বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঢাউস সাইজের একটি ফাইল বগলদাবা করে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকলেন কিনেরি। কর্মঠ এক যুবক মাথায় ছোট করে ছাঁটা সোনালি চুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, স্বভাবে বোকামির কোনো আভাস নেই। তাঁর ভেতর নেই কোনো পরিবর্তন। এফটিএল ফাউন্ডেশনের ডেপুটি ডিরেক্টর জেরমি শেচার ক্লান্ত চোখে দেখতে পেলেন, কিনেরি কোনো আমন্ত্রণ ছাড়াই টেবিলের ওপর ফাইলটা সশব্দে রেখে একটা চেয়ার টেনে বসলেন।

‘মর্নিং শেচার।’ কিনেরি বললেন রুক্ষ গলায়, ‘শেষ পর্যন্ত আপনার গার্ডদের বেড়াজাল ভেঙে ঢুকতে পেরেছি। আপনার সঙ্গে দেখা করাটা যে কতটা দুর্ভেদ্য, তা কি আপনি জানেন?’

শেচার মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘আর আপনিও একজন নাছোড়বান্দা।’ ডেপুটি ডিরেক্টর বিশালদেহী একজন মানুষ, শরীরের পরতে পরতে চর্বি, মোটা একজোড়া ভ্রু, ধূসর চুলে ভর্তি মাথা।

‘আপনার সঙ্গে কাজ করতে গেলে অমনি নাছোড়বান্দা হতে হয়। শেচার, আমি আপনার সময় নষ্ট করব না। এফটিএলে আরও অনেকের কাছে ঘুরতে হবে। আর কত দিন ঘুরতে হবে?’

‘ঘুরতে হবে?’ শেচার মুখে হাসি এনে বললেন, ‘বুঝতে পারছি না আপনি কী বোঝাতে চাইছেন।’

‘গেম খেলার চেষ্টা করবেন না। আপনি আর আমি এটা ভালো করেই জানি যে আমার মতো একজন পদার্থবিদ বছরের পর বছর ধরে আপনাদের কাছে ধরনা দিচ্ছি। আপনি তো হাইপারস্পেস নিয়ে লেখা থিসিস দেখছেন। আপনার ভেতরে এখনো বিজ্ঞানীসুলভ মনোভাবটা রয়েছে। আপনি এটাও ভালো জানেন, আমার লেখাটা বাস্তবসম্মত। লোপেজের পর আমি এই ফিল্ডের ভালো কাজ করেছি। লোপেজ তো সেই তিরিশ বছর আগে কাজ করেছে। শেচার, আমি হাইপারড্রাইভ ইঞ্জিনের নকশা প্রায় করেই ফেলেছি। প্রত্যেকেই বিষয়টা সম্পর্কে জানে।

‘কিন্তু আমার দরকার ফান্ড। ইকুইপমেন্ট কেনার মতো প্রয়োজনীয় ফান্ড আমার ইউনিভার্সিটির নেই। তাই আমি এফটিএলে এসেছিলাম। কিন্তু শেচার, আপনারা আমার আবেদনপত্র নিয়ে যা করলেন, ছি ছি। অথচ এক বছর হয়ে গেল কেউ কিছুই জানালেন না, পুরো বিষয়টা ধামাচাপা দিলেন। আমি আপনাদের কাছ থেকে কোনো ব্যাখ্যাও পর্যন্ত পাইনি। আপনি সব সময়ই কনফারেন্সে আছেন, আপনার সহকারী বকবক করেই গেল, আর লোপেজ তো স্থায়ীভাবে বিশেষ কাজে বাইরেই রয়ে গেল।’

কিনেরি দুই হাত ভাঁজ করে শক্তভাবে নিজ আসনে হেলান দিয়ে বসলেন। শেচার একমনে পেপারওয়েট নিয়ে খেলছিলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘আপনি রেগে গেলেন, মিস্টার কিনেরি।’ বললেন তিনি, ‘রেগে গেলে কোনো লাভ হবে না।’

কিনেরি সামনের দিকে ঝুঁকে বসলেন। ‘রাগ করার যথেষ্ট কারণ আছে। হাইপারস্পেস ড্রাইভের জন্য এফটিএল ফাউন্ডেশনের জন্ম। আমি প্রায় হাইপারস্পেস ড্রাইভ আবিষ্কার করে ফেলেছি। তারপরও আপনারা আমার কথা শুনছেন না, টাকাও দিচ্ছেন না।’

শেচার আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ‘আপনি তো প্রথম থেকেই একটা ভুল অনুমানের ওপর কাজ করেছেন। আলোর চেয়ে দ্রুত গতি সম্ভব কি না, তা নিয়ে গবেষণার জন্য এফটিএলের জন্ম। যেমনটা বলা যায় স্টার ড্রাইভের কথা। হাইপারস্পেস হলো একটি পথ সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে। আর এখন আমরা অন্য একটি পথের সন্ধান পেয়েছি, যা আরও বেশি প্রতিশ্রুতিশীল। আমরা...’

‘আমার জানা আছে সেসব পথের কথা।’ কিনেরি বাধা দিয়ে বললেন, ‘সবগুলোই ডেডএন্ড। আপনারা করদাতাদের টাকা নষ্ট করছেন। আপনারা যেসব বিষয়ে ফান্ড দিচ্ছেন! ও মাই গড, তা তো দেখতেই পাচ্ছি। তার ভেতর হলো অ্যালিসনে টেলিপোর্টেশেন এক্সপেরিমেন্ট। ক্লাডিয়া ডানিয়েলের এসপার ইঞ্জিন। আর চুঙের টাইম-স্টেসিস হাইপোথিসিস! কত টাকা দিয়েছিলেন তাকে? আমর কাছে জানতে চাইলে আমি বলব, মিসম্যানেজমেন্টের ভেতর পড়েছে। একজনই শুধু সঠিক পথে ছিল, সে হলো লোপেজ। আর আপনারা কয়েকজন পাগল তাকে গবেষণার কাজ থেকে সরিয়ে দিয়ে বানালেন অ্যাডমিনিস্ট্রেটর।’

শেচার তাঁর অতিথিকে একমনে লক্ষ করছিলেন। কিনেরির চেহারা উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠছিল। ঠোঁট দুটি শক্ত করে চেপে ধরেছেন পরস্পরের সঙ্গে। ‘আমি জানতে পেরেছি, আপনি সিনেটর মার্কহামের সঙ্গে দেখা করতে চান, ডেপুটি ডিরেক্টর বললেন, ‘আপনি কি এসব অভিযোগ তাঁর কাছে তুলবেন?’

‘হ্যাঁ, তুলব।’ কিনেরি তীক্ষ কণ্ঠে বললেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি সদুত্তর পাচ্ছি। আমি আপনাকে নিশ্চিত করে বলছি, ঠিক ঠিক জবাব না পেলে আমি সিনেট টেকনোলজি কমিটিতেও যাব।’

শেচার মাথা নাড়লেন, ‘বেশ, আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দেব। কিনেরি, আপনি কি বলতে পারবেন পৃথিবীতে এখন এই মুহূর্তে কত জনসংখ্যা?’

কিনেরি ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘অবশ্যই, আমি—’

‘না, না।’ শেচার বললেন, ‘পাশ কাটাবার চেষ্টা করবেন না। ভালো করে ভাবুন। বিষয়টা খুবই জরুরি। তিল ধারণের কোনো জায়গা নেই, কিনেরি। এখানে নয়, পৃথিবীর কোথাও নয়। মঙ্গল, চাঁদ আর ক্যালিস্টোতে একই অবস্থা। আমরা সবাই তো জানি। মানুষ ডেডএন্ডে পৌঁছে গেছে। মানুষের বেঁচে থাকা প্রশ্নে নক্ষত্রলোকের প্রয়োজন। এফটিএল ফাউন্ডেশন মানবজাতির আশা-ভরসা, আর এর জন্য ব্যালফেরেলকে ধন্যবাদ। মানুষের ফাউন্ডেশনের মনে হলো হাইপারস্পেস।’

কিনেরি শান্ত হলেন না, ‘শেচার, এমন গালগল্প গত এক বছর ধরে আপনার সহকারীদের কাছ থেকে শুনে আসছি। আপনার কাছ থেকে আর শুনতে চাই না।’

শেচার হাসলেন। চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার কাছে দিয়ে দাঁড়ালেন। চারপাশে আকাশ ছুঁইছুঁই করা মেনাপেসলিশ শহরের দিকে তাকালেন। ‘কিনেরি!’ না ঘুরে তিনি বললেন, ‘একটা বিষয় একবারও ভেবে দেখেছেন কি, ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর হওয়ার পরও হাইপারস্পেস রিসার্চের জন্য ফান্ড পেলেন না কেন? যেটা তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল।’

‘আমি...’ কিনেরি বলতে শুরু করলেন।

শেচার তাঁকে থামিয়ে দিলেন। ‘কিছু মনে করবেন না।’ বললেন তিনি, ‘ওটা জরুরি কিছু না। আমরা বেশ কিছু উদ্ভট থিওরির পেছনে ফান্ড ঢেলেছি, কারণ ওগুলো অন্যগুলোর চেয়ে ভালো থিওরি ছিল। হাইপারস্পেস শেষ হয়ে গেছে, কিনেরি। আমরা এই বিষয়টা বাঁচিয়ে রেখেছি মানবজাতির জন্য।’

মুখ বিকৃত করে কিনেরি বলে উঠলেন, ‘ওহ, থামুন শেচার। আমার পেপারগুলো ভালো করে দেখুন। আমাকে ফান্ড দিন, আমি আপনাকে দুই বছরের ভেতর হাইপারস্পেস ইঞ্জিন তৈরি করে দেব।’

শেচার কিনেরির মুখোমুখি ঘুরে দাঁড়ালেন। ‘আমি জানি, আপনি পারবেন।’ তিনি বললেন ক্লান্ত গলায়, ‘আপনি তো জানেন ক্যানফেরেলি একবার বলেছিলেন, হাইপারস্পেসে আলোর গতিবেগই যে গতিবেগের শেষ প্রান্ত, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। তিনি ঠিক ছিলেন। ওটা হওয়ার নয়।’

‘আমি দুঃখিত, কিনেরি। সত্যি দুঃখিত। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে লোপেজ হাইপারড্রাইভ আবিষ্কার করেছিল। আর তখনই আমরা জানতে পারি যে হাইপারস্পেসের সর্বোচ্চ গতিবেগ আলোর গতিবেগ নয়।’

‘আরও কম, কিনেরি, আরও কম।’

*লেখাটি ২০১৮ সালে বিজ্ঞানচিন্তার মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত

বিজ্ঞান কল্পগল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন