বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

চেরেনকভ বিকিরণ হলো উনিশ শতকের পদার্থবিজ্ঞান এবং সেটা বিশ শতকে এসে ডালপালা মেলেছে। ১৮৮৮ সালে ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী অলিভার হিভিসাইড এই ঘটনার তাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণী করেন। সম্ভবত পিয়েরে এবং মেরি কুরি এ ঘটনা দুর্ঘটনাবশত আবিষ্কারও করে ফেলেন। তবে এটি নিয়ে ত্রিশের দশকে বিস্তারিত গবেষণা করেন সোভিয়েত বিজ্ঞানী পাভেল চেরেনকভ এবং তাঁর নামেই নামকরণ হয়। তেজস্ক্রিয়তা হলো কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াস থেকে আলফা (হিলিয়াম নিউক্লিয়াস), বিটা (ইলেকট্রন) ও গামা রশ্মির বিকিরণ। চেরেনকভ লক্ষ করেন পানি, কাচ বা এ রকম স্বচ্ছ পদার্থের পাশে তেজস্ক্রিয় বস্তু থাকলে এ রকম নীলচে আলো দেখা যায়। কয়েক বছর পর দুই সোভিয়েত বিজ্ঞানী ইলিয়া ফ্রাঙ্ক ও ইগর টাম আইনস্টাইনের রিলেটিভিটির অধীনে এই পুরো ইফেক্টের গাণিতিক তত্ত্ব দাঁড় করান। এই তিনজনকে তাঁদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৫৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল দেওয়া হয়।

চেরেনকভ বিকিরণ হলো সনিকবুমের মতো ফোটোনিক বুম। যেকোনো মাধ্যম কণা (ইলেকট্রন, নিউক্লিয়াস) এবং আলোর পারস্পরিক সম্পর্কে তৈরি। তাই শূন্য মাধ্যম থেকে আলোর বেগ এখানে অবশ্যই কম হবে। কেননা, মাধ্যমের মধ্যে চলার সময় আলোর বারবার শোষণ আর বিকিরণ হতে থাকে। ফলে শূন্য মাধ্যমে আলো যত দ্রুত যেত, কিছুটা সময় শোষণ আর বিকিরণের মাঝে নষ্ট হয় বলে শেষ পর্যন্ত ওই দূরত্ব যেতে একটু বেশি সময় লাগে। তাই বেগ হয় একটু কম। যেহেতু মাধ্যমের পরমাণুর গাঠনিক উপাদান চার্জযুক্ত, তাই যখন আরেকটি চার্জযুক্ত কণা মাধ্যম দিয়ে চলে, তা আশপাশের অঞ্চলের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রকে পোলারাইজড করে। যখন কণার বেগ কম হয়, তখন কণাটি সরে যাওয়ামাত্র এই আন্দোলন স্থিতিস্থাপকভাবে যান্ত্রিক সাম্যাবস্থায় চলে আসতে পারে। কিন্তু বেগ অনেক বেশি হলে সাম্যাবস্থায় ফিরে আসা সম্ভব হয় না। ফলে মাধ্যমের এই আন্দোলনের শক্তি সুসংহত শকওয়েভ হিসেবে উল্টো দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সুপারসনিক প্লেন চলার সময় যেমন পেছনে সনিক বুম রেখে যায়, ঠিক তেমনি ইলেকট্রনের মতো চার্জযুক্ত কণারাও এ রকম আলোর বিকিরণ করতে থাকে। এমনিতে সব রকমের তরঙ্গদৈর্ঘ্যেই আলোর বিকিরণ হয়। তবে দৃশ্যমান আলোর কাছাকাছিতে তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত কম, তীব্রতাও তত বেশি হয়। সত্যি বলতে, সবচেয়ে বেশি বিকিরণ হয় অতিবেগুনি রশ্মিতে। দৃশ্যমান আলোর মধ্যে নীল বা বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম। আমাদের চোখ নীল আলোয় বেশ সংবেদনশীল বলে চোখেও এ আলোটাই ধরা পড়ে।

হাঁসের চলার পথে তৈরি তরঙ্গটা কতটুকু ছড়িয়ে পড়বে, অর্থাৎ দুপাশে দুটি সরলরেখা টানলে তাদের মধ্যে কোণ কতটুকু হবে, তা নির্ভর করে হাঁসের বেগের ওপর। তেমনি চেরেনকভ বিকিরণেও ছড়িয়ে পড়া আলোর কোণ দেখে সেই কণার বেগের মান ঠিক ঠিক বলে দেওয়া যায়। তা ছাড়া কণাটা কোন পথে যাচ্ছে, সেই দিক এবং এর ভর সম্পর্কেও ধারণা করা যায়। এ জন্য উচ্চশক্তির (তথা বেগ) কণা শনাক্ত করায় এই ইফেক্টের সাহায্য নেওয়া হয়। সার্নের অ্যালিস (ALICE) ডিটেক্টরে বর্তমানে চেরেনকভ বিকিরণভিত্তিক একটা ডিটেক্টর বসানো হয়েছে। সেটার নাম High Momentum Particle Identification Detector (HMPID)। নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরে তো চেরেনকভ বিকিরণ অহরহ ঘটছে। বিক্রিয়ার হার, কতটুকু জ্বালানি রড ব্যবহৃত হলো, তেজস্ক্রিয় বর্জ্যে কতটুকু তেজস্ক্রিয়তা অবশিষ্ট আছে—এসব বুঝতে এই পদ্ধতির জুড়ি নেই।

চেরেনকভ বিকিরণের কথা আসলে নিউট্রিনোর কথা না বললেই নয়। কণার জগতে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র ঠিক রাখতে এর অবতারণা করা হয়। কিন্তু এর অন্য পদার্থের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এতই কম যে এক শ আলোকবর্ষ দীর্ঘ একটি লোহার দণ্ডের মধ্য দিয়ে একটা নিউট্রিনো কণা চালনা করলে তা কোনো লোহার পরমাণুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া না করেই চলে যাবে। তাই অনেক বিজ্ঞানীই ধারণা করতেন, এই ভুতুড়ে কণাকে কখনোই খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ভুতুড়ে হলেও তো তার বেগ থাকবে এবং কয়েকটির বেগ ওই মাধ্যমে আলোর বেগ থেকে বেশি হতেই পারে। আর তখনই নীলচে আলোর ফুলঝুরি ছড়িয়ে জানান দেবে তার অস্তিত্বের। তাই নিউট্রিনোকে ধরতে পারার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো চেরেনকভ বিকিরণ। বিশেষ করে মহাজাগতিক নিউট্রিনো ধরতে বেশ কয়েকটি ডিটেক্টর রয়েছে পৃথিবীজুড়ে। যেমন দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত আইসকিউব, কানাডার সাডবারি নিউট্রিনো অবজারভেটরি, জাপানের সুপারকামিওকান্ডে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো কামিওকান্ডে। এটা ১৯৮৭ সালের সুপারনোভা থেকে আসা নিউট্রিনো ধরেছিল। সুপারকামিওকান্ডে মাটির এক কিলোমিটার নিচে এবং তাতে ৫০ হাজার টন বিশুদ্ধ পানি এবং ১৩ হাজার ফোটোমাল্টিপ্লায়ার টিউব রাখা আছে যেন। কোনো না কোনো নিউট্রিনোর একটুখানি চেরেনকভ বিকিরণ হলেই তা ধরতে পারা যায়। এমনকি মানুষের চোখের পানির মধ্যেও চেরেনকভ বিকিরণ হতে পারে। সেটা চোখে একটুখানি আলোর ঝিলিক হয়ে ধরা পড়ে। গাণিতিক হিসাব করে দেখানো যায়, ১৯৮৭ সালের সুপারনোভার নিউট্রিনো সেই সময়ের পৃথিবীর অন্তত একজন মানুষের একটি চোখে একবার চেরেনকভ বিকিরণ দিয়েছিল। সেই আলোর ঝিলিককে হয়তো সেই ভাগ্যবান নিতান্ত সাধারণ কিছু একটা ভেবে পাত্তাই দেয়নি। ২০০২ এবং ২০১৫ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান যে বিজ্ঞানীরা, তাঁদের পরীক্ষণের মূলনীতিই ছিল নিউট্রিনোর কারণে তৈরি হওয়া চেরেনকভ বিকিরণ।

চেরেনকভ বিকিরণ থেকে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার প্রমাণও পাই। ধরা যাক, শূন্য মাধ্যমে কোনো কণার বেগ আলোর বেগের থেকে বেশি। তবে তারা বিপুল পরিমাণ শক্তি বিকিরণ করবে চেরেনকভ বিকিরণে। ফলে আমরা যেসব কসমিক রে ধরতে পারব, তাতে উচ্চশক্তির কোনো কণা থাকবে না। কেননা, তারা ইতিমধ্যে অনেকটা শক্তি বিকিরণ করে ফেলেছে। কিন্তু আমরা পৃথিবীতে বসে উচ্চশক্তির কসমিক রে ধরতে পারি, কাজেই বোঝা যায় শূন্য মাধ্যমে এরা চেরেনকভ বিকিরণ করেনি; অর্থাৎ এদের বেগ আলোর থেকে কম।

টাইম ট্রাভেল নিয়ে কথা বলতে গেলেও চেরেনকভ রেডিয়েশনের কথা চলে আসে। আমরা জানি যে, মহাবিশ্বে আলোর বেগ সর্বোচ্চ, এর বেশি বেগে চলে সম্ভব নয়। যদি তা-ই হয়, তাহলে কোন একটা চার্জযুক্ত কণা (যেমন ইলেকট্রন) কীভাবে একটা ডাইইলেকট্রিক মাধ্যমে আলোর গতির চেয়ে বেশি গতিতে চলাচল করছে এবং চেরেনকভ বিকিরণ নিঃসরণ করছে? এর মানে কি ইলেকট্রনগুলো টাইম ট্রাভেল করছে? উত্তর হচ্ছে, না। ইলেকট্রন যে মাধ্যমে চলাচলের কারণে চেরেনকভ বিকিরণ নিঃসরণ করছে, সে মাধ্যমে আলোর গতিবেগ থেকে বেশি বেগে তারা চলছে, শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ (c) থেকে বেশি বেগে নয়। শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ থেকে বেশি বেগে চলতে পারে, এমন কাল্পনিক কণার কথা প্রস্তাব করা হয়েছে, যেমন ট্যাকিয়ন। এরাও যদি কোন মাধ্যমে চলাচল করে, তাহলে চেরেনকভ বিকিরণ নিঃসরণ করার কথা।

ইদানীং মানবদেহের অভ্যন্তরের ছবি তৈরির কাজে চেরেনকভ বিকিরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। চেরেনকভ রেডিয়েশন তাই শুধু পদার্থবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার জন্যই নয়, সামনের দিনগুলোতে বাস্তবিক জীবনে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

*লেখাটি ২০১৮ সালে বিজ্ঞানচিন্তার জানুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন