দেশের শস্যভান্ডারে যুক্ত হলো দুটি হাইব্রিডসহ ৬টি নতুন ধানের জাত

ব্রি ধান১১৭ফাইল ছবি

দেশের শস্যভান্ডারে যুক্ত হলো ২টি হাইব্রিডসহ আরও ছয়টি নতুন ধানের জাত। ৫ ফেব্রুয়ারি কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত নতুন এই ছয়টি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত সারা দেশজুড়ে চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ব্রির মহাপরিচালক মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে একটি ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ ধানের জাত, ৩টি লবণাক্ততা সহনশীল, একটি ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী, একটি হাওরাঞ্চলের উপযোগী ও ঠাণ্ডা সহনশীল এবং দুটি ঢলে পড়া প্রতিরোধী হাইব্রিড ধানের জাত রয়েছে। সবশেষ অনুমোদিত এই ৬টি জাতসহ ব্রি উদ্ভাবিত জাতের সংখ্যা দাঁড়াল ১২৭টি।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত সাড়ে পাঁচ দশকে ব্রি এ দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। গত ৫৫ বছরে ১১৭টি ইনব্রিড ও ১০টি হাইব্রিড মিলিয়ে মোট ১২৭টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে ব্রি। দেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য—যেমন উত্তরে খরা, দক্ষিণে লবণাক্ততা, মধ্যাঞ্চলে বন্যা, উপকূলীয় জলমগ্নতা ও ঠাণ্ডা-সহনশীল জাতসহ প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলায় ব্রি উদ্ভাবন করেছে লবণাক্ততা সহনশীল, খরা সহনশীল, জলমগ্নতা সহনশীল, ঠাণ্ডা সহনশীল, জোয়ার-ভাটা সহনশীলসহ নানা ধরনের ৪১টি জাত। শুধু প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীলতাই নয়, ২৭টি পুষ্টিসমৃদ্ধ ধানের জাত ও ১৪টি সরু ও সুগন্ধি চালের ধানও উদ্ভাবন করেছে ব্রি। সেগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিযোগ্য। বিশ্বের প্রথম জিংকসমৃদ্ধ ধান ব্রি ধান৬২ সহ ৭টি জিংকসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন করে বাংলাদেশকে বিশ্বে গৌরবময় অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

আরও পড়ুন
পূর্ণবয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা ১০০ সেন্টিমিটার। ধান লম্বা ও চিকন। ধান কালচে বাদামি রঙের এবং ধানের দানার রং কালো। ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ১৭.৮ গ্রাম।

নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে ব্রি ধান১১৫ ভিটামিন-ই এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ একটি জাত। এটি বাংলাদেশের প্রথম উচ্চ ফলনশীল কালো চালের জাত, যা অ্যান্থার কালচার পদ্ধতি ব্যবহার করে উদ্ভাবন করেছেন ব্রির বায়োটেকনোলজি বিভাগের বিজ্ঞানীরা। এ জাতের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৭.৪ টন এবং জীবনকাল ১৩৭-১৪২ দিন। পূর্ণবয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা ১০০ সেন্টিমিটার। ধান লম্বা ও চিকন। ধান কালচে বাদামি রঙের এবং ধানের দানার রং কালো। ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন প্রায় ১৭.৮ গ্রাম। এ ধানের অ্যামাইলোজ ২৩ শতাংশ। ধানের দানায় ভিটামিন-ই এবং সায়ানিডিন-৩-গ্লুকোসাইডের পরিমাণ যথাক্রমে ১৪.৯৮ মিলিগ্রাম/কেজি এবং ২৯.১২ মিলিগ্রাম/কেজি। এ ছাড়া ধানের দানায় প্রতি ১০০ গ্রামে ৫৩৬.৬১ μM AAE অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে।

ব্রি ধান১১৬
ফাইল ছবি

নতুন উদ্ভাবিত ব্রি ধান১১৬ বোরো মৌসুমের উচ্চ ফলনশীল একটি নাবি জাত। জাতটি ব্রি ধান৯২-এর সমসাময়িক একটি দীর্ঘ জীবনকালের জাত। এর গড় জীবনকাল ১৫৪ দিন। এ জাতের চালের আকার-আকৃতি মাঝারি চিকন এবং ব্রি ধান৯২-এর চালের চেয়ে সরু। গাছ শক্ত ও মজবুত বিধায় এ জাতটি সহজে হেলে পড়ে না। এ জাতের ডিগ পাতা খাড়া ও লম্বা হওয়ায় ধানের শিষ ওপর থেকে দেখা যায় না। ধান পাকলেও এর পাতা সবুজ থাকে। প্রস্তাবিত জাতের ফলন পরীক্ষায় দশটি অঞ্চলে এটি ব্রি ধান৯২-এর চেয়ে প্রায় ১৩.৭৫ শতাংশ বেশি ফলন দিয়েছে। এ জাতের হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৮.৫৯ টন। তবে উপযুক্ত পরিবেশে সঠিক ব্যবস্থাপনা করলে জাতটি হেক্টরে ১০.৩৬ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। এর চাষাবাদ পদ্ধতি ব্রি ধান২৯ ও ৯২-এর অনুরূপ হওয়ায় এটিকে ব্রি ধান২৯ ও ৯২-এর বিকল্প হিসেবে আবাদ করা যাবে।

আরও পড়ুন
নতুন উদ্ভাবিত ব্রি ধান১১৬ বোরো মৌসুমের উচ্চ ফলনশীল একটি নাবি জাত। জাতটি ব্রি ধান৯২-এর সমসাময়িক একটি দীর্ঘ জীবনকালের জাত। এর গড় জীবনকাল ১৫৪ দিন।

নতুন উদ্ভাবিত ব্রি ধান১১৭ বোরো মৌসুমের স্বল্প জীবনকালীন লবণাক্ততা সহনশীল ও ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী জাত। ইতিপূর্বে ব্রি ধান১১৪ নামে ব্লাস্ট প্রতিরোধী আরেকটি জাত উদ্ভাবন করেছিল ব্রি। ব্রি ধান১১৭-এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৮.৬ টন, যা ব্রি ধান১১৪-এর তুলনায় ১.৫ টন বেশি। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে ব্রি ধান১১৭-এর ফলন হেক্টরপ্রতি ৯.৯০ টন পর্যন্ত পাওয়া যায়। এ জাতের দানা মাঝারি মোটা এবং সোনালি বর্ণের। এ জাতের জীবনকাল ১২৯-১৩৫ দিন, যা বোরো মৌসুমের জনপ্রিয় জাত ব্রি ধান২৮-এর সমান জীবনকাল। ধানের দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ শতকরা ২৪.২ ভাগ এবং প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ৯.৩ ভাগ। ভাত ঝরঝরে। জাতটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, লবণাক্ততা সহনশীলতা ছাড়াও এটি ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী এবং আর্টিফিশিয়াল ইনোকুলেশনে উচ্চমাত্রার ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।

ব্রি ধান১১৭
ফাইল ছবি

নতুন উদ্ভাবিত ব্রি ধান১১৮ হাওরাঞ্চলের উপযোগী ঠাণ্ডা সহনশীল ধানের জাত। এ জাতটি প্রজনন পর্যায়ে ঠাণ্ডা সহনশীল হওয়ায় হাওরে আকস্মিক বন্যায় আধাপাকা থেকে পাকা পর্যায়ে ধান ডুবে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য উদ্ভাবিত। দেশের মোট বোরো উৎপাদনের ১৭ ভাগ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। চারা অবস্থায় ঠান্ডার প্রকোপ এবং আধাপাকা থেকে পাকা পর্যায়ে উজানের ঢলের কারণে ধান ডুবে নষ্ট হওয়া হাওরাঞ্চলের একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা ছিল। স্বল্প জীবনকালীন এ জাতটি সে সমস্যা মেটাতে সক্ষম হবে। এটি আগাম বপন (২৫ অক্টোবর-১ নভেম্বর) করলেও চিটা হবে না এবং কমপক্ষে ৬.০ টন/হেক্টর ফলন দিতে সক্ষম। তবে স্বাভাবিক সময়ে (১৫-২০ নভেম্বর) বপনে ১৪৫ দিনে ৬.৯-৮.৫ টন/হেক্টর পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। এ ধানের চালের আকার-আকৃতি মাঝারি মোটা। ভাত ঝরঝরে এবং সাদা। এ ধানের চালে অ্যামাইলোজের পরিমাণ শতকরা ২৮.৩ ভাগ। এ ছাড়া প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ৯.১ ভাগ। প্রস্তাবিত জাতের ফলন পরীক্ষায় দশটি অঞ্চলে এটি ব্রি ধান২৮-এর চেয়ে প্রায় ২২.৮৩ শতাংশ বেশি ফলন দিয়েছে।

আরও পড়ুন
উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে ব্রি ধান১১৭-এর ফলন হেক্টরপ্রতি ৯.৯০ টন পর্যন্ত পাওয়া যায়। এ জাতের দানা মাঝারি মোটা এবং সোনালি বর্ণের। এ জাতের জীবনকাল ১২৯-১৩৫ দিন।

নতুন উদ্ভাবিত লবণাক্ততা সহনশীল এবং লজিং টলারেন্ট হাইব্রিড ধানের দুটি জাত হচ্ছে ব্রি হাইব্রিড ধান৯ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান১০। এর মধ্যে ব্রি হাইব্রিড ধান৯ ঢলে পড়া প্রতিরোধী এবং মধ্যম মাত্রায় লবণাক্ততা সহনশীল। এটি চারা থেকে পরিপক্ব অবস্থা পর্যন্ত ৪-৮ ডিএস/মি. মাত্রায় লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। এর দানার আকৃতি মাঝারি ও দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৩.৬ শতাংশ। এক হাজার দানার ওজন ২৫.৫ গ্রাম ও দানায় প্রোটিনের পরিমাণ ৯.৩ শতাংশ। জীবনকাল ১৪৫-১৪৭ দিন। কৃষকের মাঠে স্বাভাবিক অবস্থায় ফলন ৯.৫-১০.৫ টন/হেক্টর। উপকূলীয় অঞ্চলে ফলন ৬.৫-৭ টন/হেক্টর। অন্যদিকে, ব্রি হাইব্রিড ধান১০ লজিং টলারেন্ট বা ঢলে পড়া প্রতিরোধী। দানার আকৃতি চিকন ও দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৩.৫ শতাংশ। এক হাজার দানার ওজন ২৩.৭ গ্রাম ও দানায় প্রোটিনের পরিমাণ ৯.১ শতাংশ। জীবনকাল ১৪৫-১৪৭ দিন। কৃষকের মাঠে স্বাভাবিক অবস্থায় ফলন ৯.৭-১০.৭ টন/হেক্টর।

ব্রি উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ফলেই বর্তমানে বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়। যেখানে স্বাধীনতার আগে ১৯৭১ সালে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ছিল ২০ শতাংশ, এখন তা ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। এ সময়ে লোকসংখ্যা আড়াই গুণ বেড়েছে, কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। ব্রি কেবল একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের উন্নয়ন এবং জাতীয় সমৃদ্ধির প্রতীক। দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ব্রির সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত থাকুক।

 

লেখক: ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), গাজীপুর

আরও পড়ুন