বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

এলএইচসিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তির সংঘর্ষ ঘটানো হয়। এ কারণে এখানকার ডিটেক্টরগুলোকে আগের তুলনায় অনেক বড় করে বানানো হয়েছে। আবার এই বিশাল ডিটেক্টরগুলো স্বভাবতই মাটির নিচে প্রায় ৫০ মিটার গভীরে খোঁড়া সুড়ঙ্গে নামাতে হয়েছে। একেকটা ডিটেক্টর পুরো একসঙ্গে জোড়া লাগিয়ে নামানো অসম্ভব; কারণ এগুলোর ভেতর যেমন রয়েছে সূক্ষ্ম ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, আরও আছে ভারী চুম্বক।

চুম্বক কেন লাগে, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার একটু প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। যেসব কণা চার্জ বহন করে, যেমন ইলেকট্রন, প্রোটন—তাদের শনাক্ত করা সহজ। কারণ তারা গ্যাসজাতীয় পদার্থের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় গ্যাসের অণুগুলোকে আয়নিত করে। এখন এই গ্যাসকে যদি একটা বিভব পার্থক্যের মধ্যে রাখা যায়, যেমন একটা ধনাত্মক ও আরেকটা ঋণাত্মক চার্জবিশিষ্ট ধাতব প্লেটের মধ্যে রেখে এই আয়ন তৈরি হয়, তাহলে সেই গ্যাসের ভেতর স্পার্ক বা স্ফুলিঙ্গ দেখা দেয়। এই স্ফুলিঙ্গ সহজেই ইলেকট্রনিক বর্তনীর মাধ্যমে চিহ্নিত করা যায়। এ তো গেল চার্জবাহী কণাকে ধরার উপায়। কিন্তু এসব সংঘর্ষে তো উচ্চ শক্তির ফোটন (যেমন গামা রশ্মি) কণাও তৈরি হয়, এরা চার্জ বহন করে না। এ ধরনের কণা শনাক্ত করার উপায় দুটি। ফোটনের জন্য বিশেষ ধরনের ক্রিস্টাল (যেমন: PbW04—যাকে আমরা লেড টাংস্টেট বলি) ব্যবহার করা হয়। এর ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় গামা কণা ক্ষণিকের জন্য ইলেকট্রন অবমুক্ত করে। এই ইলেকট্রনকে বিদ্যুতের ঝলকানি হিসেবে শনাক্ত করা যায়। কিন্তু এ ছাড়া তৈরি হয় নিউট্রিনো, যাদের দ্রুত শনাক্ত করার জন্য কোনো সরাসরি প্রক্রিয়া জানা নেই। তাহলে এদের কীভাবে আমরা শনাক্ত করি? এখানে নিউটন ও আইনস্টাইনই আমাদের পরিত্রাতা। আমরা ভরবেগের নিত্যতায় বিশ্বাসী। সংঘর্ষের আগে প্রোটন কণা দুটির ভরবেগ আমাদের জানা থাকলে আর সংঘর্ষ–পরবর্তী শনাক্তকৃত কণাগুলোর ভরবেগ জানা থাকলে আমরা দুটির (ভেক্টর) যোগফল মিলিয়ে দেখি। যদি গরমিল পাওয়া যায়, তাহলে সেখান থেকে আমরা বুঝব যে সংঘর্ষে চার্জবিহীন কোনো কণা তৈরি হয়েছে (যেমন: নিউট্রিনো), যা আমরা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছি। আর সেই কণাটিই এই ‘চুরি হওয়া’ ভরবেগটা বহন করছিল। কিন্তু যেকোনো চার্জবাহী কণার ভরবেগ জানার উপায় কী?

এর উত্তরটা সহজ, চৌম্বক বলক্ষেত্র! চুম্বকের ক্ষেত্রে যেকোনো চলমান চার্জ বেঁকে গিয়ে তার গতিপথ পরিবর্তন করে। এই বক্রপথের ব্যাসার্ধ জানলে আর চুম্বক ক্ষেত্রের তীব্রতা জানা থাকলে সহজেই ভরবেগ বের করা সম্ভব। আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগে এই ব্যাসার্ধ বের করার জন্য সার্নে বিশাল বিশাল ফটোগ্রাফের ওপর হুমড়ি খেয়ে কর্মী–বাহিনী (এরা সবাই বিজ্ঞানী নয়) স্কেল আর ফিতা নিয়ে কাজ করত। এখন সব ছবি ডিজিটাল ডেটা হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। ফলে এসব ডেটা দ্রুত সংগ্রহ করা যায়, তেমনি সেগুলোর উপাত্ত বিশ্লেষণও কম্পিউটারের সাহায্যে অটোমেটেড উপায়ে করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে আমরা জানলাম, এসব ডিটেক্টর এত ভারী কেন? কারণ, তাদের ভেতর আছে শক্তিশালী চুম্বক এবং সে জন্য তাদের ভেতর আছে প্রচুর লোহা। যেমন: ALICE ও CMS ডিটেক্টরের প্রতিটার ভেতরের লোহার ওজন প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের ওজনের চেয়ে বেশি। এত ভারী যন্ত্রাংশগুলো সরু সুড়ঙ্গে নামানোর জন্য যেমন লেগেছে যন্ত্র-প্রকৌশলীদের, তেমনি লেগেছে তড়িৎ-প্রকৌশলীদের।

এ জন্য সার্নে নিয়মিত কাজ করেন, এমন ব্যক্তিদের ভেতর প্রকৌশলীদের সংখ্যাই বেশি, যদিও তাঁদের কাজের সরাসরি সুবিধাভোগীরা হচ্ছেন কণাপদার্থবিজ্ঞানীরা। আর এই নতুন উদ্ভাবনার উপকার পাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

কণাপদার্থবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ঘটনা হলো যে এখানে কণার সংখ্যা ধ্রুব থাকে না। যেমন আমাদের একটা অতীব পরিচিত তেজস্ক্রিয়তার নিউট্রন পরিবর্তিত হয়ে প্রোটন, ইলেকট্রন তার প্রতি–নিউট্রন তৈরি করে।

n→ p+ e+ve

এখানে জরুরী জিনিসটা হলো, কপার বা তামা পরিবর্তনের জন্য দায়ী িবভিন্ন মৌলিক মিথস্ক্রিয়া। ভিন্ন ভিন্ন মিথস্ক্রিয়ার কারণে বিভিন্ন ধরনের বিক্রিয়া ঘটে আর সে কারণে যে কথাগুলো বিলীন হয়ে যায়, তাদের স্থায়ীত্বও ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। আমাদের জানা মৌলিক বল চারটি—

১. সবল নিউক্লিয়ার মিথস্ক্রিয়া

২. দুর্বল নিউক্লিয়ার মিথস্ক্রিয়া

৩. তড়িৎচুম্বকীয় মিথস্ক্রিয়া

৪. মহাকর্ষ মিথস্ক্রিয়া

এদের মধ্যে মহাকর্ষ কণাপদার্থবিজ্ঞান–সম্পর্কিত পরীক্ষাগুলোতে কোনো রকম ভূমিকা পালন করে না। কিন্তু বাকী মিথস্ক্রিয়াগুলো মৌলিক কণার পরিবর্তনে তাদের নিজস্ব চিহ্ন রেখে যায়—তাদের বিক্রিয়ার ফলাফলে লব্ধ কণাগুলোকে শনাক্ত করার প্রক্রিয়াটিও ভিন্ন ভিন্ন।

ধরা যাক, কোনো কণা x ভেঙে A ও B কণা তৈরি হয়।

x→A+B ....(1)

আরও ধরে নিই, এই বিক্রিয়াটি সবল ও তড়িৎচুম্বকীয় দুই মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই ঘটতে পারে। কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের (QUANTUM FIELD THEORY বা QFT) ভাষায় দুটো বিক্রিয়াকেই আমরা যে গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারব, তা হলো—

H = yXAB ....(2)

x, A, B হচ্ছে (1) নং সমীকরণে দেখানো কণাগুলোকে প্রতিনিধিত্বকারী কোয়ান্টাম ক্ষেত্রগুলো। আর H হলো এই মিথস্ক্রিয়ার সম্পর্কিত শক্তি। আর y হবে প্রক্রিয়ার মিথস্ক্রিয়ার ধ্রুবক।

হাইজেনবার্গের অনিয়শ্চয়তার নীতির একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল হলো, কোনো কণার স্থায়িত্বকালের সঙ্গে তার শক্তির অনিশ্চয়তার মানের সম্পর্ক, যার প্রকাশ ঘটে নিচের সমীকরণের মাধ্যমে—

T= ħ/ΔE

স্বভাবতই E–এর মান আমাদের (2) নং সমীকরণের দেওয়া মিথস্ক্রিয়ার শক্তির মাধ্যমে পেতে পারি। কারণ, কণার অস্তিত্ব না থাকলে তার মিথস্ক্রিয়ার প্রশ্নই আসবে না। সেহেতু কণার শক্তির অনিশ্চয়তার নাম (2) নং সমীকরণ দিয়েই পরিমাপ করা যাবে। এখান থেকে আমরা খুব সহজেই একটা ব্যাপার টের পাচ্ছি যে যদি একটি কণা পরিবর্তিত হয়ে এই কণাযুগল তৈরি করে, তাহলে সেই প্রক্রিয়ার স্থায়িত্ব (অর্থাৎ আদিকণার জীবনকাল) প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ধ্রুবকের বিপরীত অনুপাতিক। এখান থেকে সহজেই দেখতে পাব যে, যে মিথস্ক্রিয়ার কার্যকরী ধ্রুবক, অর্থাৎ কার্যকরী ‘y’ যত কম হবে, সেই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনশীল কণার স্থায়িত্ব তত বেশি হবে।

আমাদের পর্যবেক্ষণ বলে, এই কার্যকরী ধ্রুবকের মান হিসাব করলে সবল নিউক্লিয় মিথস্ক্রিয়াশীল কণার জীবনকাল সবচেয়ে কম হবে, অন্যদিকে দুর্বল নিউক্লিয় মিথস্ক্রিয়ার ক্ষয়িষ্ণু কণার স্থায়িত্ব বেশি হবে—অর্থাৎ তারা তাদের উত্পত্তিস্থল থেকে সবচেয়ে বেশি দূরত্বে যেতে পারবে।

ঠিক এ কারণেই আলোচনার শুরুতে জ্যামরোলের কথা বলেছিলাম। কারণ, সব ধরনের মিথস্ক্রিয়ায় তৈরি কণা একই স্থানে ক্ষয় হবে না, মনে করিয়ে দিই—LHC–তে যে শক্তির কণা তৈরি করা হয়, তারা সব এক ধাপেই পরিবর্তিত হয় না। অনেকগুলো পথেই এক কণা ভেসে ভেসে অনেক কণা তৈরি হয়। প্রতিটি ধাপকে শনাক্ত করার জন্য বিভিন্ন ‘ছিদ্রের জাল’ নিয়ে বিজ্ঞানীরা বসে থাকেন। এখন এই ‘জালে’ আটকা কণাগুলো কিন্তু থেকে যায় না—জেলিফিশের মতো তারা মিলিয়ে যায়। তাই এই কণার প্রবাহগুলোর উপাত্ত ধরে রাখার জন্য ডিটেক্টরের সব স্তরের ডেটা খুব দ্রুত রেকর্ড করে কম্পিউটারে সংরক্ষণ করতে হয়।

আবার এই ডেটার মধ্যেও প্রচুর গুরুত্বহীন ডেটা রয়ে যায়। তাই এই র' বা ‘কাঁচা’ ডেটাগুলোকে আবার এই জঞ্জালমুক্ত করার জন্য বহু নিত্যনতুন ফিল্টার তৈরি করতে হয়। এ কারণে এই পর্যায়ে একজন কণাবিজ্ঞানীকে হয়ে উঠতে হয় একেকজন বিশেষায়িত সফটওয়্যার ডেভেলপার (অবশ্য এই সফটওয়্যার বাজারে বিক্রি করার মতো কিছু নয়)।

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে LHC–এর প্রয়াস কোনো বিশুদ্ধবাদী পদার্থবিদের ক্লাব নয়—এখানে রয়েছে প্রায় সবারই কাজ করার সুযোগ—পদার্থবিজ্ঞানী, বিভিন্ন প্রকৌশলের বিশেষজ্ঞদের যন্ত্রপ্রকৌশলী থেকে ডেটাবিজ্ঞানীদের। এত সুযোগ থাকার পরও কেন আমরা হাত লাগাতে পারছি না—সেটাও একটা গবেষণার বিষয়।

লেখক: অধ্যাপক, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন