নিউরোইমিউনোলজি সম্পর্কে জানার আগে নিউরন আর ইমিউনোলজি—এই দুটোকে আলাদাভাবে জেনে নেওয়া যাক। প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক মস্তিষ্ককে। বিজ্ঞান না জানা মানুষও জানে এর গুরুত্ব। এটা কাজ করে সুপার কম্পিউটারের মতো। আমাদের পুরো শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখে মস্তিষ্ক বা ব্রেইন। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র, সুষুম্নাকাণ্ড বা স্পাইনাল কর্ড এবং সঙ্গে আরও কিছু স্নায়ু মিলে কাজ করে আমাদের মস্তিষ্ক। এর গাঠনিক একক হলো নিউরন বা স্নায়ুকোষ। সুস্থ মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ১০০ বিলিয়নের মতো নিউরন আছে। এরা আবার প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন সিন্যাপসের মাধ্যমে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থেকে যোগাযোগ রক্ষা করে। স্নায়ুকোষ ছাড়াও মস্তিষ্ক আরও অন্যান্য সহকারী কোষ দিয়ে তৈরি। তাদের কাজও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন গ্লিয়া কোষ প্যারেনকাইমা টিস্যু গঠন করে। এদের কাজ শরীরের বিভিন্ন তথ্য প্রক্রিয়া করা। এই প্যারেনকাইমা টিস্যুর অবলম্বন হিসেবে কাজ করে স্ট্রোমাল কোষ। আর মস্তিষ্কের কোষগুলোতে রক্ত সরবরাহ করে এন্ডোথেলিয়াল কোষ। এই এন্ডোথেলিয়াল কোষগুলো আবার একধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। যেই মস্তিষ্ক আমাদের পুরো শরীরকে চালনা করে, তার তো অবশ্যই বিশেষ নিরাপত্তার দরকার। তাকে নিরাপত্তা দেয় এই প্রতিবন্ধক, যার নাম ব্লাড ব্রেইনব্যারিয়ার। আক্রমণকারী জীবাণু বা বিভিন্ন বিষজাতীয় পদার্থের জন্য এই প্রতিবন্ধক ভেদ করা প্রায় দুঃসাধ্য।

এবার জেনে নেওয়া যাক আমাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে। মূলত দুই স্তরের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে আমাদের শরীরে। বাইরের নানা ধরনের অণুজীব, যার অনেকে প্রাণঘাতী রোগ তৈরি করতে পারে, তারা যেন শরীরে ঢুকতে না পারে, তার জন্য রয়েছে আমাদের ত্বকসহ আরও কিছু প্রতিবন্ধক টিস্যু। এদের চোখ ফাঁকি দিয়ে যদি অণুজীবরা শরীরের ভেতরে ঢুকেই যায়, তবে ইমিউন সিস্টেমের কাছে তাদের ধরা পড়তেই হবে। দুই স্তরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রথম স্তরে রয়েছে সহজাত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। যেকোনো অণুজীব শরীরে ঢোকামাত্র সহজাত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এদের ধ্বংস করে দেয়। যদি এরা ব্যর্থ হয় জীবাণুদের মারতে, তখন দ্বিতীয় স্তরের সুরক্ষাব্যবস্থা কাজ শুরু করে। একে বলে অ্যাডাপটিভ বা অর্জিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার আছে কিছু বিশেষ সৈন্য, যারা যুদ্ধ করে শরীরে ঢুকে পড়া অবাঞ্ছিত শত্রুদের সঙ্গে। এরা হলো বি লিম্ফোসাইট আর টি লিম্ফোসাইট কোষ। এদের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও কিছু যোদ্ধা কোষ, যারা শরীরকে সুরক্ষা দেয় বাইরের রোগজীবাণু থেকে।

প্রশ্ন হলো, এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কীভাবে বোঝে যে শরীরে অণুজীব প্রবেশ করেছে? কেন শুধু সে বাইরের কোষকেই আক্রমণ করে? কেন নিজের শরীরের ভালো কোষকে আক্রমণ করে না?

আসলে প্রতিরক্ষার পুরো ব্যবস্থা অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। নিজের কোষের তারা ক্ষতি করে না, কিন্তু বাইরের কিছু দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। অণুজীবের কোষ আর নিজের শরীরের কোষের মধ্যে তারা পার্থক্য করতে পারে। আবার বাইরের অণুজীব যখন শরীরের কোনো কোষকে আক্রমণ করে, তখন আক্রান্ত কোষ কিছু সিগন্যাল তৈরি করে। তখন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কোষগুলো দ্রুত জড়ো হয় আক্রান্ত স্থানে এবং প্রদাহের সৃষ্টি করে। ব্যাপারটা দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মতোই। কোনো বিপদে পড়লে আমরা ইমারজেন্সি নম্বরে কল দিলেই পুলিশ এসে পড়ে। এরপর আমাদের যাবতীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করে তারাই। কিন্তু কখনো কখনো পুলিশের ভুলে নিরপরাধ ব্যক্তিও কিন্তু সাজা পায়। এমন ভুল আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাতেও দেখা যায়। নিজের সুস্থ কোষকেই আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়। বিভিন্ন অটোইমিউন রোগে এমনটা দেখা যায়।

কিন্তু চোর না থাকলে পুলিশের ভূমিকা কী? তেমনি বাইরের কোনো জীবাণু না ঢুকলে প্রতিরক্ষাকারী কোষেরা কি ঘুমিয়ে থাকে? বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পরীক্ষা করে উত্তরটা দিয়েছেন। দেখা যায় যে শরীরে অর্জিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে আর কোনো জীবাণু আক্রমণ না করলেও শরীরের কোনো জায়গায় অসংগতি দেখা যায়। যেমন কোনো কোনো কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি শুরু হয়ে যায়। তাই সৃষ্টি হয় টিউমার, যা থেকে হতে পারে ক্যানসার! অর্থাৎ আমাদের শরীরের কোষগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে প্রতিরক্ষা কোষগুলোর ভূমিকা আছে।

ইমিউন সিস্টেমের এত কাজ থাকলেও মাথা নিয়ে তার যে কোনো মাথাব্যথা নেই, এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন। কারণ, মস্তিষ্কে প্রবেশের রাস্তা ব্লাড ব্রেইন ব্যারিয়ার একেবারেই বন্ধ করে রাখে। আবার ছোটখাটো বাইরের জিনিস যদি ঢুকেই যায়, তাহলে মস্তিষ্কের মাইক্রোগ্লিয়া কোষ এদের মেরে ফেলতে পারে। মস্তিষ্কের বাইরে থেকে ইমিউন কোষের আসা লাগে না। মানে মস্তিষ্কে নিজেই নিজের রক্ষক। এই ব্যাপারটা প্রমাণ করে বিজ্ঞানী পিটার মেদাওয়ার নোবেল পুরস্কারও পেয়ে গেলেন। তিনি দেখালেন মস্তিষ্কে যদি বাইরের কোনো কোষ স্থাপন করা হয়, তবে বাইরের কোষকে অপসারণ করতে মস্তিষ্কের বেশ সময় লাগে। কিন্তু শরীরের অন্য যেকোনো জায়গার বাইরের কোষ স্থাপন করলে তা দ্রুত অপসারিত হয়। যদি শরীরের প্রতিরক্ষাকারী কোষগুলো মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে পারত, তাহলে বাইরের কোষকে অপসারণ করতে একই সময় লাগত। আবার সব কৃতিত্ব যে মস্তিষ্কের একার, তা বললে ভুল হবে। বরং অন্যভাবে বলা যায়, মস্তিষ্কে প্রবেশের আগেই শরীরের ইমিউন কোষগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ক্ষতিকর বস্তুকে ধ্বংস করে। তাই অণুজীব বা বাইরের ক্ষতিকর কিছু মস্তিষ্কে ঢোকার সুযোগই পায় না।

কিন্তু ব্রেইনে যখন সংক্রমণ হয়? ১৯৯২ সালে বিজ্ঞানী লরেন্স স্টেইনম্যান দেখালেন যে কিছু ব্রেইনের অসুখে ইমিউন কোষগুলো মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে পারে। যেমন বিভিন্ন ধরনের স্ক্লেরোসিসে মস্তিষ্কের প্যারেনকাইমা টিস্যুতে একধরনের ক্ষতিকারক প্রোটিন তৈরি হয়, যা ব্লাড ব্রেইন ব্যারিয়ারকে নষ্ট করে দেয়। এতে সহজেই ইমিউন কোষগুলো মস্তিষ্কে প্রবেশ করে মস্তিষ্কের ক্ষতি করে। তখন একধরনের ওষুধ দেওয়া হয়, যা এই দুর্বল ব্যারিয়ারকে ভেদ করে ভেতরে ঢুকে ক্ষতিকর প্রোটিনকে ধ্বংস করে দেয়। আবার ব্লাড ব্রেইন ব্যারিয়ারটি ঠিক হয়ে যায়। তখন ক্ষতিকর বস্তু বা ইমিউন কোষ আর ভেতরে ঢুকতে পারে না। এতে বোঝা গেল, অসুস্থ না হলে মস্তিষ্কে আর ইমিউন কোষের দেখা হওয়া প্রায় অসম্ভব।

কিন্তু ইমিউন কোষের কারণে কেন মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়? কোনো ক্ষতিকর বস্তু নিউরনকে আক্রমণ করলে ইমিউন কোষগুলো আক্রান্ত নিউরনকে ধ্বংস করে দেয়। শরীরের অন্যান্য কোষের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটলে খুব একটা সমস্যা হয় না, কারণ ধ্বংস হওয়া কোষগুলো আবার নতুন করে তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু নিউরন একবার ধ্বংস হলে আর নতুন করে তৈরি হয় না। তাই মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যায়।

তবে শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যে মস্তিষ্কের শুধু ক্ষতিই করে তা কিন্তু নয়। ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যেসব ইঁদুরের অর্জিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ঘাটতি থাকে, তাদের আলঝেইমার বা স্কেরোসিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

default-image

সুস্থ–স্বাভাবিক অবস্থাতেও মস্তিষ্কের ওপর ইমিউন সিস্টেমের প্রভাব আছে। পরীক্ষার আগের রাতে বা নতুন কোনো রান্নার রেসিপি বানানোর আগে আমাদের মস্তিষ্ক একধরনের চাপ অনুভব করে। যাদের অর্জিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ঘাটতি থাকে, তারা এ ধরনের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ একটু বেশি অনুভব করে, আর মানসিক চাপের স্থায়িত্বও অনেক বেশি হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, যেহেতু কোনো রোগ বা ইনজুরি ছাড়া ইমিউন কোষগুলো ব্লাড ব্রেইন ব্যারিয়ার ভেদ করতে পারে না, তাহলে সুস্থ মস্তিষ্কে কীভাবে ইমিউন কোষগুলো ভেতরে না ঢুকেই এতটা প্রভাব বিস্তার করছে? প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটা গুরুত্বপূর্ণ কোষ হলো সাইটোকাইন। এরা স্বাভাবিক ব্লাড ব্রেইন ব্যারিয়ারের ফাঁক গলে মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে পারে আর ভেগাস স্নায়ুর ওপর সরাসরি কাজ করতে পারে। এই ভেগাস স্নায়ু আবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরো শরীরে কাজ করে। অর্থাৎ পরোক্ষভাবে ইমিউন কোষ সাইটোকাইন পুরো শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে। মস্তিষ্ককে ঘিরে রাখা আবরণ, মেনিনজেসেও এই সাইটোকাইনদের পাওয়া যায়।

মেনিনজেসের সাধারণ কাজ হলো সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড ধারণ করা, যা মস্তিষ্ককে ভাসিয়ে রাখে। এতে আরও থাকে লিম্ফ ভেসেল বা লিম্ফ নামক তরল বহনকারী নালি। ধারণা করা হয়, এদের মাধ্যমে সাইটোকাইনগুলো মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। কীভাবে সাইটোকাইনগুলো প্রবেশ করে, সে নিয়ে আরেকটা ধারণাও আছে। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের প্যারেনকাইমা কোষের সঙ্গে একটা চ্যানেলের মাধ্যমে সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইডের আসা–যাওয়া আছে। এই ফ্লুইডের সঙ্গেও সাইটোকাইন চলে যেতে পারে।

ইন্টারফেরোন গামা নামের সাইটোকাইন মস্তিষ্কে ঢুকে এর নিউরনের সঙ্গে কাজ করে প্রাণীদের সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। আবার ইন্টারলিউকিন-১৭ নামের আরেক ধরনের সাইটোকাইন ব্রেইনের করটেক্সে গিয়ে কাজ করে। এটাও সামাজিক আচরণে প্রভাব ফেলে। অটিজমের সঙ্গে নাকি এই সাইটোকাইনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

কেন ইমিউন সিস্টেমকে সপ্তম ইন্দ্রিয় বলা যেতে পারে

মানুষের পাঁচটি ইন্দ্রিয় হলো—দৃষ্টি, শ্রবণ, স্পর্শ, স্বাদ আর ঘ্রাণ। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের কথাও শোনা যায়। যদি কেউ কোনো কিছু ঘটার আগেই ঘটনার গতিবিধি আঁচ করতে পারে, তাহলে আমরা বলি তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বেশ প্রবল।

ইমিউন সিস্টেম বা শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অনেকটা ইন্দ্রিয়ের মতোই কাজ করে। কোনো অণুজীব আক্রমণ করলে তা মস্তিষ্কে প্রবেশের আগেই মস্তিষ্ককে ইমিউন সিস্টেম জানিয়ে দেয়। আবার সেই অণুজীবকে ধ্বংস করতেও সাহায্য করে। তাই একে সাত নম্বর ইন্দ্রিয় বলা যেতেই পারে।

প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে মস্তিষ্কের জোরদার সম্পর্ক প্রমাণ করতে বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। মস্তিষ্কের কোনো জটিল রোগ সারানো এখনো অনেক দুঃসাধ্য। ভবিষ্যতে হয়তো শুধু ইমিউন সিস্টেমে পরিবর্তন এনেই সারানো যাবে মস্তিষ্কের জটিল রোগ।

লেখক: শিক্ষার্থী, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন