কথাটা যত সহজভাবে বলা গেল, ঘটনা আসলে তার চেয়ে বহুগুণ জটিল আর নাটকীয়। ধারণার চেয়েও অনেক বড় কর্মকাণ্ড সেগুলো। দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যন্ত্রের নাটবল্টুর মতো খুলে খুলে দেখা সম্ভব হলে দেখা যেত সেগুলো খুব জটিল আর প্রকাণ্ড। বেঁচে থাকার জন্য ফুসফুস মানবদেহের অতিজরুরি এক অঙ্গ। ফুসফুসকে ছড়িয়ে রাখা হলে সেটা রাখার জন্য আস্ত একটা টেনিস কোর্ট প্রয়োজন হতো। দেহের রক্তনালিকাগুলোও কিন্তু কম যায় না। এই নালিগুলো একত্র করে পরপর জোড়া দিলে যে দৈর্ঘ্য পাওয়া যাবে, তা পৃথিবীর চারদিকে আড়াইবার পাক খেয়ে আসার সমান। তবে এদের সবার চেয়ে অসাধারণ হলো বংশগতির একক ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড) অণু। মানবদেহের প্রতিটি কোষে প্রায় এক মিটার বা তিন ফুট দৈর্ঘ্যের ডিএনএ জড়ানো-প্যাঁচানো থাকে। সবগুলো কোষের ডিএনএ পরপর জোড়া দিলে পাওয়া যাবে বিপুল পরিমাণ এক দৈর্ঘ্য—১০ বিলিয়ন মাইল (১৬,০৯৩,৪৪০,০০০ কিলোমিটার)। বলে রাখা ভালো, পৃথিবী থেকে প্লুটোর দূরত্ব সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন কিলোমিটার। কাজেই পৃথিবী থেকে সৌরজগতের সীমানায় সর্বশেষ বড় বস্তু ছাড়িয়ে চলে যাবে মানবদেহের ডিএনএ। তাই আক্ষরিক অর্থেই মানুষ মহাজাগতিক যাত্রী।

কিন্তু দেহের পরমাণুগুলো নিছক গাঠনিক একক, তারা নিজেরাও কোনো জীবন্ত সত্তা নয়। তাই জীবনের সূচনা ঠিক কোথায় বা কীভাবে হয় তা সহজভাবে বলা সম্ভব নয়। জীবনের গাঠনিক একককে বলে কোষ, এ ব্যাপারে সবাই একমত। কোষ সদা ব্যস্ত এক বস্তু। কোষ আসলে অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোষীয় উপাদানের সমষ্টি। এখানে ডিএনএ ছাড়াও থাকে রাইবোজম, প্রোটিন, আরএনএ, মাইটোকন্ডিয়াসহ আরও অন্যান্য কোষীয় উপাদান। কিন্তু এদের কেউই এককভাবে জীবন্ত নয়। কোষকে এক অর্থে শুধু একটা কক্ষ বলা চলে—একধরনের ছোট্ট ঘর। ইংরেজি সেল কথাটার মধ্যেও সে রকম ইঙ্গিতই আছে। কোষ তার কোষীয় উপাদানগুলো ধারণ করে এবং সে নিজেও যেকোনো সত্যিকার ঘরের মতো চেতনাহীন। কিন্তু তারপরও এসব বস্তু যখন একত্র হয়, তখন রহস্যময়ভাবে আপনি সজীব বা চেতনাধারী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। এ অংশটি এখনো বিজ্ঞানের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।

এখানে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, কোষের মধ্যে কেউ বা কোনো কিছুর নেতৃত্ব নেই। কোষের প্রতিটি উপাদান অন্য উপাদান থেকে আসা সংকেতে সাড়া দেয়। অনেকগুলো গাড়ির মতো প্রত্যেকে পরস্পরের সঙ্গে আঘাত করে, ধাক্কা খায়। কিন্তু তারপরও এই এলোমেলো গতির ফলাফল দাঁড়ায় সুষম আর সংঘবদ্ধ এক কর্মকাণ্ডে। এ ঘটনা শুধু কোষের মধ্যে নয়, ঘটে পুরো দেহে। সেখানে কোষেরা বিভিন্ন অংশের অন্য কোষদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাই একে বলা চলে আপনার ব্যক্তিগত এক মহাজগৎ।

কোষের কেন্দ্রকে বলে নিউক্লিয়াস। তিন ফুট দৈর্ঘ্যের ডিএনএ এই নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকে। সেখানে এটি অতিক্ষুদ্র একটি জায়গায় কুঁচকে বা ভাঁজ হয়ে থাকে। কোষের অতিক্ষুদ্র জায়গায় এত ডিএনএ এঁটে যাওয়ার কারণ হলো, এটি অতি পাতলা একটি বস্তু। ডিএনএকে পাশাপাশি সাজিয়ে মানুষের চুলের মতো প্রশস্ত করতে চাইলে আপনার প্রয়োজন হবে ২০ বিলিয়ন ডিএনএ সূত্রক। মানবদেহের প্রতিটি কোষে আপনার ডিএনএর দুটি কপি থাকে। তাই আপনি ডিএনএর ওপর ভর করে প্লুটো গ্রহকে ছাড়িয়ে চলে যেতে পারবেন।

কোষে ডিএনএ থাকার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো আরও ডিএনএ তৈরি করা। একটি ডিএনএ অণু দুটি সূত্রক দিয়ে গঠিত, যা ডাবল হেলিক্স নামে প্যাঁচানো সিঁড়ি দিয়ে পরস্পর সংযুক্ত থাকে। আপনার ডিএনএতে আপনার দেহ তৈরির সব তথ্য বা নির্দেশ লিপিবদ্ধ থাকে। ডিএনএর দৈর্ঘ্য কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা যায়, যাকে বলে ক্রোমোজম। এর প্রতিটি একককে বলা হয় জিন। আর সব জিনের সমষ্টির নাম জিনোম।

ডিএনএ চরমভাবে স্থিতিশীল, যা প্রায় কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। এ কারণে ডিএনএ নিয়ে বহু যুগ আগের নৃতাত্ত্বিক গবেষণা করা যায়। সম্ভবত এই মুহূর্তের কোনো কিছুকে হাজার বছর পর আর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু আপনার ডিএনএ এই দীর্ঘ সময়েও দিব্যি টিকে থাকতে পারবে। কেউ তা খুঁজে দেখতে যদি চায় তাহলে তা পুনরুদ্ধার করাও সম্ভব।

ডিএনএ যেভাবে তথ্য স্থানান্তর করে তা এককথায় অসাধারণভাবে নির্ভুল। প্রতি বিলিয়ন অক্ষর অনুলিপি তৈরির সময় মাত্র একটা ভুল হয় এতে। মানবদেহে এত বেশি কোষ বিভাজন হয় যে প্রতি বিভাজন প্রক্রিয়ায় প্রায় তিনটি ভুল বা মিউটেশন হয়। অবশ্য বেশির ভাগ মিউটেশন দেহ বাতিল করে দেয়, কিন্তু মাঝে মাঝে তারা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

আপনার দেহের জিনোমের প্রতিটি উপাদানের একটাই ইচ্ছা, সেটা হলো আপনার অস্তিত্বকে ঠিকঠাকমতো টিকিয়ে রাখা। আপনি যেসব জিন বহন করছেন, সেগুলো খুবই প্রাচীন এবং সম্ভবত চিরন্তন। একসময় আপনি মরে ধুলার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবেন, কিন্তু আপনার বংশধরেরা সন্তান জন্ম দিতে থাকবে, তত দিন টিকে থাকবেন আপনি ও আপনার জিন। জেনে অবাক হবেন, পৃথিবীতে মানুষ আবির্ভূত হওয়ার পর থেকে বিগত তিন বিলিয়ন বছর আপনার ব্যক্তিগত বংশগতির এই ধারা এখনো ভেঙে যায়নি। আপনার বহাল তবিয়তে টিকে থাকার মানে হলো, আপনার পূর্বপুরুষ সফলভাবে তাদের জেনেটিক পদার্থ তার নতুন প্রজন্ম বা উত্তরসূরির কাছে পাঠাতে পেরেছিল। তাই একে সফলতার দীর্ঘ একটি শিকল বলা যায়।

প্রশ্ন আসতে পারে, জিন আসলে কী কাজ করে? জিন বিশেষ করে প্রোটিন সংশ্লেষণের নির্দেশ দেয়। আর প্রোটিন আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ এক উপাদান। কিছু প্রোটিন রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বাড়ায়, তাদের বলে এনজাইম বা উৎসেচক। আবার কিছু প্রোটিন বিশেষ ধরনের বার্তা বহন করে। এদের নাম হরমোন। কিছু প্রোটিন আছে, যারা জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করে, তাদের বলে অ্যান্টিবডি। মানবদেহের সবচেয়ে বড় প্রোটিনটির নাম টিটিন। এটি মাংসপেশির ইলাস্টিসিটি বা স্থিতিস্থাপকতা নিয়ন্ত্রণ করে। এর রাসায়নিক নাম লিখতে গেলে সাকুল্যে ১৮৯,৮১৯টি অক্ষর লাগে। সে ক্ষেত্রে এটিই অভিধানে সবচেয়ে বড় শব্দ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সৌভাগ্য বলতে হবে, অভিধানে রাসায়নিক নামের জন্য কোনো জায়গা বরাদ্দ নেই। থাকলে বিশাল এ শব্দটিও হয়তো শিখতে হতো আপনাকে। আমাদের শরীরে কত রকম প্রোটিন আছে, তা কারও জানা নেই। তবে এর সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ বা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

জেনেটিকসের সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স হলো, আমরা সবাই পরস্পর থেকে একেবারে আলাদা, কিন্তু জিনগতভাবে প্রায় হুবহু এক। পৃথিবীর সব মানুষের ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ ডিএনএ একই রকম। তারপরও কেউ কারও মতো নয়। আমার এবং আপনার ডিএনএর মধ্যকার তফাত দেখা যায় সাধারণত তিন থেকে চার মিলিয়ন জায়গায়। শরীরের মোট ডিএনএর তুলনায় এই তফাতের পরিমাণ অতি সামান্য। কিন্তু এই সামান্য পার্থক্যই আপনার আর আমার মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য তৈরি করে। এই সামান্য পার্থক্যের কারণে একজন থেকে আরেকজন মানুষের চেহারাসহ অন্যান্য বিষয়ে এত এত তফাত। আবার আপনার শরীরে যেসব মিউটেশন হয়, তার অন্তত প্রায় শ–খানেক একান্ত আপনার ব্যক্তিগত মিউটেশন। এই জেনেটিক নির্দেশনাগুলো আপনার মা–বাবার সঙ্গে মিলবে না, কারণ, সেগুলো তাদের কাছ থেকে আসেনি।

এসব কিছু কীভাবে কাজ করে, তার খুঁটিনাটি এখনো বিশাল এক রহস্য হয়ে রয়ে গেছে। মানুষের জিনোমের মাত্র ২ শতাংশ প্রোটিনের জন্য সংকেত বহন করে। বাকি সিংহভাগ বা ৯৮ শতাংশ জিনোমের কাজ এখনো অজানা। অ্যালু এলিমেন্ট নামের ছোট্ট একটি সিকোয়েন্সের কথা ধরা যাক। এটি আমাদের জিনোমে ১০ লাখের বেশিবার পুনরাবৃত্ত হয়েছে। মাঝেমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন কোডিং জিনের মাঝখানেও একে দেখা যায়। কিন্তু এর যে কাজ কী তা এখনো বোঝা যায়নি। অনেক বিজ্ঞানী একে অর্থহীন বলে রায় দিয়েছেন। অথচ এই সিকোয়েন্সের পরিমাণ আমাদের মোট জিনোম পদার্থের ১০ শতাংশ জায়গা দখল করে রেখেছে। কিন্তু এমন কেন, সে ব্যাপারে কারও ধারণা নেই। মানব কোষের এমন আরেকটি রহস্যময় অংশকে বলা হয় জাংক ডিএনএ। অবশ্য একটু বিনয়ীভাবে বলতে চাইলে একে ডার্ক ডিএনএ নামেও ডাকা যায়। বাংলায় বলা যায় গুপ্ত ডিএনএ। এর মানে হলো, এ ধরনের ডিএনএর কাজ কী বা এটি থাকার মানেই বা কী, সে সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। অনেকটা মহাকাশের ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্ত পদার্থের মতোই যেন ব্যাপারটা। অজানা, উড়ন্ত কিছু একটা। ইদানীং জানা গেছে, এদের কিছু অংশ জিন নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত, কিন্তু তারপরও সিংহভাগের কাজ সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি।

মানবদেহকে মাঝেমধ্যে যন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু এটি যন্ত্রের চেয়েও বেশি কিছু। দশকের পর দশক এটি ২৪ ঘণ্টা নিয়মিত কাজ করে, কোনো রকম সার্ভিসিং বা খুচরা যন্ত্রাংশ সংযোজন ছাড়াই। আবার এটি পানিতে এবং গুটিকয়েক অজৈব যৌগ ব্যবহার করে চলে। বেশ নরমসরম, কমনীয়, ভ্রাম্যমাণ ও প্রাণবন্ত এটি। প্রবল আগ্রহে নিজে নিজেই বংশবৃদ্ধি করতে পারে, কৌতুক বলতে পারে, লাল সূর্যাস্ত কিংবা শীতল বাতাসের কদর করে কবিতা লিখতে পারে, ছবি আঁকতে বা সুরেলা গান লিখতে ও গাইতে পারে। এখন বলুন, আপনার মতো করে কি কোনো যন্ত্র এত সব কাজ করতে পারে? তাই বলা বাহুল্য, সত্যিই এক অবাক বিস্ময়ের নাম হলেন আপনি তথা মানুষ।

তাহলে আমাদের অস্তিত্বের এই মহিমা সেলিব্রেট করার উপায় কী? নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দেওয়া? কোনো কিছু সেলিব্রেট করতে গেলে আমরা অধিকাংশ বেশি বেশি খাই আর ব্যায়াম করি একেবারেই কম। গলার ভেতর দিয়ে দরকারি খাবার ছাড়াও যেসব আবর্জনা আমরা পেটের ভেতর ছুড়ে দিই এবং জীবনের কতটা গুরুত্বপূর্ণ সময় আমরা জ্বলে জ্বলে টিভি, পিসি বা মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে স্রেফ গাছের মতো বসে কাটিয়ে দিই, সে কথা ভাবুন একবার। কিন্তু তারপরও বিস্ময়কর কোনো এক উপায়ে আমাদের দেহ আমাদের দেখেশুনে রাখে, পেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হাবিজাবি আবর্জনা থেকে দরকারি খাবারগুলো আলাদা করে সেখান থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে। এভাবে দশকের পর দশক আমাদের দেহ টিকে থাকে, মানে আমাদের টিকিয়ে রাখে।

এমনকি আপনি যখন প্রায় সবকিছু ভুল কাজ করেন, তখন আপনার দেহ সেগুলো সংশোধন করে এবং আপনাকে বহাল তবিয়তে রাখার চেষ্টা করে। আমাদের বেশির ভাগ মানুষই নিয়ম মেনে চলে না। প্রতি ছয়জন ধূমপায়ীর মধ্যে পাঁচজনেরই কখনো ফুসফুসের ক্যানসার হয় না। আবার যাদের হার্ট অ্যাটাক হওয়ার কথা সবার আগে, তাদের বেশির ভাগের তা হয় না। হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতিদিন আপনার পাঁচটি কোষের মধ্যে একটি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। কিন্তু আপনার ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সেটাকে ধরাশায়ী করে স্রেফ মেরে ফেলে। ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন, দেহের ভেতর এই ব্যবস্থাটা না থাকলে কী ঘটতে পারত। প্রতি সপ্তাহে ডজনখানেক বার, প্রতিবছরে প্রায় হাজার বার ভয়ংকর সব রোগ আপনার দেহে বাসা বাঁধার পাঁয়তারা করে। কিন্তু আপনার দেহ সেটা বরদাশত করে না কোনোভাবেই। আপনাকে বিস্ময়কর উপায়ে বাঁচিয়ে দেয় প্রতিবার। প্রায় সময়ই আপনার দেহে গুরুতর ক্যানসার কোষের বিকাশ ঘটতে শুরু করে এবং আপনাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থার কারণে ক্যানসারকে বিরল বলা যায় এখনো। আপনার দেহ কোষগুলো কোটি কোটিবার নিজেদের হুবহু নকল করে নতুন কোষ তৈরি করে। কিন্তু সেখানে কোনো ভুল হয় না বললেই চলে। সে কারণে ক্যানসারকে মৃত্যুর সাধারণ কারণ বলা যায়, কিন্তু আপনার জীবনের সাধারণ ঘটনা বলা যায় না।

আগে বলেছি, আমাদের শরীরকে নিজ নিজ ব্যক্তির জন্য একটা মহাজগৎ বলা চলে। কারণ, এখানে ৩৭.২ ট্রিলিয়ন কোষ সব সময় সুষমভাবে নিজেদের কাজ করে চলেছে। একটা সামান্য চুলকানি, বদহজমের ব্যথা, কোথাও একটা কালশিটে বা ব্রণ—সবগুলোই সাধারণভাবে আমাদের ত্রুটির কথা জানান দেয়। আমাদের চারপাশের হাজারো জিনিস আছে, যার কারণে আমাদের মৃত্যু হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সঠিক সংখ্যাটি আট হাজার। অর্থাৎ আমাদের চারপাশে প্রায় আট হাজার মৃত্যুদূত ওত পেতে আছে। এদের যেকোনো একটি কারণে জীবনলীলা সাঙ্গ হয়ে যেতে পারে। তারপরও আমরা দু-একটা বাদে প্রায় সবগুলোকে পাশ কাটিয়ে নিরাপদে চলে আসতে পারি। আমাদের বেশির ভাগের জন্যই সেটা তেমন একটা সমস্যাজনক নয়। সত্যিই বিস্ময়কর।

তবে যেভাবেই বলি না কেন, মানবদেহ পুরোপুরি নিখুঁত নয়। আমাদের মুখের ভেতর মাড়ির দাঁতগুলো ঠাসাঠাসি করে বসানো। কারণ, মুখের ভেতর ছোটখাটো জায়গার মধ্যে সহজাতভাবে পাওয়া দাঁতগুলো জায়গামতো বসিয়ে রাখতে হয়। আমাদের মেরুদণ্ডের নিচের অংশে ও নিতম্বের মধ্যকার অস্থিকাঠামো খুবই ছোট। এটা এতই ছোট যে প্রবল ব্যথা ছাড়া বাচ্চা প্রসব করা কোনোভাবে সম্ভব নয়। আমরা পিঠের ব্যথা সহ্য করতে পারি না। আমাদের বেশির ভাগ অঙ্গপ্রত্যঙ্গই নিজে নিজে তার ক্ষতিপূরণ করতে পারে না। অথচ জেব্রা ফিশের হৃৎপিণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে নতুন টিস্যু গজায়। কিন্তু আপনার হৃৎপিণ্ডের ক্ষতি হলে সেটা খুবই খারাপ ঘটনা। আবার প্রতিটি প্রাণীই তার নিজের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি নিজেই উৎপাদন করতে পারে। মানুষ পারে না। খুঁজলে এ রকম আরও অনেক ত্রুটি পাওয়া যাবে মানবদেহে।

আমরা জন্মসূত্রে কিছু ত্রুটি ও নাজুকতা বা ভঙ্গুরতার অধিকারী। এগুলো ধারণ করেও আমরা যে পর্যুদস্ত হয়ে শেষ হয়ে যাই না, এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এটাই সবচেয়ে বড় বিস্ময়।

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: দ্য বডি/বিল ব্রাইসন, উইকিপিডিয়া

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন