default-image

ড. এহসান হক। জন্ম ঢাকায়, ১৯৮১ সালে। ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকের পাট চুকিয়ে পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ২০০৪ সালে ইলেকট্রিক্যাল ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক। স্নাতকোত্তর, মেমফিস বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৭ সালে। এরপর ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মিডিয়া ল্যাব থেকে পিএইচডি ও গবেষণা। তিনি উদ্ভাবন করেছেন ম্যাক ও লিসা নামের দুটি কম্পিউটার সিস্টেম। সেগুলো মুখভঙ্গি দেখে মানুষের কথা বুঝতে পারে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ’-এ ৩৫ বছরের কম বয়সী সেরা গবেষকদের নামের তালিকায় তাঁর নাম উঠে আসে। বর্তমানে তিনি রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

সম্প্রতি দেশে এসেছিলেন ড. এহসান হক। সে সময় মুখোমুখি হয়েছিলেন বিজ্ঞানচিন্তার। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন মুনির হাসান আবুল বাসার।

বিজ্ঞানচিন্তা: আপনার জীবনের প্রথম প্রোগ্রামিংয়ের অভিজ্ঞতা বলুন।

এহসান হক: স্কুলজীবন থেকেই কম্পিউটারের সঙ্গে আমার পরিচয়। তবে প্রথম প্রোগ্রামিং শুরু করি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা প্রোগ্রামিং কোর্সেও ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু টানা দুই মাস চেষ্টার পরও অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উঠতে পারছিলাম না। ফলে কোর্স ছেড়ে দিতে হয়। দ্বিতীয়বার আবার ভর্তি হই। সেবারও একই অবস্থা। এক বছর পর অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রোগ্রামিং কোর্সে ভর্তি হই। সেখানে কোর্স প্রশিক্ষক একেবারে গোড়া থেকে ধীরে ধীরে শুরু করেছিলেন। প্রথমে ভাবতাম, পারব না। তবে লেগে ছিলাম। সেবার ওই কোর্সটা বেশ ভালো নম্বর পেয়ে পাস করি। আমি ওই প্রশিক্ষকের কাছে এখনো কৃতজ্ঞ। কারণ, তিনি আমার অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশে প্রযুক্তি খাতে গবেষণা খুব কম। প্রযুক্তি বাজারে আমাদের তৈরি কোনো পণ্য নেই বললেই চলে। এর উন্নতি কীভাবে করা সম্ভব?

এহসান হক: আমার কাজগুলো নিয়ে বেশ কিছু কর্মশালার আয়োজন করেছিলাম। তখন অনেকেই জানান, তাঁরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করতে চান। এ জন্য কোন ধরনের টুল ব্যবহার করবেন, সে বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করেন। আমি তাঁদের প্রথমেই নির্দিষ্ট কোনো সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে বলি। এরপর সেই সমস্যার জন্য কোন টুল নিয়ে কাজ করলে সুবিধা হবে। সবাই ভাবেন, কোন লাইব্রেরির কী তথ্য দিয়ে কোন জটিল সমীকরণ সমাধান করা যায়। তাঁদের উচিত এ ধরনের কাজ করার আগে তাঁরা সেটা কেন করছেন, সে বিষয়ে ভাবা। আমাদের দেশের জন্য খুব বড় একটি সমস্যা ট্রাফিক। প্রতিদিন ট্রাফিক জ্যামে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপচয় করছে। এ রকম সমস্যা সমাধানের কিছু অভিনব উপায় চিন্তা করা যায়। যেমন আমি যদি ধানমন্ডি থেকে গুলশান যেতে চাই, তাহলে কখন রওনা দিলে সহজে পৌঁছানো যাবে?—এ বিষয়ে কারও কাছে কোনো সঠিক, সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। আমার ধারণা, এটা নিয়ে একটা অ্যাপ বানানো যায়। যেটা নির্ধারিত সময়ে রাস্তার ট্রাফিক হিসাব করে আমাদের ট্রাফিকের অবস্থা সম্পর্কে আগাম জানান দিতে পারবে। আমাদের উচিত এ ধরনের ছোট ছোট সমস্যা নিয়ে কাজ শুরু করা। আমরা যাঁরা ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে কাজ করি, তাঁরা হয়তো এ ধরনের সমস্যাগুলো নতুনদের সামনে তুলে ধরতে পারি। তাহলে তাঁরা সেটাকে ভিত্তি করে, সেই সমস্যা সমাধানের পথ ধরে আরও বড় ধরনের লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যেতে পারবেন। বিশ্ববাজারেও আমাদের কন্ট্রিবিউশন বাড়বে তখন।

বাংলাদেশে কম্পিউটারভিত্তিক উচ্চশিক্ষা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কতটা ফলপ্রসূ?

এহসান হক: আমার ধারণা, এ দেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের অন্য দেশের শিক্ষার্থীদের তুলনায় কম মেধাবী নয়। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বন্ধু ভারতের আইআইটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে বেশ উত্সাহ প্রকাশ করেন। তাঁরা মনে করেন, সেখানকার শিক্ষার্থীরা বেশি মেধাবী। কিন্তু আমি তাঁদের প্রায়ই বলি, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রথম সারির শিক্ষার্থীরা কিন্তু কোনো অংশে কম নয়।

লক্ষ করেছি, বিদেশে এখন যাঁরা পড়তে যাচ্ছেন, তাঁদের গাণিতিক দক্ষতা বেশ কম। অনেকেই অনেক কিছু শিখছেন। কিন্তু তিনি সেটা কেন শিখবেন, শিখে কী করবেন, এটা নিয়ে তাঁরা চিন্তা করছেন না। একটা তত্ত্বের ব্যাখ্যা তিনি শিখলেও সেটার ব্যবহারিক দিক নিয়ে ভাবছেন না। এই যে পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের মিল খুঁজে বের করার যে অভাব, সে দিকটা নিয়ে আমাদের কাজ করা উচিত। বিদেশে এই বিষয় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে বলে তারা এখন বেশ ভালোই করছে। এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা শিক্ষকের। আমাদের দেশের শিক্ষকদের কম সময়ে অনেক বেশি শিক্ষার্থী নিয়ে কাজ করতে হয়। তাই ঠিকমতো পাঠদান তারা করতে পারেন না। Coursera.org, edex.com-সহ অনলাইনভিত্তিক যেসব কোর্স ভিডিও আছে, সেগুলো দেখার পরামর্শ দেব আমি। ওগুলোতে লেকচার দেন বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ অধ্যাপকেরা। তাহলে পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের যে সংযোগ, তা খুঁজে পেতে শিক্ষার্থীদের সুবিধা হবে।

আপনার তৈরি ম্যাক ও লিসা প্রোগ্রাম দুটি কীভাবে এ দেশের জন্য ব্যবহারযোগ্য করে তোলা যায়?

এহসান হক: আমাদের দেশে এখনো কাস্টমার সার্ভিসের অবস্থা বেশ করুণ। এটা হয়তো আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে যে ক্রেতার সঙ্গে কঠোরভাবে শক্ত মুখে কথা বলা। এমন কঠিন ব্যবহারের বিষয়টি আসলে কাউকে বলে কিংবা পরামর্শ দিয়ে ঠিক করানো সম্ভব নয়। অনুরোধ ও বিনয়ের সঙ্গে মানুষের সঙ্গে কথা বলাটা জরুরি। এ ক্ষেত্রে আমাকে কিন্তু শুধু শব্দগুলোর অবস্থান বদলে বাক্যেও একটু গাঠনিক পরিবর্তন করলেই চলছে। এই একই ধরনের কাজ কম্পিউটারের মাধ্যমে সহজে করতে পারি। এক্ষেত্রে ম্যাক ও লিসা প্রোগ্রাম ব্যবহার করা যেতে পারে। আমরা প্রথমেই কল সেন্টারগুলো থেকে কাজ শুরু করতে পারি। আমিও স্নাতক করার সময় যুক্তরাষ্ট্রে একটি কল সেন্টারে কাজ করতাম। এখানে একটার পর একটা ফোন আসতেই থাকে। আপনাকে সেগুলোর প্রতিটি ধৈর্য ধরে উত্তর দিতে হবে। অনেক সময় ফোনের অপর পাশ থেকে কটু কথা বলে কিংবা বাজে ব্যবহার করে। কিন্তু আপনি তখন ওই ব্যবহারের পরিবর্তে বাজে ব্যবহার করতে পারবেন না। আপনাকে বরাবরের মতো ভদ্র ব্যবহার করতে হবে। একবার আমি চীনের একটা কল সেন্টারেও আমার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মিত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে যাই। তারা আমার কাছে এমন একধরনের সফটওয়্যার চায়, যেটা দিয়ে বোঝা যাবে যে কোনো কর্মী ক্রেতাদের কেমন সেবা দিচ্ছেন। আমি তাঁদের বলেছিলাম, এটা খুব বেশি ফলপ্রসূ উপায় নয়। কেননা তাহলে প্রত্যেক কর্মীর মাথায় সব সময় এটা কাজ করবে যে কেউ তাঁদের কাজ দেখছে সব সময়। ফলে তাঁরা স্বাধীনভাবে কখনোই নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন না। আমি তখন ওদের একটা ভিন্ন ধরনের টুল দিই। যখন কোনো কর্মকর্তার ফোনে অপর পাশ থেকে ক্ষিপ্ত আচরণের আভাস পাওয়া যায়, তখন ওই টুল দিয়ে আওয়াজের তীক্ষতাকে বদলে দিয়ে সেটাকে আমরা বাচ্চাদের কিংবা হাস্যকর কোনো স্বরে বদলে দিই। এ ক্ষেত্রে কিন্তু দুই পক্ষই খুশি থাকছেন। তাঁরা সঠিকভাবে তাঁদের কাজ করতে পারছেন। প্রযুক্তি ব্যবহারের এটি একটি সুন্দর উদাহরণ। আমরা আমাদের খুব ছোট্ট একটি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেও মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে পারছি। শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে থাকাকালে সাধারণ ফোন ব্যবহার করেই তাঁর কথা বলার নানা রকম অভিব্যক্তি এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে যাচাই করতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমাদের দেশে যেসব তরুণ গবেষণায় আগ্রহী, তাঁদের কী পরামর্শ দেবেন?

এহসান হক: আমার ধারণা, আমাদের উচিত প্রতিটি সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা। ছোট ছোট সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা। আমাদের দেশে আমরা অনেক কিছু নিয়েই সমস্যার মুখোমুখি হই। এখানে যানজট সমস্যা, ময়লা নিষ্কাশন সমস্যা, আবাসন, ঘুষ নেওয়াসহ আরও নানা সমস্যার সঙ্গে নিয়মিত লড়াই করতে হয়। এখন চিন্তা করতে হবে এসব সমস্যা সমাধানে প্রযুক্তিকে কীভাবে সহজে ব্যবহার করা যায়। যেন মানুষ অচিরেই এমন সমস্যাগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। সমস্যার প্রাথমিক সমাধান নিয়ে একবার কাজ শুরু করলে এরপর আপনা-আপনি বোঝা যায় যে পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নিতে হবে।

আমি বলব, আপনার নানা রকম সমস্যার সমাধান নিয়ে চিন্তা করুন। আমাদের দেশে প্রোগ্রামিং সমস্যার সমাধান প্রতিযোগিতা যেমন হয়, তেমনি হয়তো এভাবে বিভিন্ন বাস্তব জীবনের সমস্যা নিয়েও আমরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতা করতে পারি। উচ্চতর শিক্ষা ক্ষেত্রে আসলে এই বিষয়ের প্রতি লক্ষ করা হয় যে কে কতটা ভালোভাবে একটি সমস্যা চিহ্নিত করে সেটার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান করতে পারেন। এরপর থেকেই সাধারণ চিন্তার বাইরেরগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তাই তরুণদের বলব, প্রতিনিয়ত নানা সমস্যা নানাভাবে বিশ্লেষণ করে আরও ফলপ্রসূ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করতে। এটা বর্তমান সময়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তরুণদের উচিত চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করা।

সহকারী অধ্যাপক, রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র

অনুলিখন: আলিমুজ্জামান

লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত

মন্তব্য পড়ুন 0