গাছেদের অন্তর্জাল

বাংলাভাষী বিজ্ঞানীদের মধ্যে জগদীশচন্দ্র বসু জগদ্বিখ্যাত হয়ে আছেন গাছের অনুভূতি আছে আবিষ্কার করে। তিনি দেখিয়েছেন, গাছেরা বাহ্যিক উদ্দীপনায় সাড়া দিতে পারে শারীরিকভাবে। তাঁর আবিষ্কারের শতবর্ষ পার হয়ে গেছে, বিজ্ঞান এখন অনেক এগিয়েও গেছে। গাছেদের যে শুধু অনুভূতি আছে তা নয়, তাদের যে সমাজও আছে, তা আবিষ্কার হয়ে গেছে!

অনেক আদিবাসী সমাজে প্রকৃতিকে একটি সত্তা হিসেবে দেখা হয়। তারা বিশ্বাস করে যে প্রকৃতিতে সব জীবন মিলে একীভূত হয়ে আছে। জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন মুভি অ্যাভাটার-এ প্যানডোরা গ্রহের সব গাছ ও প্রাণীকে একটি নেটওয়ার্ক দ্বারা সংযুক্ত দেখানো হয়। মুভিটাতে আদিবাসীদের বিশ্বাসটাকে বাস্তব রূপ দেওয়া হয়েছে। সব জীবন মিলে আসলেই একটা সত্তা কি না, সে আধ্যাত্মিক আলোচনা পরের কোনো দিনের জন্য তোলা থাক, কিন্তু মজার ব্যাপার হলো আদিবাসীদের এ ধারণার কিছু ভিত্তি আছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে পৃথিবীর বনের গাছেরা একে অন্যের সঙ্গে আসলেই যুক্ত একটা নেটওয়ার্কের দ্বারা, যাকে তাঁরা নাম দিয়েছেন Wood Wide Web। এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গাছেরা একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানিয়ে দেয়, কখন পোকামাকড় আক্রমণ করছে, এমনকি তারা একে অন্যকে খাদ্য ও অন্যান্য রিসোর্সও পাঠাতেও পারে।

এখন ব্যাখ্যা করা যাক এটা কীভাবে জানা গেল। Mycorrhiza হলো ছত্রাক ও স্থলজ উদ্ভিদের মূলের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে গড়ে ওঠা মিউচুয়ালিস্টিক সম্পর্ক। এই ছত্রাকটা মাটি থেকে পানি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ শোষণ করে সরবরাহ করে গাছকে আর গাছ তার বিনিময়ে খাবার দেয় ছত্রাককে। ছত্রাকটির দেহ মাটির নিচে ছড়ানো থাকে অনেক বড় স্থানজুড়ে।

বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন যে Micorrhiza তে থাকা এই ছত্রাকগুলো একই প্রজাতির অন্য ছত্রাকের মাইসেলিয়ামের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে। দুটো আলাদা উদ্ভিদের মূলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ছত্রাক যদি যোগাযোগ করতে পারে বা সংযুক্ত হয়ে যায়, তার মানে তো উদ্ভিদ দুটোও সংযুক্ত হয়ে গেল তা-ই না!

এটা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা চলতে থাকল। রেডিওঅ্যাক্টিভ ট্রেসার হিসেবে কার্বন আইসোটোপ দিয়ে চিহ্নিত শর্করা উদ্ভিদের দেহে প্রবেশ করিয়ে এর গতিবিধি দেখা হলো। দেখা গেল যে এই খাবার উদ্ভিদটির সঙ্গে যুক্ত ছত্রাকগুলোর মধ্য দিয়ে অন্য উদ্ভিদেও যাচ্ছে! সুতরাং মাটির নিচে ছড়িয়ে থাকা এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে উদ্ভিদগুলো একে অন্যের সঙ্গে খাদ্য আদান-প্রদানও করতে পারে!

এটা আবিষ্কারের সঙ্গে একটা অদ্ভুত বিষয়ও দেখা গেল। মা গাছগুলো তার বীজ থেকে জন্ম নেওয়া গাছদের শনাক্ত করতে পারে এবং প্রয়োজনে খাবার পাঠিয়ে সন্তানকে টিকে থাকতেও সাহায্য করে। এমনকি বড় বনের ছায়াঘন পরিবেশে এই সহায়তা ছাড়া সন্তান উদ্ভিদগুলো হয়তো কম বয়সে বাঁচতই না। সন্তানদের প্রতি স্নেহ তাহলে একা প্রাণীরাই দেখায় না!

কিছু জীব (যেমন ছত্রাক, পোকামাকড় ইত্যাদি) গাছের ক্ষতি করে। কেউ গাছে গর্ত খুঁড়ে ডিম পাড়ে, কেউ গাছের রস ও পাতা খায়। এমনকি এই কাজগুলো করার সময় গাছদের কখনো কখনো রোগজীবাণু দিয়ে সংক্রমিতও করে। গাছ তো নড়তে পারে না, তাই এসব ক্ষতিকর জীবদের থেকে সে নানা উপায়ে নিজেকে রক্ষা করে। যেমন পোকামাকড়ের বিরুদ্ধে তার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হলো বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক নিঃসরণ করা। এসব রাসায়নিক নিঃসরিত হলে পোকামাকড় আর গাছের কাছে আসে না।

এই প্রতিরোধব্যবস্থা আলোচ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কি না, দেখতে নতুন এক্সপেরিমেন্ট চালানো হলো। একটা গাছে পোকামাকড় ছেড়ে দিয়ে চারপাশের প্রতিবেশী গাছের প্রতিক্রিয়া খেয়াল করা হলো। যখন প্রতিবেশী গাছগুলো এই আক্রান্ত গাছের সঙ্গে নেটওয়ার্কের দ্বারা যুক্ত থাকে, তখন ওই গাছগুলো আগেভাগেই পোকামাকড় তাড়ানোর রাসায়নিক ক্ষরণ করে। এভাবে তারা নিজেদের রক্ষা করে আক্রমণ থেকে। নেটওয়ার্ক দিয়ে যুক্ত না থাকলে তখন আর চারপাশের গাছগুলো রাসায়নিক ক্ষরণ করে না। সুতরাং এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বনের উদ্ভিদরা পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রতিরোধ করে।

বিজ্ঞাপন

বনের উদ্ভিদের মধ্যে এই নেটওয়ার্কের অনেক কিছু এখনো রহস্যাবৃত। যেমন এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে উদ্ভিদরা শুধু সাহায্য না, একে অন্যের ক্ষতিও করতে পারে। কিছু গাছ (ফ্যান্টম অর্কিড) এই নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে খাবার চুরি করে বেঁচে থাকে। কিছু গাছ এই নেটওয়ার্কের সুবিধা নিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী গাছের ক্ষতি করে। তারা এমন রাসায়নিক পদার্থ পাঠিয়ে দেয়, যা ওই গাছগুলোর বৃদ্ধির হার কমিয়ে দেয়।

কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন যে মানবসমাজের মতো এই নেটওয়ার্ক উদ্ভিদসমাজ তৈরিতে সাহায্য করেছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো উদ্ভিদের এ সমাজ কাজ করে মানবসমাজের মতো করেই। আমরা যেমন একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করি, উদ্ভিদেরাও এই WWW নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে যোগাযোগ করে নিজেদের মধ্যে। আমরা যেমন একে অন্যকে সাহায্য করি, তাদের বিপদের সময় বা একতাবদ্ধভাবে বিপদকে মোকাবিলা করি, উদ্ভিদেরাও তা করে। তেমনি আমরা যেমন নিজেদের মধ্যে বিভেদ-কোন্দলে জড়িয়ে পড়ি, তারাও তা করে। এই নেটওয়ার্ক তাই মানবসমাজের মতোই মিল-অমিলের এক অদ্ভুত সুন্দর সংসার।

লেখক: শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ অনার্স, জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: বিবিসি ফোকাস

অন্যান্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন