এতে হয় কী? এখানে একেকটা হিসাবের কাজ হয় একেক রেজিস্টারে। রেজিস্টারে তথ্য আসে বাইনারি 1 আর 0 হিসাব, এরপর তা নিয়ে হিসাব করা হয়। একেক সাইজের রেজিস্টার একেক রকম দ্রুততার সঙ্গে কাজ করে, যেমন 64bit প্রসেসর 32bit প্রসেসরের থেকে দ্রুত কাজ করতে পারে।

সুপার কম্পিউটারে নোডের সংখ্যা অনেক বেশি থাকে, তাই তাতে রেজিস্টারও অনেক বেশি থাকে, ফলে খুব দ্রুত অনেক বড় হিসাব করতে পারে। এখন এভাবে চলতে থাকলে আসলে আমাদের ভবিষ্যতে বিশাল বিশাল সুপার কম্পিউটার লাগবে, বর্তমানে যা আছে, তার থেকেও বিশাল! তাই বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ধারণা নিয়ে আসেন। আর আমরা দৈনন্দিন যেসব কম্পিউটার ব্যবহার করছি, সেগুলোর নাম দেন ক্ল্যাসিক্যাল কম্পিউটার। আমরা তো এতক্ষণ দেখলাম যে ক্ল্যাসিক্যাল কম্পিউটার 0 আর 1—এই দুই স্টেটে (বা লজিক্যাল অবস্থা; আরও সহজ করে বললে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’) কাজ করে। ফলে বড় হিসাবের জন্য বেশি রেজিস্টার দরকার, কম্পিউটারের আকার বড় করা দরকার অথবা রেজিস্টারের আকার আরও ছোট করে কোয়ান্টাম প্রসেসর তৈরি করা দরকার। তাই এখন কোয়ান্টাম মেকানিকসের জগতে প্রবেশ করতে হয়েছে, যার ফলে কোয়ান্টাম কম্পিউটার আমাদের ক্ল্যাসিক্যাল কম্পিউটারগুলোর থেকেও একটু গভীরে যেতে পারে। গভীরে বলতে তা 0 আর 1—এই দুই স্টেট ছাড়া আরও কিছু মধ্যবর্তী স্টেট বিবেচনা করে সেই স্টেটগুলোকে তিন রকম প্রক্রিয়ার (ব্যতিচার, উপরিপাতন আর কোয়ান্টাম অ্যান্টাঙ্গেলমেন্টের মাধ্যমে) ভেতর দিয়ে এনে ফলাফল হিসাবে এক বিট তথ্য দেয়। অর্থাৎ আগে যে কাজ করতে লাগত ১ সেকেন্ড, কোয়ান্টাম কম্পিউটার সেটিকে আরও অনেক অংশে ভাগ করে নেওয়ায় তা অর্ধেকের কম সময়ে করে ফেলতে পারছে। এই মধ্যবর্তী অবস্থাগুলোকে কোয়ান্টাম বিট বা কিউবিট (qubit) বলে।

একটি ক্ল্যাসিক্যাল কম্পিউটার যে গতিতে কাজ করে, একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার তার তুলনায় সূচকীয় হারে অর্থাৎ কয়েক গুণ দ্রুতগতিতে কাজ করে। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের জগতে মূল চ্যালেঞ্জ হলো যখন আমাদের হিসাবের জটিলতা বা গণনার আকার ক্রমেই সূচকীয় হারে ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পাবে, এই কম্পিউটার যেন তা সূচকীয় হারে দ্রুতগতিতে সমাধানের দিকে পৌঁছাতে পারে। গুগল কোয়ান্টামের জগতে আধিপত্য দাবি করছে মূলত এই আবিষ্কারের ফলেই। গুগল কিছুদিন আগেই একধরনের কোয়ান্টাম প্রসেসর তৈরি করেছে, যা এমন কোয়ান্টাম বিট বা কিউবিটে সূচকীয় গতিতে হিসাব করতে সক্ষম। 253 লজিকের একেকটি তথ্যকে ‘কোয়ান্টাম কম্পিউটার’ মাত্র 53টি কিউবিটেই সমাধান করে ফেলতে পারে। শুধু তা–ই নয়! গুগল থেকে সম্প্রতি যে কোয়ান্টাম প্রসেসর তৈরি করা হয়েছে, তার নাম Sycamore, যা একটি ক্ল্যাসিক্যাল কম্পিউটারের থেকে কয়েক শ গুণ বেশি গতিসম্পন্ন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নতুন প্রসেসরের গতি তুলনা করতে স্যুডো র৵ান্ডম কোয়ান্টাম সার্কিট তৈরির জন্য হিসাব করতে দেওয়া হয়েছিল IBM–এর তৈরি একটি ক্ল্যাসিক্যাল কম্পিউটারকে এবং আরেকটি দেওয়া হয় Sycamore প্রসেসরের কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে। তখন দেখা যায়, যে কাজ 200 সেকেন্ডে শেষ করা যায় Sycamore–এ, সেই কাজ ক্ল্যাসিক্যাল কম্পিউটারে করতে সময় লাগে প্রায় 10000 বছর। কীভাবে এটি করছে এই কোয়ান্টাম প্রসেসর? এত দিন কিউবিট তৈরি করে কোয়ান্টাম কম্পিউটার কাজ করত, কিন্তু এবার যা যুগান্তকারী কাজটি বিজ্ঞানীরা করে ফেলেছেন, তা হলো নতুন সিলিকন সেমিকন্ডাক্টর ক্রিস্টাল তৈরি। অর্থাৎ, এবার তৈরি হলো কোয়ান্টাম প্রসেসর, যেটি একধরনের সিলিকন সেমিকন্ডাক্টরের ক্রিস্টাল দিয়েই তৈরি একধরনের ল্যাটিস, যে ল্যাটিসে কিউবিট তৈরি করে প্রসেসিংয়ের কাজ করে ফেলবে। এভাবেই গুগল তার চোখ ধাঁধানো সব আবিষ্কার দিয়ে দ্রুতই কোয়ান্টামের জগতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের দাবি জানান দিচ্ছে আমাদের কাছে।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

প্রযুক্তি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন