উড়িধান: এক বিস্ময়কর সম্ভাবনার দ্বার
‘ধনধান্য পুষ্পভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা/ তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা’-কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতেই হয়, আমাদের এই দেশ বাংলাদেশ আসলেই এক সমৃদ্ধিশালী এবং সম্ভাবনার দেশ। বর্তমানে ধান উত্পাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। ভাত এই বাংলার মানুষের প্রধান খাদ্য। তাই ধান উত্পাদন একদিকে যেমন কৃষকের কর্মসংস্থান ও আয়ের মাধ্যম, অন্যদিকে তাঁদের শক্তি ও প্রোটিনের উত্স। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক নোনা পানির জলোচ্ছ্বাস, উজানের নদীগুলোর প্রবাহ হ্রাস এবং খাওয়ার কারণে লবণাক্ততার মাত্রা ও লবণাক্ত অঞ্চলের পরিমাণ প্রতিবছর বাড়ছে। এই বর্ধিত লবণাক্ত অঞ্চলগুলো ধান উত্পাদনের অনুপযোগী। পাশাপাশি উচ্চফলনশীল ধানের জাতগুলো লবণাক্ততা ও খরায় অধিক সংবেদনশীল হওয়ায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে স্থানীয় ধানের জাত চাষ করেন, যার ফলন খুব কম। এ সমস্যাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ইতিমধ্যে চারটি মধ্যম মাত্রার লবণসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য না থাকার কারণে এদের মধ্যে ব্রি-ধান ৪৭ ছাড়া বাকিগুলো তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। তা ছাড়া অতিমাত্রায় লবণ সহনশীল বৈশিষ্ট্যের দেশীয় ধানের জাত খুবই নগণ্য। কিন্তু আশার কথা হলো বাংলাদেশে এমন একটি বন্য ধানের প্রজাতি আছে, যেটা সামুদ্রিক পানির সমতুল্য লবণ পরিবাহিতা (২০০-৪০০ মিলিমোলার) সম্পন্ন মাটিতে জন্মাতে পারে। বন্য ধানের জাতটি স্থানীয়ভাবে উড়িধান নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম: Porteresia coarctata|
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল টেকনাফ থেকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সাতক্ষীরা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা এই ধানের আবাসস্থল। এর ক্রোমোজোম সংখ্যা হলো ৪৮। অন্যদিকে সাধারণ ধানের ক্রোমোজম সংখ্যা হলো ২৪। এই ধান সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে স্বল্প পরিমাণে ফলন দেয়। উড়িধানের প্রকৃতি সাধারণ ধানের চেয়ে নরম ও খেতে সুস্বাদু। অপরিপক্ব অবস্থায় এ ধানের বীজ গাছ থেকে পড়ে শুকিয়ে যায়। তাই এর বীজ থেকে নতুন চারা জন্মানোর উপযোগিতা হারিয়ে ফেলে।
তাই বীজ থেকে বংশবিস্তার না করে এরা রাইজোমের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে। লবণসহিষ্ণু বৈশিষ্ট্যের দাতা হিসেবে এই ধানের ওপর গবেষণা করা একান্ত জরুরি এবং সময়ের দাবি। উড়িধান চারিত্রিক দিক দিয়ে বহুবর্ষজীবী এবং উচ্চমাত্রার লবণসহিষ্ণু হওয়ার কারণে সাধারণ ধানের সঙ্গে সংকরায়ণের মাধ্যমে এর মতো নতুন প্রজাতি উদ্ভাবন সম্ভব। হয়তো সেই নতুন প্রজাতিটিও একাধারে লবণসহিষ্ণু, বহুবর্ষজীবী, মধ্যম মানের ফলনশীল ও পরিবেশবান্ধব হবে। এ ছাড়া সংকরায়ণের মাধ্যমে সাধারণ ধানের মধ্যে উড়িধানের লবণসহিষ্ণু বৈশিষ্ট্য সংযোজন করা গেলে সেটি ধান গবেষণায় এনে দেবে নতুন এক মাত্রা। বিদেশের একদল গবেষক সংকরায়ণ প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি গমের জাত উদ্ভাবন করেছেন। সেটা প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীল ও যেখানে পিতা-মাতা হিসেবে একটি বন্য ও একটি উচ্চ ফলনশীল গমের জাত ব্যবহৃত হয়েছিল।
অধ্যাপক ড. জেবা ইসলাম সিরাজের তত্ত্বাবধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যান্টবায়োটেকনোলজি ল্যাবের একঝাঁক তরুণ গবেষক এ কাজ সফলতার সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন। যেহেতু সংকরায়ণ একটি সময়সাপেক্ষ জটিল প্রক্রিয়া ও সাধারণ ধানের সঙ্গে সংকরায়ণের সময় এই বন্য ধানের ক্রামোজোম সংখ্যা সম্ভবত পরিমাণে কমে যায়। তাই উড়িধানের লবণসহিষ্ণুতা প্রদানকারী জিনগুলো শনাক্ত করে সাধারণ ধানের জাতে প্রতিস্থাপন করা গেলে অতি অল্প সময়ে আমরা উড়িধানের লবণ সহনশীলতার উপযোগিতা আমাদের সাধারণ ধানের জাতের মধ্যে পাব। কয়েক বছর আগে এই ধানের জিনগত রহস্য উন্মোচনের প্রথম ধাপ হিসেবে সাধারণ ও সামুদ্রিক লবণাক্ত পানির উপস্থিতিতে এর ট্রান্সক্রিপ্টোমের (জিনগত তথ্য) ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এই উপাত্ত থেকে উড়িধানের লবণ নিষ্কাশনকারী জিনগুলো শনাক্তকরণ ও সাধারণ ধানে তা প্রতিস্থাপন সহজ হবে। যেহেতু উড়ি একটি সম্ভাবনাময় বন্য ধানের জাত, তাই দেশ-বিদেশে সর্বত্র এটি নিয়ে গবেষণা চলছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, লবণসহিষ্ণুতার জন্য উড়িধানের পাতায় লবণ গ্ল্যান্ড (গ্রন্থি) থাকে। এর মাধ্যমে এটি অতিরিক্ত লবণ কোষের বাইরে বের করে দিয়ে লবণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে গাছকে রক্ষা করে। একই সময়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এনজাইমের কাজও নিয়ন্ত্রণ করে এটি। এই ধানের এনজাইমগুলো সাধারণ ধানের জাতের মতোই, কিন্তু এদের লবণের ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আছে। উড়িধানের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ও ডিটক্সিফিকেশন (ক্ষতিকর পদার্থ নিঃশেষকরণ) ক্ষমতা খুবই দক্ষ, যা অতিরিক্ত লবণের কারণে তৈরি হওয়া ত্রুটি প্রতিরোধে সহায়তা করে। আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল থেকে উড়িধান সংগ্রহ করে মাটির পাত্র ও হাইড্রফোনিক (পুষ্টিকর মাধ্যম) এ জন্মানোর চেষ্টা চালাচ্ছি। পাশাপাশি সংগৃহীত ভিন্ন ভিন্ন জাতের অঙ্গসংস্থানিক এবং শারীরবৃত্তীয় ভিন্নতার পর্যালোচনা করছি। ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় আমরা লক্ষ করেছি, উড়িধান পানি ও মাটির লবণাক্ততার পরিমাণ কমাতে পারে। পাশাপাশি আরও দেখেছি, লবণ সংবেদনশীল ব্রি-ধান ২৮-কে উড়িধানের সঙ্গে একই পাত্রে রাখা হলে ব্রি-ধান ২৮ যে শুধু ১০০ মিলিমোলার পরিমাণ লবণের উপস্থিতিতে বেঁচে থাকে এবং দিব্যি ফসল দেয়। এ ছাড়া লবণ সহনশীল বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি এই ধানের আরও নানা উপকারিতা আছে। যেমন এর রাইজোম থেকে ঝোপের সৃষ্টি হয়, যা মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং এর স্বল্প ফলন উপকূলীয় অঞ্চলে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে কাজে লাগে।
উপরোক্ত গবেষণালব্ধ ফলাফল এবং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বলা যায়, বাংলাদেশে লবণ সহনশীল আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবনে উড়িধানের প্রয়োগ একটি সত্যিই যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমাদের মতো আরও অনেক দেশীয় বিজ্ঞানী যদি এই ধান নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান, তাহলে আশা করা যায় অচিরেই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার এই দেশে সবার খাদ্য নিশ্চিতকরণ সম্ভব হবে।
লেখক: প্রভাষক এবং গবেষক, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়; প্ল্যান্ট বায়োটেকনোলজি ল্যাব, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়