বিজ্ঞাপন

‘দরজির ভুল? হ্যাঁ, প্রথমে আমিও তাই ভেবেছি।’

‘আপনার ধারণা পাল্টাল কেমন করে?’ ভদ্রলোক চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।

‘ধারণা পাল্টাল এ জন্য যে কেবল সোয়েটারটাই অস্বাভাবিক নয়...।’

‘কেবল সোয়েটারটাই অস্বাভাবিক নয়?’ কেমন এক অপার্থিব সুরে কাউন্টারের ভদ্রলোক বলে উঠলেন।

‘ঠিক তা-ই, আপনার প্যাকেটের মধ্যে পাঁচ হাতাওয়ালা সোয়েটার ছাড়াও রয়েছে একঠেঙা ট্রাউজার। এসবের মানে কী?’

‘ওদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হয়তো বিকৃত। এ রকম পঞ্চবাহু বা একঠেঙে লোক হয়তো প্রকৃতির খেয়ালে সত্যি সত্যিই সৃষ্টি হয়েছে। যে মহিলাটির জন্য এই পোশাক তৈরি করা হয়েছে, তাঁর হয়তো অতিরিক্ত অঙ্গ রয়েছে। এটাও প্রকৃতির খেয়াল।’

‘এ শহরে সে রকম কোনো নর-নারীর আগমন ঘটে থাকলে তা জানতে পারতাম। খবরের কাগজে নিশ্চয়ই প্রকৃতির এই অদ্ভুত খেয়াল নিয়ে অনেক লেখালেখি হতো।’

‘তা বটে,’ কাউন্টারের ভদ্রলোক যেন একটু বিব্রতভাবেই বললেন, ‘তবে...তবে বোধ হয় কোনো সার্কাস দলের জোকারের জন্য এ রকম পোশাক তৈরি করা হয়েছে।’

‘সার্কাস? এ এলাকায় বা তার আশপাশে কোনো সার্কাস পার্টি এসেছে বলে তো শুনিনি।’

‘সার্কাস পার্টিও আসেনি?’ ভদ্রলোকের গলার স্বরে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল।

‘এ প্রকৃতির খেয়াল নয়,’ আমি বললাম, ‘এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে। কে বা কারা আপনাকে এ রকম পোশাক তৈরি করতে দিয়েছিল?’

‘কে বা কারা দিয়েছিল?’ স্থির দৃষ্টিতে ভদ্রলোক কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে সব মানসিক দ্বিধা যেন উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি যখন জানতে চাইছেন—বেশ, শুনুন তবে।’

কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে তাকালাম। ভদ্রলোক শুরু করলেন। তাঁর গলার স্বর অদ্ভুত রকম গম্ভীর। সে স্বর যেন অলৌকিক—অপার্থিব।

ভদ্রলোক বলতে লাগলেন, ‘আলমার নামে একটি গ্রহ আছে। সেই গ্রহ জগতের...।’

‘কী বাজে কথা বলছেন? আলমার গ্রহের নামও কখনো শুনিনি,’ ভদ্রলোককে বাধা দিয়ে বললাম আমি।

‘তার কারণ আছে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যে সুদূর অংশে আলমার নামের গ্রহটির অবস্থান, সেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপের ফোকাস এখন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। যাক, যা বলছিলাম—এই গ্রহজগতের শাসক হচ্ছেন একজন স্বৈরাচারী। জনসাধারণ এই স্বৈরাচারী শাসকের পীড়নে উত্পীড়িত। স্বৈরাচারী মহানায়কের শাসনে তাদের অবস্থা দাসের চাইতে মোটেই ভালো নয়—হ্যাঁ, তারা প্রতিবাদহীন মূকদাসেই পরিণত হয়েছে।’

‘ঠিক আছে, বলে যান আপনার আজগুবি কাহিনি।’ আমি ঠাট্টার সুরে বললাম।

আমার কথায় কর্ণপাত না করে ভদ্রলোক বলতে লাগলেন, ‘আলমার গ্রহের পুরুষেরা দেখতে প্রায় পৃথিবীর মানুষেরই মতো, যেটুকু তফাত, তা সামান্য ছদ্মবেশ ধারণেই ঢেকে যায়। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে মেয়েদের নিয়ে। তাদের চেহারা মোটেই পৃথিবীর মানবীর মতো নয়। ফলে কোনো ছদ্মবেশই তা ঢেকে রাখতে পারে না।’

‘তাই বুঝি? অবশ্য পোশাক দেখে সে রকমই মনে হচ্ছে।’ মন্তব্য করলাম আমি।

ভদ্রলোক বলতে লাগলেন, ‘আলমারের বুকে শাসকের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষ আছে। কিন্তু সেখানে বসে তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও নেই। তবু গোপনে আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু হলো। এই আন্দোলনে অংশ নিল সমাজের বিভিন্ন স্তরের আলমারবাসী। স্বৈরশাসন উত্খাত করে গণতন্ত্র কায়েম করার জন্য গোপনে পরিকল্পনাও তৈরি হলো। ঠিক হলো মহানায়কের দৃষ্টি ফাঁকি দিতে হলে আলমারের বাইরের অন্য কোনো গ্রহে গিয়ে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে এতে দুটো অসুবিধা দেখা দিল, আবহাওয়াগত এবং আকারগত।’

‘সে কী রকম?’ জানতে চাই আমি।

ভদ্রলোক জবাবে বললেন, ‘প্রথমত, এমন একটা গ্রহ বাছাই করতে হবে যার আবহাওয়া আলমারবাসীদের পক্ষে অনুকূল। দ্বিতীয়ত, সেই গ্রহে যদি বুদ্ধিমান জীব থাকে, তবে আলমারবাসীর সঙ্গে তাদের যেন মোটামুটি আকৃতিগত সাদৃশ্য থাকে।

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চল তন্ন তন্ন করে অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেল এই পৃথিবীকে। আর বিভিন্ন দেশের খোঁজখবর নিয়ে আলমারদের সবচেয়ে পছন্দ হয়ে গেল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে। কারণ, ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল শহর। এখানে সহজেই দুই কোটি মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা যাবে। কয়েক মাস আগে একদল আলমারবাসী নারী-পুরুষ অতি গোপনে নিজেদের গ্রহ ত্যাগ করে এই শহরে আশ্রয় নিয়েছে নিজেদের আন্দোলন জোরদার করে গড়ে তোলার জন্য। তবে পৃথিবীর ওপরে কোনো হামলা চালানোর উদ্দেশ্য এদের নেই। আন্দোলনের প্রস্তুতি শেষ হলেই এরা পৃথিবী ত্যাগ করে নিজেদের গ্রহলোকের স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করবে।’

‘আপনি এত কথা জানলেন কী করে?’ আমি প্রশ্ন করলাম।

‘এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কি কোনো প্রয়োজন আছে?’ রহস্যময় হাসি হেসে ভদ্রলোক বললেন।

‘যাহোক, খুব একটা গল্প শোনালেন ভাই, সময়টা বেশ কাটল।’

‘কিন্তু আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে,’ আমার কথায় আদৌ কান না দিয়ে ভদ্রলোক বলতে লাগলেন, ‘সদাসতর্ক মহানায়কের গুপ্তচর বাহিনী আলমার গ্রহের সব জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে। আমাদের গোপন পরিকল্পনা যাতে কোনো রকমেই ফাঁস না হয়, সেদিকে সব সময় নজর রাখতে হচ্ছে। এমনকি এই সুদূর পৃথিবীতেও যে আমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ, এ কথা কে জোর দিয়ে বলতে পারে? স্বৈরাচারী মহানায়কের গুপ্তচর চক্র যে আমাদের পেছনে তাড়া করে এখানে আসেনি, সে কথাই-বা কী করে বলা যায়? কাজেই...।’

ভদ্রলোক পকেটে হাত ঢোকালেন।

‘ঠিকই তো,’ আমি বললাম। আমার দৃষ্টি কিন্তু ভদ্রলোকের দিকেই স্থির।

ভদ্রলোক যখন পকেট থেকে ছোট এবং অদ্ভুত দর্শন একটি মারণাস্ত্র বের করলেন, আমি মোটেই অবাক হলাম না।

‘কাজেই বুঝতে পারছেন, আপনাকে আমি ছেড়ে দিতে পারি না। আলমারের স্বার্থে বাধ্য হয়েই আপনাকে হত্যা করতে হবে। অবশ্য যন্ত্রণা দিয়ে আপনাকে হত্যা করব না। আপনি কিছু টেরই পাবেন না। আমি খুবই দুঃখিত, কিন্তু কী করব, কোনো উপায় নেই। কোনো সূত্রেও আমাদের গোপন খবর বাইরের কারও কানে পৌঁছানো মানেই সারা আলমার গ্রহের সর্বনাশ। আপনি এ কথাটা ভেবে খানিকটা সান্ত্বনা পেতে পারেন যে গোটা গ্রহের মুক্তির জন্যই আপনি মৃত্যুবরণ করছেন।’

‘চমত্কার!’ আমি বললাম।

‘বিশ্বাস করুন, অন্য কোনো পথ থাকলে আমি সত্যিই খুশি হতাম,’ আমার দিকে মারণাস্ত্র উঁচিয়ে আলমারবাসী বললেন।

‘অন্য পথও আছে...।’

গুপ্ত আলমারবাসীকে আর সময় দিলাম না। চোখের পলকে পকেট থেকে দ্রুত রে গান বের করে ফায়ার করলাম হতবাক বিপ্লবীর দিকে। একটুও শব্দ হলো না। মানুষটা শুধু ভ্যানিশ হয়ে গেল।

লোকটি ঠিকই বলেছে, অত্যাচারী শাসকের গুপ্তচর বাহিনী সদাসতর্ক, সদাসক্রিয়। শাসক তার গুপ্তরক্ষী দলকে চমত্কার ট্রেনিং দিয়েছে। এসব আন্দোলনকারী সুশিক্ষিত গুপ্তচর বাহিনীর সঙ্গে এঁটে উঠবে কী করে? রে গানের রেতে শখের বিপ্লবী শূন্যে বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার পর দোকানের ভেতরে ঢুকলাম। দরজা বন্ধ করে দিলাম। ওদের গোপন নথিপত্র দেখলাম। এখন এখানেই অপেক্ষা করব। এটা ওদের একটা গোপন ঘাঁটি। ওদের প্রত্যেকেই এখানে আসবে, আর তখন সব কটাকে হাতেনাতে ধরব। মহানায়কের বিরোধিতা করার ফল যে কত মারাত্মক হতে পারে, তা এই শখের বিপ্লবীরা এবার বেশ ভালোই বুঝতে পারবে। তার আগে আর একটা কাজ আছে। এখানে চলে আসার জন্য আমার সহকর্মীদের কাছে এক্ষুনি খবর পাঠাতে হবে। খবর পাঠানোর যন্ত্র অবশ্য আমার পকেটেই রয়েছে।

এখন আর আমার ছদ্মবেশে থাকা প্রয়োজন নেই। তাই আমি ছদ্মবেশ ছাড়লাম। সব সময় ছদ্মবেশ পরে থাকা একটা ঝকমারি। বড্ড বিরক্তিকর ব্যাপার।

[বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে]

*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার জুন সংখ্যায় প্রকাশিত

বিজ্ঞান কল্পগল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন