বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমাদের কালের নায়ক স্টিফেন হকিং—তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি জীবদ্দশাতেই তিনি পেয়েছিলেন তারকাখ্যাতি; আর তার পেছনে অনেকটা অবদান তাঁর বইগুলোর। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত তাঁর আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইমকে বলা হয় সর্বকালের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানবিষয়ক বই। সেটির অভাবনীয় পাঠকপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়তে থাকে এর সিকুয়েলের প্রত্যাশা। প্রায় এক যুগ পর পাঠকদের সে আবেদনে সাড়া দেন হকিং, প্রকাশিত হয় দ্য ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল

সাতটি অধ্যায়ের তৈরি এক বাদামের খোসায় আমাদের ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের পুরোনো মহাবিশ্বের আদ্যোপান্ত– অর্থাৎ যতটুকু এ পর্যন্ত আমাদের আয়ত্ত্বে এসেছে তার সবটাকে পুরে পাঠকদের হাতে তুলে দিয়েছেন স্টিফেন হকিং। এর অন্ধকার সীমানা- যেখানে হয়তো কুঁচকে আছে অচেনা মাত্রাগুলো, আর সঞ্চয় করে রেখেছে মহাবিশ্বের ইতিহাসকে—সেসব নিয়েও রয়েছে আকর্ষণীয় আলোচনা। চলুন তবে একটু খোসাটা ছাড়িয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করা যাক।

প্রথম অধ্যায়টি আপেক্ষিকতার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আর দ্বিতীয়টি সময়ের রূপরেখা। এ বইটিকে যদি একটি গাছের সাথে তুলনা করা হয়, তবে এ দুটি তার মূল গুঁড়ি, আর বাকি পাঁচটি স্বাধীন শাখা। প্রথম অধ্যায়টি এক কথায় যাত্রার শুরুতেই পূর্বসূরী আইনস্টাইনের কাছ থেকে ঘুরে আসা। আর দ্বিতীয় অধ্যায়টি মূলত তাঁর কাজের যে অদ্ভুত ফলাফল, এখনো আমাদের সামনে প্রশ্নচিহ্ন হয়ে আছে সেগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয়। এখান থেকেই মূলত শুরু হয় থিওরি অফ এভরিথিংয়ের খোঁজ। ফলে বর্তমান সময় পর্যন্ত জনপ্রিয় সব তত্ত্ব—তা প্রাচীন সর্বাত্মক নিমিত্তবাদ থেকে শুরু করে অনিশ্চয়তার নীতির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা বর্তমানের থিওরিগুলোর রূপরেখা হাজির করে৷ কাজেই এটি কেবল সময়ের রূপরেখা নয়, মানবজাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তনের রূপরেখাও বটে। মূলত এটি এবং বইটির নামের তৃতীয় অধ্যায়। এ দুটিই সবচেয়ে তাত্ত্বিক অধ্যায়, যার মধ্যে হকিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক কাজগুলোকে তুলে ধরা হয়েছে। শেষের চারটি অধ্যায় বর্তমানের সায়েন্স ফ্যান্টাসির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর হকিং সব সময়ের মতোই তাত্ত্বিক আলোচনা ও অসাধারণ রসবোধের পরিচয় দিয়েই এ বিষয়গুলোর কথা বলেছেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিখে আর স্পয়লার দিতে চাইছি না।

তবে এ বইটির অন্যতম বিশেষত্বের কথা এখনো বলা বাকি থেকে গেছে। তা হল প্রতি পাতায় চমৎকার সব ছবি, গ্রাফ ও ফিগারের ব্যবহার। পাশাপাশি অতিরিক্ত তথ্য বক্স কিংবা ক্যাপশন বারে যোগ করা হয়েছে।

অনুবাদের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। সব সময়ের মতোই প্রাঞ্জল অনুবাদ। আর যে বিষয়টা আমার সবচেয়ে বেশি ভাল্লাগে, তা হল বইয়ের শেষের শব্দকোষ—সবটা মিলিয়ে একদম মনের মতো একটা বিজ্ঞান বই!

শুধু একটা ব্যাপারেই আফসোস হচ্ছিল, ছবিগুলো যদি আরেকটু স্পষ্ট আর রঙিন হতো! জানি এটা একটু খামখেয়ালি আবদার, কারণ তাতে বইয়ের প্রকাশনার অনেক ব্যাপারেই চাপ পড়ত, তবুও বলে ফেললাম।

সবশেষে প্রথম কথাটার একটু শক্তপোক্ত ভিত তৈরি করে নিই বইটা থেকেই ধার করে। পড়ে নেয়া যাক, হ্যামলেটের সেই উক্তির ব্যাপারে—হকিং বলছেন, 'হ্যামলেট সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছেন, আমরা মানবজাতি দৈহিকভাবে সীমাবদ্ধ হলেও মহাবিশ্ব অনুসন্ধানে আমাদের মন পুরোপুরি মুক্ত বা স্বাধীন। এমনকি স্টার ট্রেক যেখানে যেতে ভয় পায়, সেখানেও আমাদের অবাধ সাহসী বিচরণ।

মহাবিশ্ব কি আসলে অসীম, নাকি এটা কেবল খুবই বৃহৎ কোনো কিছু? আবার মহাবিশ্ব কি চিরন্তন, নাকি দীর্ঘস্থায়ী কোনো অস্তিত্ব? আমাদের সসীম মন কীভাবে এই অসীম মহাবিশ্বের নাগাল পায় বা একে অনুধাবন করতে পারে? একে বোঝার চেষ্টা করা কি আমাদের জন্য প্রমিথিউসের মতো ধৃষ্টতা নয়? আমরা কি এভাবে প্রমিথিউসের মতো ভাগ্য বরণ করার ঝুঁকি নেব? চিরায়ত পুরাণ অনুযায়ী, মানুষের ব্যবহারের জন্য জিউসের কাছ থেকে আগুন চুরি করে এনেছিলেন প্রমিথিউস। এই দুঃসাহসের শাস্তি হিসেবে তাকে এক পাহাড়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল, যাতে ইগল তার যকৃৎ ছিড়েখুঁড়ে খেতে পারে ।

এ রকম সতর্কতামূলক গল্প চালু থাকা সত্ত্বেও আমার বিশ্বাস, আমরা এই মহাবিশ্বকে বুঝতে পারি। একে বোঝার চেষ্টাও করা উচিত আমাদের। মহাবিশ্বকে অনুধাবনের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বিগত কয়েক বছরে আমাদের চমকপ্রদ অগ্রগতি হয়েছে। তবু মহাবিশ্বের পুরো চিত্রটি এখনো আমাদের কাছে নেই। তবে সেদিন আর খুব বেশি দূরেও নেই।'

তাহলে চলুন, চেষ্টা চালিয়ে যাই মহাবিশ্বকে বোঝার জন্য। হকিংয়ের কথায়ই, 'কৌতূহলী হোন।'

এক নজরে

দ্য ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল

স্টিফেন হকিং

ভাষান্তর : আবুল বাসার

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন

প্রচ্ছদ: সব্যসাচী মিস্ত্রী

প্রকাশকাল: আগস্ট ২০১৯

মুদ্রিত মূল্য: ৪৮০ টাকা

লেখক: শিক্ষার্থী, প্রথম বর্ষ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন