১৯৬৪ সালে যখন আমেরিকান মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার দ্বিতীয় মঙ্গল মিশন ম্যারিনার-৪ মঙ্গল গ্রহের চারপাশে ঘুরে প্রথম মঙ্গলের ছবি পাঠাতে সক্ষম হয়, তখন মঙ্গলের ব্যাপারে মানুষের উচ্চ ধারণা মিথ্যা হয়ে যায়। দেখা যায় মঙ্গলে কোনো খালের অস্তিত্বই নেই। পৃথিবী থেকে দেখে যেগুলোকে খাল বলে ধারণা করা হয়েছিল, সেগুলো আসলে লম্বা লম্বা শুকনা ভূমি, যাতে কোনো পানি নেই। তবু সহজে আশা ছাড়েন না পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা। স্যাটেলাইট প্রযুক্তি হাতে আসার পর ১৯৬০ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ৪৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে মঙ্গলের উদ্দেশে। তার মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৭টি, আমেরিকা ২২টি, রাশিয়া ২টি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ৪টি, জাপান ১টি, চীন ১টি ও ভারত ১টি মিশন পরিচালনা করেছে। ৪৮টি মিশনের মধ্যে মাত্র ২০টি মিশন সফল হয়েছে। মিশনে সাফল্যের হার শতকরা ৪০ ভাগের কাছাকাছি হলেও বিজ্ঞানীরা দমে যাননি। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আরও অনেক মিশন পরিচালনা করা হবে মঙ্গল গ্রহে পরীক্ষা–নিরীক্ষা চালানোর উদ্দেশ্যে। ২০৩৫ সালের মধ্যে মঙ্গল গ্রহে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলো একটা প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানা, মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব কি না। নাসার অনেকগুলো সফল মিশন থেকে মঙ্গল গ্রহের বর্তমান পরিবেশ সম্পর্কে যতটুকু জানা গেছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে যে বর্তমান অবস্থায় মঙ্গল গ্রহে প্রাণ থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু এই ‘প্রাণ’ বলতে আমরা বুঝছি পৃথিবীর প্রাণরাসায়নিক ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা প্রাণ। পৃথিবীর প্রাণের মূল ভিত্তি তরল পানি। পৃথিবীতে তরল পানির অস্তিত্ব যেখানে আছে, সেখানেই প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা, মঙ্গলেও যদি পানির অস্তিত্ব থাকে, তাহলে প্রাণের অস্তিত্বও থাকবে। মঙ্গল মিশনগুলো মঙ্গল গ্রহের সবদিক থেকে হাজার হাজার ছবি তুলে পাঠিয়েছে। সঙ্গে পাওয়া গেছে অসংখ্য তথ্য-উপাত্ত। সেগুলো বিশ্লেষণ করে মঙ্গল গ্রহে পানি থাকার সম্ভাবনা আছে কি না, সে ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন বিজ্ঞানীরা।

মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ও বায়ুচাপ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ধারণা পেয়েছেন। মঙ্গলের বায়ুচাপ মাত্র ৬.১ মিলিবার। পৃথিবীর গড় বায়ুচাপ ১০১৩.২৫ মিলিবার। পৃথিবীর গড় বায়ুচাপকে আমরা হিসাবের সুবিধার্থে ১ atm বা ১ অ্যাটমোস্ফেরিক প্রেসার একক ধরে থাকি। সে হিসাবে মঙ্গলের গড় বায়ুচাপ হলো পৃথিবীর বায়ুচাপের এক হাজার ভাগের ছয় ভাগ (6.0 x 10-3) মাত্র। মঙ্গলের গড় তাপমাত্রা ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রায় পানি বরফ হয়ে যায়। সেখানে শূন্য ডিগ্রিরও ৬৩ ডিগ্রি নিচে কোনো তরল পানি থাকতে পারে না। তাপমাত্রা ও বায়ুচাপের পরিবর্তনের সঙ্গে পানির যে তিন অবস্থা তরল, কঠিন, বায়বীয়, তার পরিবর্তন ঘটে। পৃথিবীর এক বায়ুমণ্ডলীয় চাপে শূন্য ডিগ্রি থেকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানি তরল আকারে থাকে, ১০০ ডিগ্রির ওপরে গেলে পানি বাষ্পে বা বায়বীয় অবস্থায় চলে যায়, আর শূন্য ডিগ্রির নিচে গেলে পানি বরফ বা কঠিন অবস্থায় চলে যায়। বায়ুর চাপ কমতে থাকলে পানির স্ফুটনাঙ্কও কমতে থাকে। বায়ুর চাপ কমতে কমতে ৬.১ মিলিবার বা 6.0 x 10-3 atm–এর কাছাকাছি এলে ০.০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানি একই সঙ্গে কঠিন, তরল কিংবা বায়বীয় অবস্থায় থাকতে পারে। এই অবস্থাকে পানির ট্রিপল পয়েন্ট বলা হয়। মঙ্গল গ্রহের বায়ুচাপ পানির ট্রিপল পয়েন্টের বায়ুচাপের সমান। কিন্তু তাপমাত্রায় শূন্য ডিগ্রির অনেক নিচে হওয়ায় মঙ্গলে তরল পানি থাকার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। কিন্তু মঙ্গলের তাপমাত্রা দিনের বেলায় বিষুবীয় অঞ্চলে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। তার মানে সেই অঞ্চলে খুব সামান্য পরিমাণে তরল পানি থাকলেও থাকতে পারে। সেই আশায় মঙ্গলে পানির সন্ধান করে চলেছে সবগুলো আধুনিক মঙ্গল মিশন।

মঙ্গল গ্রহের ভূমিতে অসংখ্য নদী–নালা হ্রদের চিহ্ন রয়েছে, যা কালের আবর্তনে শুকিয়ে গেছে। ভূমির এসব গঠন তরল পানিপ্রবাহের প্রমাণ বহন করছে। মঙ্গল গ্রহের ভূমির উপরিস্তরে এখন কোনো তরল পানি নেই। প্রমাণ পাওয়া গেছে, মঙ্গলের ধূলি বা রেগোলিথের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রচুর বরফ জমে আছে। রেগোলিথের মাঝেমধ্যে এই রন্ধ্র বা ছিদ্রগুলো তৈরি হয়েছে জমাট কার্বন ডাই-অক্সাইড বা ড্রাই আইস থেকে। শীতকালে ড্রাই আইসের পর সামান্য ধূলি পড়লে তা আটকে যায় সেখানে। শীতের শেষে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্বন ডাই–অক্সাইড বাষ্পীভূত হয়ে যায়। তখন অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত ধুলা বা রেগোলিথের আস্তরণ ভূমিতে রয়ে যায়। এভাবে বছরের পর বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে চলতে এক মিটারেরও বেশি পুরু রেগোলিথের স্তর জমা হয়েছে ভূমির ওপর। এই ছিদ্রগুলোর মধ্যে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প জমে বরফ হয়ে থাকার সম্ভাবনা আছে।

মার্স ওডিসি মিশনের ছবি ও ডেটা থেকে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে মঙ্গলের ভূমির উপরিস্তরের কাছাকাছি প্রচুর জমাট বরফ আছে। নাসার মঙ্গল মিশন ওডিসি গামা রে স্পেকট্রোমিটারের সাহায্যে এই পানি শনাক্ত করেছে। সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্র থেকে শক্তিশালী মহাজাগতিক রশ্মি মঙ্গলের ভূমিতে আসে। ভূমির রাসায়নিক উপাদানের সঙ্গে মহাজাগতিক রশ্মির বিক্রিয়ায় ভূমি থেকে গামা রশ্মি ও নিউট্রন কণা নির্গত হয়। কী ধরনের মৌলের সঙ্গে মহাজাগতিক রশ্মির বিক্রিয়া ঘটছে, তার ওপর নির্ভর করে নিউট্রন কণাগুলোর নির্গমনের গতি। নিউট্রন কণাগুলো কত বেগে নির্গত হচ্ছে, তা শনাক্ত করা হয় মার্স ওডিসি স্যাটেলাইটের গামা রে স্পেকট্রোমিটারের সাহায্যে। দেখা গেছে মঙ্গলের ভূমির মাত্র এক মিটার নিচে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোজেনের উপস্থিতি। এই হাইড্রোজেন প্রচুর পানির উপস্থিতির প্রমাণ। ঠিক কী পরিমাণ পানি মঙ্গলের ভূমির নিচে আছে, তা সঠিকভাবে বলা এখনো সম্ভব হয়নি। তবে আনুমানিক হিসাবে দেখা গেছে, পৃথিবীর মহাসাগরগুলোতে এক শ মিটার গভীরতা পর্যন্ত যতটুকু পানি ধরবে, তার চেয়ে কম হবে না মঙ্গলের পানির পরিমাণ।

মঙ্গলের পানি কি পৃথিবীর পানির মতো সুপেয়? মার্স এক্সপ্লোরেশান রোভার ও মার্স এক্সপ্রেস অরবিটার মঙ্গলের ভূমিতে প্রচুর রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত করেছে, যেগুলোর মধ্যে আছে বিভিন্ন লবণ, সালফেট, ক্লোরেট ইত্যাদি। ভূমির স্তরের ঠিক নিচে যে জমাট পানি আছে বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, সে পানিতে লবণ ও সালফেট মিশে থাকার সম্ভাবনা খুব বেশি। ফলে মঙ্গলের পানি হবে লবণাক্ত। সাধারণ পানি শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রায় বরফে পরিণত হয়। কিন্তু লবণাক্ত পানি বরফে পরিণত হতে তাপমাত্রা আরও অনেক কম হতে হয়। -২১ ডিগ্রি তাপমাত্রায় লবণাক্ত পানি জমাট বেঁধে যায়। মঙ্গলের গড় তাপমাত্রা -৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই তাপমাত্রায় লবণাক্ত পানি জমাট বেঁধে বরফ হয়ে আছে মঙ্গলের ভূস্তরের ঠিক নিচে।

২০২০ সালের ১৭ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে উৎক্ষেপণ করা হবে মঙ্গল মিশনের মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক মিশন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই মিশন মঙ্গলে পৌঁছে দেবে আধুনিক রোভার। এই স্বয়ংক্রিয় রোভার মঙ্গলের মাটিতে পানি ও প্রাণের অস্তিত্ব পরীক্ষা করে দেখবে। ২০৩৫ সালের মধ্যে মঙ্গলের মাটিতে পা রাখবে পৃথিবীর মানুষ।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, স্কুল অব বায়োমেডিকেল সায়েন্সেস, আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া

মহাকাশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন