বিজ্ঞাপন

সূর্যের আলোর বর্ণালি মেপে সেন্সর জানিয়ে দিল ও একটি বনেদি তৃতীয় প্রজন্মের নক্ষত্র। এমন নক্ষত্রের শরীরে অনেক ভারী অণু জোটে জন্মসূত্রে, তাই এদের গ্রহে জীবন সৃষ্টি হতে পারে সহজেই। সূর্যের আশপাশে নেই কোনো ও এবং বি গোত্রের নক্ষত্র, নেই কোনো কৃষ্ণগহ্বর, জীবিত প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য জায়গাটা বেশ নিরাপদ। প্রাণ খুঁজে পাওয়ার আশাটা বেড়ে গেল কয়েক গুণ! একটু পরেই সেন্সর জানিয়ে দিল সুখবরটা, অগণিত জলীয় বাষ্প মেঘ হয়ে ঘিরে রেখেছে একটি সবুজ গ্রহ, প্রাণের স্পন্দনে ভরপুর। চোখ জুড়িয়ে গেল। গোপনে মানুষের বেশ ধরে পৃথিবীর বুকে কাটিয়ে দিলাম কয়েকটি বছর। এখানকার জীবন কার্বনকেন্দ্রিক, আমাদের মতো সিলিকনকেন্দ্রিক নয়। তাই এরা আমাদের মতো দ্রুত অঙ্ক করতে পারে না। তবে এরা সিলিকন চিপস দিয়ে অতি নিম্নমানের কম্পিউটার বানানো শিখে গেছে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে এরা আমাদের চেয়ে কোটি বছর পিছিয়ে আছে। এদের মধ্যে আইনস্টাইন বলে এক বিজ্ঞানী জন্মেছিলেন, তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্ব পড়ে বেজায় মজা পেয়েছি। তবে এই তত্ত্বের গভীরে আরও যেসব মুক্তা পড়ে আছে, তার সন্ধান এরা এখনো পায়নি। এদের টেকনোলজি দেখে হাসি পায়, ইতিহাসের বইয়ে যেমন পড়েছিলাম। এদের রকেটের পেছন থেকে গ্যাস বের হয়, এমন রকেটে চড়ে ছায়াপথ পার হতেই লাগবে দুই লাখ কোটি বছর।

এখানে দুই ধরনের জীবনের সৃষ্টি হয়েছে, গাছ এবং প্রাণী। এর মধ্যে একমাত্র গাছ সূর্যের আলো, বাতাসের কার্বন ডাইঅক্সাইড এবং পানি মিশিয়ে খাদ্য বানাতে জানে, নিরামিষভোজীরা সরাসরি এবং বাকি প্রাণীরা একে অপরকে খেয়ে পরোক্ষভাবে সেই খাবারে ভাগ বসায়। মানুষ এখানকার সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। কিন্তু অজৈব পদার্থ থেকে খাদ্য বানানোর কৌশল ওদের জানা নেই। প্রতিদিন পৃথিবীতে প্রায় ২০ লাখ শিশু আধপেটা খেয়ে দিন পার করে, ক্ষুধার জ্বালায় ওদের ঘুম আসে না, মায়ের বুকে আছড়ে পড়ে হাহাকার করে—নৃশংস একটি ব্যাপার।

শহর থেকে দূরে, মেঘবিহীন আঁধার রাতে নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে একবার চেয়ে দেখুন। খালি চোখে যত তাঁরা দেখছেন, সবাই ছায়াপথের তারা। সূর্যের আয়তন পৃথিবীর চেয়ে ১৩ লাখ গুণ বড়, ছায়াপথে আছে সূর্যের মতো আরও ৪০ হাজার কোটি নক্ষত্র। এর মধ্যে খালি চোখে হাজার দশেক নক্ষত্র আমাদের চোখে পড়ে। ছায়াপথের এপার থেকে ওপারে যেতে আলোর লাগে ১ লাখ ২০ হাজার বছর। ছায়াপথ একটি চক্রাকার প্যাঁচানো গ্যালাক্সি, গরুর গাড়ির চাকার মতো ভাবতে পারেন, তবে মাঝখানের অংশ বেশ মোটা। এই বিশাল গালাক্সি চক্রাকারে ঘুরছে, সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছি আমরা, আমাদের সূর্য, আরও ৪০ হাজার কোটি তারা। আকাশের ধ্রুবতারা কি খুঁজে বের করতে পারেন? ওর আশপাশেই পাবেন তারাপুঞ্জ লাঙল (Big Dipper or Ursa Major), নক্ষত্রপুঞ্জ ক্যাসিওপিয়া (Star constellation Cassiopeia) আর রাজহাঁস পেগাসাস (Pegasus, the Swan)। ক্যাসিওপিয়া এবং পেগাসাসের মাঝামাঝি একটি অস্পষ্ট ঘোলাটে তারা দেখতে পাবেন, যা ছায়াপথের বাইরের জগতের। ও কিন্তু তারা নয়, ও আমাদের প্রতিবেশী এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি।

গ্রিক পুরাণ কাহিনিমতে, এন্ড্রোমিডা হলো মিসরের রানি ক্যাসিওপিয়ার মেয়ে। রাজকুমারী এন্ড্রোমিডা কি জলপরিদের চেয়েও সুন্দরী? রূপসী রাজমহিষী ক্যাসিওপিয়া তাই ভাবতেন, নিজের এবং মেয়ের রূপ নিয়ে বড্ড বড়াই করতেন! খেপে গিয়ে জলের দেবতা রাজকুমারীর পায়ে শিকল দিয়ে নদীর ধারে এক পাথরের সঙ্গে বেঁধে রাখেন। দেবকুমার পার্সিয়াস উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে পেগাসাসের পিঠে চড়ে ছুটে এলেন, জলদস্যুদের সঙ্গে বাধল তুমুল লড়াই, বন্দী রাজকুমারী মুক্তি পেলেন, দেবকুমার এবং রাজকুমারী প্রেমের সুতায় পড়লেন বাঁধা। মৃত্যুর পরে মা আর মেয়ের স্থান জুটেছে আকাশের ওই কোনায়। এন্ড্রোমিডা সবচেয়ে দূরতম জিনিস, যা পৃথিবী থেকে খালি চোখে দেখা যায়। আলোর গতিতে চললে ২৫ লাখ বছর লাগবে ওখানে পৌঁছাতে! যদি আলোর বেগে ছুটতে পারেন চাঁদে পৌঁছাবেন এক সেকেন্ডে, সূর্য আট মিনিটে, প্লুটো ছয় ঘণ্টায়। এন্ড্রোমিডার যে আলো এখন দেখছেন তা এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি থেকে ২৫ লাখ বছর আগে রওনা হয়েছিল। পৃথিবীর বুকে তখন ডাইনোসরদের রাজত্ব শেষ হয়ে গেছে, মানুষ বলে কোনো প্রাণীর কথা কেউ জানে না। ছায়াপথের সীমানা পেরিয়ে আরও দুটি জিনিস খালি চোখে দেখা যায়, Large Magellanic Cloud, এবং Small Magellanic Cloud, ওরা মেঘ নয়, ওরা ছায়াপথের দুই উপগ্রহ গ্যালাক্সি। ওদের দেখতে অবশ্য পৃথিবীর দক্ষিণপাড়ায় (Southern Hemisphere) যেতে হবে। মহাবিশ্বে গ্যালাক্সিগুলো দলবদ্ধ হয়ে থাকে। এই দলগুলোকে বলা হয় ক্লাস্টার। এই ক্লাস্টারগুলোও আবার জটলা পাকায়, ওদের বলে সুপার ক্লাস্টার। মহাবিশ্বে আমাদের ঠিকানা এভাবে লেখা যেতে পারে:

গ্রহ-পৃথিবী, নক্ষত্র-সূর্য, গ্যালাক্সি-ছায়াপথ, ক্লাস্টার-লোকাল গ্রুপ, সুপার ক্লাস্টার-ভার্গো, গ্যালাক্সি পুঞ্জ-ল্যানিয়াকিয়া আশপাশের দর্শনীয় স্থান—দ্য গ্রেট অ্যাট্রাক্টর কোটি কোটি কোটি সুপার ক্লাস্টার নিয়ে গড়া এই মহাবিশ্ব।

ছায়াপথের তুলনায় পৃথিবী মৃত্কণা। মহাবিশ্বের তুলনায় ছায়াপথ ধূলিকণা!

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

মহাকাশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন