করোনা ভ্যাকসিন
করোনা ভ্যাকসিনরয়টার্স

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন দৌড়ে এ মুহূর্তে সবচেয়ে এগিয়ে আছে যে দুটো ভ্যাকসিন সে দুটোই এম-আরএনএ ভ্যাকসিন। এম-আরএনএ (mRNA) হলো মেসেঞ্জার আরএনএ। জীবকোষের কার্যকারিতার জন্য অপরিহার্য এই এম-আরএনএ একজন মেসেঞ্জারের মতোই কাজ করে। জীবকোষের নিউক্লিয়াস এ ট্রান্সক্রিপশন নামে এক জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কোষের জেনোম বা ডিএনএকে অনুসরণ করে তৈরি হয় আরএনএ। আর সেই আরএনএ কে কেটে ছেঁটে ট্রান্সলেশন নামে আরেক ধরনের বিক্রিয়ায়, প্রোটিন তৈরি করতে উপযোগী করে তোলার প্রয়োজনে তৈরি হয় এম-আরএনএ। এ প্রক্রিয়ায় ঠিক এম-আরএনএ পরিবর্তিত হয়ে প্রোটিন তৈরি হয় তা নয়। নিউক্লেয়াসে থাকা জেনোম বা ডিএনএর কোডগুলোকে বহন করে নিয়ে যায় সাইটোপ্লাজমে। সেখানে এম-আরএনএতে উপস্থিত কোডের ভিত্তিতে বিভিন্ন রকমের অ্যামাইনো অ্যাসিড একে অন্যের সাথে জুড়ে তৈরি হয় হাজারো রকমের প্রোটিন। ব্যাপারটা অনেকটা হরেক রঙের বা আকারের পুঁতি দিয়ে মালা গাঁথার মতো। মালা গাঁথার সময় যেমন আমাদের মস্তিস্ক বলে দেয় কোন পুঁতি যোগ করতে হবে, প্রোটিন তৈরি করার সময় এম-আরএনএ তে সংরক্ষিত কোড অনুযায়ী অ্যামাইনো এসিডগুলো যোগ হতে থাকে। জীবকোষের অপরিহার্য উপাদান এই এম-আরএনএ কি করে ভ্যাকসিন তৈরির প্রচেষ্টায় যুক্ত হলো?

বিজ্ঞাপন

ভ্যাকসিন তৈরির উদ্দেশ্য হলো কোনো সুনিদৃস্ট রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়ার জন্য আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কে প্রশিক্ষিত করে তোলা। আর তা করার জন্য আমাদের শরীরে এমন একটা কিছু প্রয়োগ করা প্রয়োজন যা কোনো ক্ষতি সাধন করা ছাড়াই আমাদের শরীরকে চিনিয়ে দেবে সে রোগজীবাণুটিকে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে যেমনটি করেছিলেন ভ্যাকসিন বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা এডওয়ার্ড জেনার। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে কাউপক্স আক্রান্ত গোয়ালিনীদের গুটিবসন্ত হয় না। সে ধারণা থেকেই কাউপক্স ভাইরাস দিয়ে প্রতিরোধ করেছিলেন স্মলপক্স ভাইরাসকে বা গুটিবসন্ত রোগকে, যা সেসময় ছিল মরণব্যাধি। এ কাজটি সম্ভব হয়েছিলো এ কারণেই যে কাউপক্স ভাইরাসের সাথে স্মলপক্স ভাইরাসের অনেক মিল রয়েছ। আবার যেহেতু কাউপক্স ভাইরাস মানুষের শরীরে গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে না তাই। পরে অবশ্য গুটিবসন্তের ভ্যাকসিন পাল্টে যায় বিভিন্ন সময়ে। একে একে নতুন নতুন প্রযুক্তি যোগ হয় ভ্যাকসিনবিজ্ঞানে। ভ্যাকসিন হিসেবে একে একে ব্যবহৃত হয়: নিষ্ক্রিয় করা জীবাণু, যেমন—জলাতঙ্ক ও পোলিও ভাইরাসের ভ্যাকসিন; ব্যবহার করা হয়, জীবিত কিন্তু ‘এটিনিউটেড’ বা বিবশ করা জীবাণু, যেমন—বিসিজি, মিজেলস, মাম্পস ও রুবেলা ভ্যাকসিন; এছাড়া জীবাণুনিসৃত টক্সিন, যেমন—ডিপথেরিয়া ও টিটেনাসের ভ্যাকসিন ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে জিন প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে নতুন মাত্রা তৈরি করে রিকম্বিনেন্ট প্রোটিন ও কঞ্জুগেট ভ্যাকসিন যেমন হেপাটাইটিস-বি, হিব, হুপিং কফ, নিউমোকক্কাল ও মেনিনগোকক্কাল ভ্যাকসিন তৈরি হয়।

যে ধরনের ভ্যাকসিনই হোক না কেন, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার মূলমন্ত্র হলো: কোন একটি জীবাণুর বিরুদ্ধে আগে থেকেই ইমিউনিটি তৈরি করে রাখা। জীবাণুর বিরুদ্ধে তৈরি এন্টিবডিও এর একটি অংশ। এই ইমিউনিটি হতে পারে নিষ্ক্রিয় বা বিবশ করা ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে অথবা জীবাণুর শারীরিক কাঠামোর অংশ সুনিদিস্ট কোন প্রোটিন বা পলিসেকারাইেডর বিরুদ্ধে। জিন প্রযুক্তির বদৌলতে আজকাল খুব সহজে এক জীবাণুর প্রোটিন অন্য অণুজীব বা প্রাণীদেহে তৈরি করা যায়। এ ধারণা থেকে ডিএনএ বা আরএনএ ভ্যাকসিনের আইডিয়ার জন্ম। আবার যেহেতু জীবকোষের বাইরেও কৃত্তিমভাবে ও বাণিজ্যিকহারে আরএনএ তৈরি করা সম্ভব, এম-আরএনএ ভ্যাকসিনের লক্ষ-কোটি ডোজ তৈরি করাও অসম্ভব নয়। ১৯৯০ সালে প্রথম প্রাণীদেহে এম-আরএনএ প্রয়োগ করে প্রত্যাশিত প্রোটিন তৈরি করার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। সেসময় রোগজীবাণু নয়, বরং ক্যান্সার এর ভ্যাকসিন হিসেবে ব্যবহার করার লক্ষ্য নিয়েই আসলে এ গবেষণার সূত্রপাত হয়। কিন্তু জীবকোষে এম-আরএনএ ভ্যাকসিনের সফল ডেলিভারি, শরীরে অনভিপ্রেত বিক্রিয়া ও ভ্যাকসিনের স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দেহের কারণে এ গবেষণায় খুব একটা জোর দেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

গত এক যুগ ধরে জীবকোষে এম-আরএনএ ডেলিভারি ও প্রাণীদেহে এর স্থায়িত্ব নিয়ে গবেষণায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এম-আরএনএর কাঠামো ও কোডে পরিবর্তন এনে এর স্থায়িত্ব বাড়িয়ে, ও লিপিড ন্যানোপার্টিকলে এর আবরণে আবদ্ধ করে এম-আরএনএ পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে জীবকোষের অভ্যন্তরে। করোনা মহামারীর আগেই বিভিন্ন রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে এম-আরএনএ ভ্যাকসিনের সফল পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয়েছে ইঁদুর, খরগোশ ও মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণীতে। এমনকি প্রথম ধাপের ক্লিনিকাল ট্রায়ালও শুরু হয়ে গিয়েছিলো অনেক এম-আরএনএ ভ্যাকসিন; যার মধ্যে আছে ইনফুয়েঞ্জা, এবোলা, জিকা ও চিকুনগুনিয়ার ভ্যাকসিন। তবে কোভিড-১৯ করোনাভাইরাসের এম-আরএনএ ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা যে পর্যায়ে এসেছে সে পর্যায়ে আসেনি অন্য কোন ভ্যাকসিন। বলা বাহুল্য, অবিশ্বাস্য এই দ্রুত অগ্রগতির পিছনে রয়েছে গত এক যুগের এসব সঞ্চিত অভিজ্ঞতা।

করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণের জরুরি প্রয়োজন ভ্যাকসিন জগতে নিয়ে এসেছে এক মহা আলোড়ন। বর্তমানে একশোরও বেশি ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ চলছে। ক্লিনিকাল ট্রায়ালে আছে সর্বমোট ৫৪টি ভ্যাকসিন। এর মধ্যে আছে প্রচলিত সব ভ্যাকসিন টাইপ থেকে শুরু করে এডেনোভাইরাস-ভিত্তিক ভ্যাকসিন ও এম-আরএনএ ভ্যাকসিন। এডেনোভাইরাস-ভিত্তিক ভ্যাকসিন যেমন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন, রাশিয়ার স্পুৎনিক-৫ ও চীনের ক্যানসিনো বায়ো ভ্যাকসিন ক্লিনিকাল ট্রায়ালের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ পেরিয়ে এতদিন মূল আলোচার কেন্দ্রে ছিল। মডার্নার এম-আরএনএ ভ্যাকসিনও ছিল অগ্রভাগে। কিন্তু এ মুহূর্তে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ফাইজার-বায়নটেকের এম-আরএনএ ভ্যাকসিন। ক্লিনিকাল ট্রায়ালের তৃতীয় ধাপে ৪৩ হাজার লোকের মধ্যে প্রয়োগ করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ কার্যকারিতা দেখিয়েছে এ ভ্যাকসিন। তা উল্লেখযোগ্য কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই। একই ধরণের সাফল্য দেখিয়েছে মডার্নার এম-আরএনএ ভ্যাকসিন। তার উপরে মডার্নার এম-আরএনএ ভ্যাকসিনের রয়েছে সংরক্ষণজনিত বাড়তি সুবিধে। যেখানে ফাইজার-বায়নটেক ভ্যাকসিন মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর নিচের তাপমাত্রায় সংরক্ষিত করতে হয়। মডার্নার ভ্যাকসিন সাধারণ রেফ্রিজারেটরে একমাস পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকে আর ডিপ ফ্রিজে (-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়) ছয় মাস পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকে।

ইতিমধ্যে এফডিএতে ইমার্জেন্সি ইউজ অথোরাইজাসন এর জন্য আবেদন করেছে ফাইজার-বায়নটেক। মডার্নাও দু-এক সপ্তাহের মধ্যে আবেদন করবে বলে জানা যাচ্ছে। সব ঠিকভাবে চললে এ বছরের শেষ নাগাদ প্রথম বারের মতো দু-দুটো এম-আরএনএ ভ্যাকসিন অনুমোদন পাবার সম্ভাবনা আছে। অনুমোদনের পরেও রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। ব্যাপক হরে ভ্যাকসিন উৎপাদন, মান-নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও সরবরাহ। তাছাড়া ক্লিনিকাল ট্রায়ালে পাশ করে অনুমোদন পেলেই শেষ নয়। একটি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও এ থেকে কতটুকু সুরক্ষা পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিত করতে বছরের পর বছর লেগে যায়। ক্লিনিকাল ট্রায়ালের বাইরেও প্রয়োজন হয় প্রয়োগ-পরবর্তী বাস্তবভিত্তিক অভিজ্ঞতা। প্রয়োজন ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে নিয়মিত মনিটরিং।

এম-আরএনএ-ভ্যাকসিন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে এক নতুন প্রযুক্তির নাম। দীর্ঘ একযুগেরও বেশ ধরে এ ধরণের ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ চলছে। কিন্তু এপর্যন্ত এ জাতীয় ভ্যাকসিনের সফল প্রয়োগের কোনো উদাহরণ নেই পৃথিবীতে। সফল ভাবে প্রয়োগ করা গেলে ভ্যাকসিন প্রযুক্তিতে এক নতুন বিপ্লব নিয়ে আসবে কোভিড ১৯ করোনাভাইরাসের এই ভ্যাকসিন।

লেখক: ক্লিনিকাল মলিকুলার মাইক্রোবায়োলোজিস্ট, সিদরা মেডিসিন এবং সহকারী অধ্যাপক, ওয়েল কর্নেল মেডিকেল কলেজ, দোহা, কাতার

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন