নারীটি এই উত্তর শুনে চুপ মেরে গেলেন। বুদ্ধিটাও যে বংশগতভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি বৈশিষ্ট্য, তা এ গল্পের মধ্য দিয়ে খানিকটা হলেও অনুমান করা যায়। কেবল গল্প থেকে নয়, বুদ্ধিটা যে জিন–নিয়ন্ত্রিত, তাতে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই। এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে কেবল জিনই বুদ্ধিমত্তার একমাত্র নিয়ামক। পরিবেশ আর জিন—এই দুয়ের এক চমত্কার মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল হলো বুদ্ধিমত্তা। বংশগতভাবে কম বুদ্ধিমান মানুষ পরিবেশের প্রভাবে মহাবুদ্ধিমান মানুষ হয়ে উঠবে, সেটি প্রায় অসম্ভব। আবার বংশগতভাবে বুদ্ধিমান মানুষ উত্তম পরিবেশ পেলে যে মহান বুদ্ধিমান মানুষ হয়ে ওঠে, এমন নজির আসলে বিরল নয়। তাহলে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে জিন ও পরিবেশ আর এদের পারস্পরিক আন্তক্রিয়া মিলে নির্মাণ করেছে মানুষদের বুদ্ধিমত্তা।

মেধার যে জিনগত ভিত্তি রয়েছে, নানাভাবে আজ সেটা প্রমাণিত। তবে মেধা বিকাশে পরিবেশের ভূমিকাও অতিগুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক সংগতি না থাকায় বহু মেধাবী ছেলেমেয়ে পেছনে পড়ে যাচ্ছে। আবার কোনো কোনো দরিদ্র মেধাবী ছেলেমেয়ে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে সঠিক স্থানে উন্নীত করতে সক্ষম হয়। এটি ব্যতিক্রমী ঘটনার উদাহরণ। তবে ব্যতিক্রম কখনো সাধারণ উদাহরণ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত নয়। উন্নত আর্থসামাজিক পরিবেশে কোনো মেধাবী ব্যক্তি তার মেধার স্ফুরণ ঘটাতে পারলে তা দেশ ও জাতির জন্য মহামূল্যবান হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ রকম উদাহরণ আমাদের দেশেও একেবারে কম নয়। তবে মেধাবী মানুষ যে আর্থসামাজিক দিক থেকে অধিকতর সুযোগ পেয়েও মেধাহীন কাজে নিয়োজিত হয়ে যায়, এমন নজিরও আছে ভুরি ভুরি। মোদ্দাকথা, মেধা, চেষ্টা আর উপযুক্ত পরিবেশ মেধা বিকাশে প্রায়ই সহায়ক হয়। একটি শিশুর বাড়ির পরিবেশ, তার পরিচর্যা এবং তার পড়াশোনা, শিক্ষা সামগ্রীর প্রতুলতা ও শিক্ষার সুযোগ, তাঁর খাদ্য ও পুষ্টি—এমন বহু কিছু মানুষের মেধা ও মনন গঠনে ভূমিকা রাখে। যদিও এ কথা ঠিক যে একসময় গবেষকেরা বুদ্ধিমত্তার শতকরা ৭৫ ভাগ পর্যন্ত বংশগত বলেই মনে করতেন। ফলে সেটায় জিন আর পরিবেশ মিলে তবে মেধাবী মানুষ তৈরি হয়।

মেধার সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্কের বিষয়টি Flynn প্রভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটি এমন একটি অবস্থা ব্যাখ্যা করে, যার মাধ্যমে ৫০ বছর ধরে প্রতি দশকে আইকিউ প্রায় ৩ পয়েন্ট করে বেড়েছে, যেখানে প্রতি জেনারেশনে সন্তানেরা মা–বাবার থেকে অধিক স্কোর করছিল। সুতরাং গত ৫০ বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে সন্তানের প্রতিবছর আইকিউ প্রায় ৩ পয়েন্ট করে বেড়েছে। এই বৃদ্ধিটাকে কতগুলো পরিবেশগত প্রভাবকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। এদের মধ্যে ছিল উন্নত পুষ্টি, ভালো পড়াশোনার ব্যবস্থা, মা–বাবার উচ্চশিক্ষা অর্জন, শিশু রোগের নিম্নগামিতা, অধিক জটিল পরিবেশগত উদ্দীপন, নিম্নমাত্রায় জন্মহার এবং আরও নানা রকম প্রভাবক।

বুদ্ধিমত্তার বিষয়টি পরিমাপ হয়তো খুব সহজ কাজ নয়। সাধারণভাবে প্রচলিত পদ্ধতি হলো কোনো একটি প্রমিত পরীক্ষার মধ্য দিয়ে মেধা যাচাই করা। এ রকম বহুল পরিচিত একটি পরীক্ষার নাম হলো আইকিউ টেস্ট। এ রকম টেস্ট দেখা গেছে যে বেশ বিশ্বাসযোগ্য আর বৈধ। এখানে বিশ্বাসযোগ্যতা মনে করা এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে একই জিনিস পরিমাণ করে। অন্যদিকে বৈধতা হলো এরা যা পরিমাপ করতে চায়, তা–ই পরিমাপ করে। আইকিউ টেস্ট একজন ব্যক্তির কারণ জানা এবং সমস্যাগুলো সমাধান করার ক্ষমতা যাচাই করে।

বুদ্ধিমত্তা পরিমাপের জন্য প্রমিত আইকিউ টেস্ট চালু করার বিষয়টি শুরু হয়েছে ১৮৭৬ সালে, যখন ফ্রান্সিস গ্যালটন যমজের মধ্যকার সাদৃশ্য কতটা পরিবর্তিত হয়, যখন এরা দিনে দিনে বড় হতে থাকে, তা পরিমাপ করেন তখন। দিনে দিনে আইকিউ পরিমাপের বিষয়টি আরও পরিমার্জিত হয়েছে। এখন তো অধিকাংশ প্রমিত টেস্টের ফলাফলের জন্য তিন রকম বিষয় বিবেচনা করা হয়। একটি হলো ভিআইকিউ (Verbal IQ) যেখানে মৌখিক ক্ষমতা পরিমাপ করা হয়, অন্যটি হলো পিআইকিউ (Performance IQ), যা দক্ষতা যাচাই বা পরিমাপ করে। আর তৃতীয়টি হলো এফএসআইকিউ (Full Scale IQ)। এর জন্য নানা রকম স্কেল তৈরি করা হয়েছে। মোটামুটি সব টেস্টই বোধের ওপর ভিত্তি করে করা হয় বলে ফলাফল প্রায় একই রকম হয়ে থাকে।

সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে যে মা–বাবা থেকে সন্তানে মেধা বৃদ্ধি একটি নির্দিষ্ট সময়ান্তে শতকরা ২০ ভাগ হারে বেড়েছে। শিশু বয়সে তা বেড়েছে শতকরা ২০ ভাগ, তরুণ বয়সে তা বেড়েছে শতকরা ৪০ ভাগ এবং পরিণত বয়সে তা বেড়েছে শতকরা ৬০ ভাগ। এর একটি কারণ, মগজের পরিপক্বতার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার জিনের প্রকাশ ঘটেছে। পরিপক্ব মগজের আইকিউ বেশি বলে প্রমাণিত হয়েছে।

মা–বাবা থেকে সন্তান কেবল যে বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য পায় তা নয়, পায় মেধার মতো জটিল অনেক বৈশিষ্ট্যও। মেধা কোনো একক জিন–নিয়ন্ত্রিত বৈশিষ্ট্য তা কিন্তু নয়। বহু জিনের সঙ্গে জীবের পরিবেশের মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল হলো মেধা। ফলে মেধার বংশানুসরণ খুব সহজে পরিমাপ করা যায়, বিষয়টি সে রকম নয়। তবে মানুষের মেধা বংশগত কি না, সেটা পরিমাপ করার সবচেয়ে উপযোগী পদ্ধতি হলো যমজ সন্তানদের নিয়ে গবেষণা করা। আর এ কাজে ব্যবহৃত হতে পারে দুই রকম যমজ। সাধারণভাবে মা–বাবার দুটি গ্যামেট একত্রে মিলিত হয়ে তৈরি করে একটি জাইগোট। সে জাইগোট বিকশিত হয়ে রূপ নেয় ভ্রূণে। সে ভ্রূণ বিকশিত হয়ে রূপ নেয় পূর্ণাঙ্গ মানুষে। মা–বাবার গ্যামেট মিলে তৈরি হওয়া জাইগোট যদি আকস্মিক ভেঙে আলাদা হয়ে দুটি ভিন্ন ভ্রূণ তৈরি করে, তবে যে দুটি যমজ সন্তান জন্ম নেয়, তারা হলো অনুরূপ যমজ। তাদের একজন ছেলে হলে অবশ্যই আরেকজনও ছেলে। এদের একজন মেয়ে হলে অন্যজনও মেয়ে। আর এরা হুবহু একজন আরেকজনের মতো। এদের দুজনের মধ্যে কোনো জিনগত পার্থক্য নেই।

আরেক রকম যমজ সন্তানও জন্ম নেয় মানুষের। মায়ের দুটি ডিম্বকোষের সঙ্গে বাবার আলাদা দুটি পুংগ্যামেট এসে মিলে যদি দুটি আলাদা জাইগোট তৈরি করে, তাহলে এর ফলে দুটি একেবারে আলাদা রকম যমজ সন্তন জন্ম নেয়। এসব সন্তানের দুজনই ছেলে, দুজনের একজন ছেলে ও অন্যজন মেয়ে বা দুজনই মেয়ে হতে পারে। তবে এদের দুজন কখনোই আরেকজনের মতো হুবহু এক রকমের নয়। এ রকম যমজকে বলা হয় ভিন্নরূপ যমজ। বলা বাহুল্য, তাদের দুজনের জিন হুবহু এক রকম নয়। সমরূপ আর ভিন্নরূপ যমজ নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা মেধার জিনগত ভিত্তি খুঁজে পেয়েছেন খানিকটা জটিল হিসাব থেকে।

কিছু সমরূপ যমজকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে লালনপালন করা হয়। কিছু ভিন্নরূপ যমজকেও একইভাবে আলাদা পরিবেশে লালনপালন করা হয়। যমজ ছাড়াও একই মা–বাবার ভিন্ন দুই সন্তানকে একই পরিবেশে বড় হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। অতঃপর এদের আইকিউ পরিমাপ করা হয় কারণ, মেধা আত্মীয়দের মধ্যে বেশ সহ-সম্পর্কিত সম্পর্ক প্রদর্শন করে। তিন রকমের গবেষণা থেকে যেসব সমরূপ যমজ ভিন্ন স্থানে লালনপালন করা হয়েছে, এদের গড় ধীমান ছিল শূন্য দশমিক ৭২, আবার যেসব একরূপ যমজ একত্রে বসবাস করেছিল, এদের গড় আইকিউ ছিল শূন্য দশমিক ৮৬। ভিন্নরূপ যমজ যাদের একত্রে লালন করা হয়েছিল, তাদের ধীমান ছিল শূন্য দশমিক ৬০। ফলে আইকিউয়ের ওপর যে বংশগতিক প্রভাব রয়েছে অনেকটাই তা স্পষ্ট হলে। আরও বেশিসংখ্যক একত্রে বসবাসরত ৮০০০ মা–বাবা, সন্তানসন্ততি, ভাই, বোন অর্থাৎ প্রথম ডিগ্রি আত্মীয়দের মধ্যে আইকিউবিষয়ক সহসম্পর্ক নির্ণয় করে গড় মান পাওয়া গেছে বেশ নিম্ন অর্থাৎ শূন্য দশমিক ৪৩। আবার আড়াই লাখ একই মা–বাবার সন্তান জোড়ার ক্ষেত্রে গড় আইকিউ পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ৪৭। এর অর্থ শতকরা ৪০ থেকে ৮০ ভাগ আইকিউ জিনের জন্যই হয়ে থাকে। সমরূপ যমজের ক্ষেত্রে ১০ হাজার জোড়া যমজ নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে যে গড় সহসম্পর্ক মান হলো শূন্য দশমিক ৮৬। আর ভিন্নরূপ যমজের ক্ষেত্রে তা পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ০৬। ফলে বুদ্ধিমত্তার জিনগত ভিত্তি যে রয়েছে তার প্রমাণ সহজেই মেলে।

মানব জেনোম প্রজেক্ট–সম্পন্ন হওয়ায় এখন খানিকটা দ্রুত মানুষের বৈশিষ্ট্যের জিনগত ভিত্তি কী, তা জানা সম্ভব হচ্ছে। মেধা একটি বা দুটি জিন–নিয়ন্ত্রিত কোনো বৈশিষ্ট্য নয় বরং অনেকগুলো জিনের ক্রিয়ার ফসল হলো মেধা। এরা কেউ কারও ওপর প্রকট নয়। প্রতিটিরই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রভাব এর পেছনে কাজ করে। মেধার জন্য দায়ী জিনের সন্ধান পাওয়া গেছে মানব ক্রোমোজোম ৪ ও ৬–তে। ক্রোমোজোম ৬-এ সন্ধান পাওয়া গেছে তেমন সব জিনের, যারা মগজের এমন স্থানে সক্রিয় যে যা কিছু অর্জন এবং স্মরণের সঙ্গে জড়িত। ক্রোমোজোম ৪-এ বুদ্ধিমত্তার কিছু জিন আছে বলে জানতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। এর অর্থ হলো গবেষকেরা মানুষের বুদ্ধির জিনের কথা বেশ খানিকটা জানতে পেরেছেন। এসব জিনের আরও খুঁটিনাটি বিষয় জানতে পারলে মানুষের মেধার উন্নয়ন করার কৌশল নিয়েও হয়তো একসময় ভাববেন বিজ্ঞানীরা।

মোটকথা, মানুষের অসংখ্য বৈশিষ্ট্যের মতো বুদ্ধিমত্তাও মূলত জিন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। এসব জিনের প্রকাশ নির্ভর করে অনেকটাই পরিবেশের ওপর। পরিবেশ মেধা বিকাশের উপযুক্ত হলে আর ব্যক্তি নিজে যদি মেধার চর্চা করে, তাহলে মেধাসম্পন্ন লোক দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। অনেক মেধাসম্পন্ন মানুষ উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ায় অকালেই ছিটকে পড়ে। আবার সাধারণ মানের মেধা রয়েছে তেমন সব লোকও উপযুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে মেধার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন, এমন প্রমাণও রয়েছে অনেক। এ রকম মানুষের সংখ্যা আমাদের দেশে গ্রামেগঞ্জে একেবারে কম নয়। জাতির স্বার্থেই মেধাবী মানুষদের বিকাশের সুযোগ করে দেওয়ার একটি দায়িত্ব সমাজ ও সরকারের রয়েছে।

লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক, জেনেটিক ও প্ল্যান্ট ব্রিডিং বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন