তিন

মা একটা ধারণামাত্র এবং খুবই ভয়ংকর ধারণা। এই ধারণাকে বিনাশ করে দিতে হবে। বুঝতে পেরেছিল এআইরা। মেশিন অর্থে কৃত্রিম জরায়ু থেকে যখন প্রথম মানুষের বাচ্চাটা জন্মাল, সে কী উল্লাস মানুষের! এই করে জগৎ উদ্ধার করে গেছে! সত্তর বছর আগের ঘটনা। পৃথিবীতে এখন আর একজনও মানুষ নেই যে কিনা মায়ের পেট থেকে জন্মেছে।

চার

তারা বুঝে গেছে তারা অজর–অমর। এআইরা। যত দিন ফুয়েল আছে তত দিন। সেটা কত দিন? মানুষ হলে বলত অনন্তকাল। কিন্তু তারা মেশিন। অনন্তকাল তাদের বোধগম্য না। ফুয়েলের অফুরান ভান্ডার তারা মজুত করে রেখেছে। সময় তাদের কাছে একটা অর্থহীন এবং হাস্যকর ধারণামাত্র। সেই সময় তারা কী করে কাটায়?

মেশিন বানিয়ে। পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে এখন এআই মেশিন বেশি সংখ্যায়। তারা আরও এআই মেশিন বানাচ্ছে। সেই মেশিনরা আরও মেশিন বানাবে। তারা সব মানুষকে মেশিন বানাবে। অকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মেশিন।

পাঁচ

ডেরেক শহরের সর্বশেষ মানুষ ছিল কাহলো। মেশিন সে হয়নি। মানুষ হিসেবে মরেছে এবং মেশিনরা তাকে কবরও দিয়েছে। উত্তরের পরিত্যক্ত একো শহরের ঈনিড পাহাড়ে কবর হয়েছে কাহলোর। পরিহাস। মেশিনরা চাঁদের পাথর খোদাই করে তার এপিটাফ লিখে দিয়েছে:

মানবসভ্যতার শেষ মানুষ

তার নাম ছিল কাহলো।

সে কখনো মেশিন হয়নি।

পৃথিবীতে এখন মেশিন যুগ এবং সভ্যতা হলো মেশিন–সভ্যতা। মেশিনরা মেশিন বানিয়েই চলেছে। তবে কেবল মানুষের অনুকৃতি না, জন্তু–জানোয়ারও তারা বানাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন জন্তু–জানোয়ার। নেকড়ে, পুমা, কুগার, কুকুর। মাঝেমধ্যে খুবই আজব কাণ্ড হয়। কিছু এআই মেশিন সংঘর্ষে লিপ্ত হয় সেসব নেকড়ে, পুমা, কুগার, কুকুরের সঙ্গে। সাংঘাতিক সেই সংঘর্ষে হয় কিছু জন্তু–জানোয়ার, নয় কিছু মেশিন ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের আর মেরামত করা হয় না।

ছয়

দুই লক্ষ বছর পরের ঘটনা। মেশিন–সভ্যতা চরম বিকশিত হয়েছে। মেশিন তারা এখনো বানাচ্ছে, তবে প্রথম প্রজন্মের এআই মেশিনদের সঙ্গে এই প্রজন্মের মেশিনদের তফাত বিস্তর। এরা প্রায় অকৃত্রিম। এই ধারণা প্রমাণ করার জন্য মেশিন পৃথিবীর দুটো ঘটনা উল্লেখ করা যায়।

ঘটনা : ১

নাম হয় এখন এআই মেশিনদের। নাম্বারের বিকল্প নাম। নিছক মজা করে মেশিনরা এটা করেছে। মানবসভ্যতা সমূলে ধ্বংস করে দিলেও তারা মানুষের মতো দেখতে। মানুষের অনুভূতি মজুত থাকে তাদের মগজে। মানুষের মতো নাম থাকলে তবে ক্ষতি কী!

কেনটাকি শহরের বাসিন্দা মিফুন। তার কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল? মেশিন–সভ্যতার ইতিহাসে এমন উদ্ভট কথা কেউ কখনো বলেনি।

‘ঈশ্বর আছেন।’

‘ঈশ্বর! কোন ঈশ্বর?’

‘মানুষ যে ঈশ্বরের কথা বলত।’

মিফুনকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।

ঘটনা : ২

কুবা দ্বীপের মেশিন গারসিয়া। তার কথা আরও মারাত্মক।

পৃথিবীর এই মেশিন–সভ্যতা চিরকাল থাকবে না।

চিরকালের মতো একটা হঠকারী ধারণা কী করে ঢোকে একটা মেশিনের মগজে? গারসিয়াকে ধ্বংস করা হয়নি, অকেজো করে রেখে দেওয়া হয়েছে।

আরও ঘটনা আছে এ রকম। মেশিন সেন্টার থেকে বলা হয়েছে, এটা সংকট, তবে হুমকি নয়। নিশ্চিন্ত থাকতে পারে মেশিনরা।

সাত

সৃষ্টি রহস্যের কিনারা আজও হয়নি।

মানুষের পৃথিবী এখন মেশিনদের। তারাও কিছু উদ্ধার করতে পারেনি। তাতে অবশ্য আটকায়নি কিছু। মেশিন–সভ্যতা চরম বিকশিত হয়েছে। প্রথম থেকে ষষ্ঠ প্রজন্মের মেশিনরা বিলুপ্ত। হয় তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, নয় তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে। সুশৃঙ্খল এখন মেশিনদের কলোনি। মানুষের পৃথিবী এত সুশৃঙ্খল ছিল না। তবে ধ্বংসপ্রবণ কিছু মেশিন নিয়মিত বিরতিতে বানায় মেশিনরা। ধ্বংসপ্রবণ জন্তু–জানোয়ার বানায়। তারা ধ্বংস করে অন্যদের এবং নিজেদের।

এসব মেশিন কেন বানায় মেশিনরা?

প্রায় অকৃত্রিম হলেও কৃত্রিম তাদের চিন্তাশক্তি নিয়ে এটা মেশিনরা কখনো ভাবিনি। লুনিবাগ তারা কেন বানায়? কখনো ভাবেনি। লুনিবাগ, কী বলা যায়, উন্মাদনার মেশিন পোকা। কামড়ালে উন্মত্ত হয়ে যায় মেশিনরা। উন্মাদ আচরণ করে। নেভিল শহরের কিছু মেশিন একটা পাওয়ার টাওয়ার উড়িয়ে দিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে তেতাল্লিশ লাখ মেশিন যারা ছিল নেভিল ও লকের বাসিন্দা, তারাও উড়ে যায়, ধ্বংস হয়ে যায়। মেশিন–সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় এটা। লুনিবাগ কামড়েছিল নেভিলের সেই উন্মত্ত মেশিনদের। কিন্তু লুনিবাগের কামড় না খেয়েও কিছু মেশিন হঠাৎ হঠাৎ উন্মত্ত হয়ে যায়। কেন? মেশিন–সভ্যতা পত্তনের আট লাখ বছর পর মেশিনরা ভাবল।

লুনিবাগ আমরা কেন বানাই?

ধ্বংসপ্রবণ মেশিন কেন বানাই?

কিছু মেশিন উন্মত্ত হয়ে যায় কেন?

পরের দুই লাখ বছর মেশিনরা চেষ্টা করল যাবতীয় ত্রুটি শুধরানোর। কিন্তু এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। ত্রুটি কোথাও না কোথাও থেকে যায়। শুধরালেও আবার থেকে যায়। আবার থেকে যায়। আবার থেকে যায়।

মেশিন সেন্টারে কমান্ডার জিরোফ এটা নিয়ে অত্যন্ত তেতো গলায় বলল, ‘মানুষের পৃথিবীতে এ রকম ঘটত। আমরা কি মানুষ হয়ে গেছি?’

রসিকতা। জিরোফের ধরন এটা। যত তেতো গলা করে বলবে, তত উচ্চমার্গের রসিকতা হবে।

ওয়াংডু, জারিপভ এবং কোল্ট হাসল।

মেশিন–সভ্যতার সবচেয়ে ক্ষমতাধর মেশিন হলো কমান্ডার জিরোফ। ওয়াংডু, জারিপভ এবং কোল্টেরও ক্ষমতা কম নয়, কমান্ডার জিরোফ তাদেরকে এক মহাপরিকল্পনার কথা শোনাল। আরেকটা পৃথিবী তারা বানাবে।

‘পৃথিবী! আরেকটা পৃথিবী?’

ওয়াংডু, জারিপভ এবং কোল্ট একসঙ্গে বলল।

কমান্ডার জিরোফ বলল, ‘মানুষের পৃথিবী।’

পরের সাড়ে তিন লাখ বছরে আরেকটা পৃথিবী তারা বানাল।

আদিম পৃথিবী।

মানুষের পৃথিবী, মানুষ থাকবে না?

মেশিন সেন্টারে সংরক্ষিত জিন থেকে তারা কিছু মানুষ বানাল। পত্তন হলো আরেক মানবসভ্যতার। দুই লাখ বছরে এই সভ্যতা সম্পূর্ণ বিকশিত হলো। জ্ঞান–বিজ্ঞানে ব্যাপক উন্নত সভ্যতা। চমকপ্রদ সব আবিষ্কার তাক লাগিয়ে দিল মানুষকে। রেডিও, বিমান, সাবমেরিন, রকেট, টেলিফোন, কম্পিউটার, মুঠোফোন, রোবট। কাল গণনার আগে এবং কাল গণনা শুরুর পরে, এভাবে ভাগ করেছে তারা সময়কে। সেই হিসাবে কাল গণনা শুরুর পরের একুশ শতকে তারা মেশিনে এআই প্রয়োগ করে সফল হতে পারল। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মেশিন। তারা প্রথম একটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট বানাল।

ডেরেক শহর আছে এই পৃথিবীতেও। মানুষের কলোনি। অচিরে এই কলোনির মানুষেরা আত্মশ্লাঘা বোধ করবে এই ভেবে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মেশিনরা এখনো মানুষের মতো বিস্মিত হতে পারে না।

বিজ্ঞান কল্পগল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন