বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সময় গড়িয়েছে কতটা। শীতের সুর্য মাথার কতটা উপরে উঠেছে মৌরি জানে না। জোর করে চোখ বুঁজে থাকতে যেয়ে সে যে ঘুমিয়ে পড়েছিল, বুঝতে পারলো মাথার কাছে আধখোলা জানালা দিয়ে রহিমার মায়ের ডাক শুনে। ঘরের বাইরে এসে চিনতে পারল আলাউদ্দিন মিয়াকে। লিজার ড্রাইভার। ওদের তো অনেকগুলো গাড়ি, লিজাকে আনা-নেয়া করে যে পিঙ্ক কালার টু-সিটার সেটা চালায় আলাউদ্দিন ভাই।

আলাউদ্দিন ভাই প্রথম এগিয়ে দিল একটা খাম। দ্বিতীয়বারে রেক্সিনে মোড়া চারকোণা একট প্যাকেট। মৌরি ইতস্তত করে হাতে নিল।

-লিজা আপা আপনাকে ফোনে কথা বলতে বলেছে। জানাল আলাউদ্দিন ভাই।

মৌরিদের তো টেলিফোন নেই। সে ভাবে, দেখা না হলে কথা বলবে কী করে? তার চোখের প্রশ্ন পড়ে আলাউদ্দিন ভাই ইশারায় দেখাল, রেক্সিনের প্যাকেট। মুখে বলল, আপা চলি।

মৌরি অবাক! ওদিকে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হন হন করে চলে গেল আলাউদ্দিন ভাই। মৌরির হাতে খাম, প্যাকেটে ভারী কোন বস্তু। খুললেই রহস্যের সমাধান হয়ে যায়।

লিজা এই স্কুলে এসেছে তিন বছর। তিন বছরই তার রোল দুই। এক হয়নি। চেষ্টা করেছে খুব। এমনিতে পড়াশোনায় বেশ ভাল। ওর ছেলেবেলা কেটেছে নিউ হ্যাম্পশায়ারে। ইংরেজিতে তাই একটু বেশি ভাল। লিজা, লিজার মা আর ওর দু'জন প্রাইভেট টিউটর খুব চেষ্টা করে কিন্তু রোল নং ১ করতে পারে না। সব পেপারে টাফ কমিপটিশন দুজনের। লিজা কোন সাবজেক্টে তিন বেশি পেলে মৌরী অন্য বিষয়ে বেশি পায় পাঁচ। আর অঙ্কে এগিয়ে থাকে কোয়ার্টার সেঞ্চুরি। লিজা অঙ্কে কাঁচা। তার নম্বর ওঠানামা করে ষাটের ঘরে। কিন্তু এবারে লিজা অঙ্কে নাইনটি এইট, মৌরির চেয়ে তিন বেশি। অন্য পেপারে দুজনে প্রায় সমান সমান নম্বর, ফলে পাঁচ নম্বর বেশি পেয়ে এবার লিজা ফার্স্ট।

পরীক্ষার আগে তো একটু টেনশন থাকেই। এবারও ছিল। তবে এবার চিন্তার ভিতর ঢুকেছিল সরু একটা সুই। অঙ্কের পরীক্ষা শেষে অনিতা দিদিমণি মৌরির মুখোমুখি হয়েছিলেন। চাপা গলায় বলেছিলেন, কি যে হয়!

দিদিমনি কিছু ভাঙেননি। মৌরিও আগ বাড়িয়ে আর কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। ফল বেরিয়েছে গতকাল। পিনপতন নিরবতা হলরুমে। ফল ঘোষণার আগে বড় আপা একপলকে সবাইকে দেখে নিয়েছিলেন। তারপর মৌরির চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন, তুমি এবার ভাল করতে পারনি।

কথাটা ঠিক নয়। সে যেমন, তেমনি করেছে। বরং ভাল করেছে লিজা, তাকে অ্যাপ্রিসিয়েট করা উচিত ছিল। বড় আপার ভুলটা সংশোধন করল সে। বুকের কষ্ট বুকের গভীরে রেখে আন্তরিক গলায় বলল, লিজা কংগ্রাচুলেশন!

প্রথম হওয়ায় যতটা খুশি লিজা, তার চেয়ে বেশি খুশি হলো মৌরির আন্তরিক অভিনন্দনে। সে মৌরির হাতটা টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরল। মুখে বলল, তুই রাগ করিসনি তো?

মৌরি অবাক, বলল, রাগ করব কেন?

তুই আমার চেয়ে ভাল করে প্রথম হয়েছিস, এতে রাগ করার কি হয়েছে!

এ কথায় লিজা আরও খুশি হয়। পরে দুজনের নম্বর মেলাতে গিয়ে অঙ্কে লিজার নম্বর দেখে মৌরি তার চোখে চোখ রাখল এক মিনিট। আর এতেই যেন বালির বাধে সৃষ্টি হলো সরু একটা ফাটল। লিজা চোখ নামিয়ে নিল। নিরানন্দ কণ্ঠে বিদায় নিয়ে স্কুল ত্যাগ করল দ্রুত। মৌরিও।

প্রথম হওয়ার বাঁধা আসন থেকে নিচে নেমে আসার কষ্টের সঙ্গে মেশে বিস্ময়। মৌরি ভাবে, লিজা অঙ্কে নাইনটি এইট! কীভাবে?

লিজার পাঠানো প্যাকেট খুললে বেরুলো চিঠি। চিঠির অনুরোধে চেন খুললে রেক্সিনের ব্যাগ থেকে বেরুলো বড় দুপ্যাকেট চকোলেটের আকারে একটা যন্ত্র। অন সুইচে আঙুল ছোঁয়াতেই ভেসে এলো লিজার গলা, মৌরি!

গলার স্বর অস্পষ্ট। তবে এ্যানটেনা টেনে বের করতেই পরিষ্কার শোনা গেল লিজাকে। সে আবার ডাকলো, মৌরি-

মৌরি সাড়া দিল : কিছু বলবি?

লিজা কিছু বলে না। ওর ঘরে হয়তো লো-ভল্যুমে সিডি বাজছে, রেডিও ফোনের ভেতর দিয়ে অস্পষ্ট সুর ভেসে আসছে। মৌরি আবারও জিজ্ঞেস করল, লিজা কিছু বলবি?

লিজা জিজ্ঞেস করে: তুই আমার ওপর রাগ করেছিস?

: রাগ করব কেন? মৌরি অবাক হয়। লিজা ব্যাখ্যা করে না। মৌরিও বুঝতে পারে না। যেমন বুঝতে পারেনি নাইনে ওঠার সময় হঠাৎ করে ও নাইনটি এইট পেল কেমন করে। তবু এটুকু বুঝল ভিতরে কোন রহস্য আছে। আর লিজা কিছু বলতে চায়। সঙ্কোচে শুরু করতে পারছে না। বাধাটা দূর করবার জন্য মৌরি আন্তরিক গলায় বলল, লিজা আমি শুধু তোর প্রতিদ্বন্দ্বী নই, বন্ধুও। কিছু বলার থাকলে বল।

লিজা ফিসফিসিয়ে বলল, আমি অঙ্কের দিন নকল করেছিলাম। মৌরি অবিশ্বাসী গলায় বলল, যাহ্!

: সত্যি আমি অঙ্কে নকল করেছি।

মৌরি বিশ্বাস করে না। নিজে নিজেই অবিশ্বাসে মাথা নাড়ে। মুখে বলে, পরীক্ষার হলে তুই বসেছিলি আমার সামনে। আমি তোকে লক্ষ্য করেছি। নকল করলে ঠিক আমি দেখতে পেতাম।

অসহিষ্ণু গলায় বাধা দেয় লিজা। অন্যরকম নকল। গত সেকেন্ড টার্মিনালের পরে আমাকে যে কিছুদিনের জন্য বাল্টিমোরে পাঠানো হলো সে সময় আমার মাথায় লাগিয়ে নিয়ে এসেছি ম্যাথমেটিক্সের একটা চিপস। ক্লাস এইটের অঙ্ক বই-এর বাছাই পাঁচশ’ অঙ্কের সল্যুশন ছিল ওতে। শুধু একটা জ্যামিতির এক্সট্রা পারিনি। তাই দু'নম্বর কাটা গিয়েছিল। না হলে তো একশ-ই পেতাম।

মৌরি তবু বিশ্বাস করে না। বলে, কি যা-তা বলছিস!

: যা-তা নয়রে, আমি ঠিক বলছি। আমেরিকায় তো ভুগোলের, ইতিহাসের, জেনারেল নলেজের চিপস বেরিয়েছে। অপারেশন করে ব্রেনে লাগিয়ে নিলেই হলো।

মৌরি তর্ক শুরু করে। দ্যাখ লিজা, গাজাখুড়ি গল্প ছাড়। অমন চিপস আবিষ্কার হলে খবরের কাগজে সংবাদ বেরত। অন্তত সায়েন্স ম্যাগাজিনে নিশ্চয়ই এ সম্বন্ধে লিখতো।

লিজা ব্যাখ্যা করে, বিজ্ঞান কাউন্সিল অনুমোদন দেবে না বলে কিছু অসাধু বিজ্ঞানীর কাজ এসব। আমার মা তার এক কাজিনকে দিয়ে এই কাজ করিয়েছে আমার ব্রেনে।

মৌরি আর কথা খুঁজে পায় না। তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। এর পরের বছর এক হাজার অঙ্কের সল্যুশন ঢোকানো হবে লিজার মাথায়। পরের বছর দু'হাজার অঙ্ক। অঙ্ক না শিখেও স্কুল ফাইনালে সে পেয়ে যাবে পূর্ণ নম্বর। এমনি করেই হয়তো পেয়ে যাবে ইতিহাস ভূগোলের চিপস এমনকি ইংরেজি বাংলারও।

সুইচ অফ করে রেখে দিতে যাবে এমন সময় আর্তনাদ করে উঠলো লিজা, আমার কথা শেষ হয়নি।

মৌরি কথা বলে না। হাতের মুঠোর মধ্যে মিনি রেডিও-ফোন নিয়ে কানের পাশে আলতো করে চেপে ধরে। লিজার কণ্ঠে ঝরে মিনতি, আমি প্রথম হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হয়ে দেখলাম যাতে আমার কৃতিত্ব নেই তাতে কোন আনন্দও নেই। প্রোগ্রেস রিপোর্টে নাম্বার মিলিয়ে গতকাল তুই যখন আমার দিকে তাকালি তখনি বুঝলাম আমি ধরা পড়ে গেছি। গত সারারাত আমি কষ্ট পেয়েছি। আর বুঝেছি যা পাওনা নয় তা নেওয়া অন্যায়। আমি আর এর ভিতরে নেই। মাকে বলিনি, তবে সিগন্যাল, দিয়ে চিপসের মেমোরিকে অকেজো করে দিয়েছি।

মৌরির বিশ্বাস হলো। লিজা ওর যেমন প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী তেমনি বান্ধবীও। খুশি হয়ে রেডিও-ফোনে ছড়িয়ে দিল আমন্ত্রণ, আজ সারাদিন আমি বাসায় একা। দিনটা আমার সঙ্গে কাটা না?

একটু থেমে বলে, আমি ভুনা খিচুরি রান্না করব তোর জন্য!

যেন রেডিও-ফোন নয় লিজা ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে উত্ফুল্ল গলায় বলল, সত্যি !

মৌরি ঘাড় কাত করে। লিজা গানের সুরে বলে, আমি আসছি!

যেন ওর ডানায় দুটো পাখা গজিয়েছে। ও সত্যি সত্যিই উড়ে আসবে। মৌরি বাইরের দিকের দরজা খুলে অপেক্ষা করতে থাকে।

বিজ্ঞান কল্পগল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন