বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা
বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহাঅলংকরণ: মাসুক হেলাল

তাঁর হাতেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান। তাঁর তাপীয় আয়নন সমীকরণ হয়ে হয়ে উঠেছিল বিশ্বজগতকে পড়বার নতুন ভাষা। ঠিক কীভাবে মেঘনাদ সাহা বদলে দিয়েছিলেন জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যার ইতিহাস? তার গবেষণা পরবর্তীকালেই বা বিশ্ববিজ্ঞানে কী ভূমিকা রেখেছে?

বিজ্ঞাপন

১৯১৯ সালে মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন বসু আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার ভিত্তিভূমি বইটির ইংরেজি অনুবাদ করেন। একই সময়ে আইনস্টাইনের জার্মান প্রকাশক ইংরেজ বিজ্ঞানী রবার্ট লসনকে বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করার বায়না দেন। পশ্চিম–জগৎ শেষোক্ত অনুবাদটির সঙ্গেই বেশি পরিচিত। এই তথ্য দিয়ে লেখাটা শুরু করছি দুটি কারণে। সত্যেন বসু ও মেঘনাদ সাহার বয়স তখন ২৬। ওই বয়সে তাঁরা যে শুধু আপেক্ষিকতা তত্ত্বের গুরুত্বই অনুধাবন করেছেন তা নয়, আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কাঠিন্যকে আত্মস্থ করে অনুবাদ করার মতো ক্ষমতা ও সাহসও দেখিয়েছেন। জার্মান ভাষা তখন বৈজ্ঞানিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত এবং ইংরেজির সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। মেঘনাদ সাহা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় জার্মান ভাষায় শিক্ষা নিয়েছিলেন। ত্রিশের দশকে আমার (এই লেখকের) পিতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েছেন এবং তিনিও জার্মান ভাষা শিখেছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে বিজ্ঞানের ভাষা হিসেবে জার্মানের গুরুত্ব কমে যায়।

মেঘনাদ সাহার জন্ম ঢাকার কাছেই, কালিয়াকৈরের শেওড়াতলি গ্রামে। ১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর। তাঁর পরিবার ছিল নিম্নবিত্ত, উচ্চশিক্ষা বা বিজ্ঞানের পরিবেশ সেখানে ছিল না। অনেকে বলেন, পিতা জগন্নাথ সাহা ছেলের নাম রেখেছিলেন মেঘনাথ, কিন্তু পরে মেঘনাদ নিজেই শেষের অক্ষরটি বদলে দেন। আভা সুর তাঁর Dispersed Radiance বইয়ে এই মন্তব্য করেছেন যে মেঘনাদ সাহা মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং রাবণপুত্র মেঘনাদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করেছিলেন। এক প্রতিকূল অবস্থা থেকে নিজেকে গড়ে তুলতে ভাগ্যহত মেঘনাদকে এক অর্থে হয়তো তিনি গুরুসম ভেবেছিলেন। কিন্তু পড়াশোনায় তাঁর ঔজ্জ্বল্য কারোরই অলক্ষিত থাকেনি। পড়েছেন ঢাকার কলেজিয়েট আর কিশোরীলাল জুবিলী স্কুলে, ম্যাট্রিকে পূর্ববঙ্গে প্রথম হয়েছেন। ঢাকা কলেজ থেকে পাস করে ১৯১১ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএসসি পড়তে ভর্তি হয়েছেন। বাংলায় বিজ্ঞানে রেনেসাঁ বলতে যদি কোনো সময় থাকে, তবে তখনই ছিল সেই সময়। আচার্য জগদীশ বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র প্রমুখ শিক্ষকের সাহচর্য পান মেঘনাদ। তাঁর সহপাঠী ছিলেন সত্যেন বসু। ১৯১৬ সালে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে গণিত ও পরে পদার্থবিদ্যা বিভাগে পড়াতে শুরু করেন। তাঁর বয়স তখন ২৩।

গবেষণার শুরুতে মেঘনাদ সাহা সত্যেন বসুর সঙ্গে একসঙ্গে কিছু কাজ করেছেন। তাঁদের কাজগুলো ছিল গ্যাসের দশা সমীকরণের ওপর। মনে হয়, এই কাজগুলো সত্যেন বসুর উৎসাহেই হয়েছে। সত্যেন বসু ‘আমার বিজ্ঞান চর্চার পুরাখণ্ড’ নামে একটি রচনায় লিখছেন, ‘আমি ও মেঘনাদ বস্তুত গণিতের হিসাবই ভালো বুঝি। মিলেমিশে কিছু কাজ করে ছাপিয়েছি। তবে মেঘনাদের জ্যোতিষে প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য। নক্ষত্রদের ঔজ্জ্বল্য ও সেই সম্পর্কে তাপের তারতম্য নিয়ে প্রবন্ধগুলো লিখে উচ্চ প্রশংসা পেলেন। ডক্টরেট পেলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিদেশে যাওয়ার জন্য গুরুপ্রসন্ন ঘোষের বৃত্তি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।’

মেঘনাদ তাঁর প্রকৃত কাজ খুঁজে পেলেন, যখন অ্যাগনেস ক্লার্কের জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখাগুলো পড়তে শুরু করেন। তখনকার দিনে এখনকার মতো জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখা হতো না আর হলেও সেগুলো অনুপ্রাণিত করার মতো ছিল না। ব্রিটিশ লেখিকা অ্যাগনেস ক্লার্কের নিজের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, কিন্তু তিনি অনুপ্রাণিত করার মতো বিজ্ঞান লেখা লিখে যেতে পেরেছিলেন। আকাশের নক্ষত্ররা তখনো বড় রহস্য। মনে রাখতে হবে, নক্ষত্রদের শক্তির উৎস যে পারমাণবিক ফিউশন, সেটা তখন বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না। আরও জানা ছিল না আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে যে আরও গ্যালাক্সি আছে।

১৮০০ শতকের প্রথমে জার্মানবিজ্ঞানী জোসেফ ফ্রাউনহফার নক্ষত্রদের আলোকে বিশ্লিষ্ট করে আবিষ্কার করেছিলেন যে নক্ষত্রদের বর্ণালি যেমন আলাদা আবার কিছু ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে মিলও রয়েছে। প্রথমে এই বর্ণালির বিভাগ খুবই সরল ছিল, মাত্র তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। তবে আলো বিশ্লেষণের যন্ত্র যত উন্নত হলো তত এর জটিলতা বাড়ল। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এডওয়ার্ড পিকারিং ও উইলামিনা ফ্লেমিং অবলোকিত হাইড্রোজেনের কৃষ্ণরেখার শক্তির ওপর ভিত্তি করে এই রেখাগুলোকে A, B, C ইত্যাদি নাম দিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, কৃষ্ণরেখার শক্তি বেশি হলে তারাপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও বেশি হবে। ধারণাটি ঠিক ছিল না। পরবর্তীকালে অবশ্য পিকারিংয়ের অন্য একজন সাহায্যকারী অ্যানি জাম্প ক্যানন এই সারিকে OBAFGKM হিসেবে সাজান। O তারার পৃষ্ঠ তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি, M তারার সবচেয়ে কম। ১৯১১ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে অ্যানি ক্যানন প্রায় দুই লাখ তারার বর্ণালি বিশ্লেষণ করেন।

default-image
বিজ্ঞাপন

এখানে কৃষ্ণরেখা বলতে আমরা কী বুঝি, সেটার ব্যাখ্যা দেওয়া ভালো। লঘু চাপে কোনো গ্যাসীয় মৌলকে (যেমন সোডিয়াম) অত্যন্ত উত্তপ্ত অবস্থায় নিলে সেটি আলো বিকিরণ করবে। এই আলোর বর্ণালি অবিচ্ছিন্ন হবে না, বরং কয়েকটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে দেখা দেবে, সোডিয়াম থেকে আমরা উজ্জ্বল দুটি হলুদ রেখা পাব। এর কারণ হলো ওই মৌলের পরমাণুর ইলেকট্রন বাইরের তাপশক্তি গ্রহণ করে উচ্চতর কক্ষপথে লাফিয়ে ওঠে। কিন্তু সেখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না, যখন নেমে আসে, তখন দুটি কক্ষপথের শক্তির পার্থক্যকে ফোটন হিসেবে বিকিরিত করে। এর ফলে বর্ণালিতে উজ্জ্বল রেখা দেখা যায়। এবার ধরা যাক, এই গ্যাস কোন উত্তপ্ত ঘন বস্তুকে (যেমন উত্তপ্ত লোহাকে) ঘিরে আছে, যে বস্তু কিনা অবিচ্ছিন্ন (Continuous) বর্ণালি বিকিরণ করছে। আবরক গ্যাসটি তখন মধ্যকার কৃষ্ণবস্তু থেকে আসা আলো থেকে বেছে বেছে শুধু সেই সব তরঙ্গই শোষণ করবে, যা কিনা তার ইলেকট্রনের দুটি কক্ষপথের শক্তির পার্থক্যের সমান। মেঘনাদ সাহার নিজের ভাষায়, ‘সোডিয়াম গ্যাস যেমন বিশিষ্ট পীত আলো বিকীর্ণ করিতে পারে, তেমনি ওই পীত আলোক সেই পরিমাণে অন্তগ্রহণ করিতে পারে—অন্য আলোক অন্তগ্রহণ করিবার তেমন ক্ষমতা নাই। সুতরাং জ্বলন্ত লৌহপিণ্ড হইতে সর্বপ্রকার আলো সোডিয়াম গ্যাসের বহিরাবরণের ভিতর দিয়া আসে, তাহা হইলে ওই দুইটি পীতরেখা অন্তর্গৃহীত হইয়া যাইবে এবং বর্ণচ্ছত্রের এই দুইটি পীত রেখার উজ্জ্বলতা ঢের কমিয়া যাইবে। বর্ণচ্ছত্রের অন্যান্য অংশের তুলনায় উহা কৃষ্ণবর্ণ মনে হইবে।’

default-image

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, হাইড্রোজেনের বামার (বিজ্ঞানী Balmer নামের উচ্চারণ বামার হলেও এখানে বালমার লেখা হলো ইংরেজি বানান অনুসারে) উজ্জ্বল রেখাগুলো সেটির দ্বিতীয় শক্তির ওপরের কক্ষপথগুলো (n > ২) থেকে দ্বিতীয় শক্তির (n = ২) কক্ষপথে ইলেকট্রনের ঝাঁপ দেওয়ার ফল। অন্যদিকে বামার কৃষ্ণরেখাগুলো দ্বিতীয় শক্তির (n = ২) কক্ষপথের ইলেকট্রনের বামার শক্তির ফোটনকে শোষণ করে নেওয়ার ফল। প্রথমে মনে করা হয়েছিল নক্ষত্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা যত বেশি হবে, বামার কৃষ্ণরেখার ‘কৃষ্ণতা’ তত বেশি হবে। কিন্তু অ্যানি ক্যাননের হার্ভার্ড শ্রেণীকরণে O তারাদের তাপমাত্রা ৪০ হাজার কেলভিন হওয়া সত্ত্বেও তাদের বামার কৃষ্ণরেখা নেই বললেই চলে। বামার রেখাগুলো সর্বোচ্চ শক্তিশালী হয় ১০ হাজার কেলভিন তাপমাত্রার A শ্রেণির তারার বর্ণালিতে। অন্যদিকে ৬ হাজার কেলভিন তাপমাত্রার সূর্যপৃষ্ঠে বামার রেখা বেশ অনুজ্জ্বল, কিন্তু আয়নিত ক্যালসিয়ামের রেখা উজ্জ্বল। আবার A তারার আয়নিত ক্যালসিয়াম রেখা খুবই দুর্বল। অর্থাৎ বালমার কৃষ্ণরেখা শুধু মধ্যমাত্রার তাপমাত্রায় পাওয়া যায় আর আয়নিত ক্যালসিয়াম নিম্নমাত্রার তাপে। মেঘনাদ সাহা যখন অ্যাগনেস ক্লার্কের জ্যোতির্বিদ্যার বই পড়ে অনুপ্রাণিত হচ্ছিলেন, সেই সময়ে জ্যোতির্বিদেরা নক্ষত্রের বর্ণচ্ছত্রের এই প্রপঞ্চের সঠিক সমাধান পেতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। নক্ষত্রদের বর্ণালির রঙ্গমঞ্চে তখনই মেঘনাদ সাহার আবির্ভাব। তিনিই প্রথম দেখালেন, সূর্যের বুকে কেন আয়নিত ক্যালসিয়ামের রেখার ঔজ্জ্বল্য হাইড্রোজেনের চেয়ে বেশি। তাঁর জন্য সময়টি ছিল সৃজনশীলতার তুঙ্গে। ১৯১৯ থেকে ১৯২১ সালে নক্ষত্রের বর্ণালির সমাধানে ১২টি প্রবন্ধ লিখলেন, যেগুলোর প্রতিটিই ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হলো।

default-image

সূর্যের বর্ণালিতে হিলিয়ামের আবিষ্কর্তা ইংরেজ বিজ্ঞানী নরমান লকইয়ার তাঁর গবেষণাগারে নিম্ন চাপে মৌল গাসের মধ্যে তড়িৎপ্রবাহ করে বর্ণালি রেখা পাচ্ছিলেন। লকইয়ার সূর্যের ক্যালসিয়াম H এবং K নামের রেখা দুটিও তৈরি করতে পেরেছিলেন। ‘আয়োনাইজেশন ইন দ্য সোলার ক্রমস্ফেয়ার’ প্রবন্ধে মেঘনাদ নিলস বোরের পরমাণু তত্ত্ব ব্যবহার করে দেখালেন, H এবং K রেখা দুটিকে একবার আয়নিত ক্যালসিয়াম পরমাণুর শোষণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। একবার আয়নিত ক্যালসিয়ামের অর্থ হলো এটির পরমাণু তার ২০টি ইলেকট্রনের মধ্যে একটি ইলেকট্রন হারিয়েছে, এর ফলে সেটি একটি ধনাত্মক আধানযুক্ত আয়নে পরিণত হয়েছে। এ সময়ে মেঘনাদ সাহা নোবেল বিজয়ী ওয়ালথের নেরনস্ট ও তাঁর ছাত্র জোহান এগার্টের কাজকে খুব মনোযোগের সঙ্গে অনুসরণ করছিলেন। তাঁরা নক্ষত্রের উপরিভাগের আয়নিত ও নিউট্রাল পরমাণুর অনুপাতকে শুধু চাপ ও তাপমাত্রা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন। মেঘনাদ এগার্টের একটি প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে বুঝলেন, এগার্ট পরমাণুকে আয়নিত করার যে শক্তি (যাকে ionization potential বলা হয়) সেটাকে অগ্রাহ্য করেছেন। সাহা সমীকরণে এই আয়ন পোটেনশিয়াল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ‘দ্য ফিজিক্যাল থিওরি অব স্টেলার স্পেক্ট্রা’ প্রবন্ধে সাহা বিভিন্ন তাপমাত্রা ও চাপের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন মৌলের আয়নিত হওয়ার সম্ভাবনাকে গণনা করলেন। দেখালেন, সূর্যপৃষ্ঠে হাইড্রোজেন খুব একটা আয়নিত নয়।

সাহা সমীকরণ বেশ জটিল, এটি একটি মৌলের দুটি আয়নিত পরমাণু সংখ্যার অনুপাতকে যেমন HII/HI কিংবা CaII/CaI নির্ধারণ করে। এখানে HII বা CaII একবার আয়নিত পরমাণু এবং HI বা CaI নিউট্রাল পরমাণু (কৌতূহলী পাঠকের জন্য সমীকরণটি টীকায় দেওয়া হলো)। সাহা আয়ন সমীকরণের সঙ্গে বোলজম্যানের একটি পরমাণুর উচ্চতর শক্তিতে থাকার সম্ভাবনাকে যোগ করলে খুব সহজেই নক্ষত্রের বর্ণালি ব্যাখ্যা করা যায় (বোলজম্যানের সম্পর্কটিও টীকায় দেওয়া হলো)। প্রথমে দেখা যাক, কেন উচ্চ তাপমাত্রার তারার বর্ণালিতে হাইড্রোজেন বালমার রেখা ক্ষীণ। সাহা সমীকরণ বলছে, ৫ হাজার ডিগ্রি তাপমাত্রায় প্রায় কোনো হাইড্রোজেন আয়নিত হবে না, কিন্তু ৮ হাজার ৩০০ কেলভিন তাপমাত্রায় ৫ শতাংশ, ৯ হাজার ৬০০ কেলভিনে ৫০ শতাংশ আর ১১ হাজার ৩০০ কেলভিনে প্রায় ৯৫ শতাংশ হাইড্রোজেন পুরো আয়নিত হয়ে যাবে। পুরোপুরি আয়নিত হলে হাইড্রোজেন থেকে আর কোনো কৃষ্ণ শোষণ রেখা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ, বামার ফোটনকে অধিগ্রহণ করার জন্য ইলেকট্রন লাগবে, কিন্তু সেই পরমাণুগুলো ইলেকট্রনবিহীন। তাহলে O বা B শ্রেণির তারাগুলোতে কেন বালমার রেখার ঔজ্জ্বল্য কম, সেটা বোঝা গেল। অন্যদিকে A শ্রেণির তারাদের হাইড্রোজেনরা ৫০ শতাংশ আয়নিত ও ৫০ শতাংশ নিউট্রাল। বোলজম্যান সম্পর্ক দিয়ে ওই ৫০ শতাংশ নিউট্রাল হাইড্রোজেনের কত ভগ্নাংশ দ্বিতীয় শক্তির কক্ষপথে থাকতে পারে, সেটার গণনা করা সম্ভব। তাপমাত্রা যত বেশি হবে, তত বেশি ইলেকট্রন প্রথম কক্ষপথ থেকে দ্বিতীয় কক্ষপথে উত্তরণ করবে। অন্যদিকে, তাপমাত্রা খুব বেশি হলে পরমাণু আয়নিত হয়ে যাবে। তাই দেখা যায়, ১০ হাজার কেলভিন তাপমাত্রার A শ্রেণির তারাদের বালমার রেখারা সর্বোচ্চ শক্তি দেখায়।

এখানে একটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দরকার। একটি একক হাইড্রোজেনকে আয়নিত করতে ১৩.৬ ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তির দরকার। ওই শক্তির ফোটন পেতে হলে নক্ষত্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার কেলভিন হতে হবে। তাহলে কেন ১৫ হাজার কেলভিন তাপমাত্রায় প্রায় সব হাইড্রোজেনই পুরোপুরি আয়নিত হয়ে যাচ্ছে? এর কারণ দুটি। প্রথমত, তারাপৃষ্ঠে মুক্ত ইলেকট্রনের গতিশক্তি ম্যাক্সওয়েল-বোলজম্যান বিতরণ অপেক্ষক অনুযায়ী বিতরিত হবে। এর মানে হলো, ১০ হাজার কী ১৫ হাজার কেলভিন তাপমাত্রাতেও অনেক পরমাণু ও ইলেকট্রন পাওয়া যাবে। এদের গতিশক্তি অনেক এবং যারা সংঘর্ষের মাধ্যমে হাইড্রোজেনের পরমাণুর ইলেকট্রনদের উচ্চতর কক্ষপথে নিয়ে যাবে। যেখান থেকে সহজেই তাদের আয়নিত করা যায়। দ্বিতীয়ত, ওই তাপমাত্রায় তারাটির বিদ্যুৎ চুম্বকীয় বিকিরণ প্ল্যাঙ্কের কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ অপেক্ষক অনুসরণ করবে। ফলে বেশকিছু উচ্চ শক্তির অতিবেগুনি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ফোটন পাওয়া যাবে। এরা হাইড্রোজেনকে সহজেই আয়নিত করতে পারে।

এবার দেখা যাক, সূর্যের বর্ণালিকে কেমন করে সাহা সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। আগেই বলেছি, সূর্যের ক্যালসিয়াম H এবং K কৃষ্ণরেখা হাইড্রোজেনের বামার রেখা থেকে শক্তিশালী। অথচ সূর্যপৃষ্ঠে প্রতি ৫ লাখ হাইড্রোজেন পরমাণুর জন্য মাত্র একটি ক্যালসিয়াম পরমাণু পাওয়া যায়। কাজেই মনে করা যেতে পারে, হাইড্রোজেনের রেখা উজ্জ্বল হবে। সূর্যের ৬ হাজার কেলভিন তাপমাত্রায় সাহা সমীকরণ অনুযায়ী খুব বেশি হাইড্রোজেন আয়নিত হয়নি, কিন্তু বোলজম্যান সম্পর্ক বলে ওই তাপমাত্রায় প্রতি ২০ কোটি হাইড্রোজেন পরমাণুর মধ্যে মাত্র একটি দ্বিতীয় কক্ষপথে উত্তরণ করে। আমরা জানি, বামার শোষণ রেখা সৃষ্টি করতে হাইড্রোজেনকে দ্বিতীয় কক্ষপথে থাকতে হবে। অন্যদিকে, একই তাপমাত্রায় ক্যালসিয়ামের একবার আয়নিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি এবং ওই আয়নিত ক্যালসিয়ামকে দ্বিতীয় শক্তিস্তরে নিতেও খুব বেশি তাপমাত্রার প্রয়োজন হয় না। ঠিকমতো হিসাব করে সব গণনা শেষে দেখা যায়, সূর্যের বুকে ক্যালসিয়ামের রেখা সৃষ্টি করার সম্ভাবনা হাইড্রোজেন থেকে ৪০০ গুণ বেশি।

বিজ্ঞাপন
default-image

নক্ষত্র বর্ণালির এই যে ব্যাখ্যা, তা বলতে গেলে আধুনিক জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যার সূচনা। মেঘনাদ সাহার নিজের ভাষায়, ‘১৯২০ অব্দে বর্তমান লেখক কর্তৃক তাপপ্রভাবে পরমাণুর বিদ্যুৎকণায় বিভাজন সম্বন্ধীয় থিওরি প্রকাশিত হয় (Thermal Ionisation of Elements)। এই থিওরিতে সূর্যের এবং সূর্যের বর্ণমণ্ডলের বর্ণচ্ছত্র সম্বন্ধীয় সমস্ত সমস্যার সমাধান করা হইয়াছে। এই তত্ত্ব আবিষ্কারের ফলে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের তালিকাতে আরও নূতন নূতন আয়োজন ও বিধিব্যবস্থা যোগ করিতে হইয়াছে।’ মেঘনাদ সাহা তাঁর প্রবন্ধগুলোতে বিভিন্ন মৌলের সম্ভাব্য কৃষ্ণরেখা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বিশ্বপরিচয়ে’ লিখলেন, ‘পৃথিবী থেকে যে ৯২টি মৌলিক পদার্থের খবর পাওয়া গেছে, সূর্যে তার সবগুলিরই থাকা উচিত; কেননা পৃথিবী সূর্যেরই দেহজাত। প্রথম পরীক্ষায় পাওয়া গিয়েছিল ৩৬টি মাত্র জিনিস। বাকিগুলির কী হোলো? সেই প্রশ্নের মীমাংসা করেছেন বাঙালী বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। নূতন সন্ধানপথ বের করে সূর্যে আরো কতকগুলি মৌলিক জিনিস তিনি ধরতে পেরেছেন।’

সাহা সমীকরণ যেমন নক্ষত্রের উপরিভাগের জন্য প্রযোজ্য তেমনভাবেই আন্তনাক্ষত্রিক মাধ্যমে, নতুন তারা সৃষ্টির সময় কিংবা সুপারনোভার বিস্ফোরণে কার্যকরী। এমনকি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগের আয়নিত অবস্থা জানতে এই সমীকরণ দরকারি। বিগ ব্যাং–পরবর্তী সময়ে যখন তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমে আসছিল, সেই সময়ে আয়নিত হাইড্রোজেন ইলেকট্রন অধিগ্রহণ করে নিউট্রাল হাইড্রোজেনে রূপান্তরিত হচ্ছিল। এর ফলে বিগ ব্যাং–সৃষ্ট ফোটন কণিকার জন্য মহাকাশ ক্রমেই স্বচ্ছ হয়ে উঠল। কোন সময়ে এবং কোন তাপমাত্রায় এই রূপান্তরটি ঘটল, সেটি সাহা সমীকরণ দিয়ে নির্ধারিত করা যায়। সেই আদি ফোটনদের আমরা আজ মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বিকিরণ হিসেবে জানি। কাজেই সাহা সমীকরণ আধুনিক মহাজাগতিক বিজ্ঞানেও ভূমিকা রাখছে।

মেঘনাদ সাহা নোবেল পুরস্কার পাননি বলে অনেকে আক্ষেপ করেন, কিন্তু তাঁর কাজ প্রতিটি জ্যোতির্বিদ্যার পাঠ্যপুস্তকে ঠাঁই পেয়েছে, যেটা সব বিজ্ঞানীর ভাগ্যে জোটে না। মাত্র ২৭ বছর বয়সে বাংলার গ্রাম থেকে উঠে আসা মানুষটি যে মেধা ও সাহসের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানে চিরস্থায়ী অবদান রেখে গেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। এটাই অনেক বড় পুরস্কার।

লেখক: জ্যোতিঃপদার্থবিদ ও অধ্যাপক, মোরেনো ভ্যালি কলেজ,

ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

ফিচার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন