গত লেখায় মানুষের কোষের বাইরের দিকটার সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা আমরা পেয়েছি। এবার দেখা যাক করোনাভাইরাসটা কেমন দেখতে। আমাদের কোষের আকৃতি যদি হয় বঙ্গভবনের আয়তনের কোনো দুর্গের মতো, তাহলে করোনাভাইরাসের আকার হলো একটা ফুটবলের মতো। আকারের পার্থক্য দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভাইরাস জীবনযাত্রায় অনেক মিতব্যয়ী। এটা নিয়ে আরেকটু খুলে বলা যাক।

মেমব্রেন-প্রোটিন, যা কোষের দরজার মতো কাজ করে,  ছাড়াও অনেক প্রোটিন অণু থাকে কোষের ভেতরে। প্রোটিন অণু হচ্ছে একটি কোষের আলাদিনের প্রদীপের জিন, প্রায় যাবতীয় কাজ এরাই করে বেড়ায়। মানুষের কোষে আছে অন্তত ২০ হাজার রকমের প্রোটিন অণু। ব্যাকটেরিয়ায়, যেমন যক্ষ্মার ব্যাকটেরিয়ায়, সাধারণত থাকে কয়েক হাজার রকমের প্রোটিন, আর করোনাভাইরাসের একটি কণায় থাকে মাত্র চার রকমের (করোনাভাইরাস রকমফেরে প্রোটিনের প্রকার আরও একরকম বেশি হতে পারে)। একটি জীবন্ত কোষে দৈনন্দিক কাজ চালানো, বাইরের শক্তির গ্রহণ ও তাকে কাজে লাগানো, সময়মতো কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি ও অন্যান্য বিশেষ কাজের জন্য প্রয়োজন হয় নানা রকমের প্রোটিন। ভাইরাসের জীবন সে তুলনায় হিমালয়ের সাধুর মতো। অন্যের কোষ দখল করার আগপর্যন্ত বাজারসদাই, খাওয়াদাওয়ার কোনো বালাই নেই, শুধু থাকে সুযোগের অপেক্ষায়। বাইরে থেকে দেখলে আকৃতির দিক দিয়ে করোনাভাইরাসের হচ্ছে অনেকটা গোলাকার এক মেমব্রেন এবং তার গায়ে বেশ কিছু কাঁটা, অনেকটা আমাদের বর্ষাকালের কদম ফুলের মতন। ভাইরাসের এই মেমব্রেন বা দেয়াল, কিন্তু তার নিজের নয়। জোগাড় করা অন্য একটা মানবদেহের কোষ থেকে, যেখানে হয়েছিল তার জন্ম। ফলে ভাইরাসের মেমব্রেন গঠন ঠিক মানুষের কোষের মেমব্রেনের মতোই। 

কদম ফুলের বাইরের দিকে লম্বা শজারুর কাঁটার মতো প্রোটিনটা স্পাইক বা S নামের এক মেমব্রেন প্রোটিন। আমি এর নাম দিলাম শজারু প্রোটিন। দুর্গের দেয়ালের দেয়ালের সামনে এই শজারু প্রোটিনের আকার বুড়ো আঙুলের মত। শজারু প্রোটিনের গোড়াটা ভাইরাসের মেমব্রেনে আটকানো। এই প্রোটিনের কাজই হলো ACE2-এর সাথে গাঁটছড়া বাঁধা।  শজারু প্রোটিনের ACE2 প্রোটিনের সঙ্গে গাঁটছড়ার প্রক্রিয়া ও তার বিরুদ্ধে মানবদেহের নিজস্ব এবং আমাদের সবার লড়াই শরদিন্দুর ‘শজারুর কাঁটা’র মতোই রোমহর্ষক, এ ব্যাপারে পরে আরও বলছি। 

করোনাভাইরাসের আরও তিন প্রোটিন হল M, E (আরও দুই মেমব্রেন প্রোটিন) ও N বা নিউক্লিওক্যাপ্সিড প্রোটিন।  মেমব্রেনের ভেতর N প্রোটিন ঘিরে রাখে ভাইরাসের আরএনএ, যার মধ্যে লুকানো থাকে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির সূত্র। এই চারকে একত্রে বলে স্ট্যাকচারাল বা অবকাঠামো প্রোটিন। কারণ, এরা ভাইরাসের কাঠামো তৈরিতে সাহায্য করে। এ ছাড়া ভাইরাস বংশবৃদ্ধির নানা কাজ সারার জন্য সাহায্য নেয় আক্রান্ত কোষের বিভিন্ন প্রোটিনের আর ১৬টির মতো নিজস্ব নন-স্ট্রাকচারাল প্রোটিনের, যা আরএনএর সূত্র ধরে তৈরি হয় কোষের ভেতর। এসব নন-স্ট্রাকচারাল বা অকাঠামো প্রোটিন সম্পর্কে পরে বলব। এখন মনোযোগ দেব অবকাঠামো প্রোটিনদের মধ্যে শুধু প্রোটিন শজারুতে। অবকাঠামো ও অকাঠামো প্রোটিন ছাড়াও আরও ৯ রকমের সাহায্যকারী প্রোটিন ভাইরাস তৈরি করে, যার সম্পর্কে আমরা জানি খুবই কম।       

প্রোটিন শজারুর দুটো অংশ। ডগাটা শজারু (S1) আর ভাইরাসের মেমব্রেনের সঙ্গে আটকানো গোঁড়াটা শজারু (S2)। শজারু ও শজারু শুরুতে থাকে জোড়া, আর এই জোড়াতালির জায়গাটা থাকে সযত্নে লুকানো। শজারু–ই কাঁটার লম্বাটে রূপটা দেয় আর শজারু ওর ঘাড়ের ওপর বসে তিন পাপড়ির রঙ্গনের মতো। ভেসে যেতে যেতে কোথাও কোনো ACE2–এর সাথে দেখা হলে শজারু কোনো এক পাপড়ির গাঁটছড়া বেঁধে জোড়াতালির জায়গাটাকে করে দেয় উন্মুক্ত।

প্রোটিনের বাইরের দিকের পরমাণুগুলোর ধনাত্মক-ঋণাত্মক আকর্ষণ, এটা আগেই বলেছি। ভেসে যেতে যেতে প্রেমের আকর্ষণ এক জিনিস, কিন্তু তা থেকে গাঁটছড়া বাঁধার পর্যায় যেতে লাগে আরও গভীর আকর্ষণ।

প্রোটিনের বাইরের দিকটা কিন্তু মসৃণ নয়। বাইরের দিকে থাকে যেমন থাকে নানা রকম ধনাত্মক-ঋণাত্মকের উদাসি-ভালোবাসির (হাইড্রোফোবিক-হাইড্রোফিলিক) বাহার, তেমনি থাকে উঁচুনিচু সব পর্বত ও খাত। একটা প্রোটিনকে যদি পৃথিবীর সমান বড় করে দেওয়া যায়, তাহলে সেখানে সমতল ভূমি বলে কিছু থাকবে না। বরং থাকবে হিমালয়ের মতো পাহাড় আর মহাসাগরের মত গভীর খাতে ভরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখতে পাব, হিমালয়ের থেকে ৫০ গুণ উঁচু পাহাড় বা সাগরের থেকে ৫০ গুণ নিচু খাত। এ রকম এক অণুর পাহাড় যদি অন্য অণুর খাতের কাছাকাছি আসে, আর যদি মিলে যায় আকর্ষণের খেলা, তখনি জোরদার হয় বন্ধন।   

 এ রকম পাহাড় আর খাতের কারণ হলো, প্রোটিন তৈরি হয় ২০ রকমের বিভিন্ন আকারের ইট দিয়ে। একেকটা ইটকে, যা আসলে কিছু পরমাণু দিয়ে তৈরি বলে অ্যামিনো অ্যাসিড। ২০টা অ্যামিনো অ্যাসিডের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে বড় বড় নানা আকারের প্রোটিন। এই ২০ রকমের অ্যামিনো অ্যাসিডের ২০ রকমের চার্জ আর হাইড্রোফোবিক-হাইড্রোফিলিকের প্রবণতা। তার ফলে একটা প্রোটিন যখন আকার নেয়, তার বাইরেরে দিকে গড়ে ওঠে চার্জ আর হাইড্রোফোবিক-হাইড্রোফিলিকের হরেক রকম কারুকার্য ও নানা রকম পাহাড় ও খাত দিয়ে তৈরি ভাস্কর্যের মুরাল।

প্রোটিনের বাইরের দিকে পাহাড় ও খাতে তৈরি মুর‍্যালের ব্যাপারটা পরিষ্কার হলে এখন ফেরা যাক শজারু ও  শজারু-এর জোড়াতালির ব্যাপারে। আমাদের দেহে কিছু প্রোটিন আছে প্রোটিয়েজ নামে,। এদেরকে বাংলায় বলা যায় কাঁচি প্রোটিন। এদের কাজই হল বিশেষ বিশেষ কোন মুর‍্যাল দেখলে সেখানে গিয়ে দুটো অ্যামিনো এসিডের মধ্যে সংযোগটা ছিন্ন করে দেওয়া। মুরালের রকমফেরে নির্ভর করে তাদের সংযোগ কাঁটার ক্ষমতা। জোড়াতালির জায়গাটাও সেরকম বিশেষ ধরনের কাঁচি-বান্ধব একটা মুরাল।

এখানে আমি প্রোটিনগুলোকে অণুর ইমারতের সাথে তুলনা করেছি। এরা কিন্তু ইমারতে মতো এরা এত স্থিতিশীল নয়। বরং গতিবিধির তুলনা করা যায় হাওয়ায় দোদুল্যমান ধান গাছের সাথে। আমাদের দেহের তাপমাত্রায় এরা সবসময়ই ধান গাছের মত দুলছে, সুযোগ পেলে কখনো কখনো কলা গাছের ভেলার মত জলে ভেসে বেড়াচ্ছে।  শজারু-এর সাথে Ace2 এর গাঁটছড়া বাঁধার আগে এই মৃদু দুলুনিতে জোড়াতালির জায়গাটা থাকে লুকানো। আর গাঁটছড়া বাঁধার পর দোলার তাল বদলে গিয়ে জোড়াতালির জায়গাটা হয়ে যায় উন্মুক্ত। যেমন, গাছে ধান আসার আগে গাছগুলো দুলতে থাকে মাথা উঁচু করে। বাম্পার ফলন হলে ধানের ভারে গাছের মাথা যায় নুয়ে, আর বাতাসে  উন্মুক্ত হয়ে যায় গাছের ঘাড়ের অংশ। উন্মুক্ত হওয়ার পর ফিউরিন নামের কাঁচি প্রোটিন যদি আশে পাশে থাকে তাহলে সে টুক করে কেটে দেয় শজারু ও  শজারু–এর মধ্যে জোড়াটা, আর শজারু তখন ভাসতে ভাসতে চলে যায় অন্য কোথায় (তাহলে আমরে পরিচিত হলাম ফিউরিন নামের এক মানব কোষের প্রোটিন বাসিন্দাদের সঙ্গে, যা কোষের দেয়ালে সংযুক্ত থাকে না)। এ যেন সিঁধ কাটার জন্য বিসর্জন দেয়া বুড়ো আঙুলের ডগাকে। এরপর শুরু হয় শজারু এর খেলা। এখানে একটা জিনিস লক্ষ্য করবেন, জোড়াতালি কাটার জন্যও ভাইরাস কিন্তু নিজের প্রোটিন ব্যবহার করেনি। বরং কাজে লাগিয়েছে মানুষের দেহের অন্য এক প্রোটিনকে। এই নিঃশব্দে চুরির জন্যই ভাইরাসের বিরুদ্ধে ওষুধ বার করা বেশ কঠিন।

শজারু-এর ডগার দিকটা হাইড্রোফোবিক বা জল-উদাসী, যেটা শজারু  ঘাড়ের ওপর থাকায় থাকে এক পাশে লুকানো। মাথার ওপর থেকে শজারু-এর ছাতা সরে গেলে, ডগাটা চারিদিকের জল থেকে বাঁচবার তাড়নায় গোটা শজারুকে  বেঁটে ও মোটা থেকে বেশ খানিকটা লম্বা ও সরু করে মাথাটা ঢুকিয়ে দেয় মানুষের কোষের মেমব্রেনের ভেতর। এর ভেতরটা আমরা আগেই জেনেছি যে হাইড্রোফোবিক। হাইড্রোফোবিসিটি বা উদাসী-ভালবাসার ব্যাপারটা সামলানো গেলে  শজারু-এর বাকি অ্যামিনো এসিডগুলো নিজেদের মধ্যে আকর্ষণের ফলে পুনঃমূষিক ভব এর মত আবার বেঁটে ও মোটা অবস্থায় ফিরে আসে। সঙ্গে সঙ্গে কাছে টেনে নিয়ে এসে এক সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে দেয় মানুষের কোষের ওর ভাইরাসের মেমব্রেনকে। এই দুই মেমব্রেন যেহেতু আদতে একইরকম মেমব্রেনের অংশ, জোড়া লাগতে কোন অসুবিধা হয় না। এভাবেই শুরু হয় ভাইরাসের সিঁধ কাটা আর তার বংশ বৃদ্ধির সূত্রধর জিন বা আর এন এ (RNA) এর কোষে প্রবেশ ও সংক্রামণ। এ সংক্রামণের ব্যাপার আরও বিস্তারিত এবং ভাইরাস কী করে বদলায় এবং তার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই এসম্পর্কে বলব পরের লেখায়। এখানে বলে রাখা ভাল  শজারু-এর মত কুশলী সিঁদকাটা চোর করোনা ভাইরাস ছাড়াও আরও অন্য অনেক ভাইরাসও ব্যবহার করে, যেমন HIV, ইবোলা, ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি। ভাল চোরের চাহিদা ভাইরাস সাম্রাজ্যে অনেক বেশী! অন্য কোনদিন এ নিয়ে বলা যাবে, এখন শেষ করতে চাই করোনা-১৯ এর শজারুর কাঁটার এক বিশেষত্ব দিয়ে। 

ওপরে যে শজারু বা স্পাইক প্রোটিনের এত কলাকুশল বর্ণনা করলাম, প্রাণিজগতের অনেক রকম করোনা ভাইরাস এবং মানব দেহের প্রায় সব করোনা ভাইরাসই এই উপায় ব্যাবহার করে এবং এ ব্যাপারে কমবেশি পারদর্শী। কিন্তু বর্তমান মহামারী নভেল করোনা ভাইরাসের শজারুর কাঁটায় আছে দুটো পরিবর্তন, যা একে করে তুলেছে ভয়ংকর। শজারু (S1) এর পাহাড়ের যে অংশ Ace2 খাতের এর সাথে গাঁটছড়া বাঁধে, সেই মুরালটা অন্যান্য করোনা ভাইরাসের থেকে আলাদা। যার ফলে গাঁটছড়া হয় পুরো সাতপাঁকে বাঁধা শক্ত এক বন্ধন। এই বন্ধন অন্য কিছুর ধাক্কায় সহজে খুলে যায় না। আর  শজারু ও  শজারু (S1 and S2) এর জোড়াতালির জায়গাটাও মানুষকে সংক্রামণকারী অন্যান্য করোনা ভাইরাস থেকে আলাদা। হয়ত এ কারণেই প্রয়োজনমত খুব সহজে এই দুই প্রোটিন আলাদা হয়ে যেতে পারে এবং শুরু করতে পারে মানব কোষে ভাইরাসের আরএনএর আগমনী বাজনা।  শজারুর কাঁটার এই দুই নতুন রূপের জন্য অল্প কিছু ভাইরাস কণাই শুরু করে দেয় মানুষের দেহে সংক্রামণ, আর সহজ সংক্রামণ থেকে করোনা-১৯-এর মহামারী।

লেখক: পদার্থবিদ ও কম্পিউট্যাশনাল বায়োলজিস্ট, হ্যামিলটন, যুক্তরাষ্ট্র

ইলাস্ট্রেশন: রায়ান কিসিঞ্জার, মেডিক্যাল ইলাস্ট্র্যাটর এবং আনিম্যাটর, হ্যামিলটন, যুক্তরাষ্ট্র

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0