শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থাই রোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা পালন করে
শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থাই রোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা পালন করেরয়টার্স

কুকুরকে খেয়াল করেছেন? পোষা কুকুরগুলো যে বাড়িতে থাকে, সেই বাড়ির মানুষগুলোকে ভালোভাবে চেনে। হঠাৎ কোনো সন্দেহভাজন আগন্তুককে দেখলে ঘেউ ঘেউ করে চিত্কার করে। আপনার বাসা পাহারায় কোনো কুকুর থাক বা না থাক, একদিক থেকে আপনার ও আপনার চারপাশের সব প্রাণীর মতো আপনার শরীরেও কিছু একটা আছে, যা অহেতুক উত্পাত থেকে রক্ষা করে। সেটা হলো আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, মানে ইমিউন সিস্টেম।

আপনার বাড়ির কুকুর যদি আপনাকেই তাড়া করত, তাহলে কী হতো—ভাববার বিষয়। কিন্তু কখনোই তা হবে না। তেমনি আপনার ইমিউন সিস্টেমও কখনোই আপনার দেহকে আক্রমণ করে না, আক্রমণ করে ইনভেডার বা আগন্তুকদের। কথা হলো দেহ কীভাবে নিজের আর পরের জিনিস আলাদা করে। সেই রহস্যময় কাজকারবার নিয়েই এই লেখা।

বিজ্ঞাপন

ফরাসি বিজ্ঞানী জুল হফম্যান মাছি (Drosophila melanogestar) নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেন সহজাত ইমিউনিটির কথা। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা মাছির একটা বিশেষ জিন পরিবর্তন করে দেখালেন, তাদের সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। তখন নিশ্চিত হলো যে জাতিজনিক (জেনেটিক) উপায়ে প্রাণিকুলের মধ্যে ইমিউনিটি বিকশিত হয়েছে। তবে মেরুদণ্ডী প্রাণীদের দেহে সহজাত ইমিউনিটির ভূমিকা তেমন থাকে না। নতুন রোগের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য অভিযোজিত ইমিউন সিস্টেম গড়ে উঠেছে, নতুন কোনো জীবাণু দেখলেই এরা দমন করতে পারে। দমনের কাজটা হয় তিন স্তরে: দুটো নন-স্পেসিফিক, আর একটা স্পেসিফিক।

মানবদেহের সবচেয়ে বড় অঙ্গ ত্বক। জীবাণুকে ত্বক ভেদ করেই দেহে ঢুকতে হবে। ত্বককে সুরক্ষা দিতে তার চারপাশে লিপিডের একটা স্তর থাকে। সেই সাথে থাকে আমাদের ত্বকে বসবাসকারী কিছু ভালো ব্যাকটেরিয়া, যারা রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুগুলোকে ত্বকের ওপর সংলগ্ন হতে বাধা দেয়। সেটাই দেহে ঢোকার আগে সব জীবাণুকে বাধা দেয়। কিন্তু ত্বক তো অবিচ্ছিন্ন নয়। ত্বকের মধ্যে মুখছিদ্র আছে, নাসারন্ধ্র আছে, চোখ আছে, এগুলো দিয়ে জীবাণু প্রবেশ করতে চায়। কিন্তু মজার ব্যাপার, প্রতিটা ছিদ্রেরই একটা করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকে। মুখের স্যালাইভা বা লালা আর নাসাগহ্বরের মিউকাস, চোখের লাইসোজাইম এনজাইম সেটার বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকবে। ধরুন, আপনি জীবাণু গিলেই ফেললেন, আসলে এ রকম শত শত জীবাণু আপনার খাবারের সঙ্গে পরিপাকতন্ত্রে ঢোকে। সেগুলোকে মারে পাকস্থলীর গায়ের প্যারাইটাল কোষ থেকে নিঃসৃত হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড। কিন্তু অনেক ব্যাকটেরিয়া অ্যাসিড-লাভিং, তারা সেখানে স্বচ্ছন্দে থাকে। কিন্তু পাকস্থলী পার হলেই অন্ত্রে এসে পিত্তরসের ক্ষারধর্মী পরিবেশে তাদের জীবন যায়।

কিছু জীবাণু যেভাবে হোক, আপনার দেহে এসে পড়ল। এবার শরীর কী করবে? তার দুটি প্রধান হাতিয়ার হলো জ্বর আর প্রদাহ। পাইরোজেনের (ফ্যাগোসাইট নামের এক ধরনের শ্বেত রক্তকণিকা থেকে ক্ষরিত প্রোটিন) ক্ষরণ অতিরিক্ত হলে রক্তবাহিকা সংকুচিত হয়, ফলে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। তখন জীবাণুর কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর প্রদাহ হলে ছুটে যায় দেহের সশস্ত্র বাহিনী—শ্বেত রক্তকণিকা। এর শতকরা ৭০ ভাগই হচ্ছে নিউট্রোফিল। এরা সারা দেহে চষে বেড়ায় আর ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু ভক্ষণ করে। একই কাজ করে মনোসাইট।

অবশ্য সে রূপ বদলে হয়ে যায় ম্যাক্রোফেজ। এরা ক্ষণপদ সৃষ্টির মাধ্যমে জীবাণুকে আটকে ফেলে, তারপর লাইসোজোমাল এনজাইমের ক্রিয়ায় জীবাণুর অন্তকোষীয় পরিপাক ঘটায়। ইওসিনোফিল আর বেসোফিল অ্যালার্জিক অ্যান্টিবডি আর পরজীবীর প্রতি ক্রিয়া প্রদর্শন করে।

ধরুন, এত কিছু পেরিয়েও কিছু প্যাথোজেন আপনার দেহে ঢুকল। প্যাথোজেন হলো রোগ সৃষ্টিকারী উপাদান। আর সে যা নিঃসরণ করে তার নাম অ্যান্টিজেন। এবার জীবাণুকে থামাতে আপনার দেহের নন-স্পেসিফিক ইমিউন সিস্টেম ব্যর্থ। তাই এবার আপনার দেহকে অন্য রাস্তা খুঁজতে হবে। এবার আপনার দেহকে ইমিউনিটি অর্জন করতে হবে, সেটাই হলো তৃতীয় স্তরের প্রতিরক্ষা। প্রতিটি প্যাথোজেনের অ্যান্টিজেন যেমন আলাদা, তেমনি তার প্রতিকারও আলাদা। সেটা করা হয় ইমিউনোগ্লোবিউলিন-জাতীয় পাঁচ ধরনের প্রোটিন IgA, IgM, IgG, IgE আর IgD-এর সমন্বয়ে। এদের বলা হয় অ্যান্টিবডি। প্রতিটি অ্যান্টিবডির ভেরিয়েবল প্রান্ত থাকে অনন্য, যেটা সুনির্দিষ্টভাবে একটা অ্যান্টিজেনের জন্য সুনিদিষ্ট। টি লিম্ফোসাইটের নির্দেশনায় লিম্ফ নোডে থাকা প্লাজমা কোষে অ্যান্টিবডি সংশ্লেষিত হয়। আর একবার অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেলে সেটার বর্ণনা দেহে লিপিবদ্ধ থাকে। এ কাজটা করে প্লাজমা কোষের মতোই আরেক প্রকারের দীর্ঘজীবী বি লিম্ফোসাইট, যাদের আমরা স্মৃতিকোষ বলি। তাই সংক্রামক রোগ একবার হলে পরে হওয়ার সম্ভাব্যতা কম থাকে। আর মেরুদণ্ডীদের রোগ প্রতিরোধের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হয় ভ্যাকসিন। ব্রিটিশ চিকিত্সক এডওয়ার্ড জেনার এক বসন্ত রোগের ওপর কাজ করে ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেন। এ পদ্ধতিতে মূলত জীবাণুকে মেরে ফেলে বা দুর্বল করে ফেলে দেহে প্রবেশ করানো হয়, যাতে দেহ তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি সংশ্লেষণ করে স্মৃতিকোষে সংরক্ষণ করে রাখে।

বিজ্ঞাপন

তিন স্তরে কুকুর আপনার বাড়ি পাহারা দেয়, তারপরও আপনি অসুস্থ হন। এগুলো কোনো কাজেরই না, তাই মনে হচ্ছে? ভেবে দেখেছেন, মরার কতক্ষণ পরেই এই জীবাণুগুলো দেহকে পচানো শুরু করে, অথচ আপনি বছরের পর বছর দিব্যি বেঁচে আছেন, এই জীবাণুগুলো নিয়েই।

ভাবতে থাকুন, আপনার কুকুর যদি আপনাকে দেখলে ঘেউ ঘেউ করে, মানে আপনার ইমিউন সিস্টেম যদি আপনার সুস্থ-সবল কোষকে মারা শুরু করে, তাহলে কী হবে? উত্তরটা নাই-বা দিলাম, ভাবুন, তারপর রেফারেন্স ঘেঁটে মিলিয়ে নিন।

শেখ আজিজুল হাকিম: একাডেমিক সদস্য, বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি

সূত্র: Integrated Principles of Zoology, 11th edition, Hickman et. Al., ২০১১ সালের চিকিত্সা পুরস্কারের ব্যাপারে নোবেল কমিটির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, উইকিপিডিয়া

মন্তব্য পড়ুন 0