পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের বিটা ক্ষয় (beta emission) ঘটায় দুর্বল নিউক্লিয়ার বল। দুর্বল মিথস্ক্রিয়ায় (weak interaction) নিউক্লিয়াসের চার্জহীন নিউট্রন পজিটিভ চার্জযুক্ত প্রোটনে রূপান্তরিত হয় আর পরমাণুর চার্জের সমতা রক্ষার জন্য নিউক্লিয়াসে একটা নেগেটিভ চার্জের ইলেকট্রন তৈরি হয়ে নিউক্লিয়াস থেকে বেরিয়ে আসে। চার্জহীন নিউট্রিনো নিউক্লিয়ার বলের আদান–প্রদান ঘটায়।

দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের কারণেই নক্ষত্রগুলোতে শক্তি উৎপন্ন হয়। আমাদের প্রাকৃতিক মূল উৎস যে সূর্য, সেই সূর্যের ভেতর যে হাইড্রোজেন আছে, তা ডিউটেরিয়ামে রূপান্তরিত হয় দুর্বল পারমাণবিক মিথস্ক্রিয়ার ফলে। সোলার এনার্জি বা সৌরশক্তির মূল উৎসই হলো দুর্বল পারমাণবিক বল। ১৯৩৪ সালে ইতালিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি দুর্বল পারমাণবিক বলের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু নিউট্রিনোর ভূমিকা খুব একটা পরিষ্কার ছিল না।

১৯৫৬ সালে নিউট্রিনোর সিমেট্রি ব্রেকিং বা প্যারিটি ভায়োলেশন প্রমাণিত হওয়ার পর দুর্বল পারমাণবিক বল ও বিদ্যুৎ–চুম্বক বলের মধ্যে সমন্বয়ের একটা সঠিক সম্ভাবনার পথ পাওয়া গেল। নিউট্রিনোর প্যারিটি ভায়োলেশনের ওপর গবেষণাপত্র লিখেও পাউলির হস্তক্ষেপে তা প্রকাশে অনেক দেরি করে ফেলেন আবদুস সালাম। ফলে প্যারিটি ভায়োলেশন আবিষ্কারের যথার্থ কৃতিত্ব দেওয়া হয়নি আবদুস সালামকে। কিন্তু আবদুস সালাম হাল ছাড়েননি।

১৯৬০-এর দশকে দুর্বল নিউক্লিয়ার বল ও বিদ্যুৎ–চৌম্বক বলের ওপর স্বতন্ত্রভাবে কাজ হয়েছে এমআইটি, হার্ভার্ড আর ইম্পেরিয়েল কলেজে। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইন্টারঅ্যাকশনের গেজ ইনভেরিয়েন্ট তত্ত্বের সমন্বয়ে সাফল্য আসে এক দশকের মধ্যেই।

গেজ ইনভেরিয়েন্ট তত্ত্ব প্রথম দিয়েছিলেন এমি নোইথার ১৯২০–এর দশকে। এই তত্ত্বমতে, প্রকৃতিতে যেখানেই সাম্যতা কাজ করে, সেখানে অবশ্যই সাম্যতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পদার্থ এবং শক্তির ধর্মের সংরক্ষণশীলতার নীতিও কার্যকর থাকে। যেমন স্থান ও কালের সাম্যতা বজায় থাকলে শক্তি, ভরবেগ ও কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণশীলতার নীতি বজায় থাকে।

একটা উদাহরণ দিলে গেজ সিমেট্রি বা গেজ ইনভেরিয়েন্ট তত্ত্ব বুঝতে সুবিধা হবে। মনে করা যাক আমাকে একটা পাহাড়ে উঠতে হবে ভূমি থেকে, যার উচ্চতা ১০০ মিটার। যদি পাহাড়টা সিমেট্রিক হয় অর্থাৎ সব দিক একই রকম হয়, তাহলে পাহাড়টিতে আমি যেদিক দিয়েই উঠি না কেন আমার সমান শক্তি খরচ হবে। সে ক্ষেত্রে আমি পাহাড়ের কোন দিক দিয়ে উঠেছি, তাতে মোট শক্তি খরচের কোনো তারতম্য হবে না। এখন পাহাড়টির সিমেট্রি যদি নষ্ট হয় তাহলে শক্তি-ব্যয়ের সমতাও থাকবে না। এখানে পাহাড়ে ওঠার জন্য যে শক্তি খরচ হচ্ছে, তা মাধ্যাকর্ষণ বলের সঙ্গে সম্পর্কিত। উদাহরণটি গ্র্যাভিটেশন ফিল্ডের গেজ সিমেট্রি।

আবদুস সালাম দুর্বল নিউক্লিয়ার বল ও বিদ্যুৎ–চৌম্বক বলকে একত্রে গেজ সিমেট্রি কাজে লাগালেন। এটা করতে গিয়ে আবদুস সালাম স্বতঃস্ফূর্ত সাম্যতাভঙ্গ বা স্পনটেনিয়াসলি ব্রোকেন সিমেট্রির অবতারণা করেন। স্বতঃস্ফূর্ত সাম্যতাভঙ্গের ব্যাপারটা অবশ্য আবদুস সালামের আবিষ্কার নয়। ১৯২৮ সালে ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ ফেরোম্যাগনেটিজমের ক্ষেত্রে এই স্বতঃস্ফূর্ত সাম্যতাভঙ্গের ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেছিলেন।

স্বাভাবিক অবস্থায় একটি চুম্বকের উত্তর ও দক্ষিণ এই দুই মেরু থাকে। মেরুর ভিন্নতার কারণে চুম্বক সিমেট্রিক নয়। কিন্তু একটি দণ্ডচুম্বককে গরম করতে থাকলে তার চুম্বকত্ব কমতে থাকে এবং একটা তাপমাত্রার পর আর কোনো চুম্বকত্ব অবশিষ্ট থাকে না। তখন দণ্ডচুম্বকটির দুটো মেরুর ধর্মই একই রকম। তখন কোনটা উত্তর মেরু কোনটা দক্ষিণ মেরু, তা আলাদা করা যায় না। তার মানে ওটা তখন সিমেট্রিক। তারপর যদি তাপমাত্রা কমতে থাকে একটা সময়ে চুম্বকত্ব ফিরে আসে এবং সঙ্গে সঙ্গে তার সমতা ভেঙে যায়। এ রকম ব্যাপারকেই স্বতঃস্ফূর্ত সাম্যতাভঙ্গ বলা হয়।

১৯৬৭ সালে সালাম তাঁর তত্ত্ব ইম্পেরিয়েল কলেজের লেকচারে প্রকাশ করেন। সে বছর ডিসেম্বরে স্টিভেন ওয়েনবার্গের গবেষণাপত্র প্রথম চোখে পড়ে সালামের। সালাম দেখলেন ওয়েনবার্গও তাঁর মতোই চিন্তা করেছেন। ওয়েনবার্গ তাঁর গবেষণাপত্রে শুধু লেপটন–সংক্রান্ত হিসাবই দেখিয়েছিলেন। আবদুস সালাম ভাবলেন আরও বিস্তৃত হিসাব করে, তিনি গবেষণাপত্র লিখবেন। ১৯৬৮ সালে শ্যালডন গ্ল্যাশো হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ধারণা দেন যে দুর্বল নিউক্লিয়ার বল আর বিদ্যুৎ–চুম্বক বলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এবং তাদের একই সূত্রে গেঁথে ফেলা সম্ভব। স্টিভেন ওয়েনবার্গ এবং আবদুস সালাম গ্ল্যাশোর ধারণার গাণিতিক সমীকরণ বের করেন।

দুর্বল নিউক্লিয়ার বল ও বিদ্যুৎ–চৌম্বক বল মূলত একই রকম। কিন্তু তাদের ভিন্ন মনে হয়, কারণ, দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের বিনিময় কণার ভর আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ–চৌম্বক বলের বিনিময় কণার ভর নেই। উভয় ক্ষেত্রেই বল বিনিময় কণা হলো বোসন। তড়িৎ–চৌম্বক বলের ক্ষেত্রে বিনিময় কণা ফোটন যার স্থির ভর শূন্য। ফোটন আলোর বেগে চলে। দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের ক্ষেত্রে বিনিময় কণার ভর আছে। ফলে এই বোসনগুলোর বেগ দূরত্বের সঙ্গে বদলে যায়।

দুর্বল নিউক্লিয়ার মিথস্ক্রিয়ায় চার্জের পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ চার্জহীন নিউট্রন ধনাত্মক চার্জযুক্ত প্রোটন বা ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রনে পরিণত হয়। ফলে যে কারেন্ট পাওয়া যায় তাকে চার্জড কারেন্ট বলা যায়। অন্যদিকে বিদ্যুৎ–চৌম্বক বলের ক্ষেত্রে চার্জের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। ফলে এ ক্ষেত্রে যে কারেন্ট পাওয়া যায় তাকে নিউট্রাল কারেন্ট বলা যায়।

ওয়েনবার্গ ও সালামের তত্ত্ব প্রমাণ করে যে দুর্বল নিউক্লিয়ার বল ও তড়িৎ–চৌম্বক বলের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হলো বিনিময় কণা বোসনের ভরে। বিদ্যুৎ–চৌম্বক বলের ক্ষেত্রে বিনিময় কণা ফোটন ভরহীন, কিন্তু দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের ক্ষেত্রে বিনিময় কণা বোসনের ভর প্রোটনের ভরের প্রায় এক শ গুণ। দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের বোসনকে এ কারণে ভারী ফোটনও বলা হয়।

আবদুস সালাম ও স্টিভেন ওয়েনবার্গ ধারণা দেন, দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের ক্ষেত্রে নিউট্রাল কারেন্ট ও চার্জড কারেন্ট দুটোই পাওয়া যেতে পারে। দুটো মিথস্ক্রিয়ার বল বিনিময় কণাগুলোকে একই পরিবারভুক্ত করে নাম দেওয়া হয় W+, W- এবং Z0 বোসন। +, - এবং ০ যথাক্রমে ধনাত্মক, ঋণাত্মক এবং নিউট্রাল চার্জড বোসন বোঝায়। তিনটিকে একসঙ্গে ইন্টারমিডিয়েট ভেক্টর বোসন বলা হয়। এই ভেক্টর বোসনগুলো নিউক্লিয়াসের ভেতরে খুবই ভারী। আর সেখানেই দুর্বল মিথস্ক্রিয়া ঘটে। নিউক্লিয়াসের বাইরে ঘটে তড়িৎ–চৌম্বক মিথস্ক্রিয়া।

১৯৬৮ সালের মে মাসে সুইডেনের গুটেনবার্গে নোবেল সিম্পোজিয়ামে আবদুস সালাম তাঁর ইলেকট্রো-উইক ফোর্সের বর্ণনা দেন। নোবেল ফাউন্ডেশন প্রতিবছর নোবেল সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করে। অনেক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী উপস্থিত থাকেন সেই সিম্পোজিয়ামে। সিম্পোজিয়ামে আবদুস সালামের বক্তৃতাকে কেউ খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। কারণ, অনেকে বুঝতেই পারেননি তিনি আসলে কী বলতে চাচ্ছিলেন। এমনকি সিম্পোজিয়ামের আয়োজক মারি গেল-মান তাঁর সমাপনী বক্তৃতায় সালামের প্রবন্ধের উল্লেখ পর্যন্ত করেননি।

কিন্তু পরীক্ষাগারে নিউট্রাল কারেন্ট আর ভারী বোসন পাওয়া গেলেই সালাম-ওয়েনবার্গ-গ্ল্যাশোর তত্ত্ব প্রমাণিত হয়ে যাবে। আবদুস সালাম অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। বেশি দিন অপেক্ষা করতে হলো না তাঁকে। ১৯৭৩ সালে সার্নের পরীক্ষাগারে নিউক্লিয়াস ও নিউট্রিনোর মিথস্ক্রিয়া ঘটিয়ে কোনো ধরনের চার্জ বিনিময় ছাড়াই দুর্বল নিউক্লিয়ার মিথস্ক্রিয়া ঘটানো সম্ভব হলো। নিউট্রাল কারেন্টের অস্তিত্ব প্রমাণিত হলো। ফার্মি ল্যাবেও একই ধরনের রেজাল্ট পাওয়া গেল। প্রফেসর সালামের তত্ত্ব পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণিত হলো। ১৯৭৮ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রন এক্সিলারেটরে (SLAC) ইলেকট্রন ও ডিউটেরনের মিথস্ক্রিয়া ঘটিয়েও দুর্বল নিউক্লিয়ার বল এবং তড়িৎচালক বলের সমন্বয়ের প্রমাণ পাওয়া যায়। এই আবিষ্কারের জন্য ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় বিজ্ঞানী আবদুস সালাম, স্টিভেন ওয়েনবার্গ ও শেলডন গ্ল্যাশোকে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, স্কুল অব বায়োমেডিকেল সায়েন্সস, আরএমআইটি, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন