বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

7 x 50 থেকে শক্তিশালী বাইনোকুলার পাওয়া যায়, কিন্তু এগুলো অপেক্ষাকৃত ভারী হওয়ায় দুহাত দিয়ে ধরে রাখা মুশকিল। সে জন্য আবার দুরবিনের মতোই স্ট্যান্ড লাগবে। তবে আমাদের সুপারিশ হবে 10 x 50 বাইনোকুলারের। বাজারে 20 x 60, 12 x 80 ইত্যাদি খুব উচ্চ ক্ষমতার বাইনোকুলার পাওয়া যায়, কিন্তু এগুলোর জন্য যেমন ট্রাইপড স্ট্যান্ড লাগবে, তেমনই এদের দৃশ্যপটও অনেক ছোট হবে। ২০ x ৫০ বাইনোকুলারের দৃশ্যপট মাত্র ৩ ডিগ্রি। সে ক্ষেত্রে বাইনোকুলারের পরিবর্তে কোনো দুরবিন ব্যবহার করাই ভালো।

অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, বাইনোকুলারের (বিবর্ধনশক্তি) ী (অবজেকটিভ লেন্সের ব্যাস) এই সংখ্যাটা দিয়ে বাইনোকুলারের একটা তুলনামূলক ক্ষমতার পরিমাপ নির্ধারণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে 7 x 50 বাইনোকুলারের মান হবে 350। এই বাইনোকুলারটি দিয়ে 7 x 35 (= 245) মানের যন্ত্রের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ খুঁটিনাটি জিনিস চোখে পড়বে।

default-image

দুরবিন

নিঃসন্দেহে গুরুত্বসহকারে আকাশ দেখার জন্য দুরবিনের প্রয়োজন। দুরবিনের মূল কাজ হলো খুব অনুজ্জ্বল বস্তু থেকে যতখানি সম্ভব আলো সংগ্রহ করে তাকে উজ্জ্বল করে তোলা। বস্তুর আকার বৃদ্ধি করা হচ্ছে দুরবিনের দ্বিতীয় কাজ (বিবর্ধক শক্তি), প্রথম কাজ নয়। আলো সংগ্রহ করার ক্ষমতা লেন্সের আকারের বা সেটির ব্যাসের বর্গের ওপর নির্ভর করে। একটা 8 ইঞ্চি মাপের দুরবিন একটা 4 ইঞ্চি দুরবিন থেকে 4 গুণ বেশি আলো সংগ্রহ করবে।

যে দুরবিন দুটো লেন্স—একটা অবজেকটিভ (অভিলক্ষ লেন্স) ও একটা আইপিস (অভিনেত্র)-ব্যবহার করে তাকে প্রতিসরক দুরবিন বলা হয়। শৌখিন জ্যোতির্বিদ্যার জন্য দুই থেকে চার ইঞ্চি ব্যাসের প্রতিসরক দুরবিন সাধারণত ব্যবহার হয়ে থাকে, এরপরে প্রতিফলক দুরবিন ব্যবহার করা হয়।

প্রতিফলক দুরবিনে অবজেকটিভ হিসেবে একটা আয়না ব্যবহার করা হয়। প্রতিফলক দুরবিনের অনেক ধরনের ডিজাইন আছে—নিউটনিয়ান, ডবসনিয়ান, ক্যাটাডায়পট্রিক (স্মিড ক্যাসাইগ্রেন) ইত্যাদি। এ ধরনের দুরবিনে আয়না থেকে প্রতিফলিত রশ্মি একটা আইপিসের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়।

আগে উল্লেখ করেছি, দুরবিনের আলো সংগ্রহের ক্ষমতা অভিলক্ষ (বা অবজেকটিভ) লেন্সের (বা আয়নার) ব্যাসের ওপর নির্ভর করে। কোনো বস্তুর আকার বৃদ্ধির ক্ষমতা (বিবর্ধক শক্তি) অভিলক্ষের ফোকাল দূরত্বকে অভিনেত্রের (বা আইপিসের) ফোকাল দূরত্ব দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যাবে।

উদাহরণস্বরূপ, যদি অবজেকটিভের ফোকাল দূরত্ব fo= 1000 মিলিমিটার এবং আইপিসের ফোকাল দূরত্ব fe = 40 মিলিমিটার হয়, সেই দুরবিনের আকার বৃদ্ধির ক্ষমতা বা বিবর্ধক শক্তি ভড়/ভব = 1000/40 = 25 গুণ হবে। সেখানে 25 মিলিমিটার অভিনেত্র (আইপিস) ব্যবহার করলে ক্ষমতা হবে 1000/25 = 40 গুণ, 15 মিলিমিটারের অভিনেত্র হলে বিবর্ধক শক্তি হবে প্রায় 67 গুণ ইত্যাদি।

সমস্যা হচ্ছে আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আলোর পরিমাণ বাড়ে না, যার ফলে একই পরিমাণ আলোকে অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে হয় এবং সেই খগোল বস্তুকে ম্লান দেখায়। একটি 8 ইঞ্চি ব্যাসের আয়নার (20 সেন্টিমিটার বা 200 মিলিমিটার) দুরবিনের অভিলক্ষের ফোকাল দূরত্ব যদি হয় 2000 মিলিমিটার (fo/10), তাহলে আমার মতে 25 মিলিমিটারের আইপিস (50 গুণ শক্তি) ব্যবহার করলে মোটামুটি আলো ও আকারের সাম্যাবস্থা দেখা সম্ভব।

অনেক পর্যবেক্ষক দুরবিনের অভিলক্ষ লেন্সের ব্যাসের (D) ওপর নির্ভর করে কোনো খগোল বস্তু দেখতে পাওয়ার সর্বোচ্চ মান স (অর্থাৎ সবচেয়ে কম উজ্জ্বলতা) নির্ধারণ করেন। সেটি হচ্ছে m = 2.7+ 5log(D), এখানে ব্যাস (D) মিলিমিটারে দেওয়া হয়। তবে এই হিসাবটি আকাশের অবস্থার ওপর নির্ভর করে, একটি 8 ইঞ্চি বা 200 মিলিমিটার অভিলক্ষ লেন্স দিয়ে খুব অন্ধকার আকাশে 14.2 মানের খগোল বস্তু দেখা যেতে পারে। কার্যত আমরা যে ধরনের জায়গা থেকে পর্যবেক্ষণ করে থাকি, তাতে এই মানটিতে সহজে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

আলো সংগ্রহ করে এমন যন্ত্রগুলোতে (দুরবিন, বাইনোকুলার, ক্যামেরা, অণুবীক্ষণ যন্ত্র) f-স্টপ বা f-সংখ্যা বলে একটি মান ব্যবহার করা হয়। কোনো লেন্সের f- স্টপ= (লেন্সের ফোকাল দূরত্ব)/(তারারন্ধ্র ব্যাস)। এখানে তারারন্ধ্র ব্যাস মানে হলো পিউপিল ব্যাস, অর্থাৎ ক্যামেরার ফুটোর আকার (অ্যাপারচার) বা লেন্সের ব্যাস বোঝানো হয়েছে। ক্যামেরাতে f-স্টপের মান f/1.4, f/2, f/2.8, f/4, f/5.6, f/8 ইত্যাদি হতে পারে। নিচের সংখ্যাটা যত বড় হবে, অ্যাপারচার তত ছোট হবে, তত কম আলো চোখে বা ডিটেক্টরে এসে পড়বে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, 200 মিলিমিটার ফোকাল দৈর্ঘ্যের একটি লেন্সের অ্যাপারচার f/4 হলে, সেটার পিউপিল ব্যাস হবে (200/4) = 50 মিলিমিটার। একটি 400 মিলিমিটার লেন্স f/8 অ্যাপারচার দিয়ে একই পরিমাণ আলো দেবে, কারণ (400/8) = 50 মিলিমিটার। ফটোগ্রাফিতে ভ-স্টপের নিচের সংখ্যাটি (হর বা বিভাজক) ছোট হলে সেই লেন্সকে ভধংঃ বা দ্রুত লেন্স বলা হয়। এর মানে হচ্ছে এই অ্যাপারচারে অল্প সময়ের মধ্যে অনেক আলো সংগ্রহ করা সম্ভব।

default-image

দুরবিনকে দিনের বেলা আকাশের দিকে তাক করলে আইপিসের পেছনে একটা আলোর ছোট চক্র দেখা যায়। এটাকে এক্সিট পিউপিল (Exit pupil) বলা হয়। দুরবিনের অবজেকটিভ লেন্স বা আয়না দিয়ে সৃষ্ট প্রতিবিম্বকে আইপিসের মাধ্যমে এক্সিট পিউপিলে দেখা যায়। এই এক্সিট পিউপিলে দুরবিন-সৃষ্ট বিম্ব ও চোখ মিলিত হয়, তাই দুরবিনের এক্সিট পিউপিল ব্যাস চোখের তারারন্ধ্রের ব্যাসের সমান হলে সবচেয়ে ভালো। তাহলে দুরবিন থেকে নির্গত আলোকে পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব।

এখানে আরও দু-একটি প্যারামিটারের কথা উল্লেখ করি। অবজেকটিভের ফোকাল দূরত্বকে তার ব্যাস দিয়ে ভাগ করলে ফোকাল অনুপাত ঋজ (ঋড়পধষ জধঃরড়) পাওয়া যায়, FR = fo/D, এই ফোকাল অনুপাতকেও অনেক সময় দুরবিনের ‘গতি’ বলা হয়। ফোকাল অনুপাত যত কম হবে, দুরবিনের বিবর্ধক শক্তি তত কমবে, দৃষ্টিক্ষেত্র বা দৃষ্টিগোলক (field of view) তত বড় হবে এবং বস্তুর উজ্জ্বলতা বেশি হবে। f/4 বা f/5-এর মতো দ্রুতগতির ফোকাল অনুপাত গভীর আকাশ যেমন দূরের গ্যালাক্সি বা নীহারিকা দেখার বা ছবি তোলার জন্য উপযুক্ত। অন্যদিকে f/11 বা f/15-এর মতো ফোকাল দূরত্ব চাঁদ, গ্রহ বা জোড়া তারা দেখার জন্য উপযুক্ত। f/5 সিস্টেম দিয়ে কোনো ম্লান নীহারিকার ছবি f/10 সিস্টেমের এক-চতুর্থাংশ সময়ে তোলা যাবে, যদিও বস্তুটির প্রতিবিম্ব f/10 সিস্টেমে তোলা ছবির অর্ধেক হবে।

একটা D মিলিমিটার ব্যাসের দুরবিন দিয়ে 116/D কৌণিক সেকেন্ডের আকারের বস্তুকে বিশ্লিষ্ট করা যাবে। ধরা যাক একটি দুরবিনের ব্যাস 100 মিলিমিটার, তাহলে তার কৌণিক বিশ্লেষণ হবে 1.16 কৌণিক সেকেন্ড। অর্থাৎ দুটি তারা যদি 1.16 সেকেন্ডের কম দূরত্বে অবস্থিত হয়, তবে তাদের আলাদাভাবে দেখা যাবে না। তবে যত বড় দুরবিনই হোক না কেন, বায়ুমণ্ডলের আলোড়নের কারণে 0.5 সেকেন্ডের কম কোণের আকারকে সাধারণত বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয় না। তবে আধুনিক adaptive optics, যা কিনা প্রতিফলকের ভাগ করা আয়নাগুলোকে বায়ুমণ্ডলের আলোড়নের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে, বড় বড় দুরবিনের বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে 0.05 কৌণিক সেকেন্ডেরও নিচে নামিয়ে নিয়ে আসতে পারে।

এবার আলোচনা করা যাক কোন ধরনের বিবর্ধক শক্তি (magnification) কার্যকর হবে। সাধারণত ধরা হয় বিবর্ধক শক্তি 0.2D থেকে 2D হলে খগোল বস্তুদের ভালোভাবে দেখা যাবে। তাহলে D 100 মিলিমিটার হলে, বিবর্ধক শক্তি হবে 20 থেকে 200। M-কে -> M-কে dp -> dp বিবর্ধক শক্তি M-কে আবার এই সমীকরণ দিয়েও প্রকাশ করা যায়: M = D/dp = fo/fe, এখানে dp হলো পিউপিলের ব্যাস, fo ও fe হলো যথাক্রমে অবজেকটিভ ও আইপিসের ফোকাল দূরত্ব।

তাহলে দেখা যাচ্ছে dp = Dx(fe/fo) = D/M। অর্থাৎ M যদি 0.2D হয়, তবে dp হবে 5 মিলিমিটার। সাধারণত আমাদের চোখের মণি বা তারারন্ধ্রের আকার অন্ধকার রাতে 5 মিলিমিটার হতে পারে। কিন্তু M যদি 2D হয়, তবে dp হবে 0.5 মিলিমিটার। এই ধরনের এক্সিট পিউপিলে চোখের দেখার ক্ষমতা কম হয়, কারণ এটি আমাদের তারারন্ধ্রের আকারের থেকে কম। এই সময় আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ভূমিকা বড় হয় এবং আলোর অপবর্তন বা diffraction হয়। কাজেই সব সময় উচ্চতর বিবর্ধনক্ষমতা কাজের নয়।

ধরা যাক আমাদের একটি ৮ ইঞ্চি ব্যাসের স্মিড ক্যাসেগ্রইন প্রতিফলক দুরবিন আছে। তাহলে এটার উ হবে ২০০ মিলিমিটার। সাধারণত এসব দুরবিনের অবজেকটিভের ফোকাল দূরত্ব হয় ভড়=২০০০ মিলিমিটার। তাহলে এটার ফোকাল অনুপাত হলো fo/D =২০০০/২০০=১০। এখন আমি যদি একটা ২৫ মিলিমিটার ফোকাল দূরত্বের আইপিস ব্যবহার করি, তবে তার বিবর্ধনক্ষমতা হবে fo/fe = ২০০০/২৫=৮০ এবং এক্সিট পিউপিলের ব্যাস হবে D/M=২০০/৮০=২.৫ মিলিমিটার। এটা একটা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য পিউপিল ব্যাস, প্রায় সব পর্যবেক্ষকই ২ থেকে ৪ মিলিমিটার আকারের এক্সিট পিউপিলে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

এখন আমরা যদি বিবর্ধনক্ষমতা বাড়াতে চাই, তাহলে ছোট ফোকাল দূরত্বের আইপিস ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু মনে রাখতে হবে কোনো কোনো বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া (যেমন জোড়া তারা পর্যবেক্ষণ) উচ্চ বিবর্ধন বা magnification খগোল বস্তুকে ঝাপসা করে দেবে। যেমন ৬ মিলিমিটার আইপিস ওপরের ২০০ মিলিমিটার ব্যাসের দুরবিনকে ৩৩৩ গুণ বিবর্ধনক্ষমতা দেবে বটে, কিন্তু স্পষ্ট করে কিছু দেখা মুশকিল হবে। তা ছাড়া এক্সিট পিউপিলের আকার হবে ০.৬ মিলিমিটার, যা কিনা অপবর্তন সীমার কাছাকাছি।

তাহলে একটি দুরবিনের কোন জিনিসটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? আমি বলব প্রথম গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা হলো অপটিকস বা আলোক সিস্টেম। দুরবিনের লেন্স ও আয়নার গুণগত মান ও তাদের সারিবদ্ধকরণ (alignment) ঠিক আছে কি না, সেটা দেখা খুব প্রয়োজনীয়। একটি প্রতিফলক দুরবিন খুব বড় হতে পারে, কিন্তু অভিলক্ষ ও প্রতিফলনের আয়নার মান গুণগতভাবে ভালো না হলে এবং তাদের অভিনেত্র লেন্সের সঙ্গে রৈখিকভাবে না বসালে সেই দুরবিন কোনো কাজেই লাগবে না। দ্বিতীয় জিনিস হচ্ছে অবজেকটিভ বা অভিলক্ষের ব্যাস। এই ব্যাসটি নির্ধারণ করে দেয় কত পরিমাণ আলো দুরবিনের মধ্যে প্রবেশ করবে।

একটি 8 ইঞ্চি ব্যাসের দুরবিন একটি 4 ইঞ্চি ব্যাসের দুরবিন থেকে (8/4)2 = 4 গুণ বেশি আলো নিয়ে কাজ করবে। এর মূল কারণ একটি চক্রের ক্ষেত্রফল হচ্ছে 3.14 (D/2)2 । আমাদের চোখের তারারন্ধ্র বা পিউপিলের ব্যাস যদি হয় 4 মিলিমিটার, তাহলে একটা 8 ইঞ্চি বা 200 মিলিমিটার ব্যাসের দুরবিনের আলো গ্রহণ করার ক্ষমতা (200/4)2 = 2500 গুণ বেশি হবে। তবে অবজেকটিভের ব্যাস যত বাড়বে, দুরবিনের দামও বাড়বে এবং একটা নির্দিষ্ট মানের ওপরে (16 ইঞ্চি বা তার ওপর) এই দামটা রৈখিকভাবে বাড়ে না, কারণ বড় আকারের উচ্চ মানের আয়না তৈরি করা একটা কঠিন কাজ। আমার সুপারিশ হবে একটি ভালো বাইনোকুলারের পরে উন্নত পর্যবেক্ষণে উত্তরণের জন্য অপটিকসের 8 ইঞ্চি ব্যাসের প্রতিফলকের ব্যবহার করা।

লেখক: জ্যোতিঃপদার্থবিদ ও অধ্যাপক, মোরেনো ভ্যালি কলেজ, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

মহাকাশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন