বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দুটি গবেষণাই জিনতত্ত্ব গবেষণা এমনকি রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রেও নতুন পথের সূচনা করেছে। ডিএনএ বেস এডিটিংয়ের অগ্রপথিক হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ ডেভিড লিউ বলেন, বেস এডিটরগুলো ক্রিসপার থেকে ভালো, এমন ভাবার কোনো অবকাশ নেই। এরা কেবল একটা অন্যটা থেকে ভিন্ন। ক্রিসপার হলো ব্যাকটেরিয়ার একটি আদিমতম রোগপ্রতিরোধের পদ্ধতি। এতে ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণকারী ভাইরাসের দ্বিসূত্রক ডিএনএর ভগ্নাংশ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে বেস এডিটিংয়ে দ্বিসূত্রক ডিএনএ-কে কাটার কোনো দরকারই পড়ে না। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুসারে কিছু এনজাইমের মাধ্যমে একটি ডিএনএ বেসকে রাসায়নিকভাবে অন্য তিনটি বেসের যেকোনো একটিতে পরিবর্তিত করা হয়। বেস এডিটিং ও ক্রিসপারের এই ভিন্নতার কারণে বংশগতি জিন পরিবর্তনের সুযোগ অনেক বেড়ে গেছে।

শুধু একটি বেসের পরিবর্তন মানবদেহে অনেক ধরনের রোগ তৈরি করতে পারে। এ ধরনের একক বেসের পরিবর্তন করতে ক্রিসপার অতটা সফল নয়। এ ক্ষেত্রে বেস এডিটিং অনেক বেশি কার্যকার। লিউয়ের প্রাথমিক গবেষণাপত্র প্রকাশের পর চীনের একটি গবেষক দল এটাকে কাজে লাগিয়েছে। এর জন্য ব্যবহার করেছিলেন একজন রোগীর থেকে ক্লোন করা ভ্রূণ। সেই ভ্রূণে বেস এডিটিং ব্যবহার করে রোগ সৃষ্টিকারী মিউটেশন ঠিক করতে সক্ষম হন।

প্রচলিত এই ক্রিসপার আসলে গাইড আরএনএ ও ক্যাস৯ নিউক্লিয়েজের একটি সমন্বয়, এই যৌগ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত অবস্থায় ডিএনএর একটি নির্দিষ্ট জায়গায় জোড়া লাগে। এরপর দ্বিসূত্র ডিএনএ-কে কেটে ফেলে। তখনই কোষের মেরামতযন্ত্র ওই কাটা অংশ জোড়া লাগাতে চেষ্টা করে। কিন্তু কখনো কখনো সেই পদ্ধতি ব্যর্থ হয় এবং এতে ডিএনএর ক্রমবিন্যাসের কিছু অংশ মুছে যেতে পারে বা ওই কাটা অংশে নতুন কোনো ক্রমবিন্যাস ঢুকে যেতে পারে। ফলে ডিএনএর ওই অংশ অর্থহীন একটি তথ্য বহন করে থাকতে পারে। এই পদ্ধতিতে একটি জিনকে লক্ষ্য করে একে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা যায়। নিউক্লিয়েজের মাধ্যমে জিন এডিটিং জিনকে নিষ্ক্রিয় করতে খুব ভালো ভূমিকা পালন করে। বলেন ব্রড ইনস্টিটিউট, ম্যাসাচুসেটসের ক্রিসপার গবেষক ফেং ঝেং। ক্রিসপার সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটাতে পারদর্শী বলে তিনি উল্লেখ করেন।

একটি একক মিউটেশন ঠিক করতে হলেও ক্রিসপার ক্যাস৯ পদ্ধতিতে পুরো একটি দাতা ডিএনএর ক্রমবিন্যাস লাগে। এতে কোনো মিউটেশন থাকে না এবং এই ডিএনএটা কোষের মেরামতপদ্ধতি ‘হোমোলগি ডিরেকটেড রিপেয়ার’-এর মাধ্যমে গ্রহীতার জেনোমে ঢুকে যায়। কিন্তু হোমোলগি ডিরেকটেড রিপেয়ার পদ্ধতি কোষ বিভাজনের সময় সবচেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল। ফলে যেসব কোষের বিভাজন আর সম্ভব নয়-যেমন, মস্তিষ্ক আর পেশি-এগুলোর ক্ষেত্রে এই কৌশল কাজ করে না। এমনকি বিভাজনক্ষম কোষগুলোতেও খুব কম দাতা ডিএনএ গ্রহীতার জেনোমে জায়গা করে নেয়।

মিউটেশনের মূলে প্রবেশ

বেস এডিটরগুলোও ক্রিসপারের কিছু উপাদান যেমন গাইড আরএনএ ও ক্যাস৯ বা অন্যান্য নিউক্লিয়েজ ব্যবহার করে। কিন্তু এরা দ্বিসূত্রক ডিএনএ-কে কাটে না, বরং একটি বেসকে TadA ও ADAR এনজাইমের মাধ্যমে অন্য বেসে পরিণত করে।

বেস এডিটিং, যা অনেকটা ক্রিসপারের মতোই, খুব সহজেই অবিভাজ্য কোষে কাজ করে। ডিএনএতে চারটি বেস থাকে-এডেনিন (A), থাইমিন (T), সাইটোসিন (C) ও গুয়ানিন (G)। বেস এডিটিং পদ্ধতি এই বেসগুলোকে একটি থেকে অন্য আরেকটি বেসে

রূপান্তরিত করে। ২০১৬ সালে লিউয়ের একটি গবেষক দল গাইড আরএনএর সঙ্গে একটি অকেজো ক্যাস৯-কে জুড়ে দেয়। ফলে ডিএনএ দ্বিসূত্রক আনজিপ হয় ঠিকই, কিন্তু কাটে না। এই যৌগটির সঙ্গে বিজ্ঞানীরা এপোবিই১ নামে একটি এনজাইমকে বেঁধে দিলেন, ফলে সাইটোসিন পরিবর্তিত হয়ে থাইমিন হয়ে গেল। ডিএনএর বেস পেয়ারিংয়ের নিয়ম অনুযায়ী একটি সূত্রকের থাইমিন অন্য সূত্রকের এডেনিনের সঙ্গে জোড়া বাঁধে।

ডি ক্যাস৯-কে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়, যেন এটি ডিএনএ’র অসম্পাদিত সূত্রককে কেটে ফেলে। ফলে কোষের ডিএনএ মেরামত যন্ত্রটি সক্রিয় হয় এবং এটি গুয়ানিনকে এডেনিনে রূপান্তর করে। তারপর এই এডেনিন অন্য সূত্রকে নতুন যে থাইমিন তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে জোড়া তৈরি করে।

ডিএনএ বেস এডিটর প্রথম দিকে মানুষের শরীরে রোগ সৃষ্টিকারী অতিসাধারণ পয়েন্ট মিউটেশনকে চিনতে পারেনি। এই রোগে মানুষের ডিএনএতে A-T বেস জোড়া না থেকে G-C বেস জোড়া থাকে। লিউয়ের দল একটি নতুন এডিটর তৈরি করে, যা এই সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। তাঁরা Escherichia coligi TadA

এনজাইমকে ইঞ্জিনিয়ারিং করে নতুন একটি এনজাইম তৈরি করেন। সেটা এডেনিনকে ইনোসিনে রূপান্তর করে। এরপর আরএনএতে এর আর কোনো পরিবর্তন হয় না, যেমনটা ডিএনএতে হয়। আরএনএতে এই ইনোসিন গুয়ানিনের মতো আচরণ করে। TadA-কে ইঞ্জিনিয়ারিং করা মোটেও সহজ ছিল না। হার্ভার্ডের ক্রিসপার গবেষক জর্জ বলেন, ‘যাঁরা এই দুঃসাধ্য কাজটি করেছেন, তাঁদের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।’

ঝাংয়ের দল গাইড আরএনএর সঙ্গে ভিন্ন একটি নিউক্লিয়েজ ডিক্যাস১৩ এবং একটি প্রাকৃতিক এনজাইম যুক্ত করে একটি আরএনএ বেস এডিটর তৈরি করে, যা এডেনিনকে ইনোসিনে রূপান্তর করতে পারে। ডিএনএর মতো আরএনএতেও এর কোনো পরিবর্তন হয় না। আরএনএতেও নিজেই এর মতো আচরণ করে। ডিএনএ থেকে আমিষ তৈরির কারখানায় তথ্য পাঠানো বা নিজেও জিন নিয়ন্ত্রণের একটি সক্রিয় অণু হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি, চিকিত্সার ক্ষেত্রেও আরএনএ খুবই আকর্ষণীয় একটি লক্ষ্যবস্তু। কিন্তু কোষে আরএনএ খুব অল্প সময় ধরে থাকে। ফলে আরএনএ বেস এডিটরগুলো বারবার রোগীর শরীরে দিতে হবে। তাই ঝাং ও তাঁর দল এটিকে অস্থায়ী অবস্থা যেমন স্থানিক প্রদাহ নিরাময়ে ব্যবহারের উপযোগী হবে বলে দাবি করেন। কিন্তু আরএনএগুলো খুবই ক্ষণজীবী। এ কারণে চিকিত্সার ক্ষেত্রে আরএনএ বেস এডিটরগুলোর আবেদন তুলনামূলকভাবে কম। যদিও সান্দিমার এর মধ্যে একটি ভালো দিকও দেখতে পান। তিনি বলেন, কখনো কখনো আরএনএ নিয়ে কাজ করা বেশি নিরাপদ। গবেষকেরা ডিএনএর বেস এডিটর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অনেক সময় ঘটনাক্রমে জেনোমের একটি ভুল জায়গায় এডিটরটি কাজ করতে পারে। ফলে জেনোমের একটি স্থায়ী পরিবর্তন ঘটাতে পারে। অপর দিকে আরএনএ বেস এডিটর সম্পর্কে সান্দিমার বলেন, যদি কোনো ক্ষেত্রে স্বল্পমাত্রায় লক্ষ্যভেদও হয়, তা জেনোমের কোনো স্থায়ী পরিবর্তন ঘটাবে না।

বেস এডিটিং থেরাপির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। হয়তো বা আরও বেশি সময়ও লাগতে পারে। তবে যা-ই হোক, ক্রিসপারের থেকেও ভালো বিকল্প যে ইতিমধ্যে মাঠে নেমেছে, এটি পুরোপুরি স্পষ্ট।

লেখক: শিক্ষার্থী, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্স ম্যাগাজিন

জীববিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন