্যবস্থা ডেভেলপার ভাইয়েরা করে দিয়েছেন। কমপ্লেক্সের বিল্ডিং যত দিন না উঠবে, বাড়িওয়ালা ভাই যেখানে থাকবেন, ভাড়া দেবেন ডেভেলপার ভাইয়েরা।

চারতলা বিল্ডিংয়ে পাঁচ ফ্ল্যাট ভাড়াটে। নিচতলার ফ্ল্যাট দুটো খালি হয়ে গেছে আগেই। তিনতলার বাশার সাহেবরা চলে গেছেন আজ।

নীড়রাও চলে গেছে গত সোমবারে। এই বাসার গেট পার হয়েই ভালো একটা বাসা পেয়ে গেছে তারা। একতলা!

নীড় শিল্পী আপা ও জহির ভাইয়ের মেয়ে। চারতলায় থাকত তারাও। সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাঁ দিকের ফ্ল্যাটে। আমি থাকতাম কী, এখনো আছি তাদের উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে। আমার সঙ্গে আগে দেখেছি, বাচ্চাদের কিছুতে ভাব হয় না। তারা আমাকে দেখতে পারে না, আমিও তাদের দেখতে পারি না। নীড় হলো পৃথিবীর প্রথম মানবশিশু, যে আমাকে দেখতে পারল, আমি যাকে দেখতে পারলাম এবং যার সঙ্গে আমার ভীষণ ভাব হলো। মুখোমুখি ফ্ল্যাট তো, বাসা থেকে বের হচ্ছি একদিন, দেখি নীড়কে কোলে নিয়ে তাদের কাজের মেয়েটা, নাসিমা, কাক দেখাচ্ছে এবং কথাটথা বলছে।

‘কাক দেখো, নীড়! ওই যে দেখো। কাক! কাক!’

মাত্র কথা বলতে শিখেছে নীড়, বলল কী!

‘কাকমামা!’

কাকমামা!

আমি হাসলাম।

নাসিমা বলল, ‘দেখো নীড়! ধ্রুব মামা! দেখো।’

নীড় দেখল। বলল, ‘ধুমমামা!’

ধুমমামা!

ভালো তো।

‘হ্যাঁ, ধুমমামা।’

আমি বললাম।

কী কাণ্ড! আমার দিকে ছোট্ট ছোট্ট দুটো হাত বাড়িয়ে দিল ছোট্ট মানুষটা। বিষয়টা কী? বলেছি বাচ্চাকাচ্চাদের দেখতে পারি না, তা না আসলে। পটাতে পারি না। কুটুকুটু মুটুমুটু টুটুটুটু করতে পারি না।

নাসিমা বলল, ‘কী? ধ্রুব মামার কাছে যাবা?’

‘উঁ। উঁ।’

এ রকম কাণ্ড আর ঘটেনি, বাবা! দেখতে না পারার কথা বলেছি, কুটুকুটু করতে না পারার কথা বলেছি, মূল কথা যেটা সেটা এখনো বলিনি। কথাটা হলো ওরা, মানে বাচ্চারা আমাকে দেখে ভয় পায়। ধড়াচূড়া দেখে ভয় পায় হয়তো। কাপালিক যদি চিনত, কাপালিক মনে করত। অ্যান্ডা-গ্যান্ডা ছানাপোনা হলে তো ওঁয়া ওঁয়া করে ওঠে দেখলেই। মনটা চায় কী, দিই এক ঠোনা!

কিন্তু নীড়বিবি দেখি উল্টো।

ঐতিহাসিক একটা ঘটনা ঘটল। পৃথিবীর কোনো মানবশিশু এই প্রথম আনন্দের সঙ্গে আমার কোলে এল। আমার দাড়ি ধরে টানল এবং অনেকবার ‘ধুমমামা’ বলল। কয়েক দিনের মধ্যে ভাব ভাব ভাব। আমার কোল ছাড়া নীড় আর খায় না। সে সকাল, দুপুর কী রাত হোক। আমি ঘরে থাকলেই হয়েছে, ধুমমামার কোল ছাড়া খাওয়ায় কে নীড়কে?

কোলে-কাঁখে বড় হওয়া বলে, বলতে গেলে নীড় আমার কোলে-কাঁখে বড় হয়েছে। তারা চলে গেলে আমার খারাপ লাগবে না? খুব খারাপ লাগছে। তাও বাসা সামনেই বলে, এই কদিনেই গেছি কয়েকবার। চা-টা খেয়ে কথাটথা বলেছি নীড়, শিল্পী আপা, জহির ভাইয়ের সঙ্গে। কিন্তু দুই দিন পর তো আমি আর এই বাসা বা গলিতে থাকব না। নতুন বাসা ঠিক করে ফেলেছি। এই এলাকাতেই। মাস্টার ফার্মেসির রাস্তায়। তিনতলায়, চিলেকোঠা। একদম ছাদে। স্বস্তি এই একটাই। চিলেকোঠা এবং ছাদ থেকে আকাশ দেখা যায়। সুবন্দোবস্ত আছে আড্ডার। কিন্তু এখান থেকে চলে গেলে কি আমি আর এই গলিতে কখনো আসব না? মাথা খারাপ নাকি? অবশ্যই আসব। নীড়কে দেখতে তো আসব।

আর আসব একদিন। এই বাসাটা যেদিন ভাঙবে।

কামরাঙ্গীরচরে ইদরিস মিয়া থাকেন। ছেলে-বউ-নাতি-পুতি নিয়ে সংসার। ডাব ও তরমুজ বিক্রি করতেন। এখন আর করেন না। রিটায়ার করেছেন। এলজিইআরডি ভবনের উল্টো দিকে একদিন তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। মন খারাপ করে বসে বিড়ি টানছিলেন।

কথাটথা হলো।

‘কই থাকেন?’

‘কামরাঙ্গীরচরে।’

‘দেশের বাড়ি সিলেট?’

‘অয়।’

‘কোন জেলা?’

‘ছাতক উপজিলা।’

‘অ। আমি তাইরপুর উপজেলার। সুনামগঞ্জের তাইরপুর। গেছোনি কুনোদিন?’

মানুষটা যদি বলতেন তাঁর বাড়ি বরিশাল?

কী কুষ্টিয়া কী নাইক্ষ্যংছড়ি? আমিও বরিশাল, কুষ্টিয়া কী নাইক্ষ্যংছড়ির মানুষ হয়ে যেতাম। বরিশাল, কুষ্টিয়া কী নাইক্ষ্যংছড়ি, যেকোনো অঞ্চলের ভাষায় তাঁর সঙ্গে কথা বলতাম।

কিন্তু মানুষটা সিলেট অঞ্চলের। সিলেটি ভাষায় তাঁর সঙ্গে কিছু কথাটথা হলো।

ধ্রুব এষ না, এটা পারি আমি। আমি কে? আমিও ধ্রুব এষ। ধুমমামা নীড়ের।

কামরাঙ্গীরচরনিবাসী মানুষটা তাঁর নাম বলেছেন ইদরিস মিয়া। জিজ্ঞেস করলাম, ‘মন খারাপ ক্যানে?’

‘বস্তি বুলে ভাঙত না শুনলাম।’

‘বস্তি ভাঙত না? কোন বস্তি?’

‘ওই তো। ওইটা।’

রাস্তার নিচুতে বস্তি। হাজার কয়েক ঘর হবে মনে হয়। সাত-আট হাজারের কম মানুষ তো থাকে না। এই বস্তি ভেঙে ফেলার কথা ছিল নাকি? ভাঙবে না বলে এই মানুষটার মন খারাপ কেন?

‘বস্তি ভাংগা দেখতে আইছলাম।’

‘ক্যানে? ইখানো কেউ থাকেনি তোমার?’

‘না। এমনেই।’

‘এমনেই?’

‘অয়। মজা লাগে বস্তি ভাংগা দেখতে।’

উনিশ-বিশ বছর আগের ঘটনা। মনে আছে এখনো। এই বাসাটা যখন ভাঙবে, গুঁড়িয়ে দেবে বুলডোজার দিয়ে, আমি কি মজা পাব সেই কামরাঙ্গীরচরের ইদরিস মিয়ার মতো?

এ রকম কত কথা যে ভেবেছি বাসা ছাড়ার আগ পর্যন্ত। কত-কী কত-কী। ফাইনালি বাসা ছাড়ার আগের দিন তো, সারা রাত ছাদে বসে ছিলাম একা। কত ঘটনা এই ছাদে। কত আকাশ, কত পাতাল যে ভেবেছি। সকাল হতেই দেখি আরে, তেমন মন খারাপ তো লাগছে না আর। পরের বাসায় ছিলাম, ভাড়া দিয়ে থেকেছি, তারা তাদের বাসা ভেঙে ফেলবে, তাতে আমার এত খারাপ লাগবে কেন? অযথা না?

জিনিসপত্র চিলেকোঠায় নিয়ে গেছি আগেই। খুব বেশি কিছু জিনিস তো না। আঁকাআঁকির সরঞ্জাম, খাট, বইয়ের র্যাক আর হাঁড়িকুঁড়ি কিছু। এই বাসার চাবি কাল দুপুরেই বুঝিয়ে দিয়েছি বাড়িওয়ালা ভাইকে। বিদায় আর কার কাছ থেকে নেব? হে ছাদ, হে ঘরদোর, বিদায়! বলে যে এই চিলেকোঠায় এসে উঠেছি, এগারো দিন পার হয়ে গেছে এর মধ্যে। একবারও আর পুরোনো বাসার গলিতে যাইনি। এই যে, ‘পুরোনো বাসা’ হয়ে গেছে বাসাটা। কত সহজে। শিল্পী আপাকে ফোন করেছিলাম পরশু... না, তরশু।

‘কেমন আছেন, আপা?’

‘আলহামদুলিল্লাহ। ভালো আছি ভাইয়া। আপনি কেমন আছেন? নতুন বাসা কি ভালো লাগতেছে?’

‘হ্যাঁ, আপা। খুব ভালো।’

‘ও-ও-ও। এই জন্য আমাদের ভুলে গেছেন, না ভাইয়া?’

‘আরে না, আপা! কী বলেন! বাসা এখনো গোছাইতে পারি নাই তো। মিথুন হেল্প না করলে তো গেছিলাম। সে সব গোছায়ে দিতেছে।’

‘হ্যাঁ, মিথুন ছেলেটা খুব ভালো, ভাইয়া।’

‘হ্যাঁ, আপা। এই রকম ছেলে আর আমি দেখি নাই। এতটা কেউ করে? নীড় কী করে আপা?’

‘নীড় তো আজকে বাবুইদের বাসায়, ভাইয়া। তারা আজ জুটোপিয়া দেখবে।’

‘ভালো আপা। জুটোপিয়া আমিও দেখছি। মজা পাবে ওরা।’

‘আপনি অ্যানিমেশন ছবি দেখেন, ভাইয়া!’

‘হ্যাঁ, আপা। থ্রিডি হলে সিনেপ্লেক্সে গিয়া দেখি। আচ্ছা আপা, নীড় ফিরলে বলবেন।’

‘অবশ্যই ভাইয়া। নীড় তো খুব মন খারাপ করবে। ধুমমামার সঙ্গে কথা বলতে পারল না। আপনি আবার ফোন দিয়েন ভাইয়া।’

‘অবশ্যই, আপা।’

আর ফোন করা হয়ে ওঠেনি এখনো। কিন্তু নীড়ের কথা আমার মনে পড়ে খুব। মনে পড়বে। গানটান করলে আরও মনে পড়ে। মনে পড়বে। কিন্তু নীড় কি বুঝতে পারবে কিছু? সে তো ধ্রুব এষকে ধুমমামা ডাকবেই। অনেক বড় হলেও ডাকবে। আমি জানব। কষ্টও পাব? পাওয়ার কথা না, তাও হয়তো পাব। কিন্তু এত দুঃখের কথা থাক, আমার গানটানের কথা বলি। কত যে কাহিনি। একটাই বলি। অনেক অনেক কাল আগের ঘটনা, ঢাকা শহরে তখন এত যানজট ছিল না। আমরা বিকেলে খুব রিকশায় ঘুরতাম। কাজ ছাড়া, এমনি। একদিন আমি আর টুকু ঘুরছি। আঁতকা আমাকে একটা গানে পেয়েছে। বনি-এমের ‘স্যাড মুভিজ’ গানটা। গাইছি, গাইছি, গাইছি, গাইছি।’

স্যা-এ-এ-এ-এ-ড মুভিজ অলওয়েজ মেক মি ক্রাই...

হঠাত্ মনে হলো টুকু কি বিরক্ত হচ্ছে না? হওয়ার তো কথা। অতিশয় বিনয়ী, সুশীল এবং সুবোধ ছেলে বলে হয়তো কিছু বলছে না। এত কিছুর সঙ্গে আবার সরলপ্রাণও। ‘স্যাড মুভিজ’ অফ করে বললাম, ‘টুকু’।

‘হ্যাঁ। বলেন।’

‘এই যে আমি এতক্ষণ ধরে বিশ্রী বেসুরে একটা গান গাইতেই আছি, গাইতেই আছি, আপনার কি বিরক্ত লাগতেছে না, বলেন!’

সঙ্গে সঙ্গে সরলপ্রাণ টুকু একধরনের উচ্ছ্বসিত ক্রোধের সঙ্গে বলল, ‘ওহ্ ধ্রুবদা! এতক্ষণ পর কথাটা বললেন! আমার এতক্ষণ ধরে কী ইচ্ছা করতেছিল জানেন, ধাক্কা দিয়া রিকশা থেকে ফেলে দেই আপনাকে।’

আর নীড়?

সেই ছোট্টমোট্ট বয়স থেকেই সতর্ক। তাকে কোলে নিয়ে বসে আছি আর একটা গান ধরেছি কিনা সঙ্গে সঙ্গে, ‘এই, না! ধুমমামা না! গান না! গান না!’

বেসুরো না, আমি হলাম একটা অ-সুর।

‘এমন বেসুরে গান গাওয়ার অপরাধে তোমার আঠারো হাজার বছর নরকবাস হবে, ধ্রুবদা।’

কে বলেছিল?

মিলিতা।

সেই মিলিতাও এখন দুই বাচ্চার মা।

আর নীড় পড়ে টেনে। ধ্রুব এষ মানে আমি, এখনো তার ধুমমামা আছি। ধ্রুব মামা হইনি। হতেও চাই না।

উনিশে জুন জন্মদিন নীড়ের। আর ১০ দিন। কী গিফট করব?

কয়েক দিন ধরে ভাবছি। এখনো কিছু ঠিক করতে পারিনি।

ডক্টর সিউসের কিছু বই দেখেছি আজিজ মার্কেটে। নীড় কি চার্লি অ্যান্ড দ্য চকলেট ফ্যাক্টরি বইটা পড়েছে? ওটা দেওয়া যায়। আর? আর? আর?

default-image

আচ্ছা, আমি যে এত ভাবছি, নীড় কি মিস করে আমাকে? মনে করে? মনে রাখবে? কত-কী মনে রাখার একটা নিজস্ব জগত্ এখন তৈরি হচ্ছে তার। স্কুল, বন্ধু, ফেসবুক, ওয়াই-ফাই। ব্যস্ত থাকার কত উপকরণ এখন। তাও নীড় তার ধুমমামা, ধ্রুব এষকে মিস করবে হয়তো। মনেও রাখবে। কিন্তু আমাকে? মেয়েটা তো কখনো জানবেই না, আমি ছিলাম কখনো ধ্রুব এষের সঙ্গে। সঙ্গে বলতে ধ্রুব এষই তো ছিলাম। জটিল মনে হচ্ছে? সহজ করে কী বলা যায়? ধ্রুব এষের নিউরনে নিউরনে তার সঙ্গে আমিও ছিলাম। না হলে ধ্রুব এষের মতো একটা অসামাজিক, অমিশুক ব্যক্তি ‘ধুমমামা’ হয়ে যায় নীড়ের! কখনো কিছু জানবে না মেয়েটা। ধ্রুব এষ উনত্রিশ বছর ধরে আছে ঢাকায়। আমিও আছি। উনত্রিশ বছর আগে পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে বাচ্চা ধ্রুব এষ যখন প্রথম ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে নামল, আমি তার ভেতরে ঢুকে যাই। সে হয়ে যাই। এটা আমরা পারি।

উনত্রিশ বছর। ধ্রুব এষ বা আমার বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা একেবারে কম হয়নি। পুরোনো বাসার ছাদে যারা আসত, চিলেকোঠা তাদের অধিকাংশই পরিদর্শন করে গেছে এর মধ্যে। সন্ধ্যারাতে টুকটাক আড্ডাও শুরু হয়ে গেছে ছাদে। জিজ্ঞেস করেছে পরিদর্শনকারীদের কেউ কেউ, আগের বাসার জন্য মন খারাপ হয় না? আপনার নীড় কেমন আছে? আমার নীড়! পৃথিবীর আর কারও জন্যই মনে হয় এত মায়া আমার মধ্যে জন্মেনি। তুলি কাল এসেছিল বিকেলে। দু-এক দিন আগে সে নীড়কে দেখেছে রাস্তায়। বেইলি রোডের দিকে।

‘তোমার নীড় তো দেখতে একটা মহা সুইট হইছে, দাদাভাই।’

‘তা তো হইছেই। চোখ দুইটা কেমন মায়া মায়া দেখছিস?’

‘হ্যাঁ, পৃথিবীর সব মায়া।’

‘টিউনিয়ার সব মায়াও।’

‘টিউনিয়া! টিউনিয়া কী আবার?’

‘টিউনিয়া গ্রহ।’

‘টিউনিয়া গ্রহ! নাম তো শুনি নাই।’

‘তুই তো পাপুয়া নিউগিনির প্রেসিডেন্টের নামও শুনিস নাই। তাই বলে কি মানুষটা নাই?’

‘তুমি যে কী বলো, দাদাভাই! ওইটা তো একটা মানুষ। আর কী, কিউনিয়া...।’

‘কিউনিয়া না, টিউনিয়া...।’

‘হ্যাঁ, টিউনিয়া। টিউনিয়া তো একটা গ্রহ। সেটা কোথায়?’

‘গুগল ইঞ্জিনে সার্চ দিয়া দেখো।’

আইফোনে তুলি সার্চ দিয়ে দেখল।

‘কোথায় তোমার টিউনিয়া গ্রহ? গুগলেই নাই!’

‘গুগলে না থাকলেই কি একটা মানুষ নাই হয়ে যায় নাকি? ইয়ে গ্রহ?’

‘সেটা কোথায়, তা তো বলবে!’

‘তেরো লাখ বছর পরের সময়ের।’

‘আজব! তুমি গত সপ্তাহে গেছিলা নাকি?’

এই তুলিও কখনো জানবে না, তার দাদাভাই আসলে কে? বললাম, বিশ্বাস করল না। আর কাউকে বললে কি বিশ্বাস করবে? মামুন, সৌর, উত্তমদা, শাকিল, ঢালী ভাই, বুলবুল ভাই, মৌমিতা, পুনম? কেউ বিশ্বাস করবে না।

‘গেছিলা নাকি?’

তুলি বলল।  

‘যাই নাই, তবে যাব।’

‘অ। কবে যাবা?’

‘দেখি।’

‘আমারেও নিয়ো। হি! হি! হি! মাঝেমধ্যে তুমি এমন ছেলেমানুষের মতো কথা বলো, দাদাভাই!’

‘ছেলেমানুষের মতো কথা হইলেও সত্যি।’

‘হুঁ। পঞ্চাশ বছর বয়সের একজন মানুষ, কথা বলে পাঁচ বছর বয়সের কিডদের মতো।’

‘পঞ্চাশ না এই! উনপঞ্চাশ। পঞ্চাশ হবে সামনের জানুয়ারিতে।’

‘ওই হইল! উনপঞ্চাশ আর পঞ্চাশ একই। বাদ দেও। টিউনিয়া গ্রহে যাবা কী, তুমি টিউনিয়া গ্রহেরই বাসিন্দা। হইল?’

‘হইল। আমি তো টিউনিয়ানই।’

‘অসহ্য! তুমি নিজে একটা অসহ্য ছেলেমানুষ! আমাকেও ছেলেমানুষ মনে করো নাকি!’

‘আরে না। তোরে ছেলেমানুষ মনে করবে কে? গত অক্টোবরে রমনা বটমূলে তোর তিরাশিতম জন্মদিন পালন করল না মানুষজন? আচ্ছা, সামনে তো নীড়ের জন্মদিন। নীড়কে কী গিফট করা যায় বল তো?’

‘ড্রেস কিনে দাও। ইয়েলোতে সবুজ একটা পনচো দেখেছি। আর একটা ডিপ মেরুন ব্যাগি প্যান্ট দিয়ো। দারুণ মানাবে নীড়কে।’

তাহলে চার্লি অ্যান্ড দ্য চকলেট ফ্যাক্টরি, সবুজ পনচো, ডিপ মেরুন ট্রাউজারস, আর?

ধ্রুব এষই গিফট কিনবে অবশ্য। উনিশে জুন তো আর আমি থাকব না। পাহাড়ে যাব। যেতে হবে। কাল রাতে সিগন্যাল পাঠিয়েছে তারা।

উনত্রিশ বছর। কম দিন না। পৃথিবীতে থাকলাম, কত-কী দেখলাম। কত মানুষ, কত রকমের। যাদের সঙ্গে কাটিয়েছি, ভালো থেকেছি, একটা কোনো মানুষকে ভুলব না কখনো।

আচ্ছা, এই সব কথা একদিন নীড়কে বলে যাব নাকি? একদিন মানে কী, বলতে হলে আজই, এখনই বলতে হবে। বলে পাহাড়ে চলে যেতে হবে। ছয় শ আট কিলোমিটার দূরে পাহাড়। যেতে এক মিলি সেকেন্ড লাগবে। কাল সকালে ধ্রুব এষ ঘুম থেকে উঠবে শুধুই ধ্রুব এষ হিসেবে। আমি আর তার সঙ্গে থাকব না। থাকা যাবে না। মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে আমার পৃথিবীতে থাকার। চলে যেতে হবে আমার গ্রহ টিউনিয়ায়। এখন কি ফোন করব নীড়কে? রাত এখন বারোটা বারো। নীড় কি ঘুমিয়ে পড়েনি? না, এখনো ঘুমিয়ে পড়েনি। টেলিভিশন দেখছে। ডব্লিউবি চ্যানেলে ভূতের ছবি দেখাচ্ছে। হান্টিং অ্যাট কানেটিকাট-টু। নীড়ের সঙ্গে শিল্পী আপাও দেখছেন। মা-মেয়ে দুজনই ভূত ভয় পায়। আবার ভূতের ছবিও দেখে! হান্টিং অ্যাট কানেটিকাট ছবিটা অবশ্য অন্য রকম। আটা-ময়দার বানানো ভূতের ছবি না।

জহির ভাই ঘুমিয়ে পড়েন এগারোটার মধ্যেই।

নীড় একটা গেরুয়া ফতুয়া আর বটল গ্রিন ট্রাউজার পরে আছে। চুল পনিটেইল। মনে হচ্ছে ‘পিটার প্যানে’র ছোট্ট টিংকারবেল চশমা পরে টেলিভিশন দেখছে।

মাত্র ছবিতে ভালো মানুষ ভূত মিস্টার গর্ডিকে দেখিয়েছে, বিজ্ঞাপন বিরতি হলো।

নীড় বলল, ‘আধঘণ্টা বিজ্ঞাপন দেখবে এখন! কফি খাবে, মা? কফি বানাই?’

আমি ঠিক এই সময় ফোন করলাম।

শিল্পী আপার ফোন বাজল। শিল্পী আপা ফোন দেখেই বললেন, ‘ধুমমামা! নীড়!’

কল রিসিভ করে বললেন, ‘কেমন আছেন, ভাইয়া? কিছু হইছে?’

‘না আপা। এখনো ঘুমান নাই?’

‘না, ভাইয়া।’

‘হান্টিং অ্যাট কানেটিকাট-টু দেখতেছেন?’

‘হ্যাঁ, ভাইয়া। আপনি কী করে বুঝলেন, বলেন তো।’

‘আমিও দেখতেছি, আপা।’

‘ও। নীড়ের সঙ্গে কথা বলবেন ভাইয়া? নীড় আছে। দেব?’

‘দেবেন না?’

নীড় ফোন ধরে বলল, ‘হাই ধুমমামা!’

‘তোমারে খুব সুন্দর লাগতেছে মামা। ফতুয়াটা কে দিছে?’

‘ফতুয়া! তুমি কী করে জানলে, ধুমমামা?’

‘জানলাম রে মামা। শোনো, একটা কথা তোমাকে বলি।’

‘বলো।’

‘শুভ জন্মদিন।’

‘কী?...আমার জন্মদিন তো আজ না, ধুমমামা।’

‘জানি রে মামা। উনিশে জুন। কিন্তু আমি তো সেদিন থাকব না, হ্যাঁ?’

‘থাকবা না?’

‘না।’

‘কেন থাকবা না?’

‘আমাকে চলে যেতে হবে রে, মামা। টিউনিয়ায়। এত দিন পৃথিবীতে ছিলাম, কত-কী দেখলাম, কত-কী শুনলাম। ভালো লাগল কত। কিন্তু আমি তো পৃথিবীর মানুষ না।’

‘কী? এসব কী বলো তুমি, ধুমমামা?’

‘হ্যাঁরে, মামা।’

‘যাহ্! উনিশ তারিখ তুমি আসবা। আসবা না, বলো?’

‘আচ্ছা, আসব। তোমার কথা আমার মনে থাকবে, মামা। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’

‘আমারও মনে থাকবে, ধুমমামা। আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’

নীড়ের কথা শুনে পৃথিবীর মানুষের মতো আমার চোখে জল এসে গেল।

কাল সকালে উঠে নীড় মনে করবে কী, ধুমমামাকে নিয়ে কাল রাতে কী যে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন সে দেখেছে! ততক্ষণে আমি আর পৃথিবীতে থাকব না। ধ্রুব এষের সঙ্গে থাকব না। চলে যাব আমাদের গ্রহ টিউনিয়ায়। ধ্রুব এষ? থাকবে। এই চিলেকোঠায়ই থাকবে। উনিশে জুন সন্ধ্যায় যাবে তার পুরোনো বাসার গলিতে। জন্মদিনে উইশ করবে নীড়কে।

‘নীড়, শুভ জন্মদিন, মামা।’

‘থ্যাংক ইউ, ধুমমামা।’

‘আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, মামা।’

‘আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি, ধুমমামা।’

সব আমি টিউনিয়া থেকে শুনব। সব টিউনিয়া থেকে দেখব।

টিউনিয়ানদের মন খারাপ হয় না। কিন্তু আমার মনে হয় হবে। পৃথিবীর একটা ছোট্ট মেয়ের জন্য কখনো কখনো মন খারাপ হবে। আমি কী ভাবব?

মিস ইউ, নীড়!

মিস ইউ, নীড়!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0