যমজ সন্তান হলো এই স্বাভাবিকতার ব্যতিক্রম। এর অর্থ এই নয় যে যমজ সন্তান সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি অস্বাভাবিক কিংবা যমজ সন্তান নিজেরা অস্বাভাবিক। যমজ সন্তান হলো একই সঙ্গে মায়ের গর্ভে একাধিক গর্ভধারণের সবচেয়ে সাধারণ রূপ। মূলত দুইভাবে মানুষে যমজ সন্তান তৈরি হয়। বাবা-মার মিলনের ফলে মায়ের জরায়ুতে অপেক্ষমাণ একটি ডিম্বাণুর সঙ্গে বাবার একটি শুক্রাণু মিলে তৈরি হয় একটি জাইগোট। এভাবে সৃষ্ট জাইগোট মায়ের পেটে নানা কারণে সমান দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এ দুটি ভাগ থেকে অতঃপর কোষ বিভাজন ও পরিস্ফুরণ হয়ে দুটি আলাদা ভ্রূণ তৈরি হয়। একই রকম জিনসম্পন্ন একটি জাইগোট দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে বলে এরা আসলে জিনের গঠনের দিক থেকে এক রকম। অর্থাৎ এক জাইগোট থেকে সৃষ্ট দুটি ভ্রূণ আসলে জিনগত দিক থেকে একই রকম। এ রকম দুটি ভ্রূণ কোষ বিভাজনের মাধ্যমে বড় হয় এবং এদের পরিস্ফুরণ সম্পন্ন হওয়ার পর একসময় যে দুই সন্তান জন্ম নেয়, এরা দেখতে হুবহু এক রকম। একটি জাইগোট ভাগ হয়ে দুটি যমজ সন্তান তৈরি হওয়ায় এদের মনোজাইগোটিক যমজ বলা হয়। একটি জাইগোট থেকে তৈরি হওয়ায় যমজ সন্তানের লিঙ্গ রূপ কিন্তু একই রকম হয়। এদের দুজনই হয় ছেলে কিংবা মেয়ে হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে একজন ছেলে ও অন্যজন মেয়েসন্তান জন্ম নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এদের তাই সমরূপ যমজ বলা হয়। গোটা বিশ্বে সমরূপ যমজের জন্মহার প্রায় এক রকম। প্রতি ১ হাজার শিশুর মধ্যে ৩-৪ জন সমরূপ যমজ হতে পারে। কিছু কিছু পরিবারে সমরূপ যমজ জন্ম নেওয়ার পরিমাত্রা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে বেশি।

মায়ের দুটি ডিম্বাণুর সঙ্গে যখন বাবার দুটি ভিন্ন শুক্রাণুর মিলন ঘটে, তখন মায়ের পেটে দুটি জাইগোট তৈরি হয়। এই দুটি জাইগোট বৃদ্ধি পেয়ে দুটি ভ্রূণে রূপান্তরিত হয়। একসময় মায়ের গর্ভে দুটি ভ্রূণ বিকশিত হয়ে দুটি সন্তানে রূপ নেয় এবং একসময় পৃথিবীতে তাদের আবির্ভাব ঘটে। মায়ের পেট থেকে একসময়ে জন্ম নেয় বলে বেড়ে ওঠে দুটি সন্তান। এরাও যমজ সন্তান। তবে সন্তানদ্বয় দেখতে কখনো এক রকম অর্থাৎ সমরূপ নয়। কারণ বাবার দুটি শুক্রাণুর জেনেটিক গঠন যেমন একরকম নয়, তেমনি মায়ের জরায়ুতে তৈরি হওয়া দুটি ডিম্বাণুও কখনো এক রকম নয়। ফলে ভিন্নরূপ গ্যামেটের মিলনের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া সন্তান একই লিঙ্গের হলেও এদের চেহারা এক রকম হয় না। দুটি ভিন্ন জাইগোট থেকে যমজ জন্ম নেয় বলে এ ধরনের যমজকে ডাইজাইগোটিক যমজ বলা হয়। এদের অবশ্য ভিন্নরূপ যমজও বলা হয়। এরা যেমন ছেলে হতে পারে, হতে পারে মেয়েও। তবে এরা কিছুতেই দেখতে এক রকম নয়। ভিন্ন লিঙ্গ হলে তো আর এক রকম চেহারা হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

দুই রকম যমজ সৃষ্টির রহস্য

কখনো কখনো মায়ের গর্ভে দুজন নয়, তারও অধিকসংখ্যক সন্তান সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণত দুইয়ের অধিক ডিম্বাণু দুইয়ের অধিক শুক্রাণুর সঙ্গে নিষেকের ফলে তিন বা তারও বেশি ভ্রূণ তৈরি হয় এবং একসময় সন্তানগুলো ভূমিষ্ঠ হয়। দুইয়ের বেশি যমজ সন্তানের ক্ষেত্রে তাদের মায়ের খাবার ভাগ করে খেতে। এ জন্য তাদের ওজন কম হয়। বাড়তি পরিচর্যা না পেলে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও অনেক কমে যায়। তা ছাড়া এসব ক্ষেত্রে সন্তানগুলো পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হওয়ার আগেই সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে যায়। অথবা সিজার করে সন্তান আগেই ভূমিষ্ঠ করাতে হয়। তা ছাড়া কখনো কখনো মায়ের গর্ভে অস্বাভাবিক যমজও জন্ম নিতে পারে। শুক্রাণুর আর ডিম্বাণুর মিলনে উত্পন্ন জাইগোট থেকে তৈরি কোষগুলো অনেক সময় পরস্পর থেকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা হতে পারে না। যুক্ত যমজ তৈরি হয়। অর্থাৎ দুটি যমজ সন্তান পরস্পর সংযুক্ত অবস্থায় থাকে। সংযুক্ত যমজকে স্বাভাবিকভাবে প্রসব করতে দিলে মায়ের কষ্ট অনেক বেড়ে যায়। মায়ের মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়। সে কারণে তাদের পেট কেটে বের করা হয়। কখনো কখনো এসব যমজ সার্জারি করে আলাদা করা সম্ভব হয়। আবার কখনো কখনো তা সম্ভব হয় না।

বাবার কোলে ভিন্নরূপ যমজ

এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতি ৪০ জন মনোজাইগোটিক যমজের প্রায় একটি সংযুক্তি যমজ সৃষ্টি হয়ে থাকে। সাধারণভাবে প্রতি ৯০ জন সন্তানে একটি যমজ জোড়া সন্তান জন্ম নেয়। ইদানীংকালে যমজ সন্তান তৈরি হওয়ার সংখ্যা খানিকটা বেড়েছে। জন্মবিরতির জন্য সেবনকৃত গোনান্ডোট্রোপিনও কখনো কখনো যমজ সন্তান জন্ম দিতে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়। তা ছাড়া কৃত্রিম উপায়ে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন ঘটানোর কারণেও একই সঙ্গে একাধিক গর্ভধারণের ঘটনা ঘটে। অনেক সময় সন্তানহীন মায়েরা এ রকম ইনভিট্টো পদ্ধতিতে সন্তান জন্মদানের চেষ্টা করেন। এর সফলতাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সমরূপ যমজ দুই ভাই

এখন যমজ নিয়ে প্রায়ই অনেকগুলো প্রশ্নেরই মুখোমুখি হতে হয়। যমজ সন্তান সবগুলোই কি একসঙ্গে রোগাক্রান্ত হয়? যমজ সন্তানের ভাবনাও কি একই রকম? তাদের আচার–আচরণ কি সারা জীবন একই রকম থাকে?

যমজ সন্তান বিশেষ করে শিশু অবস্থায় প্রায়ই একসঙ্গে রোগাক্রান্ত হয়। কারণ এদের খাদ্য তৈরি করা হয় একসঙ্গে। খাওয়ানোও হয় একই সঙ্গে। ফলে রোগজীবাণুর উত্সও তাদের এক। ফলে একই উত্স থেকে একই রকম রোগ দুজনেরই দেখা দিতে পারে। আবার রোগাক্রান্ত অবস্থায় তারা পাশাপাশি থাকে। কাজেই তাদের একসঙ্গে রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাই থাকে।

যমজ সন্তানেরা একই রকম ভাবে কি না বা জাগতিক বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মনের ক্রিয়া–প্রতিক্রিয়া একই রকম হয় কি না, এটি সত্যি সত্যি এক জটিল প্রশ্ন। সন্তানের চিন্তাভাবনা অনেকটা নির্ভর করে তার শিক্ষাদীক্ষা এবং পরিবেশের সঙ্গে তার জিনের ক্রিয়া–আন্তক্রিয়ার ওপর। ফলে যমজ সন্তান দুজন হুবহু একইভাবে শিক্ষিত হয়ে উঠবে, প্রায়ই এটি না হওয়ারই কথা। কোথায় কে কী পরিবেশে বড় হয়ে উঠল এবং কীভাবে কে কোথায় শিক্ষা লাভ করল, তার ওপর মানুষের চিন্তাভাবনার একটি সম্পর্ক থাকাই স্বাভাবিক। মানুষের ভাবনার জগতের বিস্মৃতি নির্ভর করে চারপাশের পরিবেশ থেকে কতটা সে তার মনোজগতে গ্রহণ করছে তার ওপর। ফলে এটি কেবল এক বা ভিন্ন পরিবেশে বড় হওয়া নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। চারপাশের জগৎ এবং জগতের নানা বিষয় তার মনে কতটা এবং কীভাবে রেখাপাত করছে, এর ওপর নির্ভর করছে তার ভাবনা ও সংবেদনশীলতা। ফলে যমজ সন্তানের জিন এক রকম বলে এরা একই রকমভাবে ভাববে, সেটি না হওয়ারই কথা। আর বেড়ে ওঠার পরিবেশ যদি তাদের আলাদা হয় তাহলে তাদের ভাবনার জগৎও আলাদা হওয়ার কথা।

সব এলাকায় ডাইজাইগোটিক যমজের পরিমাত্রা এক রকম নয়। আফ্রিকার কালো জনসমষ্টিতে ভিন্নরূপ যমজের পরিমাত্রা সবচেয়ে বেশি। এশিয়ার জনসমষ্টিতে তা সর্বনিম্ন। মায়ের বয়স, উচ্চতা, ওজন ইত্যাদি অনেক বিষয়ের ওপর এ ধরনের যমজের পরিমাত্রা নির্ভরশীল। লম্বা ও ভারী নারীদের ডাইজাইগোটিক যমজ সন্তান জন্ম দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

মানুষের আচার–আচরণেরও বংশগতিক ভিত্তি রয়েছে। তবে কোষে বিদ্যমান জিন শুধু এর জন্য দায়ী নয়। জিনের সঙ্গে পরিবেশে ক্রিয়া–আন্তক্রিয়ার ফল হলো আচরণ। যেমনটা আশা করা হয় যে সমরূপ যমজের দুজনের আচার–আচরণও এক রকম হবে। বাস্তবে কি তা–ই ঘটে? প্রায়ই তা ঘটে না। কোন প্রেক্ষাপটে জিনের সঙ্গে পরিবেশের কী রকম ক্রিয়া ঘটে, তার ওপর নির্ভর করে আচার-আচরণ। ফলে সমরূপ যমজের জিন এক রকম হলেও তাদের ভাবনা, তাদের আচার-আচরণ হুবহু এক রকম হওয়ার কথা নয়।

মানুষের সব বৈশিষ্ট্যই কি বাবা–মা থেকে সন্তানে যায়? আসলে কোন বৈশিষ্ট্যের কতটুকু পায় সন্তান বাবা–মাকে থেকে? এসব প্রশ্ন জানার প্রায়ই প্রয়োজন হয়। আচার–আচরণ কিংবা অন্যান্য মানবিক বা অমানবিক বৈশিষ্ট্যগুলোই কি বাবা–মা থেকে সন্তানে যেতে পারে? অর্থাৎ মানুষের সব বৈশিষ্ট্যের পেছনেই কি জিন কাজ করে? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য যমজদের নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে পৃথিবীর বহু স্থানেই। কোনো বৈশিষ্ট্য জিন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত নয়, কেবল পরিবেশের কারণেই এটি দেখা দেয়, সেটি জানার জন্য সমরূপ ও ভিন্নরূপ উভয় যমজদেরই ব্যবহার করা হয়। পিতা-মাতা থেকে কতটুকু বৈশিষ্ট্য সন্তানে যাবে, সেটি এর মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে। সমরূপ যমজের ক্ষেত্রে দুজনের জিন যেহেতু এক রকমের, ফলে এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখা গেলে একে পরিবেশগত প্রভাব বলেই ধরে নেওয়া হয়। ভিন্নরূপ যমজের ক্ষেত্রে কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্য যে পার্থক্য দেখা যায়, এটি ঘটে জেনোটাইপ ও পরিবেশ—এ দুটির জন্যই। কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্য সমরূপ যমজ ও ভিন্নরূপ যমজের কয়েকটি সেট পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে একটি বৈশিষ্ট্যের বংশানুসরণ করার মাত্রা নির্ণয় করা যায়। সমরূপ যমজের মধ্যে কোনো বৈশিষ্ট্যের মিল এবং ভিন্নরূপ যমজের মধ্যে কোনো বৈশিষ্ট্যের মিলের যে পার্থক্য, সেটি তুলনা করেও বাবা-মা থেকে বৈশিষ্ট্য সন্তানে সঞ্চারণের পরিমাত্রা নির্ণয় করা যায়।

যদি সমরূপ যমজের জন্য এসব মান ভিন্নরূপ যমজের তুলনায় তাত্পর্যপূর্ণ রকম উচ্চমান প্রদর্শন করে তাহলে বৈশিষ্ট্য বংশগতিক ভিত্তি রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। সমরূপ যমজের জিনগত সম্পর্ক সর্বাধিক। তাই আশা করা হয়, এরা কোনো বৈশিষ্ট্য প্রকাশের ক্ষেত্রে অধিক সমরূপতা প্রদর্শন করবে। এমনকি ভিন্নরূপ যমজ বংশগতির দিক থেকে পরস্পর ঘনিষ্ঠ–সম্পর্কিত হওয়া সত্ত্বেও এরা বংশগতিকভাবে হুবহু এক রকম না হওয়ায় বৈশিষ্ট্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কম সমরূপতা প্রদর্শন করবে।

লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক, জেনেটিক ও প্ল্যান্ট ব্রিডিং বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন