স্ট্রিং তত্ত্ব কি আসলে সফল?

আগের পর্বগুলোতে স্ট্রিং তত্ত্বের পেছনের ধারণা আর এর সাফল্যের একটা সংক্ষিপ্ত খতিয়ান দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। এবার এ তত্ত্বের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করব। স্ট্রিং তত্ত্বের সাফল্যগুলোর দিকে চোখ ফেরাতে পারি—দেশ-কালের জন্য মাত্রা নির্ধারণ (২৬ বা ১০), গ্র্যাভিটনের ভবিষ্যদ্বাণী, অন্যান্য মৌলিক বলকে এক করা, সুপারসিমেট্রির মাধ্যমে ফার্মিয়নের ভবিষ্যদ্বাণী করা এবং ব্ল্যাকহোলের এনট্রপির আণুবীক্ষণিক ব্যাখ্যা।

এ রকম আরও বেশ কটা সাফল্য আছে স্ট্রিং তত্ত্বের ঝুলিতে। এতে একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী উল্লসিত হবেন। কিন্তু ভ্রু কুঁচকাবেন পদার্থবিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার বিজ্ঞানীরা। কারণ, এই সাফল্যগুলোর একটিও পরীক্ষাগারে প্রমাণ হয়নি যে, আমরা চার মাত্রার বেশি দেশ-কালে থাকি। তাই এর চেয়ে বেশি মাত্রা বোঝাটা কঠিন। স্ট্রিংয়ের অতিরিক্ত ছয়টি মাত্রার কোনো সরাসরি প্রমাণ মেলেনি—এমনকি LHC-তে। মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করা গেছে অবশ্য। কিন্তু সেটা গ্র্যাভিটনের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করানো যায় না। যদিও ওই যুক্তি মেনে বলা হয়, মহাকর্ষ তরঙ্গই গ্র্যাভিটনের প্রমাণ, তখন অন্যরাও যুক্তি দেখাতে পারেন। বলতে পারেন, ‘আমরা আলো এবং অন্যান্য বিদ্যুত্চুম্বকীয় তরঙ্গের অস্তিত্ব জানি, অতএব ফোটনকে আলাদা করে শনাক্ত করার দরকার নেই।’ সত্যি বলতে কী, এটা একটা খোঁড়া যুক্তি।

বিজ্ঞাপন

গত পর্বে বলেছিলাম, স্টিফেন হকিং ব্ল্যাকহোলের এনট্রপির জন্য সূত্র বের করেছিলেন। স্ট্রিং তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে সেই সূত্রের আণুবীক্ষণিক ব্যাখ্যা করেন কামরান ভাফা ও এন্ড্রু স্ট্রুমিঞ্জার। তখন এটা নিয়ে বিশাল হইচই পড়ে গিয়েছিল। তাঁদের এই ব্যাখ্যা চার্জযুক্ত এবং ঘূর্ণমান ও চার্জবিশিষ্ট ব্ল্যাকহোলের বেলায় ভালোভাবেই খেটে যায়। কিন্তু সবচেয়ে সহজ ও পুরোনো ব্ল্যাকহোল, যাকে আমরা শোয়ার্জশিল্ড (schwarzschild) ব্ল্যাকহোল বলি। সেই ব্ল্যাকহোলে ভাফা-স্ট্রুমিঞ্জার ব্যাখ্যা অচল। শোয়ার্লিশল্ড ব্ল্যাকহোল হচ্ছে আইনস্টাইনের সমীকরণের সমাধান। এর জন্য কোনো আলাদা উত্স লাগে না। এ জন্য এটাকে Vacuum solution বলা হয়। স্ট্রিং থিওরিতে অতিপ্রতিসাম্যের (supersymmetry) উপস্থিতি আছে। তাই সুপারস্ট্রিং তত্ত্বের দেওয়া মাধ্যাকর্ষণের সূত্রগুলোতে বরাবরই মহাকর্ষের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্ষেত্রের (field) উপস্থিতি দেখা যায়। তাই এই তত্ত্ব আইনস্টাইনের দেওয়া মহাকর্ষের তত্ত্ব থেকে বেশ আলাদা। আবার আমাদের চেনা বিশ্বে আইনস্টাইনীয় মহাকর্ষই সবচেয়ে কার্যকর। এ কারণে স্ট্রিং তত্ত্বের নিন্দুকেরা বলবেন, আসল সমস্যার সমাধান না দিয়ে স্ট্রিং তাত্ত্বিকেরা বরং অন্য কিছুর সমাধান করছেন।

বিজ্ঞানে নতুন তত্ত্ব প্রয়োজন হয় কেন? যখন পরীক্ষিত তত্ত্ব নতুন তথ্য-উপাত্তকে ব্যাখ্যা করতে পারে না, তখন নতুন তত্ত্বের দরকার হয়। যেমন: পরমাণুর গঠন, কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ এগুলো যখন নিউটনীয় ধারণা ও ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়নি, তখনই কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ব্যবহার করে এগুলোর সমাধান করা হলো। এর মানে এই নয়, কোয়ান্টাম বলবিদ্যা নিউটনীয় বলবিদ্যার বদলি আর নিউটনীয় বলবিদ্যা ভুল। তারপরও সুনির্দিষ্ট সীমারেখায় (Limit) কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অনেক ফল নিউটনীয় বলবিদ্যার সঙ্গে মিলে যায়। এ ক্ষেত্রে স্ট্রিং তত্ত্বের ত্রুটি অনেক। এটা আইনস্টাইনীয় মহাকর্ষে সঙ্গে সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় কিছু বিষয় হাজির করে। এসব বিষয় সমর্থন করতে পারে এমন কোনো সরাসরি পরীক্ষাপদ্ধতি নেই। এ জন্য বিজ্ঞানীদের আইনস্টাইনের মহাকর্ষণের কতখানি নির্ভুল এর যাচাই-বাছাই আরও চালিয়ে যেতে হবে। মহাকর্ষ বলের স্ট্রিংভিত্তিক চিত্র কতখানি যুক্তিযুক্ত এর অনেকখানিই এই পরীক্ষাগুলোর সূক্ষ্মতার ওপর নির্ভর করবে।

অন্যদিকে স্ট্রিং তত্ত্ব যদি আসলেই একটি সর্বাত্মক তত্ত্ব (Theory of everything) হয়ে থাকে, তাহলে এর মাঝ থেকে সফল, পরিচিত ও পরীক্ষিত স্ট্যান্ডার্ড মডেলকে খুঁজে পাব। এখানে ছোট্ট কিন্তু অতি জরুরি একটা ব্যাপার আছে। সেটা হলো স্ট্যান্ডার্ড মডেলের কাঠামোটি একপেশে, যেটাকে আমরা কিরেল (Chiral) বলি।

যেমন বিটা তেজস্ক্রিয়তায় নির্গত নিউট্রিনোগুলো বাঁহাতি। বলাই বাহুল্য, স্ট্রিং তত্ত্ব থেকে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের পরবর্তী সংস্করণে বিজ্ঞানীরা যা-ই বের করুন না কেন, সেখানে নিউট্রিনো এবং অন্যান্য ফার্মিয়নকে এ রকম একপেশে ব্যবহার দেখানোর সুযোগ দিতে হবে। ডেভিড গ্রস ও তাঁর সহযোগীরা মিলে হেটেরোটিক (Heterotic) স্ট্রিং আবিষ্কার করেন। সেই তত্ত্বে বাঁহাতি ফার্মিয়নদের একপেশে অস্তিত্ব পাওয়া গেল। তখন অত্যন্ত উল্লসিত হয়েছিলেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা। এখন থিওরি অব এভরিথিংকে অবশ্যই একটি অদ্বিতীয় (Unique) তত্ত্ব হতে হবে। কিন্তু শিগগিরই দেখা গেল ঝামেলা। এ রকম হেটেরোটিক তত্ত্ব একটি বা দুটি নয়, বহু হেটেরোটিক তত্ত্ব তৈরি করা যায়। এতে স্ট্রিং তত্ত্ববাদীরা দমে গেলেন। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিজ্ঞানী রিটেন এবং অন্যরা আলাদা স্ট্রিং তত্ত্বের মাঝে পারস্পরিক রূপান্তর আবিষ্কার করলেন। তখন বিজ্ঞানীরা আশা করেছিলেন, হয়তোবা বিভিন্ন হেটেরোটিক তত্ত্ব একই তত্ত্বের বিভিন্ন রূপ। এই শতকের শুরুর দিকে নতুন কিছু তাত্ত্বিক ফলাফল পাওয়া গেল। তখন বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেন যে তাঁদের এই স্ট্রিং তত্ত্বগুলোর পারস্পরিক রূপান্তরের আশাটি মরীচিকা বৈ আর কিছু নয়।

একটা ব্যাপার মনে রাখা জরুরি, আমরা পদার্থবিজ্ঞানে যতই ভারী ভারী আর সুন্দর গণিত ব্যবহার করি না কেন, পুরো ব্যাপারটার শুরু আর শেষে রয়েছে পরীক্ষণ। তত্ত্ব শুধু সব পরীক্ষণের ফলাফলকে একটি কাঠামোর মাঝে ফেলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। পরীক্ষণের মাধ্যমে একটা তত্ত্বকে কখনোই সঠিক প্রমাণ করা যায় না; বরং সেটাকে ভুল প্রমাণ করা যেতে পারে। ফলে পরীক্ষণের ফলাফলই সর্বোপরিভাবে ঠিক করে কাঠামোটি ঠিক না ভুল। শুধু যুক্তির কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে ঠিক-বেঠিক প্রমাণ করা গেলে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের অ্যাটমের ধারণা প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমাদের প্রায় দুই হাজার বছর অপেক্ষা করতে হতো না।

বিজ্ঞাপন

এখন পর্যন্ত আমরা স্ট্রিং তত্ত্বের কাছ থেকে এমন কোনো দৃঢ় ফলাফল পাইনি, যা দিয়ে আমরা এটা সঠিক না ভুল, সেটা পরীক্ষাগারে বিচার করতে পারব। এটাকে অনেকে তত্ত্বের ত্রুটি হিসেবে ঠাওরাতে পারেন। পাউলির সেই বিখ্যাত উক্তি ‘Not even wrong’-কে শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পিটার ওয়িট তো স্ট্রিং তত্ত্বকে সমালোচনা করে একটা চাঞ্চল্যকর বই পর্যন্ত লিখে ফেলেছেন।

ছোট একটা তুলনা দিয়ে আলোচনার ইতি টানতে চাচ্ছি। আমরা যে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো জানি, তা প্রায় ১০-১৯ মি. দূরত্ব পর্যন্ত কাজ করে। আর এর পাশাপাশি স্ট্রিং তত্ত্বের জন্য কার্যকর দূরত্ব হলো ১০-৩৩ মি.। অর্থাত্ এই দূরত্বের অনুপাত হলো ১০১৪। এই অনুপাত কেমন, সেটা বোঝানোর জন্য আরেকটা তুলনা দিই—পরমাণুর ব্যাস প্রায় ১০-৯ মি. আর এভারেস্ট শৃঙ্গের উচ্চতা প্রায় ৮–১০৩ মি.। এ ক্ষেত্রে অনুপাত হলো ১০১৩। ব্যাপারটা তাহলে দাঁড়াল কী? গুহামানবকে যদি শুধু এভারেস্ট পর্বত দেখিয়ে বলা হয় যে এই পুরো স্থাপনাটি পরমাণু নামের অতি ক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি, সেটা গুহামানবের পক্ষে বিশ্বাস করা সহজতর—বর্তমান পরীক্ষাগারের শক্তিমাত্রা নিয়ে আমাদের পক্ষে স্ট্রিং তত্ত্বে ভরসা রাখার তুলনায়। বোঝাই যাচ্ছে যে এই আকর্ষণীয় তত্ত্বটি ঠিক কি না, এটার উত্তর খুব শিগগিরই আমরা পাচ্ছি না বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারে। আমাদের এই ধারণা যদি ভুল বলে প্রমাণিত হয়, তবে পদার্থবিজ্ঞানের জন্য সামনে উত্তেজনাকর দিন আসবে এ ব্যাপারে কোনোই সন্দেহ নেই।

লেখক: তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী, বর্তমানে ঢাকার ইনডিপেনডেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনারত

* লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত

মন্তব্য পড়ুন 0