সাগান বইটির প্রতি পদে সমাজের সাধারণ ঘটনাবলির সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্কগুলো তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। তিনি এগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে এমন এক আবেগ অনুভব করেছিলেন যে আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিজ্ঞানের বর্ণনাকে তিনি কাব্যের পর্যায়ে নিয়ে এসেছিলেন। ১৯৮০ সালে কসমস বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। এটি ইংরেজি ভাষায় রচিত সবচেয়ে পঠিত বিজ্ঞান বইগুলোর একটি। প্রায় ৫০ লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল। বইটি এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে কসমস-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ১৩ পর্বের টিভি সিরিজটি ৬০টি দেশের প্রায় ৫০ কোটি দর্শক মোহিত হয়ে দেখেছিলেন। সিরিজটি ১৯৮৫ সালের দিকে বাংলাদেশের টেলিভিশনেও দেখানো হয়েছিল। আমি নিজেও কসমস ও কার্ল সাগানের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম এই টিভি সিরিজের মাধ্যমে।

কসমস বইয়ের ভূমিকায় সাগান খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ বছর আগের একটি কবিতার উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, ‘প্রাচীনকালে প্রাত্যহিক কথাবার্তা ও রীতিনীতির ভেতরে সবচেয়ে পার্থিব ঘটনাপ্রবাহও মহাজাগতিক ঘটনাবলির সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রাচীন পূর্বপুরুষদের কল্পনায় ওই ধরনের বিশ্বে মানুষ কেন্দ্রীয় না হলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। আমরা প্রকৃতির বাকি অংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।’ কসমস বইয়ে ভূমিকা ছাড়াও ১৩টি অধ্যায় আছে, প্রতিটি অধ্যায়ের আছে কাব্যময় শিরোনাম এবং অধ্যায়গুলো পরস্পরের সঙ্গে একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক তৈরি করেছে, আবার এগুলোকে স্বতন্ত্র হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি, মহাজাগতিক ঐকতানে এক অনুপম সুর, জগতের শৃঙ্খলা, স্বর্গ আর নরক, একটি লাল গ্রহের জন্য নীল, পথিকের গল্প, রাত্রির মেরুদণ্ড, স্থান ও সময়ের ভেতর ভ্রমণ, নক্ষত্রের জন্ম–মৃত্যু, চিরকালের প্রান্ত, স্মৃতির আঁধার, এনসাইক্লোপেডিয়া গ্যালাক্টিকা—কারা পৃথিবীর জন্য কথা বলবে?

কসমস-এর প্রথম অধ্যায়, মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমিতে বলা হয়েছে যে মানব প্রজাতি বিবর্তিত হয়েছে বিস্মিত হওয়ার জন্য, সে বিস্ময় নিবৃত্তি হচ্ছে ‘আনন্দ’ আর বেঁচে থাকার পূর্বশর্ত হচ্ছে ‘জ্ঞান’। সাগান এখানে বিশালতায় ভরা বিশ্বকে আমাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, বিশ্বের সংজ্ঞায় বলেছেন যা কিছু আছে, যা কিছু ছিল আর যা কিছু থাকবে, তার সবটা মিলেই হচ্ছে এ মহাবিশ্ব। গ্যালাক্সি, গ্রহ–নক্ষত্রের বর্ণনাসহ তাদের অপরূপ সৌন্দর্যের কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। সেই সঙ্গে এই অপরিমেয় বিশালতায় ভরা মহাবিশ্ব সম্পর্কে কতটা জানি, সে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘এই জানার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের টিকে থাকা।

‘মহাবিশ্বের বিশালতা ও এর গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহের বর্ণনা শেষে মহাজাগতিক সমুদ্রে হারানো আমাদের ক্ষুদ্র ভঙ্গুর নীল-সাদা পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে। পৃথিবীটা হলো আমাদের ঘর, আমাদের জন্মভূমি। মানব প্রজাতি এখানে বিকশিত হচ্ছে। এটা হলো সেই জগৎ, যে জগতে আমরা আমাদের আবেগ ও ইচ্ছাকে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শনের জন্য উন্নত করেছি।’

মস্তিষ্ক সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘আর-কমপ্লেক্সকে ঘিরে আছে যে অংশটা, তা হলো লিম্বিক সিস্টেম অথবা স্তন্যপায়ীদের মস্তিষ্ক, যার উদ্ভব ঘটেছিল কোটি কোটি বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে, “লিম্বিক সিস্টেম” হলো আমাদের মেজাজ-মর্জি, আবেগ, উদ্বেগের এবং নবীনদের প্রতি স্নেহ-বাত্সল্যের একটা বড় উত্স। মস্তিষ্কের আগের আদিম অংশগুলোকে নিচে রেখে এবং তাদের সঙ্গে বৈরিতামূলক সহাবস্থান বজায় রেখে লাখ লাখ বছর আগে আমাদের প্রাইমেট পূর্বপুরুষদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল সেরেব্রাল কর্টেক্স। সেরেব্রাল কর্টেক্স এখানে আছে বলে আমাদের আছে ধারণা ও প্রেরণা, এটা এখানে বলেই আমরা পড়ালেখা করি, এখানে বলেই গণিতশাস্ত্র নিয়ে মাথা ঘামাই, সংগীত রচনা করি, কবিতা লিখি। কর্টেক্স আমাদের সচেতন জীবনযাপনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটা হলো আমাদের প্রজাতির স্বতন্ত্রতা, মানবিকতার আবাসস্থল। সভ্যতা হলো “সেরেব্রাল কর্টেক্সের” একটি ফলাফল। মানুষের মধ্যে শুভ ও অশুভ প্রবৃত্তির যে চিরন্তন দ্বন্দ্ব, তা প্রকৃতপক্ষে আর-কমপ্লেক্সের সঙ্গে লিম্বিক সিস্টেম ও সেরেব্রাল কর্টেক্সের বিরোধ।’

আয়োনিয়া, আলেক্সান্দ্রিয়ার ঘটনা থেকে বোঝা যায়, কোনো এক অঞ্চলে একটি সভ্যতা কিছুদিন পর আপন ইচ্ছায় ধ্বংস হয়ে যায়। রাজনৈতিক সামাজিক অনেক কারণই হয়তো। ঢাকা শহর তার উদাহরণ হতে পারে। সাগান বলেছেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরমাণু অস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষমতাধর দেশ ছাড়াও ছোট দেশগুলো নানা মাত্রায় পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। আর বলছে, তাদের দেশের জনগণের অধিকতর নিরাপত্তা বিধানে তারা এই কাজ করছে। কিন্তু পৃথিবী আবহাওয়া ক্রমাগতভাবে মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। তেজস্ক্রিয়তার কারণে নানা ধরনের মরণব্যাধি বেড়ে যাচ্ছে। সবাই তার দেশ এবং জাতির জন্য কথা বলছে। কিন্তু পৃথিবীর জন্য কারা কথা বলবে? পৃথিবীকে এই ভয়াবহ বিপদ থেকে কারা রক্ষা করবে? এটা তো সত্যি, এই পৃথিবী না বাঁচলে এই জাতি–রাষ্ট্র কোনো কিছুই থাকবে না।

পৃথিবীতে বিজ্ঞান বইয়ের ইতিহাসে কসমস এমন একটা বই, যেখানে বিজ্ঞানের বর্ণনাকে কাব্যময়তার জগতে নিয়ে আসা হয়েছে। যেখানে গণিতের যুক্তি বিজ্ঞানের তত্ত্ব ইতিহাসের কাহিনি আর চলচ্চিত্রের নাটকীয়তার এক মহাসমাবেশ ঘটানো হয়েছে। এ জন্য বিজ্ঞানকে খাটো করতে হয়নি। সাধারণ মানুষকে বোঝানোর জন্য ‘জনপ্রিয় বিজ্ঞান’ বলে কোনো নতুন বিভাগ খুলতে হয়নি। বিজ্ঞান মানুষের কাছে ধরা দিয়েছে আরও ব্যাপকতা নিয়ে আরও গভীরভাবে। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, এই মহাবিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চলই খালি। সেই তুলনায় আমাদের অবস্থান কত ক্ষুদ্র। প্রাণ কোনো বিশেষ ব্যাপার নয়। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে বিশ্বের যেকোনো জায়গায় প্রাণের উদ্ভব সম্ভব। ইতিহাসের পর ইতিহাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, সাংস্কৃতিক পার্থক্য, মূল্যবোধের অভাব, সামান্য লোভ আর তুচ্ছ সব কারণে পৃথিবীর এক সভ্যতা আরেক সভ্যতাকে কত নির্মমভাবে ধ্বংস করেছে। এসব উদাহরণ থেকে সাগান বলেছেন, ‘আমাদের টিকে থাকতে হলে, পৃথিবীকে অর্থবহ করে তুলতে হবে আমাদের প্রশ্ন করার সাহস এবং উত্তরের গভীরতা দ্বারা।’ বর্তমান সভ্যতার প্রেক্ষাপটে তিনি এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে উন্নতির সঙ্গে বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির যদি সমন্বয় ঘটানো না যায়, তাহলে পুনরায় মধ্যযুগের মতো অন্ধকার যুগ আসন্ন।

লেখক: বিজ্ঞান বক্তা

মহাকাশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন