বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

একটা মহাকাশযানের কথাই ভাবুন। ধরুন, মহাকাশযানটি মঙ্গলে যাবে। কবে কখন মঙ্গলে অবস্থান করবে মহাকাশযানটি, সেটা আপনি আগে ঠিক করে রাখতে পারেন। বলতে পারেন, নিউটনীয় গতিবিদ্যার, ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতার কারণেই সেটা সম্ভব। পৃথিবী থেকে মঙ্গলে যেতে এখন একটা মহাকাশযানের ৬ মাস সময় লাগে। ধরুন, এ মুহূর্তে আপনি মহাকাশযানটি মঙ্গলে পাঠালেন। ২০ মিনিট পর আপনি বলে দিতে পারবেন তার অবস্থান কোথায়। এমনকি তার সাথে যদি আপনার বেতার যোগাযোগ না-ও থাকে, তবু বলতে পারবেন।

শুধু তখন কেন, এ মুহূর্তেই আপনি ২০ মিনিট পরের অবস্থার কথা বলতে পারবেন। আপনি বলতে পারবেন ২০ মিনিট পর মহাকাশযানটি ঠিক কোথায় অবস্থান করছে, কোন দিকে যাচ্ছে, তার গতিবেগ কত ইত্যাদি। এখনো আপনি বলে দিতে পারেন ঠিক কোন দিন, কোন সময়, কোন মুহূর্তে মহাকাশযানটি মঙ্গলের মাটিতে অবতরণ করবে। আর এটা সম্ভব হচ্ছে নিউটনীয় গতিবিদ্যা ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতার কারণেই। আসলেই ক্ষমতাটা আছে বলেই তো আপনি মঙ্গলে মহাকাশযান পাঠানোর সাহস করছেন। হিসাব কষে আগেই বের করে ফেলেছেন ঠিক কোন পথে মঙ্গলে যাওয়া যাবে। এর জন্য আপনার কতটা পথ অতিক্রম করতে হবে। আপনি জানেন, মহাকাশযান কত গতিতে গেলে আপনি ছয় মাসে পৌঁছে যেতে পারবেন। অর্থাৎ নিউটনের গতিবিদ্যার হিসাব-নিকাশ থেকে আপনি আগেই মহাকাশযানটির গতিপথ জেনে ফেলেছেন। তার অবস্থান জানতে পারবেন, একই সাথে তার গতিবেগ জানতে পারবেন। আর এই সবকিছুর পেছনেই রয়েছে ওই নিখুঁত হিসাব-নিকাশ। কিন্তু কোয়ান্টামের জগতে সেই হিসাব অচল। কেন অচল, সেটাই আমাদের মূল প্রশ্ন।

আবার একটু ফিরে যাই দর্শনে। ধরুন, গহিন অরণ্যে আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সেই সময় হঠাৎ একটা গাছ ভেঙে পড়ল। আপনি গাছের ভেঙে পড়া দেখলেন, ভেঙে পড়ার শব্দ শুনবেন, গা বাঁচাতে পালিয়ে এলেন। তাই নিশ্চিত করে বলতে পারেন, আসলেই জঙ্গলের ভেতর একটা গাছ ভেঙে পড়েছে।

আপনি যদি জঙ্গলে না যেতেন, গাছ ভেঙে পড়া দেখতে বা শব্দ যদি না শুনতেন, তাহলে কি আদৌ গাছটা ভেঙে পড়ত না। দর্শনের দৃষ্টিবাদ বলে একটা কথা আছে। যে জিনিস আপনি দেখছেন না তার কোনো অস্তিত্বই নেই। কথাটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। দর্শনের যুক্তি কিন্তু তাই বলে। কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের আগে আমেরিকার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। অন্তত সাধারণ মানুষের কাছে তো নয় বিজ্ঞানী ও দার্শনিক কাছেও নয়। তাই বলে কি আমেরিকা তার জায়গায় ছিল না? বিজ্ঞান বলবে আমেরিকা সেখানে ছিল। কারণ বিজ্ঞানের হাতে প্রমাণ আছে, সেই প্রমাণটা যেমন কলম্বাস লিখে গেছেন, তেমনি ভূতাত্ত্বিক ও সৃষ্টিতত্ত্ব বিশ্লেষণ করে বলে দেওয়া যায় বহু আগে থেকেই আমেরিকা আমেরিকার জায়গায় ছিল। এ ধরনের প্রমাণ আছে বলেই বিজ্ঞান এটাকে সত্যি বলে স্বীকার করে। কিন্তু কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের আগে বিজ্ঞানের হাতে কোনো প্রমাণ ছিল না, আমেরিকা আদৌ আছে কিনা। সুতরাং তখন আমেরিকার অস্তিত্বই থাকার কথা নয়। সত্যি বলতে কি তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের জন্মই হয়নি। তাই বিজ্ঞানও নিশ্চিত করে বলতে পারত না।

দার্শনিকেরা বলেন, যুক্তি দিয়ে যা প্রমাণ করা যায় না, তার অস্তিত্বই আসলে নেই। এখানে যুক্তি বলতে শুধু ভাবনার যুক্তি নয়। এখানে দৃষ্টিপাত বড় ভূমিকা পালন করে। চোখে আপনি যা দেখবেন তারই শুধু অস্তিত্ব আছে। এটা দৃষ্টবাদের প্রধান সুর। আবার চোখে না দেখে দৃষ্টবাত কাজে লাগানো যায়।

যেমন আপনি একটা পচা ডিমের গন্ধ পাচ্ছেন। সুতরাং পূর্ব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে বলে দিতে পারেন আশপাশে কোথাও পচা ডিম আছে, সেটা হয়তো আপনি দেখছেন না। তেমনি কানে শুনেও অনেক কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করতে আপনার বাধবে না। অর্থাৎ পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের যেকোনো একটি দিয়েই আপনি কোনো বস্তুর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারেন। এটাই হলো দৃষ্টবাদ। কিন্তু বিজ্ঞান শুধু দৃষ্টিবাদে আটকে থাকে না। বিজ্ঞান প্রমাণ চায়। শুধু চোখে দেখলে চলে না, শুধু কানে শুনলেই চলে না, শুধু গন্ধ বা স্পর্শ অনুভূতি দিয়ে প্রমাণ করলেই চলে না। এগুলো ভুল হতে পারে। অন্ধদের হাতি দর্শনের মতো। একদল অন্ধকে লাগিয়ে দিন, হাতির শরীর স্পর্শ করে হাতির বর্ণনা দিতে। যে অন্ধ হাতির যে অঙ্গ স্পর্শ করবে, তার কাছে হাতি তেমনই হবে। যে কানে হাত দেবে, সে ভাববে হাতি কুলার মতো। যে পা স্পর্শ করবে তার কাছে হাতি থামের মতো। লেজ স্পর্শ করবে যে, তার কাছে হাতি দড়ির মতো। আর যে হাতির পিঠ স্পর্শ করবে তার কাছে হাতি জেলখানার প্রাচীরের মতো। সুতরাং শুধু পর্যবেক্ষণ করে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে আসাও ঠিক হবে না। এর জন্য হিসাব-নিকাশের সঙ্গে মিলতে হবে। এখানেই দর্শনের সঙ্গে বিজ্ঞানের পার্থক্য।

বিজ্ঞান হিসাব-নিকাশ করে বলে দিতে পারে, কী ঘটতে যাচ্ছে বা কোনো কণা বা বস্তুর অবস্থান বলে দিতে পারে। পরে সেটা পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় হিসাব-নিকাশ যা বলেছে তা একদম ঠিক। আবার হিসাব-নিকাশ ঠিক থাকলেও পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যদি না মেলে তাহলে সেটা কেউ বিজ্ঞান বলে স্বীকার করবে না। আর এ জন্যই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কোনো বস্তু, কোনো ঘটনা বা কোনো গতিবেগ, কোনো অবস্থান আগেভাগেই বলে দেওয়া সম্ভব। নিউটনের গতিবিদ্যায় এটা হয়ে এসেছে কয়েক শ বছর ধরে। পরে যখন বিদ্যুৎ গতিবিদ্যা আবিষ্কার হলো, সেটাও নিউটনীয় গতিবিদ্যাকে অনুসরণ করল। অর্থাৎ বৈদ্যুতিক গতিবিদ্যার সাহায্যে আপনি চাইলেই চার্জ, চার্জ প্রভাব, প্রবাহের দিক, এর অবস্থান, কী পরিমাণ চার্জ বহন করছে বস্তুটা, আধঘণ্টা পরে বা এক ঘণ্টা পরে সেটার কী অবস্থা হবে, আগেভাগেই হিসাব করে দেওয়া যেত। কিন্তু মুশকিলটা হলো কোয়ান্টাম মেকানিকস লাইম লাইটে আসার পর।

২.

কোয়ান্টাম জগতে ভবিষ্যদ্বাণী অচল। চাইলেই আপনি বলতে পারবেন না বস্তুটি এক ঘণ্টা, আধঘণ্টা কিংবা প্রায় এক বছর পরে কোথায় থাকবে। শুধু তা-ই নয়, ঠিক নির্দিষ্ট একটা মুহূর্তে বস্তুটির অবস্থান আর গতিবেগ একই সঙ্গে আপনি বলতে পারবেন না ।এটা হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির কথা। কিন্তু কথা হচ্ছে কেন এই ভবিষ্যদ্বাণী করতে অক্ষম বিজ্ঞান? নিউটনীয় বলবিদ্যাই বা কেন অচল কোয়ান্টামের জগতে?

আমরা ফিরে যাই সেই জঙ্গলে। যেখানে আপনার সামনে একটা গাছ ভেঙে পড়েছিল আর আপনি সেটার শব্দ শুনেছিলেন। গাছের চাপা থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসেছিলেন। নিউটনীয় মেকানিকস হলে হিসাব-নিকাশ করেই বলে দেওয়া যেত, একটা গাছ কী অবস্থায় থাকলে, বাতাস বা ঝড়ের কী পরিমাণ ধাক্কা খেলে সেটা ভেঙে পড়বে এবং কখন সেটা ভেঙে পড়বে, আপনি কী বেগে দৌড়ে পালালে গাছের হাত থেকে বাঁচতে পারবেন।

এ ঘটনাটা যদি আপনি কোয়ান্টাম জগতের সাথে মেলান, তাহলে হিসাবটা যাবে উল্টে। কোয়ান্টাম মেকানিকস বলবে, আপনি ওখানে গিয়েছিলেন বলেই গাছটা ভেঙে পড়েছিল। আপনি যদি গহিন জঙ্গলে না যেতেন তাহলে ওই গাছটা হয়তো ভেঙে পড়ত না। ব্যাপারটা অনেকটা সেই প্রাচীন দার্শনিকদের মতো। কলম্বাস যাওয়ার আগে আমেরিকার অস্তিত্বই ছিল না পৃথিবীতে। কলম্বাস গিয়েছিলেন বলেই কি আমেরিকার জন্ম হয়েছিল। ভোজবাজির মতো সেখানে একটা আদিবাসী সভ্যতাও পাওয়া গিয়েছিল। বিষয়টা গাঁজাখোরের মতো হতে পারে। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে এমনটাই ঘটে চলেছে অহরহ। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার কিংবা জঙ্গলে আপনার সামনে দেয়াল ভেঙে পড়া এ দুটোই অনেক বৃহৎ স্কেলে পরিমাপযোগ্য। তাই কোয়ান্টামের অনিশ্চয়তা এখানে খাটবে না। নিশ্চিত করেই আপনি বলে দিতে পারেন কলম্বাস যাওয়ার আগেই আমেরিকা আমেরিকাতেই ছিল। আপনি গহিন জঙ্গলের না গেলেও গাছটা ভেঙে পড়ত।

এই যদি হয় বিজ্ঞানের ভাষ্য, তাহলে কোয়ান্টাম জগতেও সেটা কেন নয়?

পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী পলাশ বরণ পাল তাঁর বিজ্ঞান: ব্যক্তি যুক্তি সময় সমাজ নামের বইটিতে কোয়ান্টাম জগতের অনিশ্চয়তার কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন সরল দোলক দিয়ে। যাঁদের এ বিষয়টা নিয়ে আগ্রহ আছে, তাঁরা বইটা পড়ে দেখতে পারেন। আমি একটু অন্যভাবে ব্যাখ্যা করছি।

ধরুন, দুজন কিশোর মুখোমুখি বসে আছে মেঝের ওপর। তাদের মধ্যে দূরত্ব ২ মিটার। তাদের কাছে একটা মার্বেল আছে। মার্বেলটা মেঝের ওপর গড়িয়ে একজন আরেকজনকে দিচ্ছে। মার্বেল গড়িয়ে গড়িয়ে যখন একজনের কাছে চলে যাচ্ছে, অন্যজন সেটা ধরে আবার পাঠিয়ে দিচ্ছে বন্ধুর কাছে। ধরে নিই, দুই বন্ধু সমান বলে (Force) মার্বেলটা ঘুরিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং মার্বেলের গতি সব সময় একই থাকছে। নিউটনের গতিসূত্র থেকে আমরা সহজেই বলে দিতে পারি মার্বেলটার গতিপথ। কোনো একটা নির্দিষ্ট সময় মার্বেলটা কোথায় অবস্থান করছে, তার ভরবেগ কত, সেটাও আমরা হিসাব করে বলে দিতে পারি। কিন্তু যদি মার্বেলটাকে তুলনা করি একটা কণার সাথে, তাহলে বদলে যাবে হিসাব। মার্বেলটাকে তো আর কণায় পরিণত করা যাবে না। অনিশ্চয়তার নীতি পরীক্ষা যেভাবে আমরা করি, দুই বন্ধুর মার্বেল গড়িয়ে দেওয়ার খেলাটাকেও অনেকটা সেভাবে করতে পারি।

ধরা যাক, দুই বন্ধু এখন বসে আছে একটা অন্ধকার ঘরে। ঘুটঘুটে অন্ধকার যাকে বলে। তারা যেখানে বসে আছে তার পাশেই একটা দেয়াল। দেয়ালের সামনে লম্বালম্বি দাগকাটা। দাগটা দেয়ালের সমান্তরাল। এই দাগের ওপর দিয়েই দুই বন্ধু মার্বেল গড়িয়ে দেবে। যেহেতু অন্ধকার তাই মার্বেলের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হবে আমাদের জন্য। এ জন্য আমরা একটু ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করব। এখন আর শুধু দুই বন্ধুতে চলবে না। তৃতীয় আরেকজন বন্ধু যোগ দেবে এই খেলায়। তার হাতে থাকবে আরেকটা মার্বেল।

এই মার্বেলটা আগের মার্বেল এর চেয়ে বড়। দুই বন্ধু যেখানে বসে আছে তাদের থেকে একটু দূরে নতুন বন্ধুটি বসবে। এমনভাবে বসবে যেন দুই বন্ধুর থেকেই তার দূরত্ব সমান। তাদের অবস্থানটা অনেকটা সমবাহু ত্রিভুজের মতো। ত্রিভুজের ভূমির দুই বিন্দুতে বসবে প্রথম দুই বন্ধু আর শীর্ষবিন্দুতে বসবে তৃতীয় বন্ধু। তৃতীয় বন্ধু দেয়ালের দিকে মুখ করে বসবে। দেয়াল থেকে তার অবস্থান পর্যন্ত একটা রেখা টানা থাকবে। প্রথম দুই বন্ধু যখন মেঝেতে মার্বেল গড়িয়ে দেবে তার কিছুক্ষণ পরে তৃতীয় বন্ধুটি দেয়ালের দিকে যে রেখা টানা আছে, তার ওপর তার মার্বেলটি গড়িয়ে দেবে।

দ্বিতীয় বন্ধুর পাশে ধরা যাক আরো সাত-আটজন বন্ধু পাশাপাশি বসে আছে। তাদের প্রত্যেকেরই সামনে দেয়াল থেকে একটা দাগ টানা আছে। তাদের প্রত্যেকের হাতেই একটা করে মার্বেল আছে।

তৃতীয় বন্ধুর মার্বেল প্রথম দুই বন্ধুর মার্বেলের চেয়ে বড়। নতুন অন্য বন্ধুদেরও তা-ই। নতুন বন্ধুদের প্রত্যেকের মার্বেলে একটা করে নম্বর দেওয়া আছে। ১, ২, ৩, ৪ এই ক্রমে। প্রথম দুই বন্ধু যখন তাদের মার্বেল দাগের ওপর গড়িয়ে দেবে। তখন এরাও তাদের সামনে থাকা দাগের ওপরে তাদের মার্বেল গড়িয়ে দেবে দেয়াল লক্ষ্য করে। এভাবে কয়েক শ বার একই কাজ করলে আমরা একটা ফলাফলে পৌঁছাতে পারব। দেখব, প্রতিবার কোনো না কোনো নম্বরযুক্ত মার্বেল প্রথম দুই বন্ধুর মার্বেলের সাথে ধাক্কা খেয়েছে। বেশির ভাগ মার্বেল ধাক্কা না খেয়ে দেয়ালে আঘাত করেছে। প্রতিবারই নতুন বন্ধুরা যখন মার্বেল ছুড়বে, তখন আলাদা আলাদা নম্বরের মার্বেল ছুড়বে। তাই কোন মার্বেলটা দেয়ালে আঘাত করেছে আর কোন মার্বেল প্রথম দুই বন্ধুর মার্বেলের সঙ্গে আঘাত করে দিক পরিবর্তন করেছে, সেটা আমরা সহজেই বুঝতে পারব। সবগুলো হিসাব-নিকাশ এক করে আমরা প্রথম দুই বন্ধুর মার্বেলের গতিপথ, ভরবেগ, কখন কোন সময় কোন কোন জায়গায় সংঘর্ষ হয়েছে মার্বেলদের সেগুলোও বের করে ফেলতে পারব নিউটনের গতির সূত্রের সাহায্যে।

সুতরাং আলোতে না দেখেও আমরা প্রথম দুই বন্ধুর মার্বেলের গতিপথ, অবস্থান ইত্যাদি বের করে ফেলতে পারলাম।

আসলেই কি তা-ই?

খালি চোখে এমন মনে হলেও হিসাবটা কিন্তু একটু অন্য রকম। কারণ তৃতীয় বন্ধুর মার্বেলটি প্রথম দুই বন্ধুর মার্বেলের চেয়ে বড়। সুতরাং এই মার্বেল যখন প্রথম দুই বন্ধুর মার্বেলকে আঘাত করছে, তখন কিন্তু মার্বেলের অবস্থান আর সেই দাগের ওপরে থাকছে না। দাগ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে। তার মানে তার অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তন হচ্ছে তার গতিপথও। অর্থাৎ অবস্থান ও ভরবেগের অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, এর সঙ্গে কোয়ান্টাম কণাদের কী সম্পর্ক?

এই প্রশ্নটাই আসলে জার্মান বিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গকে ভাবিয়ে তুলেছিল। আমরা কোয়ান্টাম ফিজিকস বইয়ে আইনস্টাইনের আলোক তড়িৎক্রিয়া দেখেছি। সেখানে দেখেছি আলোর ফোটন কণারা কীভাবে ধাক্কা দিয়ে ধাতু থেকে ইলেকট্রন সরিয়ে দিচ্ছে। তার মানে ক্ষুদ্র কণার ওপর আলোর কণা ভালোই দাদাগিরি করতে পারে। তা-ই যদি হয়, ইলেকট্রনের গতিপথ যদি আপনি মাপতে চান, তাহলে আপনাকে তার ওপর আলোকরশ্মি ফেলতে হবে। আলোকরশ্মি তো ফোটন কণাদের ঝাঁক। সেই ফোটন কণা যখন ইলেকট্রনের ওপর পড়বে তখন ইলেকট্রন ধাক্কা খেয়ে তার অবস্থান থেকে সরে যাবে। সুতরাং চাইলেও আপনি ইলেকট্রনের গতিপথ নির্দিষ্ট করতে পারেন না। চারপাশ থেকে আসা ফোটন কণার ধাক্কা ইলেকট্রনের গতিপথকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। সে জন্যই ইলেকট্রনের বা কোয়ান্টাম কণাদের সত্যিকারের কোনো গতিপথ থাকে না। তাই তাদের অবস্থান নির্দিষ্ট করা যায় না। শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ থেকে আপনি শুধু কোনো বিন্দুতে কণিকাদের পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, সেটা অঙ্ক কষে বের করতে পারেন। শতভাগ নিশ্চয়তা কোনো বিন্দুতে পাবেন না।

যে বস্তুর অবস্থান নির্দিষ্ট নয়, যাদের নির্দিষ্ট কোনো গতিপথ নেই, যারা কণা নাকি তরঙ্গ, এমন নির্দিষ্ট কোনো ফায়সালা নেই, তাদের আপনি নিউটনের সূত্র দিয়ে পরিমাপ করবেন কীভাবে?

সুতরাং খুদে কণিকাদের জগতে চলবে না নিউটনের সূত্র।

নিউটনের সূত্র ধরে বস্তুর গতিপথ, ভর ইত্যাদির হিসাব থেকে নির্দিষ্ট একটা সময়ের পর এর ভর, অবস্থান ইত্যাদির ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন, সেটা কোয়ান্টাম জগতে সম্ভব নয়। কোয়ান্টাম জগতে আপনি বলতে পারবেন না ১ সেকেন্ড পরে কণাটির অবস্থান কোথায় হতে পারে, কোথায় সেটা যেতে পারে।

তবে এখানে একটা সুবিধা আছে। আপনি যেমনটা চান, খুদে কণারা সেভাবেই আপনার কাছে ধরা দেবে। কণারা যেহেতু একই সঙ্গে তরঙ্গ ও কণা। তাই আপনি চাইলেই এদের যেকোনো একটা রূপ বেছে নিতে পারেন। আপনি যদি চান ইলেকট্রনকে কণারূপে দেখতে, সে কণা হিসেবে আপনার সামনে ধরা দেবে। তেমনি যদি চান ওরা ধরা দিক তরঙ্গরূপে, তাহলে ইলেকট্রনের আপনার সামনে নিজেকে জাহির করবে তরঙ্গ হিসেবে।

এ এক প্রহেলিকা। এই প্রহেলিকার জগৎ বলে, আপনি যদি জঙ্গলে না যান তাহলে বুড়ো গাছটি ভেঙে পড়বে না। আপনি গিয়েছিলেন বলেই গাছটি ভেঙে পড়েছিল। এ কথার দার্শনিক বিষয়টা আরো গভীরে প্রোথিত। কোয়ান্টাম জগৎ বলে, আপনি আছেন বলেই মহাবিশ্ব আছে, আপনি না থাকলে মহাবিশ্ব নেই। রেগেমেগে যেমনটা বলেছেন আইনস্টাইন, আমি যদি তাকিয়ে না থাকি তাহলে কি আকাশের চাঁদটা থাকে না?

কোয়ান্টাম জগতের আসলেই তা-ই। আপনার মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকান। একটা ছবি ওপেন করুন। ধরা যাক, ২নং ছবিটা আপনি ওপেন করলেন। ছবিতে কামরাঙার ওপরে একটা মাছি বসে আছে। তারপর স্ক্রিনে কয়েকবার টোকা দিয়ে ছবিটাকে জুম করুন। মাঝখানের ছবিটা পাবেন। জুম করার ফলে মাছিটা দেখা যাচ্ছে অনেক বড় করে। এবার স্ক্রিনে আঙুলটা একটু সরিয়ে নিন ডান দিতে। মাছিটা চলে যাবে স্ক্রিনের বাইরে। কামরাঙার একপাশের ছবি দেখতে পাবেন। মাছিটা তাহলে গেল কোথায়? আপনি ভাবলেন ওটা তো ডিসপ্লের একপাশে সরিয়ে রেখেছি। আসলেই কি তাই?

default-image

আসলে যখন ডিসপ্লের ছবিটা ডান দিকে সরিয়ে নিচ্ছেন, তখন মাছি ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে। আসলে আপনি তো তখন ওটাকে দেখতে চাচ্ছেন না। আবার যখন ডানে সরিয়ে নিয়ে আসছেন ছবিটা, তখন আবার দেখা দিচ্ছে মাছি। আপনি মাছিটাকে দেখতে চাচ্ছেন বলেই তখন দেখছেন। মোবাইলের ডিসপ্লেতে অসংখ্য পিক্সেল থাকে। আর ছবি হিসেবে যেটা আপনার মোবাইলে থাকে। সেটা কিন্তু ছবি নয়। প্রতিটা পিক্সেলের জন্য একটা করে তথ্য থাকে ছবি হিসেবে যেটা দেখছি, সেটার ফাইলে। ছবির ফাইল যখন ওপেন, তখন সেই তথ্যগুলো স্ক্রিনের ডিসপ্লেকে যা নির্দেশ করবে, সেটাই পর্দায় ছবি হিসেবে ফুটে উঠবে। ছবি যখন জুম করছেন তখন আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রতিটা পিক্সেলের থাকা তথ্য বিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। ছবিটাকে যখন বাঁয়ে সরাচ্ছেন, তখন আর মাছিটা পিক্সেল এরিয়ায় থাকছে না। সুতরাং তার কোনো অস্তিত্বই তখন আর নেই। সেটা মোবাইলের মেমোরিতে তথ্য হিসেবে আছে। আপনি চাইলেই তখন, সেই তথ্য ঘেঁটে আবার মাছিটাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারবেন।

খুদে কণারাও আসলে তরঙ্গ আর কণার মিশেলে একধরনের তথ্য। আপনি তাকে যেভাবে দেখতে চাইবেন, সে সেভাবে ধরা দেবে। আপনি তখন যে পথে তাকে দেখতে চাইবেন সেই পথেই সেটাকে দেখা পাবেন। নির্দিষ্ট করে কোনো একটা অবস্থা তাদের নেই। তাই নিউটনীয় বলবিদ্যার মতো তাদের নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়। এখানে নিমিত্তবাদ একেবারেই ভেঙে পড়ে।

লেখক: সহসম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা

সুত্র: ফিজিকস ওয়ার্ল্ড, কসমস ম্যাগাজিন

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন