বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দুই

১৯৭০-এর দশক। স্টিফেন হকিং ব্ল্যাকহোল নিয়ে আলোচনা করেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রজার পেনরোজের সঙ্গে। সেখানে হকিং একটা প্রস্তাব দেন। সেটা হলো, এনট্রপির সঙ্গে কৃষ্ণগহ্বরের সম্পর্ক। কৃষ্ণগহ্বর যা কিছু গ্রহণ করে, তার আর কোনো প্রভাব বোঝা যাবে কি না, এ নিয়ে একটা ধারণা তখন ছিল। কোনো ব্ল্যাকহোল কিছু গিলে ফেললে তার প্রভাব বোঝা যাবে না। এই তথ্য তাপগতিবিদ্যার সূত্রগুলোর পরিপন্থী।

তাপগতিবিদ্যার একটি সূত্র বলে, মহাবিশ্বের মোট শক্তির কখনোই পরিবর্তন হয় না। নতুন করে শক্তি যেমন জন্ম দেওয়া যায় না, তেমনি সামান্যতম শক্তিও ধ্বংস করা সম্ভব নয়। আলবার্ট আইনস্টাইন এই নীতি আরেকটু সম্প্রসারণ করে বলেন, মহাবিশ্বের মোট ভরশক্তিতে কখনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। চাইলে ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করা যাবে কিংবা শক্তিকে ভরে।

তাপগতিবিদ্যায় এনট্রপি নামে আরেকটা বিষয় আছে। যেটাকে বলে তাপীয় বিশৃঙ্খলা। তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র থেকেই এর আবির্ভাব। এনট্রপির নীতিটা হলো মহাবিশ্বের এনট্রপি প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। পৃথিবীতে, মহাবিশ্বে এমন কোনো ঘটনা বা সিস্টেম পাওয়া যাবে না, যেখানে এনট্রপি কমছে।

কিন্তু সত্তরের দশকের শুরুতেই ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রে নীতির সূত্রের লঙ্ঘন দেখলেন বিজ্ঞানীরা। অবশ্যই সেটা তাত্ত্বিকভাবে। কোনো বস্তু খেয়ে ফেললে ব্ল্যাকহোলের কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। তাহলে যে পরিমাণ ভরশক্তি ব্ল্যাকহোল গিলে ফেলেছে, সেটা কোথায় যাচ্ছে? মোটাদাগে মনে হয়, ব্ল্যাকহোল যে বস্তু, যে তথ্য খেয়ে ফেলছে, তা চিরতরে উধাও হয়ে যাচ্ছে! তা–ই যদি হয়, মহাবিশ্বের ভরশক্তি কমে যাওয়ার কথা। কমে যাওয়ার কথা এনট্রপিও। কিন্তু ব্ল্যাকহোলে তো এ নীতি খাটে না! কোনো ভরশক্তি খেয়ে ফেলার কোনো তথ্যই যখন ব্ল্যাকহোল থেকে পাওয়া যায় না, তার মানে এর এনট্রপিও সব সময় এক থাকে। তা–ই যদি হয়, ভরশক্তির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিয়ত মহাবিশ্ব থেকে একটু একটু করে এনট্রপি গিলে ফেলছে ব্ল্যাকহোল। ফলে একটু একটু করে কমছে মহাবিশ্বের এনট্রপি। এ তো তাপগতিবিদ্যার সূত্রগুলোর দফা রফা হয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার! এটা কি সম্ভব?

সেকালের বেশির ভাগ ব্ল্যাকহোল গবেষকই মনে করতেন, ব্ল্যাকহোলকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করার মতো তত্ত্ব বর্তমানে পদার্থবিদদের হাতে নেই। এর ব্যাখ্যা দিতে পারে কোয়ান্টাম মহাকর্ষের কোনো তত্ত্ব। সেই তত্ত্ব এখনো যেহেতু পাওয়া যায়নি, তাই চিরায়ত একটা তত্ত্ব দিয়ে ব্ল্যাকহোলের চরিত্র ব্যাখ্যা না করতে যাওয়াই ভালো। তাপগতিবিদ্যার সূত্রগুলো ক্ল্যাসিক্যাল ফিজিকস বা চিরায়ত বলবিদ্যার অংশ, তাই এই তত্ত্বের কোনো নীতি ব্ল্যাকহোল মানতে বাধ্য নয়। অর্থাৎ ভরশক্তির সংরক্ষণশীলতা ও এনট্রপি বৃদ্ধির যে নীতি তাপগতিবিদ্যায় প্রচলিত, সেই নীতি ব্ল্যাকহোলের জন্য প্রযোজ্য নয়। কিন্তু এটা মানতে নারাজ ছিলেন স্টিফেন হকিং। সমস্যাটা যখন জাঁকিয়ে বসেছে, তখন হকিং একটা ক্লু পেয়ে যান। এ জন্য রীতিমতো অঙ্ক কষে তিনি দেখান, ব্ল্যাকহোল ভরশক্তি খেয়ে একেবারে হজম করতে পারে না। তার প্রভাব দেখা দেয় কৃষ্ণগহ্বরের দেহেই। কীভাবে? সেটা বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে কৃষ্ণগহ্বরের দেহ বলতে কী বুঝি!

তিন

সাধারণত কৃষ্ণগহ্বর বলতে আমরা বুঝি, একটা ছোট্ট বিন্দুর ভেতর একটা ভারী নক্ষত্রের সবটুকু ভর এসে জড়ো হওয়া। এই বিন্দুকে বলে সিঙ্গুলারিটি বা পরম বিন্দু। পরম বিন্দুটাকে ঘিরে মূল কৃষ্ণগহ্বরের শক্তিশালী মহাকর্ষীয় প্রভাব ছড়িয়ে থাকে ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনাদিগন্ত পর্যন্ত। পরম বিন্দুটাকে ঘিরে একটা গোলক কল্পনা করা যেতে পারে, সেই গোলকের বাইরের পৃষ্ঠকেই আসলে ঘটনাদিগন্ত বলে। শুরুর দিকে ঘটনাদিগন্তের ব্যাপারটা এমনই ছিল। তখন মনে করা হতো ব্ল্যাকহোল স্থির। এটা যে পৃথিবী বা অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের মতো নিজ অক্ষের ওপর ঘুরতে পারে, সেটা সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের বিজ্ঞানী রয় কার দেখান, ব্ল্যাকহোল নিজ অক্ষের ওপর ঘোরে। প্রবলবেগে ঘূর্ণনের ফলে কোনো বস্তু বা গ্যাসীয় পদার্থ ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি এলে সরাসরি ব্ল্যাকহোলে পতিত হতে পারে না। ব্ল্যাকহোলকে ঘিরে এগুলো ঘুরতে থাকে। সিঙ্গুলারিটিকে এক পাশে রেখে বিপরীত দিকে একটা জ্বালামুখের মতো তৈরি হয়। এই জ্বালামুখের সবচেয়ে বাইরের প্রান্ত বা কিনারাকে বলে ঘটনাদিগন্ত।

যে ব্ল্যাকহোলের ভর যত বেশি, সেই ব্ল্যাকহোল তত বড়। ব্ল্যাকহোলের এই বড়ত্ব নির্ধারিত হয় ইভেন্ট হরাইজনের ওপর। হকিং বলেছিলেন, ব্ল্যাকহোল যখন বস্তুকে গিলে ফেলে, তখন এর ঘটনাদিগন্তের আকার বেড়ে যায়। অর্থাৎ ব্ল্যাকহোলের ওই জ্বালামুখের ক্ষেত্রফলও বেড়ে যায়। অর্থাৎ বাইরে থেকে যখন কোনো বস্তু বা শক্তি ব্ল্যাকহোলের ভেতর প্রবেশ করে, তার প্রভাব দেখা যায় ব্ল্যাকহোলের ঘটনাদিগন্তের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধির মাধ্যমে। এভাবে ক্ষেত্রফল বৃদ্ধির ফলে মহাবিশ্বের এনট্রপিও কিছুটা বেড়ে যায়। সুতরাং কোনো বস্তু বা শক্তি ব্ল্যাকহোলে ঢুকে পড়ার কারণে মহাবিশ্বের এনট্রপি যেটুকু কমেছিল, সেই ঘাটতিটুকু পূরণ হয় ঘটনাদিগন্তের আকার বৃদ্ধির মাধ্যমে।

চার

এমআইটির গবেষক দলটি আসলে পর্যবেক্ষণ করেছিল মহাবিশ্বের দূরতম অঞ্চল থেকে আসা মহাকর্ষ তরঙ্গ। নক্ষত্র বা ব্ল্যাকহোলের মতো ভারী বস্তুর নড়াচড়ার ফলে স্থানকালে ঢেউ ওঠে। এটাকেই মহাকর্ষ তরঙ্গ বলে। মহাকর্ষ তরঙ্গ প্রথম শনাক্ত হয় ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর। দুটি ভারী কৃষ্ণগহ্বর মিলে একটি ভারী কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হয়েছিল ১৩০ কোটি বছর আগে। সে দুটো এতই দূরের, সেখান থেকে আলোর বেগে ছুটেও মহাকর্ষ তরঙ্গের সময় লেগেছে ১৩০ কোটি বছর। তখনই জানা গিয়েছিল, ৩৬ ও ২৯ ভরের দুটি কৃষ্ণগহ্বর সংযুক্ত হয়ে তুলনামূলক বড় একটা কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হয়। অবশ্য সেই বড়ত্বের মাপটা নেওয়া হয়েছিল ভরের দিক থেকে। কিন্তু সেদিন ঘটনাদিগন্তের আকার আদৌ বড় হয়েছিল কি না, তার প্রমাণ ছিল না। সেটা প্রমাণের জন্যই এমআইটির বিজ্ঞানীরা সেদিনের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। দীর্ঘ ছয় বছর পর তাঁরা এখন জানাচ্ছেন, সংঘর্ষের পর যে বড় ব্ল্যাকহোলটি তৈরি হয়েছিল, সেটার আকার সংঘর্ষের আগের দুটি ব্ল্যাকহোলের যেকোনো একটির চেয়ে বেশি। এটাই হকিংয়ের সেই ব্ল্যাকহোলের এরিয়া থিওরেম বা ক্ষেত্রফল উপপাদ্যের প্রমাণ বলে দাবি করছে গবেষক দলটি।

কিন্তু এখনই শেষ কথা বলার সময় আসেনি। এটা নিয়ে আরও যাচাই–বাছাই হবে। অন্য কোনো দল একই পদ্ধতিতে গবেষণা করে একই ফলাফল পেলে তখন নিশ্চিতভাবে বলা যাবে, হকিংই ঠিক ছিলেন।

লেখক: সহসম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: দ্য থিওরি অব এভিরিথিং/ স্টিফেন হকিং, অনু: আবুল বাসার; এমআইটি নিউজ

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন