ন্যানোর জগৎ

আজকাল প্রতিনিয়তই আমরা ন্যানো প্রযুক্তি বা ন্যানো টেকনোলজি (Nanotechnology) শব্দটা শুনে থাকি। তবে সবাই ন্যানো প্রযুক্তির সঙ্গে তেমনভাবে পরিচিত না হলেও আজকের দুনিয়ায় আমাদের দৈনন্দিন জীবন অনেকাংশেই ন্যানো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। ব্যাপারটা অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও কথাটা কিন্তু সত্যি। আমি যখন ২০১০ সালে ন্যানো প্রযুক্তির ওপর পড়তে যুক্তরাষ্ট্রে আসি, এর আগে পর্যন্ত এই বিষয়ে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আজও বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের কাছে ন্যানো প্রযুক্তি এক কল্পকাহিনির মতো। আসলে তা মোটেও নয়। ন্যানো প্রযুক্তির উদাহরণ আমাদের হাতের মুঠোতেই আছে। বিশ্বাস করুন, একটুও বাড়িয়ে বলছি না। আমাদের মুঠোফোন আসলে ন্যানো প্রযুক্তিরই অবদান। কীভাবে? বুঝিয়ে বলছি।

আজ থেকে যদি প্রায় ৭০ বছর আগে যদি ফিরে যাই, ‘ট্রানজিস্টর’-এর উদ্ভাবনের মাধ্যমে ইলেকট্রনিকস ন্যানো প্রযুক্তির সূচনা। ট্রানজিস্টর মানে কিন্তু রেডিও নয় (বাংলাদেশে আগে অনেকেই রেডিওকে ট্রানজিস্টর বলে জানত)। ট্রানজিস্টর হচ্ছে রেডিও তৈরির একটি মূল যন্ত্রাংশ মাত্র। ১৯৪৭ সালে আবিষ্কৃত সেই একটি ট্রানজিস্টরের আয়তন ছিল আমাদের হাতের মুঠোর সমান। অর্থাৎ এর দৈর্ঘ্য ছিল কয়েক সেন্টিমিটার। ঠিক তেমনি প্রথম কম্পিউটার ‘ইনিয়াক’-এর জন্য প্রায় ১৬৭ বর্গমিটার জায়গার দরকার হতো। অথচ রেডিও, টেলিভিশন, ফোন, ক্যালকুলেটরসহ অনেক কিছুই আজ একটি মাত্র মুঠোফোনের মাধ্যমে পরিচালনা সম্ভব। আধুনিক মুঠোফোন বা স্মার্টফোন (যেমন: আইফোন) তৈরিতে ব্যবহূত হয়ে থাকে ২ বিলিয়ন বা দুই শ কোটি অতি ক্ষুদ্র আয়তনের ট্রানজিস্টর। এগুলো এতই ক্ষুদ্র যে প্রচলিত আলোক-অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমেও দেখা সম্ভব নয়। এগুলো দেখতে হয় বিশেষভাবে তৈরি ইলেকট্রন-অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে। এই ট্রানজিস্টরগুলোর একেকটির দৈর্ঘ্য ২০ ন্যানো মিটার। এক ন্যানো মিটার মানে হলো এক মিটারের এক বিলিয়ন বা এক শ কোটি ভাগের এক ভাগ।

default-image
বিজ্ঞাপন

এই যে আমরা এত ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করতে পারছি, যা আমাদের আধুনিক জীবনকে আরও অত্যাধুনিক করে তুলেছে, এটাই ন্যানো প্রযুক্তির অবদান। আর যেসব পদার্থ ন্যানো মিটার-স্কেলে আমাদের পরিচিত পদার্থের (সেন্টিমিটার-স্কেল বা তার বড় আয়তনের, যেমন: ট্রানজিস্টর) সমান বা এর চেয়েও অধিক কর্মশালী হয়ে উঠেছে, সেগুলোকে বলা হয় ন্যানোম্যাটেরিয়াল (Nanomaterial) বা ন্যানোপদার্থ। আবার যেহেতু এগুলো অতিক্ষুদ্র কণা, তাই এগুলোর আরেক নাম হচ্ছে ন্যানোপার্টিকেল (Nanoparticle) বা ন্যানোকণা।

আমরা এতটুকু বুঝি, ন্যানো পদার্থ অনেক ছোট—একদম অণু-পরমাণুর সমান। সেই ছোট আসলেই কত ছোট? ধরুন, আপনি পৃথিবীর ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে ভূপৃষ্ঠের কোথাও পড়ে থাকা একটা ফুটবলকে দেখার চেষ্টা করছেন। আবার একটা ফুটবলের ওপর দাঁড়িয়ে থেকে প্রথম আবিষ্কৃত ন্যানো কণা ফুলারিনকে (Fullerene) খুঁজে বের করতে চাচ্ছেন—এই দুটো ব্যাপার একই রকম।

default-image

কারণ, একটি ফুলারিন ও একটি ফুটবলের ব্যাসের অনুপাতের সমান হচ্ছে একটি ফুটবল এবং পৃথিবীর ব্যাসের অনুপাত। এই গোলাকার ফুলারিন কিন্তু ৬০টি কার্বন (Carbon) পরমাণু পাশাপাশি যুক্ত হয়ে তৈরি হচ্ছে, অর্থাত্ এটি একটি অণু, যার ব্যাস ০.৭ ন্যানো মিটার। একটি পানির অণু, যা কিনা একটি অক্সিজেন আর দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু মিলে তৈরি হয়। এর ব্যাস হলো ০.২৫ ন্যানো মিটার। কিন্তু আমরা ফুলারিনকে অণু না বলে বলছি ন্যানোকণা। কিন্তু কেন? এর কারণ হলো ফুলারিন কিন্তু তরল নয়, বরং একটি অতি ক্ষুদ্র কঠিন পদার্থ অথবা কণা। এ রকম বেশ কিছু কণা আছে, যা কার্বন থেকে তৈরি হয়। যেমন কার্বন ন্যানো টিউব (Carbon Nanotube) এবং গ্রাফিন (Graphene)। এ ছাড়া বিভিন্ন ধাতু থেকেও ন্যানো কণা তৈরি হয়। যেমন সোনা, রুপা, প্লাটিনাম ইত্যাদি।

এখন প্রশ্ন হলো কেন আমরা ন্যানো কণা নিয়ে এত উদ্গ্রীব? এই কণাগুলোর আমাদের পরিচিত সাধারণ পদার্থ থেকে অনেকটাই ভিন্ন ব্যবহার দেখায়। যেমন: কার্বন ন্যানো টিউব লোহার চেয়েও শক্ত। সাধারণ অবস্থায় আমরা কার্বন বলতে বুঝি পেনসিলের সিসা, যা মোটেও এ রকম নয়। এমনকি ধারণা করা হয় যে একদিন হয়তো পৃথিবী থেকে চাঁদ পর্যন্ত মই বানানো যাবে কার্বন ন্যানো টিউব দিয়ে। তবে সেই দিন আসতে এখনো অনেক দূরে। আবার একে অনেকে অলীক কল্পনা বলেই বিবেচনা করেন। এখন যা হচ্ছে তা-ও কিন্তু কম নয়। এই কার্বন ন্যানো টিউব দিয়ে তৈরি হালকা অথচ টেকসই সাইকেল নিয়ে ২০০৬ সালের ট্যুর-দ্য-ফ্রান্স (সাইকেল রেসিংয়ের বিশ্বকাপ)-এ অংশ নেন সাইক্লিস্টরা।

বিজ্ঞাপন

স্বর্ণ আমরা তেমন কোনো কাজে ব্যবহার করি না, একমাত্র অলংকার ছাড়া। আমরা যদি চিন্তা করি, কেন স্বর্ণ এত দামি, তাহলে দেখব যে এর মূল কারণ হচ্ছে স্বর্ণ খুবই নিষ্ক্রিয় একটি পদার্থ। সময়ের সঙ্গে বা আবহাওয়ার কারণে এর কোনো পরিবর্তন হয় না। কোনো রাসায়নিক পদার্থের সঙ্গেও এরা বিক্রিয়া করে না। মজার ব্যাপার হলো ন্যানো স্বর্ণের রং কিন্তু সোনালি নয়, বরং কিছুটা বেগুনি রঙের। এ ছাড়া ১-১০০ ন্যানো মিটার পরিসীমার মধ্যে এদের আয়তনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রঙও পরিবর্তিত হতে থাকে। একই কারণে ন্যানো স্বর্ণ বিক্রিয়া করে থাকে, অনেক ক্ষেত্রে এরা বিক্রিয়ায় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এসব গুণের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই ন্যানো স্বর্ণ ক্যানসার চিকিত্সায় ব্যবহূত হয়ে থাকে। এরা কিছুটা অতি ক্ষুদ্র মিসাইলের মতো কাজ করে। এদের যদি উপযুক্তভাবে বানিয়ে শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে এরা শরীরের রক্তনালি, কলা ও কোষের মধ্যে গিয়ে টিউমার খুঁজে বের করতে পারে। আমরা এমআরআই বা সিটিস্ক্যানের মাধ্যমে তখন সেই টিউমারকে দেখতে পাই। এরপর এগুলো ধ্বংসও করতে পারে ন্যানো স্বর্ণ।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক, বাফেলো, যুক্তরাষ্ট্র

*লেখাটি ২০১৭ সালে বিজ্ঞানচিন্তার এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত

লেখকের নাম যাবে (লেখক:নিরুপম আইচ)

default-image
মন্তব্য পড়ুন 0