বিজ্ঞাপন

সাধারণ আপেক্ষিকতা ও ব্ল্যাকহোল

নিউটন মহাকর্ষকে যেভাবে দেখেছেন আইনস্টাইন ঠিক সেভাবে দেখেননি। মহাকর্ষক্ষেত্রকে আইনস্টাইন তুলনা করেছেন ত্বরণ ক্ষেত্রের সঙ্গে। এ জন্য তাঁকে ক্ষেত্র সমীকরণ সমাধান করতে হয়। সেগুলোর জটিলতায় না গিয়ে সহজভাবে বলা যায়, ভারী বস্তু আশপাশের স্থানকালকে বাঁকিয়ে দেয়। এই বাঁকানো স্থানকাল আমাদের বোধে ধরা দেয় মহাকর্ষ হিসেবে। বস্তু যত ভারী, বাঁকানোর পরিমাণ তত বেশি। ধরুন, রেললাইনের ওপর দিয়ে একটা রেলগাড়ি চলছে। লাইনটা যদি সোজা হয়, গাড়িটাও সোজা যাবে। কিন্তু লাইনটা যদি বাঁকা হয় বা কোনো দিকে বাঁক নেয়, তবে গাড়িটা কিন্তু আর সোজা চলতে পারবে না। বাঁকাই চলতে হবে। মহাকর্ষের কাজটাও তেমন। আশপাশের স্থানটাই যখন বাঁকিয়ে দেয়, কোনো কিছু ওই জায়গা থেকে যেতে হলে বেঁকে যেতে হবে। বস্তুর খুব কাছের স্থানকাল খুব বেশি বেঁকে যায়। যে বস্তু ওই বাঁকানো পথে চলছে, তার ভরবেগের সঙ্গেও আছে এর সম্পর্ক। ব্যাপারটা তুলনা করা যায় একটা টানটান কাপড়ের পর্দার সঙ্গে। পর্দার মাঝে যদি একটা ভারী লোহার বল রাখা হয়, পর্দাটা একটা গর্তের মতো করে পর্দাটাকে নিয়ে দেবে যায়। এই পর্দার বেঁকে যাওয়াকে বলা যেতে পারে দ্বিমাত্রিক স্থানকালের বক্রতা। এই পর্দার ওপর দিয়ে কোনো কিছু গড়িয়ে চলতে দেওয়া হলে তা বাধ্য হয়ে ওই বক্রতায় পড়ে যাবে।

মহাকর্ষের ক্ষেত্রে বক্রতার এই খেলা চলে ত্রিমাত্রিক স্থানে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সময় বা কাল। একসঙ্গে আমরা বলি চতুর্মাত্রিক স্থানকাল। আইনস্টাইন এভাবে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করেন, তাতে নিউটনের তত্ত্বে যে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল তার বেশ কয়েকটা দূর হয়ে যায়। তবে এই তত্ত্বের চমত্কারিত্ব হলো, নিউটনের মহাকর্ষ শুধু ভর আছে এমন বস্তুর ওপর প্রযুক্ত হলেও আইনস্টাইনের মহাকর্ষ প্রযুক্ত হয় ভরহীন কণাদের ওপরও। কারণ, রাস্তাই যেখানে বাঁকা, আলোকেও চলতে হবে সে পথেই। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া এই অভিনব দৃশ্য (আলোর বাঁকা হওয়া) পর্যবেক্ষণ হয় ১৯১৯ সালে, স্যার এডিংটনের নেতৃত্বে।

আইনস্টাইনের যে সমীকরণগুলো, সেগুলো সমাধান করতে গিয়ে ১৯১৬ সালেই শোয়ার্জশিল্ড অসামান্য এক সিদ্ধান্তে পৌঁছান। ভারী বস্তুর ঘনত্বের এমন একটা সীমা আছে, যার বেশি হলে বস্তুর পাশের পথ এতটাই বাঁকাবে যে ওই বক্রতা থেকে কোনো কিছুই বেরিয়ে আসতে পারবে না। বলা বাহুল্য, আইনস্টাইনের তত্ত্বে কোনো কিছু মানে সব কণাই বোঝায়। সে হিসাবে বেরিয়ে আসতে পারবে না কোনো আলোও।

ওই সীমার মধ্যে তৈরি হবে এক বিশেষ অবস্থা, যাকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি। সিঙ্গুলারিটি এক অভিনব ব্যবস্থা। কারণ, এর মধ্যে পদার্থবিজ্ঞানের আমাদের জানা সূত্রগুলো ভেঙে পড়ে। মহাকর্ষ বাদে অন্য যে চারটি বল আছে, সেগুলো কীভাবে থাকে তাও জানি না আমরা।

নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব থেকে যে কৃষ্ণগহ্বর ধরনের কিছু একটা পেয়েছিলাম তার সঙ্গে কিন্তু এর কোনো মিল নেই। ওই কৃষ্ণগহ্বর দিয়ে কোনো বস্তু বেরিয়ে আসতে না পারলেও ভেতর থেকে কিন্তু আলো আসতে পারত। তাই ওটা বিশেষ সমস্যা তৈরি করে না পদার্থবিজ্ঞানে। কিন্তু আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা থেকে যে কৃষ্ণগহ্বরের ধারণা এল তা এতই অদ্ভুত, সবাই ভাবলেন এ এক তাত্ত্বিক ব্যাপার। প্রায় অর্ধশত বছর তেমন কোনো আলোচনাই পেল না। অবশ্য কৃষ্ণগহ্বর থেকে যে সম্ভাবনা দাঁড়ায়, তা অতিরিক্ত অবোধ্য, কল্পনার বাইরে। একটা কৃষ্ণগহ্বরে কোনো বস্তু পড়লে ব্ল্যাকহোলের মোট ভর একটু বাড়ে। সে হিসাবে তার বক্রতার যে সীমা, শোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধ, তাও একটুখানি বেড়ে যায়। যেহেতু কেউ কখনো বের হতে পারবে না, তাহলে এ কি একটু একটু করে বড় হতে হতে মহাবিশ্বকেই গিলতে শুরু করবে?

ব্যাপারটা এখানেই শেষ না। মহাকর্ষের যে সিঙ্গুলারিটি, তার সঙ্গে মিল আছে মহাবিস্ফোরণের বা বিগ ব্যাংয়ের মুহূর্তের সিঙ্গুলারিটির। প্ল্যাংক সময়ের আগে অর্থাৎ বিগ ব্যাংয়ের মুহূর্তে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো কাজ করে না। তখন চারটা মৌলিক বল কীভাবে ছিল তা আমরা জানি না। তারপর যখন কৃষ্ণগহ্বরের ধারণা পাওয়া গেল তখন প্রশ্ন উঠল, কৃষ্ণগহ্বর কি নতুন মহাবিশ্বের সূচনা?

কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাকহোল নিয়ে খুব বেশি কিছু জানা না থাকায় এরপর এ নিয়ে শুরু হলো পপুলার কালচার। তাতে চমত্কার আগ্রহের জায়গা তৈরি হলো সবার মধ্যে। এ ক্ষেত্রে যা হয়, গল্পের ছলে নানা কথা বাজারে ছড়াল। যেমন ব্ল্যাকহোল একটা ওয়ার্মহোল। এর মধ্য দিয়ে স্থানকালকে ছিদ্র করে মুহূর্তে পৌঁছে যাওয়া যাবে মহাবিশ্বের অন্য প্রান্তে। আপনি খুঁজলেই দেখবেন গন্ডায় গন্ডায় বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি আছে ব্ল্যাকহোলের মধ্যে চলে যাওয়া নিয়ে। তবে ব্যাপারটা কি শুধু কল্পবিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ? না। গবেষণা আরও এগোল।

রঙ্গমঞ্চে স্টিফেন হকিং

এখানেই শেষ হলে বোধ হয় ব্যাপারটা কল্পবিজ্ঞানের কাছে ছেড়ে দিতে হতো। কিন্তু তখন রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত স্টিফেন হকিং। হকিং বললেন, না, কৃষ্ণগহ্বর থেকে কিছুই বেরিয়ে আসতে পারে না—কথাটা ঠিক নয়। কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেকে দেখানো যায়, ওখান থেকেও বেরিয়ে আসতে পারে বিকিরণ, যার নাম দেওয়া হলো হকিং রেডিয়েশন। তার মানে ব্ল্যাকহোল আসলে একদম ব্ল্যাক নয়? ব্ল্যাক বডির মতো এরও আছে রেডিয়েশন? সবাই নড়েচড়ে বসলেন। এ তত্ত্ব ঠিক হলে একটা ব্ল্যাকহোল যে শুধু আস্তে আস্তে বিকিরণ করে উবে যেতে পারে তা-ই নয়, সমস্যা বাধায় কোয়ান্টাম মেকানিকস আর মহাকর্ষ তত্ত্বের মধ্যেও। এমনিতে নানা পরীক্ষায় আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সব ভবিষ্যদ্বাণী ঠিকঠাক মিলে গেছে। সর্বশেষ পাওয়া গেছে মহাকর্ষ তরঙ্গও। কিন্তু হকিং রেডিয়েশন হলে তো আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সঙ্গে বিরোধ বাধে খোদ কোয়ান্টাম মেকানিকসেরই। কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্বকেও ফেলে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, অন্য সব ক্ষেত্রে এ তত্ত্বও পুরোপুরি সফল। তাহলে এই বিরোধের সমাধান কী? বিজ্ঞানীরা এখনো জানেন না। কারণ, মহাকর্ষ বলের খুঁটিনাটি এখনো জানেন না তাঁরা। মহাকর্ষ বল অন্য চার বল থেকে আলাদা মনে হয়, এর মান খুবই কম। শুধু এই বলই বাস্তবিক অর্থে বিশাল জায়গাজুড়ে কাজ করে। এমনকি অভিনব ব্ল্যাকহোলের উত্পত্তি হয়।

default-image

ব্ল্যাকহোল ও ডার্ক ম্যাটার

মহাবিশ্বের মোট বস্তুর ২৭ ভাগ ডার্ক ম্যাটার। কিন্তু এটি কী—তা আমরা জানি না। তবে তা যে বস্তুর মতো মহাকর্ষ বলের প্রভাব দেখায় তা আমরা দেখি। এদিকে পপুলার কালচারে ব্ল্যাকহোল যেমন জনপ্রিয়, ডার্ক ম্যাটারও সমানভাবে আছে। তাই অনেকেই মাঝে মাঝে গুলিয়ে ফেলেন ব্ল্যাকহোল আর ডার্ক ম্যাটারকে। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের কাছে এমন কোনো প্রমাণ নেই, যার ওপর ভিত্তি করে বলা যায় ব্ল্যাকহোল আর ডার্ক ম্যাটার একই। তবে সাম্প্রতিক হাইপোথিসিস বলছে, ডার্ক ম্যাটার হয়তো প্রাইমোডিয়াল ব্ল্যাকহোল। তবে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো প্রমাণ বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। তবে এটা প্রমাণ হলে ব্ল্যাকহোলের সংখ্যা নিয়ে বিশেষভাবে ভাবতে হবে। কারণ, মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির মাত্র শতকরা ৫ ভাগ আমাদের জানা বস্তুতে তৈরি, বাকি ২৭ ভাগ ডার্ক ম্যাটার, বাকিটা (৬৮ ভাগ) ডার্ক এনার্জি। যদি ডার্ক ম্যাটার আসলে কৃষ্ণগহ্বর হয়, তবে ৩২ ভাগ পৃথিবী হবে আমাদের জানা বস্তুর মহাবিশ্ব।

ব্ল্যাকহোলের যত প্রকার

কৃষ্ণগহ্বর কীভাবে ভাগ করা যেতে পারে? এদের স্বাদ-গন্ধ তো আমরা জানি না! যেহেতু তথ্য বাইরে আসে না, তাই কোন পদার্থ কতটুকু ছিল তৈরির আগে তারও নিশ্চিত হদিস দেওয়া কঠিন। আবার মাঝে মাঝে এ যেহেতু আশপাশের নক্ষত্র বা বস্তুকে খায়, তাই কখন কী খেল তাও বলা সম্ভব নয়। অর্থাৎ কী পদার্থে কৃষ্ণগহ্বরের উত্পত্তি, তা দিয়ে ভাগ করা যায় না। তবে কৃষ্ণগহ্বরটি কীভাবে উত্পন্ন হলো তার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীদের ধারণা, তিন ধরনের ব্ল্যাকহোল আছে। সেগুলো প্রাইমোডিয়াল (Primordial), নাক্ষত্রিক (Stellar) ও গ্যালাক্সি কেন্দ্রের সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল। এর বাইরে নাক্ষত্রিক ও সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের মাঝামাঝি ভরের কিছু ব্ল্যাকহোল (Intermediate-mass black holes) নিয়েও কিছু তত্ত্ব আচে।

default-image

প্রাইমোডিয়াল ব্ল্যাকহোল

মহাকর্ষীয় সংকোচনে সিঙ্গুলারিটি (ব্ল্যাকহোল) হতে হলে ঘনত্ব অনেক বেশি হতে হয়। মহাবিস্ফোরণের সময় মহাবিশ্বের ঘনত্ব ছিল অনেক বেশি। তাই এ সময় কৃষ্ণগহ্বর তৈরি সম্ভব। অন্যদিকে ১৯৭১ সালে হকিং দেখান ব্ল্যাকহোলের ভর সূর্যের থেকে অনেক কমও হতে পারে। ফলে মহাবিস্ফোরণের সময় ১০৮ কেজি থেকে কয়েক হাজার সৌরভরের ব্ল্যাকহোল তৈরি হওয়া সম্ভব। তবে হিসাবমতো ১ হাজার ১১ কেজির থেকে কম ভরের সব ব্ল্যাকহোল ইতিমধ্যে হকিং রেডিয়েশনের মাধ্যমে বিলীন হয়ে গেছে।

কদিন আগে লাইগোতে যেসব ব্ল্যাকহোল শনাক্ত হলো, সেগুলোর ভর নাক্ষত্রিক ব্ল্যাকহোল হওয়ার জন্য অনেক বেশি। তাই ধারণা করা হচ্ছে, এসব ব্ল্যাকহোল মহাবিস্ফোরণের ঠিক পরে তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ এগুলোও প্রাইমোডিয়াল। ২০১৬ সালের মার্চে প্রথম ঘোষণা আসার এক মাস পর তিনটি আলাদা গবেষকের দল দাবি করে যে এই ব্ল্যাকহোলগুলো মহাবিশ্বের শুরুতে তৈরি হয়েছে। আগেই বলা হয়েছে, ডার্ক ম্যাটার সমস্যার একটা সম্ভাব্য সমাধান এই প্রাইমোডিয়াল ব্ল্যাকহোল। অন্যদিকে গ্যালাক্সির ভেতরে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের উত্পত্তির কারণ হিসেবেও অনেক গবেষক এই প্রকৃতির ব্ল্যাকহোলকে দায়ী করেন।

নাক্ষত্রিক ব্ল্যাকহোল

ব্ল্যাকহোলের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত প্রকার হচ্ছে তারা থেকে বিবর্তিত ব্ল্যাকহোলরা। যেসব মহাকর্ষীয় বস্তুতে হাইড্রোজেন ফিউশনে হিলিয়াম তৈরি হয়, তাদের তারা নক্ষত্র বলে। অর্থাৎ তারার ক্ষেত্রে হাইড্রোজেন হচ্ছে জ্বালানি আর হিলিয়াম হচ্ছে উত্পাদ। তারার প্রচণ্ড মহাকর্ষ বলের জন্য ধাক্কাধাক্কিতে তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। একসময় সেই তাপমাত্রা পৌঁছে যায় নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায়। তখন হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস পরস্পরের সাথে যুক্ত হতে থাকে। এতে তারার অভ্যন্তর থেকে নির্গত হয় বিপুল শক্তি। এতে আবার গ্যাসের বহির্মুখী উচ্চচাপ তৈরি হয়। আবার তারার নিজের ভরের জন্য মহাকর্ষ বল কেন্দ্রের দিকে টানে। এই দুই বলের সাম্যাবস্থা বজায় থাকায় তারা মোটামুটি স্থির আকৃতি পায় এবং স্থির হারে শক্তি নির্গত করতে থাকে। এমন অবস্থায় তারাকে বলা হয় মেইন সিকুয়েন্স স্টার (Main sequence star)।

সাধারণ অবস্থায় তারার ভেতরে হিলিয়ামের আর ফিউশন হয় না। ফলে একসময় তারা তার সবটুকু জ্বালানি শেষ করে ফেলে। এ জন্য আর বহির্মুখী গ্যাসের চাপ মহাকর্ষকে বাধা দিতে পারে না। ফলে মহাকর্ষ তারাকে সংকুচিত করতে থাকে। ০.৫ সৌরভরের নিচের তারাগুলো ধীরে ধীরে সাদা বামন তারায় পরিণত হয়। ০.৫ থেকে ১০ সৌরভরের তারাগুলোতে সংকোচনে তাপমাত্রা বেশ বেড়ে যায় ও হিলিয়ামের ফিউশন শুরু হয়ে যায়। এ সময় তারাদের বলে লাল দানব। আমাদের সূর্যও একটি লাল দানবে পরিণত হবে। লাল দানবে ফিউশন লোহা পর্যন্ত চলতে পারে। এরপর তা প্লানেটারি নেবুলা (planetary nebulae) হয়ে সাদা বামনে পরিণত হয়। ভারী তারাদের ক্ষেত্রে এদের বিকিরণের চাপে বহিঃস্তরের বেশির ভাগই মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যায়। আর ভেতরে ফিউশন চলতে থাকে। একসময় ফিউশনে লোহা তৈরি হয়। এ সময় আর ফিউশন চলতে পারে না। তখন সাধারণত সুপারনোভা বিস্ফোরণ হয়ে তারার বেশির ভাগ মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে।

সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর তারার যেটুকু অবশিষ্ট থাকে, তার ভর যদি চন্দ্রশেখর সীমার (১.৪ সৌরভর) থেকে বেশি হয়, তখন তারাটির মধ্যবর্তী ইলেকট্রনের ডিজেনারেসি চাপ (degeneracy pressure) মহাকর্ষের ফলে সংকোচনকে বাধা দিতে পারে না। ফলে ইলেকট্রন ও প্রোটন যুক্ত হয়ে নিউট্রনে পরিণত হয়। এ সময় তারায় শুধু নিউট্রন অবশিষ্ট থাকে বলে এই রকম তারাকে বলে নিউট্রন স্টার। এখন নিউট্রন তারার ভর যদি টিওভি (TOV) বা টোলম্যান-ওপেনহাইমার-ভলকভ সীমা (LOV বা লন্দাউ-ওপেনহাইমার-ভলকভ সীমা নামেও পরিচিত) অতিক্রম করে যায়, তখন নিউট্রন তারা আরও সংকোচনে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়। টিওভি সীমার মান ২ থেকে ৩ সৌরভরের মধ্যে।

মেইন সিকুয়েন্স স্টার অবস্থায় কোনো তারার ভর ১৫-২০ সৌরভর হলে তা সুপারনোভা বিস্ফোরণের পরও টিওভি সীমা অতিক্রম করতে পারে। অর্থাৎ ১৫-২০ সৌরভরের থেকে বেশি ভরের কোনো তারার শেষ পরিণতি হচ্ছে ব্ল্যাকহোল। এভাবে বিবর্তিত ব্ল্যাকহোলের ভর সাধারণত ৫-২০ সৌরভরের মতো হয়।

সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল

এগুলো সত্যিকার অর্থেই ম্যাসিভ বা বিপুল ভরের। পৃথিবীর ভরের প্রায় ৩ লাখ ৩৩ হাজার গুণ বেশি ভর সূর্যের। সূর্যের ভরকে বলে সৌরভর। সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলগুলোর ভর কয়েক লাখ থেকে কয়েক শতকোটি সৌরভর পর্যন্ত হতে পারে। এদের মূলত পাওয়া যায় গ্যালাক্সির ভেতরে। প্রতিটি গ্যালাক্সির মধ্যে (কেন্দ্রেও বলা যেতে পারে) একটি করে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল আছে বলে ধারণা করা হয়। গ্যালাক্সির কেন্দ্রের দিকের তারাদের গতি পর্যবেক্ষণ করে এসব কৃষ্ণগহ্বরের হদিস পাওয়া যায়। তবে একটা মজার ব্যাপার আছে, কৃষ্ণগহ্বরের ঘনত্ব কত? এমনিতে মনে হতে পারে, নিশ্চয় খুব বেশি। কিন্তু ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রে ঘনত্ব ভরের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। তাই সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলদের ঘনত্ব এমনকি পানির থেকেও কম হতে পারে!

আমাদের মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে যে ব্ল্যাকহোল আছে তার নাম স্যাজিটেরিয়াস এ স্টার (Saggitarious A*), যার ভর মোটামুটি ৪১ লাখ সৌরভর। এই প্রজাতির ব্ল্যাকহোলগুলো ঠিক কীভাবে তৈরি হয় তার এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তবে গ্যালাক্সি গঠনের শুরুতে কোনো ব্ল্যাকহোল থাকলে সেটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের তারা থেকে ভর নিয়ে অথবা অন্য ব্ল্যাকহোলের সঙ্গে মিলে ভর বৃদ্ধি করতে পারে। অনেক বিজ্ঞানীর মতে, এসব ব্ল্যাকহোল বিগ ব্যাংয়ের সময়ে তৈরি হয়। কেননা, সে সময় মহাবিশ্বের আয়তন অনেক কম ছিল বলে এত বিশাল ভরের ব্ল্যাকহোল তৈরি হওয়া সম্ভব। অথবা অন্তত মোটামুটি ভরের একটা ব্ল্যাকহোল তৈরি করতে পারে, যেটা পরে আরও ভর নিয়ে এ রকম সুবিশাল আকার নিতে পারে।

মাঝামাঝি ভরের ব্ল্যাকহোল

এখন পর্যন্ত খুব বেশি কৃষ্ণগহ্বর বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করতে পারেননি। মাত্র ১২০টির মতো। এর মধ্যে মাঝামাঝি ভরের (১০০ থেকে ১০ হাজার সৌরভরের) ব্ল্যাকহোল নেই।

কেন ওপরের তিন প্রকারের ব্ল্যাকহোলের বাইরে সুপারম্যাসিভ ও নাক্ষত্রিক ব্ল্যাকহোলের মাঝামাঝি ভরের কিছু নেই বা পাওয়া যাচ্ছে না, তার কিছু ব্যাখ্যা হাজির করেছেন ইসরায়েলের ভাইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের তাল আলেক্সান্ডার ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেন বার-ওর। তাঁরা গত ১৯ জুন নেচার অ্যাস্ট্রোনমি জার্নাল-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখিয়েছেন, পাওয়া যায়নি মানে এই নয় যে এমন ভরের ব্ল্যাকহোল নেই। হয়তো আছে, তবে তাদের সংখ্যা অনেক কম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যেহেতু ব্ল্যাকহোল অন্য তারাদের থেকে ভর নেয়, অন্য কথায় ভর খায়, তাই এদের ভর দিন দিন বাড়তে থাকে। তাঁদের হিসাবে পাওয়া যাচ্ছে একটা ব্ল্যাকহোল মোটামুটি ১০ হাজার বছরে এক সৌরভর করে খাদ্য খায়, বা ভর বাড়ায়। তাহলে প্রাইমোডিয়াল ব্ল্যাকহোল মাঝামাঝি ভরে উত্পন্ন হয়ে থাকলেও শতকোটি বছর ধরে তারা ‘খেয়ে খেয়ে’ সুপারম্যাসিভ হয়ে গেছে। তবু যদি মাঝামাঝি ভরের ব্ল্যাকহোল থেকে থাকে তবে তা পাওয়া যাবে মহাবিশ্বের খুব ঘন অঞ্চলে। এসব অঞ্চলে সমস্যা হলো অন্য তারাদের ভিড়ে এগুলো খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। তবে ভরসা হলো, দিন দিন প্রযুক্তি উত্কর্ষ লাভ করছে, শোনাচ্ছে আশার বাণী।

ব্ল্যাকহোলের খোঁজে

শুরু থেকেই বলা হচ্ছে কৃষ্ণগহ্বর কিছুই ফিরে আসতে দেয় না। আলোকেও খেয়ে ফেলে। এমন অবস্থায় একে খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবু এর খোঁজ পেতে বিজ্ঞানীরা কিছু বুদ্ধি বের করেছেন। প্রথম ব্ল্যাকহোল পাওয়া যায় ১৯৬৪ সালে। অ্যাক্রেশন ডিস্কের এক্স-রে বিকিরণ থেকে। এর নাম সিগনাস এক্স-১ (Signus X-1) ।

ব্ল্যাকহোল শনাক্তের উপায় আগে ছিল তিনটি। আশপাশের নক্ষত্রের গতি দেখে, অ্যাক্রেশন ডিস্কের বিকিরণ ও মহাকর্ষীয় লেন্সিং। এখন যুক্ত হয়েছে মহাকর্ষ তরঙ্গ।

নক্ষত্র গতি থেকে ব্ল্যাকহোল

কৃষ্ণগহ্বর আলো আটকে দিয়ে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করলেও মহাকর্ষ দিয়ে ঠিকই ধরা পড়ে। কৃষ্ণগহ্বরের মহাকর্ষক্ষেত্র স্বভাবতই বেশ শক্তিশালী। ফলে আওতার মধ্যে পেলে আশপাশের অন্য কোনো তারার পথ বাঁকিয়ে নিজেকে প্রদক্ষিণ করতে বাধ্য করে। সেই উজ্জ্বল তারার আলো শনাক্ত করে কক্ষপথ নির্ধারণ করা গেলেই কেন্দ্রীয় বস্তুর ভর নির্ণয় করা যায়। আমাদের গ্যালাক্সির ভেতরের স্যাজিটারিয়াস এ স্টারের সব মাত্রা এভাবেই নির্ণিত হয়েছে।

অ্যাক্রেশন ডিস্কের বিকিরণ

কোনো অধিক ভরের তারা প্রচণ্ড মহাকর্ষকে ব্যবহার করে তার পাশের কোনো তারা থেকে ক্রমাগত ভর শোষণ করতে থাকে। ফলে ওই তারা থেকে ভারী তারার চারপাশে অ্যাক্রেশন ডিস্ক (accretion disk) তৈরি হয়। প্রচণ্ড ঘর্ষণের ফলে অ্যাক্রেশন ডিস্কের তাপমাত্রা এতই বেড়ে যায় যে এটা থেকে ক্রমাগত কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ (black body radiation) নির্গত হয়, যার বেশির ভাগ এক্স-রে আকারে নির্গত হয়। এভাবে মোট ভরের প্রায় ৪০ শতাংশ শক্তিতে পরিণত হয় (যেখানে তারার মধ্যে ফিউশনে ভর থেকে শক্তিতে পরিণত হয় মাত্র ০.৭ শতাংশের মতো)। এ রকম জোড়কে বলে এক্স-রে যুগল (X-ray Binary)। এ রকম এক্স-রে বাইনারি থেকে আসা সিগন্যাল পরীক্ষা করে দেখা হয় কেন্দ্রীয় তারাটি কোন প্রকৃতির। সাধারণত কেন্দ্রীয় বস্তুটি নিউট্রন তারা অথবা ব্ল্যাকহোল হয়ে থাকে। আবার কোনো সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের পাশেও এ রকম অ্যাক্রেশন ডিস্ক তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্গত বিকিরণ অনেক বেশি হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, কোয়াসার ও অ্যাকটিভ গ্যালাকটিক নিউক্লি আসলে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের পাশে তৈরি হওয়া অ্যাক্রেশন ডিস্কের বিকিরণ। বর্তমানে পৃথিবীর বাইরে স্থাপিত (কেননা বায়ুমণ্ডল এক্স-রে আটকে দেয়) নাসা এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি মহাবিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এ রকম এক্স-রে উত্স পর্যবেক্ষণ করে এ রকম ব্ল্যাকহোল শনাক্ত করে।

মহাকর্ষ তরঙ্গ

আগের দুই পদ্ধতিতে ব্ল্যাকহোল শনাক্ত করতে আশপাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র দরকার। কিন্তু ব্ল্যাকহোল থাকলেই যে তার সঙ্গে কোনো নক্ষত্র থাকবে কিংবা তার একটা অ্যাক্রেশন ডিস্ক থাকবে, এমন কোনো কথা নেই। তাই এমন নিঃসঙ্গ ব্ল্যাকহোল ধরতে দরকার অন্য পদ্ধতি। এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় মহাকর্ষ তরঙ্গ। ২০১৫ সালে প্রথমবার লাইগো এ পদ্ধতিতে একটি মহাকর্ষ তরঙ্গের উপস্থিতি পায়। এরপর আরও দুটি মহাকর্ষ তরঙ্গের খোঁজ তারা জানিয়েছে। এসব মহাকর্ষ তরঙ্গ উত্পন্ন হয়েছিল দুটি ব্ল্যাকহোলের যুক্ত হওয়ার ফলে।

মহাকর্ষীয় লেন্সিং

এ আরেক মজার পদ্ধতি। মহাকর্ষের জন্য আলো স্থান-কাল বেঁকে যায়। তাই এ পথে আলো গেলে তার পথটাও যায় বেঁকে। তাই যদি কোনো ব্ল্যাকহোলের ঠিক পেছন দিয়ে কোনো উজ্জ্বল কিছু চলে যায়, তখন আলো এমনভাবে আমাদের চোখে ধরা পড়ে যেন আলো কোনো বিকৃত লেন্সের মধ্য থেকে আসছে। এটার নামই মহাকর্ষীয় বা গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং। ব্ল্যাকহোলের মহাকর্ষ ক্ষেত্র বেশ শক্তিশালী বলে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের মাধ্যমেও সরাসরি ব্ল্যাকহোল ধরা সম্ভব। তবে এ পদ্ধতিতে এখনো কোনো ব্ল্যাকহোল শনাক্ত করা যায়নি।

মহাকাশের দিকে আমাদের তাকাতে হয় আলোর খোঁজে। সেই আলোই ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে কোন তথ্যই দেয় না। তবু আমরা ব্ল্যাকহোলকে খুঁজে পাচ্ছি নানা উপায়ে। প্রতিনিয়ত যা দিচ্ছে মহাবিশ্ব সম্পর্কে নতুন সব তথ্য। ভবিষ্যতে বিশ্বতত্ত্বের সমাধান হয়তো দেবে এই ব্ল্যাকহোলই।

লেখকদ্বয়:

ইবরাহিম মুদ্দাসসের, পিইচডি গবেষক, পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব ওহাইওমিং, যুক্তরাষ্ট্র

ইশতিয়াক আকিব, শিক্ষার্থী, শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, কোরিয়া অ্যাডভান্সড ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (কাইস্ট)

সূত্র: ফান্ডামেন্টার অ্যাস্ট্রোনমি/ কার্তুনেন, ফান্ডামেন্টালস অব ফিজিক্স/ হ্যালিডে-ওয়াকার-রেজনিক, নেচার, নাসা

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন