বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এ দেশে বসন্ত-গ্রীষ্মে মাঠের পাশে পথের ধারে পল্লির জঙ্গলে আলো করা রূপে ভাঁট ফুল ফুটতে দেখা যায়। সে রূপে মধুপায়ী মৌমাছিরা যেমন মত্ত থাকে, কবিরাও সে রস আস্বাদন থেকে বাদ যায় না। কবি জীবনানন্দ দাশ গ্রামের ঝোপঝাড়ে ভাঁট ফুলকে ফুটতে দেখেন—‘সাদা ভাঁটপুষ্পের তোড়া/ আলোকলতার পাশে দ্রোণ ফুল গন্ধ ঢালে বাসকের গায়’। ভাঁট ফুলের গোছা থেকে কয়েকটা ফুল নিয়ে দেখলেই হয়তো মনে পড়তে পারে জীবনানন্দ দাশের আরেকটি কবিতায় বেহুলার কথা—‘ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়/ বাংলার নদী মাঠ ভাঁট ফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।’

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘেঁটু আর জীবনানন্দ দাশের ভাঁট একই গাছ, একই ফুল। পার্থক্য শুধু দুই বাংলার। আরণ্যক–এর ঘেঁটু ফুল আমাদের দেশে ভাঁট ফুল নামে পরিচিত, অন্য নাম ভাঁটগাছ, ভাঁইটগাছ, ভাঁইদোরা, কুইদিন ইত্যাদি। গারো ভাষায় বাইটা গাছ, চাকমা ভাষায় বাকে পাতা, মারমা ভাষায় ভাইদ্যং পাতা, তামিল ভাষায় ভট্টকান্নি। ঘেঁটুগাছের ইংরেজি নাম গ্লোরি ট্রি, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Clerodendrum viscosum ও পরিবার ভার্বেনেসী। ঘেঁটু গুল্ম প্রকৃতির বর্ষজীবী জংলি গাছ। গাছ ১ থেকে ২ মিটার উঁচু হয়। কাণ্ড ও শাখা-প্রশাখা চতুষ্কোণাকার। পাতা ধূসর সবুজ, খসখসে, প্রায় গোলাকার, কিছুটা হৃৎপিণ্ডাকৃতি, তবে পাতার আগা খুব সুচালো নয়। কাণ্ডে পাতা বিপরীতমুখীভাবে বিন্যাসিত। ছড়ায় থোকা ধরে ফুল ফোটে। ফুলের পাঁপড়ি ৫টি, সাদা, কেন্দ্রস্থল বেগুনি বা লালচে। বৃতি লাল। পুরুষ ও স্ত্রী কেশর বেশ লম্বা। বসন্ত ও গ্রীষ্মে ফুল ফোটে। ঝোপ করে অনেক গাছে ফুল ফুটলে সুন্দর দেখায়। ফুলে হালকা সুগন্ধ আছে। ফল মটরবুটের মতো গোল, চকচকে, পাকলে কালো হয়। ভালোভাবে পাকা বীজ বুনে চারা তৈরি করা যায়। বীজ গজাতে ২০ থেকে ৬০ দিন সময় লাগে। বীজ ছাড়া শিকড় কেটে লাগালেও তা থেকে গাছ হয়। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে ঘেঁটুগাছ অনেক দেখা যায়।

ঘেঁটুগাছ তিতা স্বাদের। ক্লিরোডিন নামক একপ্রকার রাসায়নিক দ্রব্যের উপস্থিতির কারণেই এ গাছ তিতা হয়। তিতার কারণেই তা কৃমি নিয়ন্ত্রণ করে। পাতা ও শিকড় বেটে মলমের মতো টিউমারের ওপর লাগানো হয় এতে থাকা ক্লিরোডোলন, ক্লিরোডন, ক্লিরোডোল, ক্লিরোস্টেরল প্রভৃতি রাসায়নিক উপাদানের কারণে। এসব রাসায়নিক উপাদান টিউমার নিরাময়ে সাহায্য করে। শিকড় ও পাতার রস ক্ষত সারানোয় কাজ করে। অর্শের বলিতে ঘেঁটুপাতার রস লাগালে যন্ত্রণা কমে। পাতার রস খেলে রক্তে চিনির পরিমাণ কমে, এতে ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণ হয়।

খাওয়ার জন্য অজীর্ণ পেটব্যথা, ম্যালেরিয়া জ্বর, বিছার কামড়, উঁকুন, টিউমার ইত্যাদি চিকিত্সায় ঘেঁটুগাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হয়।

লেখক: উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন