বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সাইক্লোট্রনের জন্মই হয়েছে কণাকে গতিশীল থেকে আরও গতিশীল অর্থাৎ ত্বরিত করতে। এর আগে তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে ছুটে বেরিয়ে আসা কণারাই ছিল বিজ্ঞানীদের কামানের গোলা। এই গোলাই আলফা কণা পরীক্ষায় কাজে লাগিয়েছিলেন আর্নেস্ট রাদারফোর্ড।

কেন এই ত্বরণের দরকার। কণারা এমনিতেই অতি ক্ষুদ্র, গতি অনেক বেশি হলেও ভর খুব কম। তাই এদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটানো কঠিন। কিন্তু কণাদের যদি আরও গতিশীল করা যায়, তারপর এদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটানো যেতেই পারে। কথা হলো সংঘর্ষের আদৌ কি দরকার আছে?

আছে। প্রকৃতির মন পুরোপুরি এখনো বুঝে উঠতে পারেনি মানুষ। এখনকার পদার্থবিজ্ঞানের দুটি শাখা। বড়দের জগৎকে অর্থাৎ গ্রহ–নক্ষত্রের গতি, ভর, বেগ, বল, মহাকর্ষ ইত্যাদি ব্যাখ্যা করে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা। অন্যদিকে পরমাণুর অন্দরমহলের যে জগৎ, সেটা ব্যাখ্যার জন্য দরকার হয় কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা দিয়ে বড়দের জগৎ ব্যাখ্যা করা যায় না, অন্যদিকে সাধারণ আপেক্ষিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না খুদে কণাদের জগৎ। অথচ মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে অর্থাৎ বিগ ব্যাং তত্ত্বের সত্যিকার প্রমাণ পেতে হলে দরকার এই দুই তত্ত্বের মিলন। আবার ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরের খবরও আমরা জানি না। সেটা জানতে হলে এই দুই তত্ত্বের মিলন জরুরি। জরুরি একটি সার্বিক তত্ত্বের, যেটি কোয়ান্টাম মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করতে পারবে।

মহাবিশ্বের জন্মের পরপরই কোনো কণার জন্ম হয়নি। এমনকি প্রকৃতির যে চার বল—মহাকর্ষ, বিদ্যুৎচুম্বক, সবল ও দুর্বল নিউক্লীয় বল—এগুলোর আলাদা কোনো অস্তিত্ব ছিল না শুরুতে। চার বল একসঙ্গে ছিল। বিজ্ঞানীরা তাই নিশ্চিত, মহাবিশ্বের জন্ম-ইতিহাস, মহাবিশ্বের গোপন রহেস্যর সবটকু জানতে হলে এই চার বলকে একত্রিত করতে শিখতে হবে। বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় আর দুর্বল নিউক্লীয় বলকে একত্র করা গেছে গত শতাব্দীর ৭০ দশকে। কিন্তু মহাকর্ষ আর সবল নিউক্লীয় বল সেই তড়িৎ-দুর্বল বলের সঙ্গে এখনো একত্রিত করা যায়নি। এই কাজটাই করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।

মৌলিক বলগুলোর বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়েই তাই বিজ্ঞানীরা একের পর এক কণার হদিস পাচ্ছিলেন, আর সে জন্যই উইলিস ল্যাম্বের ওই রসাল মন্তব্য।

কিন্তু কণা আবিষ্কারের পথটা সহজ ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কণাদের ভাঙনের ইতিহাস। আর সেটা শুরুই হয়েছিল গত শতাব্দীর শুরুর দিকে। ১৯০৮ সালে দুর্ভাগ্যক্রমে রসায়নে নোবেল পেয়ে যান রাদারফোর্ড। দুর্ভাগ্য এ জন্য যে তিনি ছিলেন আপাদমস্তক পদার্থবিজ্ঞানী। এমনকি রসায়নবিজ্ঞানীদের খাটো করে দেখার একটা প্রবণতা তাঁর মধ্যে ছিল, সেই তিনিই কিনা পেলেন রসায়নে নোবেল! যাহোক, নোবেল বক্তৃতা দিতে গিয়েই আলফা কণা শনাক্ত করার একটা পথ বাতলে দেন তিনি। তখনো জানতেন না আলফা কণা আসলে কী? পরে নিশ্চিত হন, তেজস্ক্রিয় বস্তু থেকে যে আলফা কণা বেরিয়ে আসে, সেগুলো আসলে হিলিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াস।

এরপর সেই সুবর্ণ বছর ১৯১১ সালে করলেন তাঁর বিখ্যাত স্বর্ণপাত পরীক্ষা। রাদারফোর্ড একটা যন্ত্র বানালেন, সেই যন্ত্রের ভেতরে ছিল কিছু তেজস্ক্রিয় পদার্থ। যন্ত্রের সামনের দিকের একটা ছিদ্র দিয়ে তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে বেরিয়ে আসা আলফা কণা আঘাত করে সামনে থাকা স্বর্ণপাতকে। স্বর্ণপাতের চারপাশে জিংক সালফাইডের পর্দায় গিয়ে আঘাত করে, স্বর্ণপাত ভেদ করে বা স্বর্ণের নিউক্লিয়াসে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে আলফা কণা। এ পরীক্ষা থেকেই রাদারফোর্ড নিশ্চিত হন যে পরমাণুর কেন্দ্রে আছে ধনাত্মক চার্জযুক্ত নিউক্লিয়াস। অর্থাৎ স্বর্ণপাতের সঙ্গে আলফা কণার সংঘর্ষ ঘটিয়ে রাদারফোর্ড পেলেন পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সন্ধান। এ ক্ষেত্রে পরমাণুটি ছিল গোল্ড বা স্বর্ণের। দ্রুতগামী কণার সংঘর্ষ ঘটিয়ে কণা আবিষ্কারের পথ বাতলে দেয় রাদারফোর্ডের এ পরীক্ষাই।

এর কিছুদিন পরে, ১৯১৫ সালে আরেক নিউজিল্যান্ডার আর্নেস্ট মার্সডেন একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করেন। আলফা কণাকে বাতাসের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটান তিনি। এই সংঘর্ষের ফলে একধরনের কণার জন্ম হচ্ছে। কণাগুলো বেশ ভারী। তিনি কণাগুলোর কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ করে দেখেন, এ ধরনের কণার দেখা রাদারফোর্ড আগেই পেয়েছেন। রাদারফোর্ড হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াসে আলফা কণা দিয়ে আঘাত করে এই কণার সন্ধান পেয়েছিলেন। মার্সডেন ভাবলেন, এটাই বোধহয় হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস। ব্যাপারটা দৃষ্টি আকর্ষণ করে রাদারফোর্ডেরও। তিনি ভাবলেন, এটা অন্য কিছুও হতে পারে। ১৯১৭ সালে তিনি লেখেন, বাতাসে আলফা কণার সংঘর্ষে যেসব কণা তৈরি হচ্ছে, সেগুলো শুধু হাইড্রোজেন নয়, বাতাসে অন্য যেসব উপাদান আছে—নাইট্রোজেন, হিলিয়াম, লিথিয়ামেরও হতে পারে। তিনি বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা চালিয়ে গেলেন। এরপর দীর্ঘ দুই বছর গবেষণার পর ১৯১৯ সালে একটা প্রবন্ধ লিখলেন। শিরোনাম ‘কলাইশন অব আলফা পার্টিকেল উইথ লাইট অ্যাটম’ অর্থাৎ হালকা পরমাণুর সঙ্গে আলফা কণার সংঘর্ষ। সেই প্রবন্ধে রাদারফোর্ড যা বললেন, তা ছিল মধ্যযুগের অ্যালকেমিস্টদের সেই অধরা স্বপ্ন! অ্যালকেমিস্টরা চেয়েছিলেন সঞ্জীবনী রস তৈরি করতে, যা খেয়ে মানুষ অমর হবে। তাঁদের আরেকটা স্বপ্ন ছিল লোহাকে সোনায় রূপান্তর করা। সেই যুগে কণাপদার্থবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হয়নি, আধুনিক রসায়ন থেকেও বিস্তুর দূরত্ব, সুতারাং অ্যালকেমিস্টরা তখন যেন ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সরদার। রাদারফোর্ড লোহাকে সোনায় পরিণত করার পথ প্রথম বাতলে দিলেন। বললেন, আলফা কণা দিয়ে যদি নাইট্রোজেনকে আঘাত করা হয়, তাহলে সেই নাইট্রোজেন নিউক্লিয়াসের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে হাইড্রোজেন। আর এই হাইড্রোজেনের জন্ম হয়েছে ওই নাইট্রোজেনের বুক থেকেই। এটাই ছিল নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ঘটিয়ে এক পদার্থ থেকে আরেক পদার্থ জন্ম দেওয়ার পথে প্রথম পদক্ষেপ। সেই সঙ্গে গতিশীল কণাদের দিয়ে আঘাত করিয়ে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের দুয়ারও খুলে গিয়েছিল তখন।

১৯১৭ সালে রাদারফোর্ড আরেকটা পরীক্ষা করেন। সেই পরীক্ষার ফল তিনি প্রকাশ করেন ১৯১৯ সালে। পরীক্ষাটিতে রাদারফোর্ড নাইট্রোজেন নিউক্লিয়াসকে আঘাত করেন আলফা কণা দিয়ে। এই সংঘর্ষ থেকে জন্ম হয় একটি অক্সিজেন নিউক্লিয়াস আর একটি ধনাত্মক চার্জযুক্ত কণা। এত দিন সেই কণাটি শুধু হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসেই পাওয়া যেত। রাদারফোর্ড নিশ্চিত হলেন, যেটাকে এত দিন তিনি শুধু হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস বলেই মনে করতেন, সেই কণাটি আসলে সব পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরেই থাকে। এর ভর ইলেকট্রনের ১৮৩৬ গুণ। চার্জ ইলেকট্রনের সমান কিন্তু বিপরীত। ১৮১৫ সালে এমন একটি কণার কথা বলেছিলেন উইলিয়াম প্রাউট। আর এটাকেই হাইড্রোজেন আয়ন বলে পরিচিতি দিয়েছিলেন জার্মান বিজ্ঞানী ইউজিন গোল্ডস্টাইন। রাদারফোর্ডই প্রথম কণাটি শনাক্ত করে দেখালেন।

এরপর থেকে কণাপদার্থবিজ্ঞান তরতর করে এগিয়ে চলল। এখন দরকার আরেকটা কণা, যেটা চার্জ নিরপেক্ষ। এর জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করেই রেখেছিলেন রাদারফোর্ড। তিনি অনুমান করেন এমন কিছু হাইড্রোজেন পরমাণু আছে, যার কক্ষপথ থেকে ইলেকট্রন শক্তি বিকিরণ করে নিউক্লিয়াসে পতিত হবে। তখন হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস আর ইলেকট্রন পরস্পরের চার্জকে নাকচ করে দিয়ে চার্জ নিরপেক্ষ কণায় পরিণত হবে। আর বিকিরিত হবে গামা রশ্মি। ১৯২০ সালে এক বক্তৃতায় এই অনুমানের কথা বলেন রাদারফোর্ড। সেই বক্তৃতা দৃষ্টি আকর্ষণ করে জার্মান বিজ্ঞানী ওয়ালথার বোথেকে। তিনি এই কণার খোঁজে নামেন। বেরিলিয়ামকে তিনি আঘাত করেন আলফা কণা দিয়ে। এর ফলে জন্ম হয় গামা রশ্মির। তিনি ধরে নিলেন, এই সংঘর্ষের ফলে এমন একটি হাইড্রোজেন পরমাণু তৈরি হয়েছে, যার নিউক্লিয়াসে নিউট্রন পতিত হয়ে একটা চার্জ নিরেপক্ষ কণা তৈরি করেছে। আর ইলেকট্রন-প্রোটন একত্র হওয়ার পর উৎপন্ন হয়েছে গামা রশ্মি। অর্থাৎ হাইড্রোজেনের ইলেকট্রন আর নিউক্লিয়াস মিলে আসলে জন্ম হয় একটি চার্জ নিরপেক্ষ কণা। পরে তার নাম হয় নিউট্রন। সেই নিউট্রনের খোঁজেই পরমাণুর গভীরে ধরনা দেন ফরাসি বিজ্ঞানী দম্পতি আইরিন কুরি আর ফ্রেডেরিক জুলিও। তাঁরা ছিলেন আরেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী দম্পতি পিয়েরে কুরি ও মেরি কুরির মেয়ে–জামাতা। নতুন কুরি দম্পতি বোথের পরীক্ষাটাকেই আরেকটু এগিয়ে নেন। দেখান, বোথে যে গামা রশ্মির সন্ধান পেয়েছিলেন, সেটা দিয়ে প্যারাফিনকে আঘাত করলে এর ভেতর থেকে প্রোটন বের করে দিতে পারে। এটা কঠিন একটি কাজ। সাধারণ আলোকরশ্মি আলোক-তড়িৎক্রিয়ায় আলোকরশ্মির আঘাতে ইলেকট্রন ধাতু থেকে আলগা হয়ে যায় এবং ছুটে বেরিয়ে আসে ধাতব বন্ধন ছেড়ে। কিন্তু প্রোটনের ভর ইলেকট্রনের চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি। সেটাকে নিউক্লিয়াসের ভেতর থেকে কীভাবে বের করে আনে গামা রশ্মি? এত শক্তি এই রশ্মি পাচ্ছে কোথায়? তাহলে আলফা ও বিটা রশ্মির মতো এই রশ্মিতেও লুকিয়ে আছে কোনো কণা?

আইরিন ও জুলিও দম্পতির গবেষণার কথা জানতে পারেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেমস চ্যাডউইক। তিনি গামা রশ্মি দিয়ে আঘাত করেন হিলিয়াম ও নাইট্রোজেন পরমাণুকে। এর ফলে সেসব পরমাণুর নিউক্লিয়াস বের হয়ে আসা প্রোটনের ধর্ম, গতি, শক্তি বিশ্লেষণ করে চ্যাডউইক নিশ্চিত হন যে গামা রশ্মিতে চার্জ নিরপেক্ষ কণা আছে। যেটার নাম আগেই ঠিক করা হয়েছে নিউট্রন বলে।

কণা আবিষ্কারকেরা এখানেই থামলেন না। রশ্মি বা কণা দিয়ে ভারী নিউক্লিয়াস বা কণাকে আঘাত করার নেশা তাঁদের পেয়ে বসে। তবে এর জন্য চাই আরও গতিশীল কণা। স্বাভাবিকভাবে তেজস্ক্রিয় রশ্মিতে যে গতিশক্তির কণা থাকে, এর চেয়ে বেশি শক্তির কণা তাঁরা চান। এ জন্য চাই কণাকে গতিশীল করার যন্ত্র। যে যন্ত্র বন্দুকের মতো কণাকে ছুড়েই শুধু দেবে না, প্রতিমুহূর্তে বাড়িয়ে দেবে কণার গতি।

১৯২৫ সালে দুই মার্কিন বিজ্ঞানী জি ব্রাইট ও এমটুভে তাঁদের সহযোগীদের নিয়ে একটি ট্রান্সফরমার তৈরি করলেন। এই ট্রান্সফরমারের সাহায্যে কণাকে ত্বরিত করার উপায় তাঁরা বের করেন। কিন্তু খুব বেশি সফলতা পাননি। এরপর একদল জার্মান বিজ্ঞানী প্রোটন–ত্বরক যন্ত্র তৈরি করেন। ত্বরিত প্রোটন দিয়ে তাঁরা পরমাণুর নিউক্লিয়াসকেও ভাঙতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন এ ব্যাস্ক ও এফ ল্যাংলে। তাঁদের ত্বরক যন্ত্র কতটুকু সফল হতো কে জানে, মাঝপথেই থেমে যায় তাঁদের কর্মকাণ্ড। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান একজন পদার্থবিদ।

কৃত্রিম ত্বরক যন্ত্র দিয়ে প্রথম সফলভাবে পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভাঙতে সক্ষম হলেন দুই ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ডগলাস ককরফট ও আর্নেস্ট ওয়ালটন। তারা ক্ষরণ যন্ত্রে উচ্চ বৈদ্যুতিক বিভব পার্থক্য তৈরি করে কণাকে উচ্চশক্তিতে ত্বরিত করতে সক্ষম হন। অতি উচ্চ বিভব পার্থক্য তৈরির জন্য তাঁরা একটি শক্তিশালী ট্রান্সফরমার বানালেন। সেটার বিভব ছিল ২ লাখ ভোল্ট! সত্যিকার অর্থে এটাই ছিল প্রথম শক্তিশালী ও সফল কণা–ত্বরক যন্ত্র।

এরপরই কণার রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব কণা–ত্বরক যন্ত্রের মহানায়ক আর্নেস্ট অরনাল্ডো লরেন্সের। নরওয়েজিন মা–বাবার ঘরে জন্ম এই মার্কিন বিজ্ঞানীর যতটা ছিল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে ঝোঁক, তার অনেক বেশি ঝোঁক ছিল যন্ত্রপাতির প্রতি। তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে যোগ দেন ১৯২৮ সালে। সেখানকার লাইব্রেরির একটা জার্নাল পড়তে গিয়ে তাঁর মাথায় সাইক্লোট্রন তৈরির চিন্তা আসে। এর আগে যেসব ত্বরক যন্ত্র তৈরি হয়েছিল, সেগুলো কণাকে ত্বরিত করত সোজা পথে। লরেন্স ধরলেন একটু ভিন্ন পথ। তাঁর যন্ত্রে ছিল একটা বৃত্তাকার পথ, সেই পথে কণাদের বারবার ঘুরিয়ে এদের গতি বাড়ানো হয় প্রতিটি বাঁকে। এ জন্য একটা বিশেষ উপায় বের করেছিলেন লরেন্স। যন্ত্রের ভেতর তৈরি করেছিলেন উচ্চশক্তির চৌম্বক বলক্ষেত্র। সেই চুম্বকক্ষেত্রের ভেতরে একটা আয়ন উৎস রাখা হয়; সেটা এমনভাবে, যেন উৎস থেকে নির্গত কণার কণারা চৌম্বকক্ষেত্রের বলরেখায় লম্বভাবে ছোটে। কিন্তু চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে সে আর সোজা পথে চলতে পারবে না। তার চলার পথ হবে বৃত্তাকার। এরপর পড়বে এসি কারেন্টের পাল্লায়—জ্বলন্ত উনুন থেকে ফুটন্ত কড়াই আরকি। বৃত্তাকার পথে এই কারেন্টের বিদ্যুৎক্ষেত্রের ভেতর চলতে গিয়ে মুহুর্মুহু পড়তে হবে বিদ্যুৎ কম্পাঙ্কের পাল্লায়। কম্পন পথের ব্যাস প্রতিবার অতিক্রম করার সময় বাড়বে কণার বেগ। প্রতি সেকেন্ডেই ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কম্পন, কণার বেগও তাই হু হু করে বাড়বে। লাভ করবে প্রবল গতিশক্তি। সেই পরাক্রমশালী কণা দিয়ে পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে আঘাত করলে কী ঘটবে ভাবা যায়! ভেঙে চুরমার হবে নিউক্লিয়াস, মুক্ত হবে বিপুল পরিমাণ শক্তি। এটাই ছিল লরেন্সের সাইক্লোট্রনের মূলনীতি। আজকের এলএইচসির মতো সাইক্লোট্রনেও এই মূলনীতি মেনে চলা হয়।

লরেন্স প্রথম যে সাইক্লোট্রন তৈরি করেন, সেটার ব্যাস ছিল কয়েক ইঞ্চি মাত্র। এরপর একের পর এক সাইক্লোট্রন তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন বিজ্ঞানীরা। ১৯৩৯ সাল নাগাদ সাইক্লোট্রনের ব্যাস গিয়ে দাঁড়ায় ১৫৫ ইঞ্চিতে। এসব সাইক্লোট্রনের সাহায্যে ভারী পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙে তৈরি হলো নানা ধরনের আইসোটোপ। আর এ জন্যই ১৯৩৯ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল আসে লরেন্সের ঘরে।

এরপর বাজে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। যুক্তরাষ্ট্র আর জার্মানির বিজ্ঞানীরা তখন নিউক্লিয়ার বোমা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আর সে কাজে বড় সহায়ক হয়ে ওঠে কণা–ত্বরক যন্ত্র। মার্কিন নিউক্লিয়ার বোমা তৈরির অগ্রগামী নায়ক রবার্ট ওপেনহাইমার। সে-ও বন্ধু লরেন্সের অনুরোধ-সুপারিশে।

যুদ্ধের পর কণাপদার্থবিজ্ঞান প্রাণ ফিরে পায়। আর গবেষণাও চলে যায় বিগ সায়েন্সের দখলে। একের পর এক কণার ভবিষ্যদ্বাণী করছেন বিজ্ঞানীরা; কিন্তু সেগুলোর হদিস পাওয়ার জন্য চাই কণাদের মধ্যে সংঘর্ষ। এখন আর নিউক্লিয়াসকে কণা দিয়ে আঘাত করলে চলবে না। কিন্তু অতি হালকা এসব কণা একে অন্যের সঙ্গে সংঘর্ষ করবে কেন? তা ছাড়া সমচার্জের কণারা পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। তাহলে?

সংঘর্ষ ঘটবে, যদি সাইক্লোট্রনে কণাদের গতি কয়েক হাজর গুণ বাড়ানো যায়। সে গতিতে কণা ছুড়ে দেওয়া লরেন্সের সাইক্লোট্রনের পক্ষে সম্ভব নয়। সম্ভব নয়, সে সময় প্রচলিত কোনো ত্বরক যন্ত্রের পক্ষেই। সত্তর দশকের শেষ দিকে আবদুস সালাম, স্টিভেন ওয়েনবার্গ আর শেলডন গ্ল্যাশোরা দুর্বল নিউক্লীয় বল আর বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় বলকে তাত্ত্বিকভাবে একত্র করতে সক্ষম হন। দুই বলের মিলনে জন্ম হয় তড়িৎ–দুর্বল বলের। আর এই বলের বাহক কণা W-, W+ এবং Z0 কণা। ইউরোপিয়ান কণা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সার্নের বিজ্ঞানীরা ১৯৮৪ সালের মধ্যে আবিষ্কার করে ফেললেন এই কণাগুলো। আর এই কাজের কাজী সার্নের শক্তিশালী কণা–ত্বরক যন্ত্রগুলো। তখন সার্নের বিজ্ঞানীদের চোখ উঠে যায় আরও ওপরে। বস্তুর ভরের জন্য দায়ী যে কণা, সেই হিগস–বোসন বা ঈশ্বরকণার ইঙ্গিত ছিল আগেই। কিন্তু সেই কণার হদিস পেতে যে পরিমাণ শক্তির দরকার, কণাকে সংঘর্ষ ঘটাতে যতটা ত্বরণের দরকার, সেই শক্তি বা ত্বরণ দান করার ক্ষমতা তখনকার কণা–ত্বরক যন্ত্রগুলোর ছিল না। দরকার এর চেয়ে লাখোকোটি গুণ শক্তিশালী সাইক্লোট্রন। আর সে জন্য সার্নের বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, এলএইচসির অর্থাৎ লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার নামের এক যন্ত্রদানবের কথা। নামের মধ্যেই রয়েছে বিশালত্বের আভাস। কয়েক ইঞ্চি ব্যাস নিয়ে যে সাইক্লোট্রনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, এলএইচসিতে গিয়ে সেটা দাঁড়ায় ২৭ কিলোমিটার পরিধিতে। কিন্তু এত বিশাল দক্ষযজ্ঞের আয়োজনটা সহজ ছিল না। তা ছাড়া আর্থিকভাবে মহাপরাক্রমশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর (যুক্তরাষ্ট্র) চোখরাঙানিতে শুরুর আগেই হোঁচট খায় এলএইচসির পরিকল্পনা।

জেড জিরো বোসন আবিষ্কারের পর নড়েচড়ে বসেন মার্কিন কণাবিজ্ঞানীরা। কণা আবিষ্কারের সাফল্য একের পর এক ঘরে তুলছে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রের ভাঁড়ার পরিণত হতে চলেছে শূন্য কলসে। এ অবস্থান থেকে উত্তরণের উপায় এলএইচসি তৈরির আগেই এর চেয়ে বড় সাইক্লোট্রন তৈরি করা। এরপর তড়িঘড়ি করে দাঁড় করানো হয় বিশাল এক প্রজেক্ট। নাম এসএসসি । অর্থাৎ সুপারকন্ডাক্টিং সুপার কলাইডার। পরিধি ৮৭ কিলোমিটার, এলএইচসির মতো এটাও বসানোর পরিকল্পনা ছিল মাটির নিচে সুড়ঙ্গ করে। রাশি রাশি টাকা ঢেলে শুরুও হয় কাজ। কিন্তু নোংরা রাজনীতি আর ষড়যন্ত্রের বলি হয়ে অঙ্কুরেই পণ্ড হয় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কণা–ত্বরক যন্ত্রের জীবন।

এসএসসির ডামাডোলে থমকে গিয়েছিল এলএইচসির শুরুর কাজ। কিন্তু ওটার বাতিলে আবার আশা দেখলেন সার্নের বিজ্ঞানীরা। জোর কদমে শুরু হলো এলএইচসি প্রকল্পের কাজ। প্রায় দুই দশকের নির্মাণকাজ শেষে ২০০৮ সালে চালু হয় এলএইচসি। এরপরই হিগস–বোসন আবিষ্কারের তোড়জোড়।

এলএইচসির সাইক্লোট্রনে প্রবল গতি নিয়ে প্রোটন কণার স্রোত ছুটে যায়, ধাক্কা মারে একে অপরকে। তা থেকে তৈরি হয় বহু রকমের কণা। কিছু ভারী কণাও তৈরি হয়। তবে তা অস্থায়ী। দ্রুতই সেই কণা কয়েকটা হালকা কণার জন্ম দিয়ে নিজে বিলুপ্ত হয়ে যায়। হিগস কণার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটার কথা। সাইক্লোট্রনে জন্ম নেওয়া নানা ধরনের কণাকে পর্যবেক্ষণ করে, তাদের উত্স যে অন্য কণা নয়, হিগস কণা—এটা প্রতিষ্ঠা করাই ছিল পদার্থবিদদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

২০১২ সালের ৪ জুলাই জেনেভায় এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে এলএইচসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, হিগস–বোসনের হদিস পাওয়া গেছে। শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বলা যাচ্ছে না, নতুন আবিষ্কৃত কণাটিই হিগস–বোসন কণা—এ কথাও বলা হয় ওই সম্মেলনে। তবে ২০১৩ সালে সন্দেহের কফিনে পেরেক ঠুকে বিজ্ঞানীর ঘোষণা করেন, নতুন আবিষ্কৃত কণাটিই হিগস–বোসন। ঈশ্বরকণা আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানজগতে খুলে যায় এক নতুন দিগন্ত। মেলে ‘বস্তুর ভরের উত্স কী’ প্রশ্নের উত্তর। সেই সঙ্গে মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য উন্মোচনের জন্য যে মহামিলনের পথ খুঁজে চলেছেন বিজ্ঞানীরা, সেদিকেই বিজ্ঞানীদের একধাপ এগিয়ে দেয় কণা ভাঙনের এই যন্ত্র। তাই ভাঙনের বাঁশিতেই আজ আমরা শুনছি মিলনের গান।

লেখক : সাংবাদিক

সূত্র: সার্ন ও ফিজিকস ওয়ার্ল্ড

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন