বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দুই

তরঙ্গ কোনো বাধার সম্মুখীন হলে কী হয়?

কোনোকিছুর কিনারে আঘাত করার পর তরঙ্গে বেঁকে যাওার প্রবণতা দেখা যায়। এটাই হলো তরঙ্গের বিচ্যুতি। এটা তরঙ্গের মৌলিক ধর্ম।

একটি তরঙ্গ কোনো ক্ষুদ্র চির বা ছিদ্রযুক্ত দেয়ালে গিয়ে আঘাত করলে, বিচ্যুতির ব্যাপারটা ভালোভাবে বোঝা যায়। চিরের ভেতর দিয়ে পার হওয়া তরঙ্গ সোজাসুজি যায় না। বরং তরঙ্গের বিচ্যুতি ঘটে, বিভিন্ন কোণে গিয়ে পড়ে ওপারের কোনো পর্দার ওপর। তরুঙ্গটি চির পার হওয়ার পর কতটুকু ছড়িয়ে পড়বে, কত দ্রুত ছড়াবে, তা নির্ভর করে এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য আর চিরের প্রস্থের ওপর। চিড়ের প্রস্থ যদি তরঙ্গদৈর্ঘের কাছাকাছি হয়, তাহলে তরঙ্গটি বিচ্যুতি ঘটবে উল্লেখ করার মতো। অর্থাৎ বিচ্যুতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে তখন।

শব্দ তরঙ্গের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেশ বড়। তাই কোনো বাধা পেলে, যেমন ধরা যাক কোনো গাছ, বা পিলার, তাহলে এর বিচ্যুতি অনেক বেশি হয়, তখন শব্দ তরঙ্গ বাধাদানকারী বস্তুর চারপোশে ছড়িয়ে পড়ে। বিচ্যুত হয়ে একে পেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কিন্তু খুব কম। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, হ্যারি পটারের চুলের যে ব্যাস, তার ভেতর আলোর একশটা তরঙ্গদৈর্ঘ্য পর পর সাজানো যাবে। তাই চলার পথে দৃশ্যমান আলো বাধা পেলেও এর বিচ্যুতি ঘটে খুব সামান্য। তাই, প্রতিবিম্বের ভেতর গাঢ় ছায়া তৈরি হয়। ছায়াগুলো আসলে অতটা গাঢ় অন্ধকারও নয়। বাধাদানকারী বস্তুর কিনারে খুব সামান্য হলেও আলো বিচ্যুত হয়। তাই গাঢ় অন্ধকারের ভেতরও আবছা আলো থাকে।

তাহলে কি হ্যারি পটারের পক্ষে সম্ভব দেযালের কণাগুলোর দুপাশ দিয়ে বিচ্যুত হয়ে ওপারে চলে যাওয়া? চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান বলে এটা সম্ভব নয়। তবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা দিয়ে একে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা যেতে পারে। দুটো তুলনা ব্যবহার করে ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে—একটা প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবক ব্যবহার করে, আরেকটা শক্তি ও সম্ভাবনা তত্ত্ব ব্যবহার করে।

তিন

কোয়ান্টাম ফিজিকসে প্ল্যাঙ্ককে ধ্রুবককে ভরবেগ দিয়ে ভাগ করলে বস্তুর তরঙ্গদৈর্ঘ্য পাওয়া যায়। প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবক h-এর মান হলো 6.62607015×10−34 J⋅Hz−1। অন্যদিকে কোনো বস্তুর ভরবেগ হলো ভর আর বেগের গুণফল। ইলেকট্রনের ভর 9.1093837015×10−31 kg; এটাকে 10-30 লেখা যায়। কল্পনা করুন, একটি ইলেকট্রন সেকেন্ডে ৬০ লাখ মিটার গতিতে ছুটছে। এটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য হবে মোটামুটি এক ন্যানোমিটারের এক দশমাংশ বা 0.0000000001 মিটার হবে। ৩৫ কেজি ভরের (যেমন হ্যারি পটারের) তরঙ্গদৈর্ঘ্য হবে 10×-35 মিটার বা 0.00000000000000000000000000000000001 মিটার। এই তরঙ্গদৈর্ঘ্য এত ছোট, দেয়ালের কোনো কণায় আঘাত করে এর বিচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সুতরাং হ্যারি পটারের আস্ত দেহ দেয়াল ভেদ করে ওপাশে চলে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মোটকথা, দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিচ্যুত হয়, আর খুব ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিচ্যুত হয় না বললেই চলে। তাই সে প্ল্যাটফর্ম 9¾-এর দেয়ালের ওপাশে যেতে পারবে না। তাহলে আর কি উপায় আছে প্ল্যাটফর্ম 9¾-এর এপাশে যাওয়ার?

বস্তুর বেগ এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্যও পরস্পরের ব্যাস্তানুপাতিক। তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মান অনেক বাড়ালে বস্তুর বেগ কমে যায় উল্লেখযোগ্য হারে। ধরা যাক, আমরা একটি ইলেকট্রনকে পুরু লোহার পাতের টানেল তৈরি করে এপাশ থেকে ওপাশে নিতে পেরেছি। চিন্তা করে দেখুন তো, একটা ইলেকট্রনের ভরের তুলনায় হ্যারির ভর কেমন? হ্যারিকে যদি আমরা ইলেকট্রনের মত টানেলিং করে দেয়ালের চাই তাহলে হ্যারির ভর প্রচুর পরিমাণে কমিয়ে ইলেকট্রনের ভরের কাছাকাছি নিতে হবে। এটা করতে গিয়ে হ্যারির তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যাবে বেড়ে যাবে অনেক বেশি।

তরঙ্গদৈর্ঘ্য ঠিক রাখতে হ্যারিকে দেয়ালের দিকে খুব ধীরে দৌড়াতে হবে। সেটা এত ধীরে যে দেয়ালের কাছে পৌঁছুতে পৌঁছুতে দুই-তিন আলোকবর্ষও পার হয়ে যাবে। সেটা কি সম্ভব?

সম্ভব নয়। অর্থাৎ বাস্তব জীবনে কোয়ান্টাম টানেলিং করে একটা আস্ত মানুষকে দেয়াল ভেদ করে ওপারে পাঠানো সম্ভব নয়।

তবে ক্ষুদে কণাদের কোয়ান্টাম টানেলিং সম্ভব। সূর্যের ভেতরে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হলে প্রতিনিয়ত কোয়ান্টাম টানেলিং হচ্ছে কণাদের। আবার স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপে কোয়ান্টাম কণাদের কোয়ান্টাম টানেলিং করে অতিক্ষুদ্র কণাদের ছবি তোলা যায়।

লেখক: শিক্ষার্থী, বগুড়া জিলা স্কুল

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন