বৈজ্ঞানিক ভালোবাসার উপাখ্যান

বিজ্ঞানীরাও মানুষ। সাধারণ মানুষের মতো তাঁদের মনেও আছে প্রেম-ভালোবাসা, আবেগের অনুভূতি। ভালোবাসা হারানোর­­­­­ বেদনায় মুষড়ে পড়ার উদাহরণ বিজ্ঞানী সমাজেও কম নয়। সেই ভালোবাসাবাসিতেও নাকি হরমোনের কারসাজি। এক বৈজ্ঞানিকের ভালোবাসার গল্পের ফাঁকে উঠে এসেছে সে রসায়ন...

বিজ্ঞাপন

প্রথম নারী নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী মেরি কুরি। একাধিকবার প্রেমে পড়েছেন তিনি। প্রথম প্রেম কৈশোরে। টানাটানির সংসার ছিল মেরির পরিবারের। বাবা সংসার চালানোর জন্য বাড়িতেই একটা স্কুল খুলে বসেছিলেন। ছেলেমেয়েরা পড়তে আসত। তাঁদের বাড়িতেই মেস বানিয়ে থাকত কেউ কেউ। ভিটোল্ড রেমেকি নামে এক সুদর্শন ছাত্র এলেন তাঁদের বাড়িতে বোর্ডার হয়ে। প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে গেলেন মেরি। হৃদয় তোলপাড় করা প্রেম যাকে বলে।

ভিটোল্ডকে ঘিরেই তাঁর ভাবনা-ভালোবাসার জগৎ। তাঁকে দেখলেই বুক ধক ধক করে, বেড়ে যায়

হূত্স্পন্দনের গতি। হাত-পায়ের তালু ঘামে। কিশোর বয়সের প্রেম তো এমনই হয়। ভালোবাসার মানুষটি মিষ্টি করে কথা বললে ভালো লাগে, তার হাসি ভালো লাগে, ভালো লাগে তার নাম শুনলেও। তবু মুখ ফুটে মানুষটিকে বলা যায় না সেসব কথা। ভেতরে ভেতরে মান-অভিমান চলে। মেরি কুরির প্রেমটাও ছিল এমন। ছটফট করেন। কাছের মানুষকে জানাতে ইচ্ছে করে। পিঠোপিঠি বোন হেলেনা। বছর খানেকের বড়। কিশোরী কুরি অব্যক্ত ভালোবাসার কথা বলতে গেলেন বোনকে। কিন্তু হায়, হেলেনাও তত দিনে ভিটোল্ডের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। শুরু হলো দুবোনের প্রতিযোগিতা—ভিটোল্ডের মন জয় করার।

আগেরকার মানুষ মনে করত মানুষের আবেগ-অনুভূতির বাস বুকের ভেতরে-হূিপণ্ডে। আবেগের সঙ্গে হূত্কম্পনের ওঠানামার সম্পর্ক আছে বলেই ভুল ধারণাটা শিকড় গেড়ে বসেছিল। এখন আর ধারণায় চলে না। চিকিত্সাবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে আবেগ-অনুভূতি, দুঃখ-বেদনা, ভালোবাসার বাস মগজে।

মনে ভালোবাসার যে অনুভূতি, সেটার জন্য দায়ী ডোপামিন নামের একধরনের হরমোন। এই হরমোন মস্তিষ্ক থেকে যখন রক্তে নিঃসৃত হয়, রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যায়। তার প্রভাব পড়ে রক্তচাপে। হার্টবিট যায় বেড়ে। তবে ভালোবাসার রসায়নে ডোপামিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অক্সিটোসিন, ভেসোপ্রেসিন নামের আরও কিছু হরমোন।

বিজ্ঞাপন

হরমোন যতই সক্রিয় হোক, বাস্তবতার কাছে তাকে হার মানতে হয় প্রায়ই। ভিটোল্ড মেরি বা হেলেনা কাউকে ভালোবেসেছিলেন কি না যায় না। তবে শিগগিরই মেরিদের বাড়ি থেকে চলে যান ভিটোল্ড। অপমৃত্যু ঘটে মেরি আর হেলেনার কিশোর প্রেমের।

অভাবের কারণে লেখাপড়ার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল মেরিদের। তাই বাধ্য হয়ে বাবার এক ধনাঢ্য বন্ধুর পরিবারে গভর্নেসের কাজ নেন মেরি। সেই পরিবারেরই বড় ছেলে কাজিমি জোরাভস্কি। সুদর্শন, শিক্ষিত, গণিতানুরাগী। প্রথম দর্শনেই তাঁর প্রেমে পড়ে যান মেরি। কাজিমিও সমান আগ্রহী। ভালোবাসা শুরু। গোপনে গোপনে চলে তাঁদের অভিসার। এক বছর বেশ সুখেই কাটে তাঁদের প্রেমপর্ব। মেরি তখন আঠারো বছরের তরুণী। কাজিমির কয়েক বছর বেশি। বাবা-মাকে জানান কাজিমি-মেরিকে বিয়ে করতে চান। গরিব মেরিকে ছেলের বউ হিসেবে মানতে পারেননি তাঁরা। কাজিমিও তর্ক করেননি বাবা-মায়ের মুখের ওপর। সুতরাং মেরির দ্বিতীয় প্রেমেরও করুণ সমাপ্তি ঘটে।

মানব মস্তিষ্কে অ্যামিগডালা নামের একটা অঞ্চল আছে। বাদামাকৃতির। আর মস্তিষ্কের ওপরের স্তরে আছে কর্টেক্স। অ্যামিগডালা আর কর্টেক্স অঞ্চলের আছে বিশেষ কিছু গুণ। ভয়ভীতির জন্ম ওই অঞ্চলে। মানুষ বিপদের আগাম গন্ধ পায়, খারাপ পরিস্থিতিতে সতর্ক হতে পারে, এড়াতে পারে আকস্মিক দুর্ঘটনা-তা ওই অঞ্চলের কারণে। তুর্কি তরুণ প্রেমে পড়লে কর্টেক্স আর অ্যামিগডালা কাজ বন্ধ করে দেয় অনেকটাই। আসলে ভালোবাসা সৃষ্টিকারী হরমোনগুলো বাধ্য করে ওই অঞ্চলকে নিষ্ক্রিয় থাকতে। তখন ভালোবাসায় উত্তাল মানুষটি দুর্বার হয়ে ওঠে। ভয়ভীতি এমনকি মৃত্যুকেও সে পরোয়া করে না। অভিভাবকদের সঙ্গে বিদ্রোহ করে। দরকার হলে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়।

মেরি কুরি বা কাজিমির ক্ষেত্রে ভালোবাসার হরমোনগুলো অ্যামিগডালা-কর্টেক্স অঞ্চলে হয়তো অতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। তাই ভালোবাসার কাছে পরাস্ত না হয়ে দুজনই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পেরেছিলেন।

পরে অবশ্য মেরি চলে যান ফ্রান্সে। বিখ্যাত সরবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি সমাপ্ত করেন। এরপর গবেষণার ইচ্ছে তাঁর। কোথায় করবেন? টাকাপয়সারও অভাব খুব। তখন তাঁর শিক্ষক জোসেফ কাওয়ালাস্কি পরিচয় করিয়ে দিলেন তরুণ গবেষক পিয়েরে কুরির সঙ্গে। কুরির বাবা ইউজিন কুরি নিজের বাড়িতেই একটা গবেষণাগার গড়ে তুলেছিলেন। সেখানেই ভাই জাকা কুরি আর বাবাকে নিয়ে রাত-দিন গবেষণা করতেন পিয়েরে।

মেরিকে দেখেই প্রেমে পড়ে গেলেন পিয়েরে। প্রথম দেখায় পিয়েরেকেও ভালো লেগেছিল মেরির। কিন্তু কাজিমির সঙ্গে ভালোবাসার তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেননি। তাই প্রথম দিকে এ বিষয়টাকে এড়িয়েই চলতেন।

যাহোক, কুরিদের গবেষণাগারে মেরি গবেষণার সুযোগ পান। দুজন মিলে চুম্বক গবেষণায় মেতে ওঠেন। সেই সঙ্গে তীব্র ভালো লাগার অনুভূতি-জন্ম নেয় এক বৈজ্ঞানিক প্রেমের উপাখ্যান। পিয়েরেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। অন্যদিকে মেরি বাস্তববাদী। শেষমেশ প্রস্তাবই দিয়ে বসেন পিয়েরে। মেরি সরাসরি না বলেননি, তবে বেশ কিছু অজুহাত তুলে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। আসলে মেরি ফিরে যেতে চেয়েছিলেন তাঁর নিজ দেশ পোল্যান্ডে। সেখানকার স্কুলে শিক্ষকতা করতে চান। জবাবে পিয়েরে জানিয়েছিলেন তিনিও গবেষণা ছেড়ে পোল্যান্ডে যেতে রাজি। সেখানে গিয়ে তিনিও নাহয় শিক্ষকতা করবেন।

এরপর আর ‘না’ বলতে পারেননি মেরি। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয়। ১৮৯৫ সালের ২৬ জুলাই। সংসার, গবেষণা আর ভালোবাসা যেন হাত ধরাধরি করে চলছিল। পিয়েরে ও মেরি দুজনেই পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন। করেছেন তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা। স্বামী-স্ত্রীর সেই যৌথ গবেষণার সূত্র ধরেই আবিষ্কার হয়ে রেডিয়াম নামের তেজস্ক্রিয় ধাতুটি। এ জন্য ১৯০৩ সালে নোবেল কমিটিতে পদার্থবিজ্ঞানের জন্য সুপারিশ করা হয় দুটি নাম। হেনরি বেকেরেল ও পিয়েরে কুরি। মেরির নাম ছিল না। পিয়েরে আপত্তি তোলেন। জানান রেডিয়াম আবিষ্কারের কৃতিত্ব তাঁর একার নয়। মেরি তাঁর সঙ্গে না থাকলে মিলত না রেডিয়ামের দেখা। নোবেল কমিটি বাধ্য হয় মেরির নাম যুক্ত করতে। ১৯০৩ সালে তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারে যৌথভাবে তিন বিজ্ঞানী নোবেল পান পদার্থবিজ্ঞানে।

বেশ সুখেই কাটছিল মেরি আর পিয়েরের বৈজ্ঞানিক ভালোবাসাময় জীবন। তাঁদের ঘর আলো করে আসে দুই কন্যা আইরিন কুরি ও ইভ কুরি। এরই মধ্যে দুজন যোগ দিলেন সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে। হঠাত্ তাঁদের সুখের জীবনে নেমে আসে বিষাদের ছায়ায়। গাড়ি দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু হয় পিয়েরের। ১১ বছরের ভালোবাসার সমাপ্তি সেখানেই! না বোধ হয়। মেরি ভালোবাসা ধারণ করেই এগিয়ে নিলেন অসমাপ্ত কাজ। ১৯১১ সালে প্রথম বিজ্ঞানী হিসেবে পেলেন দ্বিতীয়বার নোবেল পুরস্কার। এবার রসায়নে। তারপর পিয়েরের প্রতি ভালোবাসাটা উজাড় করে দিলেন মানবসেবায়। তেজস্ক্রিয়তাকে চিকিত্সাবিজ্ঞানে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সে চেষ্টা করলেন। সফলও হলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের লাখো মানুষের চিকিত্সায় কাজে লাগল তাঁর প্রযুক্তি। কিন্তু দিন-রাত তেজস্ক্রিয় মৌল নাড়াচড়ার ফল ভালো হলো না। নিজের দেহে ডেকে আনলেন ঘাতক ব্যাধি ক্যানসার। পিয়েরে কুরির সাহচর্যে যে তেজস্ক্রিয় ভালোবাসার জন্ম হয়েছিল, ১৯৩৪ সালে তার সমাপ্তি ঘটল মেরি কুরির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

লেখক: সহসম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: মেরিকুরি ডট ওআরজি ডট ইউকে

ফিচার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন