নানাভাবে তাই চেষ্টা করা হচ্ছে কার্বন ডাই–অক্সাইডের পরিমাণ কমানোর, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বাজারে আসছে হাইব্রিড গাড়ি, যেসব গাড়ি শুধু পেট্রল বা ডিজেলে চলবে না, থাকবে সৌর বা বিদ্যুত্শক্তি ব্যবহারের সুযোগ। ব্যবহার বাড়ছে বায়ুশক্তি ও সৌরশক্তি এবং বায়োফুয়েলের। এই বিকল্প শক্তির ধারায় সম্প্রতি যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেকটি নতুন শক্তির উত্স—কৃত্রিম পাতা। গাছের পাতা যেমন সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে গাছের জন্য শক্তি তৈরি করে, তেমনি বিজ্ঞানীদের তৈরি কৃত্রিম পাতা সূর্যের আলো ও পানি ব্যবহার করে জীবাশ্ম জ্বালানির মতো তরল জ্বালানি তৈরি করবে, যা বিভিন্ন ইঞ্জিন বা গাড়িতে ব্যবহার করা যাবে। এর নাম দেওয়া হয়েছে সিনগ্যাস।

কৃত্রিম পাতা আসলে কী?

এই পাতা গাছের সজীব পাতার মতোই, যা সূর্যের আলো ও পানির সাহায্যে সালোকসংশ্লেষণের মতোই রাসায়নিক ক্রিয়ার মাধ্যমে একধরনের তরল রাসায়নিক তেল বা তরল গ্যাস তৈরি করে, যা জ্বালানি তেলের মতো ব্যবহার ও মজুত করা যায়। এলএনজি বা লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস তৈরি করা হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে, যা বোতলজাত বা কনটেইনারে মজুত রেখে ব্যবহার করা যায়। কৃত্রিম পাতা দিয়ে তৈরি করা সিনগ্যাসও একইভাবে পাত্রে তরল অবস্থায় মজুত করা যায়। ভাবা হচ্ছে, আগামী পৃথিবীতে কৃত্রিম পাতা দিয়ে প্রস্তুতকৃত এই জ্বালানিই হবে পেট্রল ও ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি। আর এই গ্যাস তৈরির প্রক্রিয়াটিও তেমন জটিল নয়।

কৃত্রিম পাতা আসলে দুটি পরস্পর সংযুক্ত সেমিক্লাক্টিং ইলেকট্রোড। এটা পানির মধ্যে ডোবালে তা সূর্যের আলোয় সক্রিয় হয়ে পানির হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনকে আলাদা করে ফেলে। অক্সিজেন চলে যায় বায়ুমণ্ডলে, হাইড্রোজেন গ্যাস তরলাকারে জমা হয় পাত্রে। সেটাই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কৃত্রিম পাতা কোনো অবস্থাতেই কার্বন ডাই–অক্সাইড তৈরি করে না, ফলে পরিবেশদূষণও হয় না।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আরউইন রেইজনার তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে সিনগ্যাস উত্পাদনে সাত বছর ধরে গবেষণা করছেন। এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘আপনারা হয়তো সিনগ্যাস কথাটি শুনে থাকবেন, কিন্তু তা যদি সত্যিই আমরা টেকসইভাবে উত্পাদন করতে পারি। তবে তা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি থেকে উৎপন্ন কার্বন ডাই–অক্সাইডের পরিমাণ কমাতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে।’

রেইজনাররা এই গবেষণার জন্য অণুপ্রাণিত হয়েছেন উদ্ভিদের প্রাকৃতিক সালোকসংশ্লেষণ–প্রক্রিয়া দ্বারা যে প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের পাতা সূর্যের আলো, পানি ও কার্বন ডাই–অক্সাইডকে ব্যবহার করে উদ্ভিদের জন্য শক্তি উত্পাদন করে। ঠিক একইভাবে কৃত্রিম পাতায় থাকে দুটি আলোক শোষক বা লাইট অ্যাবসরবার। এগুলো একটি পাত্রে রাখা পানির মধ্যে ডুবিয়ে রাখায় সেগুলো সূর্যের আলো শোষণ করে এবং অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন তৈরি করে। গবেষণার সময় গবেষকেরা এটাও দেখতে পান, কৃত্রিম পাতা স্বল্প আলো এমনকি মেঘলা দিনেও কাজ করতে পারে। দলের গবেষক ও ছাত্র ভার্জিল আন্দ্রেই এ বিষয়ে বলেন, ‘কৃত্রিম পাতা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পৃথিবীর যেকোনো স্থানে কাজ করতে সক্ষম।’ রেইজনার যোগ করেন, ‘আমাদের শক্তি চাহিদার মাত্র ২৫ শতাংশ আমরা এখন বৈদ্যুতিক শক্তি দ্বারা পূরণ করতে পারি, বাকি শক্তির সিংহভাগই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। যদি কৃত্রিম পাতা দিয়ে এ ধরনের তরল জ্বালানির ব্যাপক উত্পাদন সম্ভব হয়, তবে তা বহু ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে।’

কৃত্রিম পাতা তৈরির উপাদান পৃথিবীর বুকে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে প্রকৃতিতে। এ পাতা তৈরি করতে লাগে সিলিকন, কোবাল্ট, নিকেল ও পানি। ভবিষ্যতে সিলিকনের পরিবর্তে আয়রন অক্সাইড ব্যবহার করে কৃত্রিম পাতা তৈরি করা যায় কি না, তা নিয়ে এখন গবেষণা চলছে। কৃত্রিম পাতার পাঁচটি অংশ থাকে—সিলিকন সেমি ক্লাক্টর, যা সূর্যের আলো সংগ্রহ করে; সিও-ওইসি বা কোবাল্ট-অক্সিজেন ইভলভিং কমপ্লেক্স অ্যানোডের দিকে অক্সিজেন জমা করে; নিকেল মলিবডেনাম জিংক কমপ্লেক্স হাইড্রোজেন উত্পাদন করে; আইটিও বা ইন্টিয়াম টিন অক্সাইড স্তর, যা পানিতে সিলকন স্ট্যাবিলাইজিং করে এবং স্টেইনলেস স্টিল, যা কাঠামোর সহায়তা দান করে ও এর ওপরে সিলিকন জমা হয়।

যখন কোনো কৃত্রিম পাতা সূর্যালোকিত স্থানে একটি পানিপূর্ণ পাত্রে স্থাপন বা ডোবানো হয়, তখনই তা থেকে গ্যাসের বুদ্‌বুদ বের হওয়া শুরু হয়। পাতার এক পাশ থেকে অক্সিজেন ও অন্য পাশ থেকে হাইড্রোজেন বের হতে থাকে। পাত্র থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে হাইড্রোজেন সংগ্রহ করে আর একটি পাত্রে জমা রাখা হয়, অক্সিজেনও চাইলে মজুত করে রাখা যায়। অন্যথায় তা বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে পরিবেশদূষণ কমানো যায় যে কাজ সাধারণত উদ্ভিদকুল করে থাকে। অ্যানোড অংশে ঘটে অক্সিডেশন বিক্রিয়া, জারণ অংশে ঘটে বিজারণ বিক্রিয়া। এই জারণ-বিজারণ বিক্রিয়ার ফলেই অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন উত্পন্ন হয়।

জীবাশ্ম জ্বালানির মজুত সীমিত, একদিন তা ফুরিয়ে যাবে। তখন কি হবে পৃথিবীর অবস্থা? তাই এখনই ভাবার সময় এসেছে বিকল্প শক্তি সন্ধানের। কৃত্রিম পাতার মাধ্যমে উত্পাদিত শক্তি একবারেই পরিশুদ্ধ, এর মাধ্যমে পরিবেশদূষণের আশঙ্কা নেই, এর মাধ্যমে কোনো গ্রিনহাউস গ্যাস বা ক্ষতিকর কোনো উপজাত উত্পাদিত হওয়ার আশঙ্কা নেই।

গাছের সত্যিকার পাতার ভেতরে বায়ুমণ্ডল থেকে আহরিত কার্বন ডাই–অক্সাইডের সঙ্গে হাইড্রোজেন মিলে শর্করা, কোষপ্রাচীর ও অন্যান্য জৈব উপাদান গঠন করে। কৃত্রিম পাতায় বিজ্ঞানীরা হাইড্রোজেনকে বিদ্যুৎ বা কার্বন ডাই–অক্সাইডের সঙ্গে মিশিয়ে মিথানল বা বায়োফুয়েল তৈরির চেষ্টা করছেন, যা বিভিন্ন গাড়ির ইঞ্জিনে ব্যবহার করা সম্ভব। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষক জিম বারবার কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি সিলিকনের পরিবর্তে আয়রন অক্সাইড ব্যবহার করে আলোক শোষক সেমিকন্ডাক্টর তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন, যা হবে খুবই সস্তা। কে জানে হয়তো আজকের সোলার প্যানেলের মতো কয়েক বছরের মধ্যেই প্রতি বাড়িতে এই কৃত্রিম পাতার প্ল্যান্ট বসবে কি না? প্রতিটি বাড়িই হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ পাওয়ার হাউস, যা থেকে ঘর আলোকিত করা থেকে গাড়ি পর্যন্ত চলবে এই কৃত্রিম পাতা, সৌরালোক ও পানির জোরে। গবেষকেরা এখন তাকিয়ে আছেন ভবিষ্যতের দিকে, আসলে এই কৃত্রিম পাতা দ্বারা উত্পাদিত জ্বালানি কতটা পেট্রলের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে?

লেখক: কৃষিবিদ ও উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ

সূত্র: সায়েন্স ডেইলি (২১ অক্টোবর, ২০১৯) ও গার্ডিয়ান নিউজ অ্যান্ড মিডিয়া

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন